করাত কল শ্রমিক
দুইটা আঙুল দিয়ে কাঠ কিনেছি।
১
বাঁ হাতের তিনটা আঙুল আছে। বুড়ো আঙুল আর কড়ে আঙুল। মাঝখানের তিনটার মধ্যে একটাই আছে, তর্জনী। বাকি দুইটা নেই। মধ্যমা আর অনামিকা।
আট বছর আগে করাতের ব্লেড নিয়ে গেছে।
কাটেনি, ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। একটা টান, একটা আওয়াজ, গরম রক্ত, সাদা হাড়। বদরুল সেদিন চিৎকার করতে পারেনি। গলা থেকে শব্দ বের হয়নি। চোখ দিয়ে দেখেছে আঙুল দুইটা মেঝেতে পড়ে আছে। কুঁচকে যাচ্ছে। ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। তার নিজের আঙুল, তার থেকে আলাদা হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। কাঠের গুঁড়ার মধ্যে। রক্তে ভিজে কাঠের গুঁড়া কালচে হয়ে যাচ্ছে।
ওস্তাদ ছুটে এসে গামছা জড়িয়ে দিল হাতে। রক্ত থামল না। গামছা ভিজে লাল হলো। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত মেঝেতে পড়ছিল। কাঠের গুঁড়ার ওপরে রক্তের ফোঁটা।
রিকশায় করে হাসপাতাল। জেলা হাসপাতাল। ডাক্তার সেলাই করল। আঙুল জোড়া লাগানোর কোনো কথাই হলো না। সেটা শুধু সিনেমায় হয়। মাইক্রোসার্জারি লাগে। জেলা হাসপাতালে মাইক্রোসার্জারি হয় না। ঢাকায় হয়। ঢাকায় যাওয়ার টাকা নেই। সময়ও নেই। আঙুল ততক্ষণে মরে গেছে। মাংস মরে যায় দ্রুত। রক্ত না পেলে মাংস মরে যায়।
বদরুল হাসপাতাল থেকে ফিরে এসেছিল ব্যান্ডেজ হাতে। বউ কেঁদেছিল। মা কেঁদেছিল। বদরুল কাঁদেনি। কান্না আসেনি। ডাক্তার বলেছিল শক। পরে কান্না আসবে। আসেনি। আট বছরেও আসেনি।
কান্না শুকিয়ে গেছে ভেতরে। অথবা কান্নার জায়গায় অন্য কিছু বসে গেছে। শক্ত কিছু। পাথরের মতো।
২
মালিক পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিল। পাঁচ হাজার। দুইটা আঙুলের দাম পাঁচ হাজার। আঙুল প্রতি আড়াই হাজার।
বদরুল হিসাবটা মাঝে মাঝে করে। মনে মনে। কাউকে বলে না।
দুইটা আঙুল দিয়ে সে আট বছর কাজ কিনেছে। মালিক তাকে বের করে দেয়নি, এটাই ক্ষতিপূরণ। ভাবখানা এমন যে আঙুল কাটা মানুষকে রেখে মালিক দয়া করেছে। তিন আঙুলে যে কাজ করতে পারে এমন লোক তো সহজে মেলে না। মালিক দয়া করেনি। মালিক সুবিধা নিয়েছে। তিন আঙুলের লোককে কম মজুরিতে রাখা যায়। কে আর রাখবে। অন্য কলে কাজ দেবে না। ঝুঁকি। দুর্ঘটনা হলে দায়িত্ব নিতে হবে।
দুইটা আঙুল দিয়ে কাঠ কিনেছি, বদরুল বলে।
কথাটায় রাগ নেই। বিদ্রূপ আছে। শুকনো বিদ্রূপ। আট বছরের পুরনো বিদ্রূপ। বিদ্রূপটাও এখন অভ্যাস। প্রথম প্রথম বলতে ভেতরটা মোচড় দিত। এখন কিছু হয় না। মুখের পেশি নড়ে, কথা বের হয়, ব্যস।
শ্রমিক আইনে ক্ষতিপূরণের বিধান আছে। বদরুল জানে না। জানলেও কিছু করতে পারত না। আইন জানা আর আইন পাওয়া আলাদা জিনিস। আইন বইয়ে আছে। কোর্টে আছে। বদরুলের জীবনে নেই। বদরুলের জীবনে আছে তিনটা আঙুল, একটা করাত, পাঁচশো টাকা।
