মোটর মেকানিক

জিনিয়াস হলে মেকানিক হতাম না।

পর্ব ৭৭ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

হাত কালো। গ্রিজের কালো। সাবান দিয়ে ধুলেও যায় না। নখের তলায় কালো জমে আছে স্থায়ীভাবে। আঙুলের রেখায় গ্রিজ ঢুকে গেছে। হাতের দাগ দেখলে বোঝা যায় না ভাগ্যরেখা কোনটা, কর্মরেখা কোনটা। সব একাকার। কালো। গ্রিজ কোনো রেখা মানে না। সব রেখা ঢেকে দেয়।

আনিস গ্রামের ছেলে। ময়মনসিংহের একটা গ্রাম। ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে। স্কুল ছেড়েছে, কারণ বাবা বলেছিল পড়ে কী হবে।

বাবা রিকশা চালাত। রিকশাওয়ালার ছেলে পড়ে কী হবে। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলেও রিকশাই চালাতে হবে। সার্টিফিকেট দিয়ে ভাত হয় না। গ্রামে এসএসসি পাশ করে যারা বেকার, তাদের দেখলে বোঝা যায় বাবা ঠিকই বলেছিল। সার্টিফিকেট ঘরে, বেকারত্ব হাতে।

আনিস মোটরসাইকেল ঠিক করে। হোন্ডা, ইয়ামাহা, বাজাজ, টিভিএস, হিরো। সব চেনে। ইঞ্জিন খুললে ভেতরটা পড়তে পারে। কোন পার্টস ক্ষয়ে গেছে, কোন বিয়ারিং শব্দ করছে, কোন সিল লিক করছে, কোন ভালভ ক্লিয়ারেন্স বেশি। চোখে দেখে, কানে শোনে, হাতে ছুঁয়ে বোঝে, নাকে শুঁকে বোঝে।

পোড়া গন্ধ মানে ক্লাচ প্লেট। তেলের গন্ধ মানে সিল লিক। ধাতুর গন্ধ মানে বিয়ারিং শেষ। মিষ্টি গন্ধ মানে কুল্যান্ট লিক। প্রতিটা সমস্যার একটা গন্ধ আছে।

কারো কাছে শেখেনি। মানে কোনো ওস্তাদের কাছে না। ইউটিউবে শিখেছে।

গ্রামে ওয়াইফাই নেই। মোবাইল ডাটা কিনে ভিডিও দেখত। রাতে, যখন ডাটা সস্তা। একটা ভিডিও দশবার দেখত। বারোবার। পনেরোবার। হাত দিয়ে নোট করত খাতায়, যেটা স্কুলে করত না। ইংরেজি ভিডিও, কিছু বুঝত না। কিন্তু হাত দেখত। ভিডিওতে লোকটার হাত কী করছে, সেটাই আসল। কথা গুরুত্বপূর্ণ না। কথা কেউ বোঝে না, হাত সবাই বোঝে।

ইন্ডিয়ান ভিডিও কিছু পেত হিন্দিতে। হিন্দি একটু বোঝে। সিনেমা থেকে শেখা। শাহরুখের সিনেমা দেখে হিন্দি শিখেছে। সিনেমাও শিক্ষা। কে বলেছে সিনেমা থেকে কিছু শেখা যায় না।

প্রথম মোটরসাইকেল খুলেছিল নিজেরটা। বাবার পুরনো হোন্ডা সিডি-৮০। বিশ বছরের পুরনো। কালো, চ্যাপ্টা, মরচে ধরা। ইঞ্জিন খুলল, পার্টস সাজিয়ে রাখল মাটিতে। একটা পুরনো চাদরের ওপরে। কোনটা কোথা থেকে খুলেছে মনে রাখল। ভিডিও দেখল। আবার জোড়া দিল।

স্টার্ট হলো না।

আবার খুলল। আবার ভিডিও দেখল। দুইবার দেখল। তিনবার দেখল। টাইমিং চেইন উলটো লাগিয়েছিল। একটা দাঁত এদিকে-ওদিকে হলে ইঞ্জিন ধরে না। ঠিক করল। আবার জোড়া দিল। কিক মারল।