৩
সকাল ছয়টায় কল খোলে। বদরুল আসে সাড়ে ছয়টায়। হেঁটে আসে। দশ মিনিটের রাস্তা। পায়ে স্যান্ডেল, গায়ে একটা ময়লা গেঞ্জি, মাথায় গামছা বাঁধা। গামছা ছাড়া কল-এ ঢোকা যায় না। কাঠের গুঁড়া চুলে জমে।
করাতের ব্লেড চেক করে। তেল দেয়। মেশিন চালু করে। করাত ঘুরতে শুরু করে। সেই আওয়াজ। চিরচির চিরচির। ধাতব, তীক্ষ্ণ, বিরামহীন। ইস্পাতের দাঁত ঘুরছে, প্রতি সেকেন্ডে হাজারবার। এই আওয়াজ শুনলে আগে কানে ব্যথা হতো। এখন হয় না। কান অভ্যস্ত হয়ে গেছে। অথবা কান আধা বধির হয়ে গেছে। দুইটার মধ্যে কোনটা ঠিক বদরুল জানে না। জানার ইচ্ছাও নেই।
কাঠ আসে ট্রাকে। টিক, সেগুন, শাল, মেহগনি। বড় বড় গোল গুঁড়ি। ভারী। এক একটা গুঁড়ি দুইশো কেজি হয়। দুইজনে মিলে নামায়। কাঁধে দাগ পড়ে গেছে। চামড়া কালো, শক্ত। বারো বছর কাঠ বইতে বইতে কাঁধের চামড়া কাঠ হয়ে গেছে।
ক্রেনে তুলে করাতের কাছে আনে। বদরুল কাঠ ধরে, ঠেলে দেয় ব্লেডের দিকে। ব্লেড ঘুরে, কাঠ চিরে যায়। সমান, সোজা। গুঁড়ি থেকে তক্তা হয়। তক্তা থেকে ব্যাটেন হয়। ব্যাটেন থেকে পাটাতন হয়।
তিনটা আঙুলে কাঠ ধরে। আগে পাঁচটায় ধরত। এখন তিনটায়। গ্রিপ কম। হাত পিছলে যাওয়ার ভয় আছে সবসময়। সেই ভয়টা শরীরে ঢুকে গেছে। পেশিতে আছে। হাড়ে আছে। প্রতিটা ধাক্কায়, প্রতিটা টানে, ভয়টা জেগে ওঠে। ব্লেডের কাছে হাত যেতেই হৃৎপিণ্ড একটু দ্রুত চলে।
আট বছর হয়ে গেছে। তবু শরীর ভোলেনি। শরীর কিছু ভোলে না। মাথা ভোলে। শরীর ভোলে না।
৪
করাত যখন কাঠ চেরে, তখন ধুলো ওড়ে। কাঠের গুঁড়া। সূক্ষ্ম, হালকা, বাতাসে ভাসে। সোনালি রঙ। রোদ পড়লে ঝিকমিক করে। সুন্দর দেখায়। কিন্তু ওই সূক্ষ্ম গুঁড়া নাকে ঢোকে। মুখে ঢোকে। গলায় যায়। ফুসফুসে ঢোকে। জমে। স্তরে স্তরে জমে। বছরের পর বছর।
মাস্ক দেয় না বদরুল। মাস্ক পরলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। গরমে ঘাম হয়। মাস্ক ভিজে যায়। নাকে-মুখে লেপটে ধরে। তারচেয়ে না পরাই ভালো। মালিক মাস্ক দেয় না। কিনতে বলে। বদরুল কেনে না। ত্রিশ টাকার মাস্ক কিনতে হলে একটা চায়ের পয়সা কমবে। মাস্ক না চা। এই হিসাব গরিবের। গরিব মাস্ক বাদ দেয়। চা রাখে। কারণ চা এখন সুখ দেয়। ফুসফুস কুড়ি বছর পরে মরবে। কুড়ি বছর পরের মৃত্যু আজকের চায়ের চেয়ে কম জরুরি।
দশ বছর ধরে কাঠের গুঁড়া খাচ্ছে বদরুলের ফুসফুস। সকালে কাশি হয়। ঘন কাশি। শুকনো না, ভেজা। কফ ওঠে। কফে মাঝে মাঝে কাঠের রঙ দেখা যায়। হলদেটে, বাদামি। শাল কাঠের গুঁড়া লালচে হয়। টিকের গুঁড়া বাদামি। মেহগনির গুঁড়া গাঢ়। বদরুলের কফে সব রঙ আছে। কাঠের রংধনু।
ফুসফুস ভারী হয়ে যাচ্ছে। আগে দৌড়াতে পারত। এখন সিঁড়ি উঠলে হাঁপায়। দুই তলায় উঠতে দাঁড়াতে হয়। নিশ্বাস নিতে হয়। বুকে একটা চাপ অনুভব হয়। যেন কেউ ভেতর থেকে চাপ দিচ্ছে।
ডাক্তারের কাছে যায়নি। যাওয়ার দরকার নেই। ডাক্তার কী বলবে সেটা বদরুল জানে। বলবে কাজ ছেড়ে দিতে। ধুলো থেকে দূরে থাকতে। কাজ ছেড়ে দিলে খাবে কী। ডাক্তারের কথা শুনলে রোগ সারে, কিন্তু পেট মরে। ফুসফুস বাঁচাতে গেলে পেট মরবে। পেট বাঁচাতে গেলে ফুসফুস মরবে।
বদরুল পেট বেছে নিয়েছে। গরিবের পেট সবসময় জেতে। ফুসফুস হারে।
৫
দিনে পাঁচশো টাকা। সকাল ছয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা। এগারো ঘণ্টা। ঘণ্টায় পঁয়তাল্লিশ টাকা। মিনিটে পঁচাত্তর পয়সা।
বদরুলের চার সন্তান। বড় ছেলে গার্মেন্টসে কাজ করে। মেয়ে বিয়ে হয়ে গেছে। দুই ছোট স্কুলে যায়। বউ ঘরে। পাঁচশো টাকায় ছয়জনের সংসার চলে না। বড় ছেলে কিছু দেয়। মেয়ের জামাই দেয় না, নিজেরই চলে না। পাঁচশো টাকায় চাল হয়, ডাল হয়, তেল হয়, একটু সবজি হয়। মাছ সপ্তাহে একদিন। মাংস ঈদে।
বদরুলের হাত দিয়ে যে কাঠ কাটা হয়, সেই কাঠ দিয়ে আলমারি হয়। খাট হয়। ডাইনিং টেবিল হয়। শো-কেস হয়। বুকশেলফ হয়। সোফার ফ্রেম হয়।
একটা টিকের খাটের দাম পঞ্চাশ হাজার। বদরুলের একশো দিনের মজুরি। একটা ডাইনিং টেবিলের দাম পঁচিশ হাজার। পঞ্চাশ দিনের মজুরি। একটা আলমারির দাম ত্রিশ হাজার। ষাট দিনের মজুরি।
বদরুল সেই খাটে ঘুমাবে না কোনোদিন। বদরুল মাটির মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে ঘুমায়। একটা পাতলা তোশক আছে, তুলা চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। মাটির শক্ততা টের পাওয়া যায় পিঠে।
এই সব জিনিস যেসব ড্রইংরুমে যায়, বদরুল সেসব ড্রইংরুমে ঢুকবে না। গেটেও দাঁড়াতে পারবে না। গেটে দারোয়ান আছে। দারোয়ান জিজ্ঞেস করবে কী চাই। বদরুল বলবে কিছু না। কিছু না বলে চলে আসবে।
কিছু না। এটাই বদরুলের উত্তর। সব জায়গায়। কী চাই। কিছু না। কেমন আছো। ভালো। ভালো মানে কিছু না। কিছু না মানে ভালো।
৬
কলের ভেতরে শব্দের রাজত্ব। করাতের শব্দ সবচেয়ে বড়। তীক্ষ্ণ, বিরামহীন, কান ফাটায়। তারপর কাঠ পড়ার শব্দ। ধুম। ভারী, ভোঁতা। মাটি কাঁপে। তারপর ক্রেনের শব্দ। ঘড়ঘড়। ইস্পাতের চেইন ঘুরছে। তারপর চেঁচামেচি। শ্রমিকরা চেঁচিয়ে কথা বলে। করাতের আওয়াজে স্বাভাবিক গলায় কথা শোনা যায় না। গলা ফাটিয়ে বলতে হয়। তবু অনেক সময় শোনা যায় না। তখন হাতের ইশারায় কাজ চলে।
বদরুলের ডান কানে কম শোনে। বাঁ কানে তবু কিছু শোনা যায়। ডান কান করাতের দিকে থাকে। দশ বছরের শব্দ সেই কান প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ডাক্তার বলবে নয়েজ-ইনডিউসড হিয়ারিং লস। বদরুল বলে কান ভারী। শব্দ আলাদা, মানে একই।
বউ রাতে কিছু বললে বদরুল বলে হ। ডান কান বালিশে চাপা, বাঁ কানে অস্পষ্ট শোনে। বউ রাগ করে। বলে কথা শোন না। বদরুল বলে শুনি। আসলে শোনে না। শুনতে পায় না। শুনতে চায় না সেটাও হতে পারে। সারাদিন করাতের আওয়াজ শুনে রাতে আর কোনো আওয়াজ শোনার ইচ্ছা থাকে না।