স্টার্ট হলো।

ইঞ্জিনের আওয়াজ। ধক ধক ধক। আনিসের কাছে সেদিন সবচেয়ে সুন্দর শব্দ ছিল। এখনো আছে। একটা মরা ইঞ্জিন যখন বেঁচে ওঠে, সেই প্রথম ধকধক, সেটা কোনো গানের চেয়ে কম না।

আসল পার্টসের দাম বেশি। হোন্ডার একটা আসল ক্লাচ প্লেটের দাম আটশো টাকা। চীনের কপি পার্টস দুইশো। দেখতে একই রকম। ওজন একটু কম। ধাতুর গুণগত মান কম। কিন্তু এসব কাস্টমার জানে না। চোখে দেখে একই। হাতে ধরে একই। শুধু ছয় মাস পরে বোঝা যায় আসল আর কপির পার্থক্য।

আনিসও বলে না। বলার দরকার নেই।

কাস্টমার সস্তা চায়। আসল পার্টস দিলে বলবে দাম বেশি, অন্য মেকানিকের কাছে যাব। তখন কাস্টমার যাবে। আনিসের পেট চলবে না। গরিব মেকানিক আর গরিব কাস্টমার মিলে কপি পার্টসের বাজার চালায়।

চীন থেকে কনটেইনার ভর্তি কপি পার্টস আসে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ঢোকে। ঢাকার বনগ্রাম থেকে ছড়িয়ে যায় সারা দেশে। পাইকারি দোকান থেকে খুচরা দোকান। খুচরা দোকান থেকে মেকানিক। মেকানিক থেকে মোটরসাইকেল। সাপ্লাই চেইন।

কপি পার্টস ছয় মাস চলে। আসল চলে তিন বছর। কিন্তু কাস্টমার ছয় মাস পরে ভুলে যায় কবে বদলেছিল। আবার আসে। আবার কপি পার্টস। আবার দুইশো টাকা। চক্র। এই চক্রে সবাই ঘুরছে। কাস্টমার ঘুরছে, আনিস ঘুরছে, চীনের ফ্যাক্টরি ঘুরছে। চক্র থেকে বের হওয়ার উপায় নেই। কারণ বের হতে হলে টাকা লাগে। টাকা নেই।

আনিস জানে এটা ঠিক না। কিন্তু ঠিক-বেঠিক দিয়ে গ্যারেজ চলে না। গ্যারেজ চলে পার্টসের মার্জিনে। লেবারে লাভ নেই। পার্টসে লাভ। এটাই নিয়ম। সব মেকানিকের নিয়ম। আনিস নিয়ম বানায়নি। নিয়ম ভাঙেওনি।

আনিসের টুলবক্স লোহার। ভারী। দশ কেজি হবে। পুরনো, মরচে ধরেছে কোণায়। কিন্তু ভেতরটা পরিষ্কার। তেল মাখানো। প্রতিটা টুল নির্দিষ্ট জায়গায়। আনিস জানে কোন টুল কোথায় আছে চোখ বন্ধ করে।

হাতুড়ি বাঁ দিকে। পেঁচকস চার সাইজের মাঝখানে। রেঞ্চ সেট ডান দিকে। প্লায়ার্স, স্পার্ক প্লাগ রেঞ্চ, ফিলার গেজ, মাল্টিমিটার। মাল্টিমিটারটা সবচেয়ে দামি। বারোশো টাকা দিয়ে কিনেছে। ডিজিটাল। ভোল্টেজ, অ্যাম্পিয়ার, রেজিস্ট্যান্স মাপে। ইলেকট্রনিক ফল্ট ধরতে লাগে।

টুলবক্সের দাম হিসাব করলে বারো হাজার টাকা হবে। আনিসের ঘরের দাম দশ হাজার। টিনের ছাউনি, বাঁশের বেড়া, মাটির মেঝে। বৃষ্টিতে চুঁইয়ে পড়ে। ঝড়ে টিন ওড়ে। কিন্তু টুলবক্স শক্ত। টুলবক্স ভাঙে না। টুলবক্স আনিসের আসল ঘর। ঘর ভাঙলেও টুলবক্স আছে। টুলবক্স আছে মানে আনিস আছে।

হাতুড়ি, পেঁচকস, রেঞ্চ, এগুলো আমার সম্পদ, আনিস বলে। এগুলো দিয়ে আমি মোটরসাইকেল জিন্দা করি।