৭
রাতে বদরুল শোয়। চোখ বন্ধ করে। করাতের আওয়াজ শুরু হয়। চিরচির চিরচির। মাথার ভেতরে। বন্ধ হয় না।
দশ বছর ধরে এই আওয়াজ মাথায় বাজে। জেগে থাকলে আশপাশের শব্দে চাপা পড়ে। রাস্তার শব্দ, মানুষের কথা, টিভির আওয়াজ। ঘুমালে আর কোনো শব্দ নেই। শুধু করাত। করাত একা হয়ে যায়। নিঃসঙ্গ আওয়াজ। অন্ধকারে করাত ঘুরছে, কাঠ নেই, শুধু ঘুরছে। ফাঁকা ঘুরছে। বদরুলের মাথার ভেতরে করাত কাঠ ছাড়াই ঘুরে।
মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখে আঙুল কাটছে। আবার। একই ঘটনা। একই ব্লেড। একই গরম রক্ত। কিন্তু স্বপ্নে পাঁচটাই কাটে। অথবা হাতটাই কাটে। অথবা দুই হাতই কাটে। স্বপ্নে কোনো সীমা নেই। জেগে থাকলে দুইটা কেটেছে। ঘুমালে কত কাটবে ঠিক নেই।
ঘুমেও করাতের আওয়াজ শুনি, বদরুল বলে। জেগে থাকলে হাত কাটে, ঘুমালে স্বপ্ন কাটে।
কোনটা বেশি কষ্টের জিজ্ঞেস করলে বদরুল চুপ করে থাকে। উত্তর দেয় না। কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দরকার নেই। প্রশ্নটাই উত্তর।
৮
বদরুলের সাথে আরো চারজন শ্রমিক কাজ করে। রহিম, জব্বার, সোহেল, মনির। সবার শরীরে দাগ আছে। রহিমের বুড়ো আঙুলে সেলাইয়ের দাগ। জব্বারের কপালে কাঠ পড়ে ফেটেছিল, সেই দাগ। সোহেলের বাঁ চোখে কম দেখে, কাঠের ছিলকা ঢুকেছিল। মনির নতুন, এখনো কোনো দাগ নেই। বদরুল মনিরের দিকে তাকায়। ভাবে কতদিন। কতদিন দাগহীন থাকবে।
কেউ কোনোদিন ক্ষতিপূরণ পায়নি। মালিকের একটা কথা: সাবধানে কাজ করো। সাবধান মানে দায়িত্ব শ্রমিকের। দুর্ঘটনা মানে শ্রমিকের দোষ। মেশিনে গার্ড নেই। সেফটি গ্লাভস নেই। ইয়ার প্লাগ নেই। গগলস নেই। কিচ্ছু নেই। শুধু সাবধান। সাবধান শব্দটা সস্তা। মালিকের কিছু খরচ হয় না।
দুপুরে ভাত খায় সবাই একসাথে। মাটিতে বসে। বটপাতায়। ভাত, ডাল, একটু সবজি। কথা বলে। হাসে। করাতের আওয়াজ থেমে থাকে আধঘণ্টা। সেই আধঘণ্টা স্বর্গ। কান বিশ্রাম পায়। ফুসফুস বিশ্রাম পায়। হাত বিশ্রাম পায়।
তারপর আবার শুরু। আবার আওয়াজ। আবার ধুলো। আবার ভয়।
৯
বদরুলের বউ রাবেয়া। রাবেয়া সেলাই করে। অন্যের কাপড় সেলাই করে। মাসে দুই-তিন হাজার আসে। বদরুলের পাঁচশো আর রাবেয়ার দুই হাজার মিলিয়ে সংসার চলে। কোনোরকম।
রাবেয়া বদরুলের হাতের দিকে তাকায়। তিন আঙুলের হাত। আট বছর হয়ে গেছে, তবু অভ্যস্ত হতে পারেনি। মাঝে মাঝে ভুলে যায়, হাত ধরতে গেলে আঙুলের ফাঁকা জায়গা ছুঁয়ে ফেলে। সেই ফাঁকা জায়গাটা মসৃণ, সেলাইয়ের দাগ আছে। রাবেয়া হাত সরিয়ে নেয়। কিছু বলে না। বদরুলও কিছু বলে না। দুইজনে চুপ থাকে।
রাতে শোয়ার সময় বদরুল বাঁ হাত বালিশের তলায় রাখে। লুকিয়ে রাখে। অভ্যাস হয়ে গেছে। বাঁ হাত কেউ দেখুক চায় না। দিনে কলে কাজ করার সময় কোনো সমস্যা নেই। সবাই জানে। কিন্তু রাতে, অন্ধকারে, নিজের বউয়ের পাশে, বাঁ হাত লুকিয়ে রাখে। লজ্জা না। অভ্যাস। অথবা লজ্জাই। অভ্যাস হয়ে যাওয়া লজ্জা।
১০
বিকেলে কাজ শেষ। শরীরে কাঠের গুঁড়া। চুলে, ভ্রুতে, নাকের লোমে, কানের ভেতরে। গুঁড়া ঝেড়ে ফেলে বদরুল। গামছা দিয়ে মুখ মোছে। সব যায় না। কিছু থেকে যায়। চামড়ার ভাঁজে, নখের তলায়। কিছু ভেতরে থেকে যায়। ফুসফুসে। চামড়ার গুঁড়া ধুলে যায়। ভেতরের গুঁড়া কোনোদিন যায় না।
বদরুল হেঁটে বাড়ি যায়। রাস্তায় একটা ফার্নিচারের দোকান। শো-রুম। কাচের দেয়ালের ভেতরে টিকের খাট সাজানো। ম্যাট্রেস, বালিশ, চাদর, সব সাজানো। কেউ ঘুমায় না সেই খাটে। শুধু সাজানো। এসির ভেতরে ঠান্ডা ঘরে দামি কাঠ।
বদরুল দাঁড়িয়ে দেখে। কাঠটা চেনে। টিক। বার্মিজ টিক। গত মাসে এই কাঠ সে কেটেছিল। হয়তো এই কাঠই। হয়তো না। কিন্তু একই ধরনের কাঠ। একই করাতে কাটা। বদরুলের হাতের ছাপ আছে এই কাঠে। তিন আঙুলের ছাপ। যদিও পলিশ করে মুছে ফেলেছে। পলিশ সব মোছে। শ্রমিকের ছাপ, ঘামের দাগ, রক্তের দাগ। পলিশের নিচে কিছু নেই। শুধু কাঠ। শুধু দাম।
দাম লেখা: ৬৫,০০০ টাকা।
বদরুল বাঁ হাতের তিনটা আঙুল দিয়ে কাচে ছোঁয়। কাচ ঠান্ডা। কাঠ দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না। ছোঁয়ার দরকারও নেই। কাঠ চেনে বদরুল। গন্ধে চেনে, শব্দে চেনে, ওজনে চেনে। করাতে কাটলে কোন কাঠ কেমন আওয়াজ করে সেটা বলতে পারবে চোখ বন্ধ করে। টিক ভারী আওয়াজ করে, গম্ভীর। শাল তীক্ষ্ণ, ঝনঝন। মেহগনি নরম, প্রায় ফিসফিস।
কিন্তু কাঠ বদরুলকে চেনে না। কাঠ শো-রুমে বসে আছে। বদরুল রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে কাচ।
কাচটা পাতলা। কিন্তু এই পাতলা কাচ বদরুল কোনোদিন ভাঙবে না। ভাঙার কথা মাথায়ও আসে না। বদরুল ভাঙে না। বদরুল কাটে। কাঠ কাটে। আর কাটা হয়। আঙুল কাটা হয়। স্বপ্ন কাটা হয়। ফুসফুস কাটা হয়। আয়ু কাটা হয়।
কাটতে কাটতে একদিন কিছু থাকবে না। শুধু করাতের আওয়াজ থাকবে। সেটাও থামবে। তখন নিস্তব্ধ।
নিস্তব্ধতাও একটা আওয়াজ। সবচেয়ে জোরে।
বদরুলের ছোট ছেলে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল: বাবা, তোমার আঙুল কই?
বদরুল বলেছিল: করাত খেয়ে ফেলেছে।
ছেলে বলেছিল: করাত খায়?
বদরুল বলেছিল: হ্যাঁ। করাত সব খায়। কাঠ খায়। আঙুল খায়। সময় খায়। আয়ু খায়।
ছেলে বুঝল না। বুঝবে না। বুঝলে ভালো হবে না। কিছু কিছু কথা না বোঝাই ভালো। বোঝা মানে ভার। বোঝা মানে কষ্ট। ছেলে বড় হোক। নিজে বুঝুক।
বদরুল চায় না ছেলে করাত কলে কাজ করুক। কিন্তু ছেলে কী করবে সেটাও জানে না। গরিবের ছেলে কী করে। যা পায় তাই করে। যা পায় না তা চায় না। এটাই নিয়ম। এটাই করাত। শুধু এই করাতের ব্লেড দেখা যায় না।