জিন্দা শব্দটা আনিস ইচ্ছে করে বলে। মোটরসাইকেল মেরামত করি বলে না। জিন্দা করি বলে। কারণ যখন একটা মোটরসাইকেল স্টার্ট হয় না, সেটা মরা। আনিস সেটাকে বাঁচায়। ডাক্তার যেমন রোগী বাঁচায়। কিন্তু ডাক্তার ভিজিট নেয় পাঁচশো টাকা। আনিস নেয় দুইশো।

ডাক্তারকে ডাক্তার বলে সবাই। সম্মান করে। আনিসকে বলে মেকানিক। সম্মান করে না। দুইজনই বাঁচায়। কিন্তু একজনের সম্মান আছে, আরেকজনের নেই। একজনের হাত পরিষ্কার, আরেকজনের হাত কালো। পরিষ্কার হাতের সম্মান বেশি।

একদিন একটা রয়্যাল এনফিল্ড আসল। পুরনো মডেল। বুলেট। ৩৫০ সিসি। সিঙ্গেল সিলিন্ডার। ভারী, কালো, গম্ভীর চেহারা। মালিক একজন ডাক্তার। শহর থেকে এসেছে। গ্রামের বাড়ি দেখতে এসেছে। ফেরার পথে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে।

কিক মারতে মারতে পা ব্যথা হয়ে গেছে ডাক্তারের। বুলেটের কিক ভারী। সাধারণ মোটরসাইকেলের মতো না। পুরো শরীরের ওজন দিতে হয়। ডাক্তার মোটা মানুষ। ঘাম ঝরছে। মুখ লাল।

আনিস ইঞ্জিনের কাছে কান পাতল। কিক মারল একটা। শুনল। ইঞ্জিন ঘুরছে কিন্তু ধরছে না। কম্প্রেশন আছে। স্পার্ক আছে। ফুয়েল আসছে না।

বলল, কার্বুরেটর জ্যাম।

খুলল। পরিষ্কার করল। জেট নিডল বদলাল। ফ্লোট চেম্বারের তলানি বের করল। পুরনো পেট্রোল জমে গ্যাম হয়ে গেছে। আঠালো, বাদামি। ফিল্টার বদলাল। এয়ার ফিল্টারও পরিষ্কার করল, ধুলো জমে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

চল্লিশ মিনিট। শান্তভাবে, ধীরে ধীরে। তাড়াহুড়ো নেই। প্রতিটা বোল্ট ঠিকমতো টানল। টর্ক অনুভব করল হাতে। কতটুকু টাইট করতে হবে সেটা হাত জানে। টর্ক রেঞ্চ নেই। হাতই টর্ক রেঞ্চ।

স্টার্ট দিল। ইঞ্জিন ধরল। বুলেটের সেই ধুক ধুক ধুক আওয়াজ। মোটা, ভারী, বুকে কাঁপুনি লাগে। গ্যারেজের টিনের চাল কাঁপে।

ডাক্তার বলল, তুমি তো জিনিয়াস।

আনিস বলল, জিনিয়াস হলে মেকানিক হতাম না।

ডাক্তার হাসল। মজা পেয়েছে। আনিস হাসেনি। মজার কিছু বলেনি। সত্যি কথা বলেছে।

জিনিয়াস শব্দটা গরিবের জন্য প্রশংসা। ধনীর জন্য বিবরণ। ডাক্তারকে জিনিয়াস বললে মানুষ বিশ্বাস করে। মেকানিককে জিনিয়াস বললে মানুষ হাসে। একই শব্দ, দুই ওজন।

ডাক্তার পাঁচশো টাকা দিল। আনিস তিনশো চেয়েছিল। ডাক্তার বলল রাখো। আনিস রাখল। দুইশো টাকা বেশি। বেশি টাকাটা টিপ না। দয়া। দয়ার টাকা গরিবের পকেটে ভারী হয়ে বসে। কিন্তু ফেরায় কে।

দিনে ছয়শো টাকা হয়। কোনোদিন চারশো, কোনোদিন আটশো। গড়ে ছয়শো। মাসে আঠারো হাজার। ভাড়া নেই, নিজের জমিতে গ্যারেজ। কিন্তু পার্টস কিনতে মূলধন লাগে। মূলধনের সুদ লাগে।

মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া। মাসে দশ শতাংশ। বারো মাসে একশো বিশ শতাংশ। গণিত জানলে মহাজনের কাছে যাওয়া যায় না। আনিস গণিত জানে না। ইঞ্জিন জানে। ইঞ্জিনের হিসাব বোঝে, টাকার হিসাব বোঝে না।

বউ হিসাব রাখে। খাতায়। প্রতিদিনের আয়-ব্যয়। বউ বলে সুদে খাচ্ছে। আনিস বলে কী করব। ব্যাংক দেবে না। ব্যাংকে যেতে হলে জামানত লাগে। জামানত মানে জমি। জমি নেই। টিনের ঘর জামানত হয় না। মহাজনের জামানত লাগে না, সুদ লাগে। জামানত না সুদ, গরিবকে একটা বেছে নিতে হয়। দুইটাই বিষ।

সন্ধ্যায় গ্যারেজ বন্ধ করে আনিস। টুল গুছিয়ে রাখে টুলবক্সে। তালা মারে। হাত ধোয়। কেরোসিন দিয়ে ধোয়, তারপর সাবান। গ্রিজ যায়, কিন্তু গন্ধ থাকে। পেট্রোল, গ্রিজ, ধাতুর গন্ধ। বউ বলে তোমার গায়ে সবসময় মেশিনের গন্ধ। আনিস বলে এটাই আমার আতর।

বউ নাক কুঁচকায়। আনিস হাসে। গরিবের আতর সবসময় অন্যরকম।

গ্যারেজটা টিনের। তিন দিকে টিন, সামনে খোলা। মেঝে কাঁচা, সিমেন্টের না। বৃষ্টিতে কাদা হয়। গরমে ধুলো ওড়ে। একটা পুরনো পাখা, সিলিংয়ে ঝোলানো। সেটা কাজ করে, কিন্তু বাতাস দেয় কম। গরমে গ্যারেজের ভেতর চুলার মতো। টিনের ছাদ গরম হয়, ভেতরে তাপ আটকে থাকে। ঘাম গড়ায় গায়ে, চোখে ঢোকে, ঝাপসা দেখায়।

শীতে গ্যারেজ ঠান্ডা। লোহার টুল ধরলে হাত জমে। রেঞ্চ ধরতে কষ্ট হয়। আঙুল অবশ হয়ে যায়। আনিস হাতে ফুঁ দেয়। গরম করে। তারপর কাজ করে।

গ্যারেজে একটা পুরনো ক্যালেন্ডার ঝোলানো। ২০২১ সালের। পাঁচ বছর আগের। ছেঁড়া নেই। সুন্দরী মেয়ের ছবি আছে, মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে। মেয়ের হাত পরিষ্কার। নখে রঙ। আনিসের হাত কালো। নখে গ্রিজ। দুইটা হাত একই মোটরসাইকেলের দুই পাশে। একটা বিজ্ঞাপনের, একটা বাস্তবের।

আনিসের ছেলে একটা। তিন বছর। ছেলের হাত ছোট, নরম, পরিষ্কার। আনিস ছেলেকে কোলে নেয়। হাত ধোয় আগে। ভালো করে ধোয়। কেরোসিন, সাবান, দুইবার। তারপর কোলে নেয়। ছেলের পরিষ্কার জামায় কালো দাগ যেন না লাগে। আনিসের কালো হাত ছেলের সাদা জামায় ছোঁয় না। সাবধানে ধরে। কিন্তু মাঝে মাঝে একটু দাগ লেগে যায়। বউ বলে আবার দাগ। আনিস বলে ধুলে যাবে। যায়। কিন্তু আবার লাগে। এটাও চক্র।

একদিন একটা ই-বাইক এলো গ্যারেজে। ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে না। মালিক বলল দেখো। আনিস দেখল। ইঞ্জিন নেই। কার্বুরেটর নেই। চেইন নেই। গিয়ার নেই। শুধু মোটর। ব্যাটারি। কন্ট্রোলার। তিনটা জিনিস। তিনটাই ইলেকট্রনিক।

আনিস কন্ট্রোলারের ঢাকনা খুলল। সার্কিট বোর্ড। ছোট ছোট চিপ। রেজিস্টর। ক্যাপাসিটর। সোল্ডারিং। আনিসের রেঞ্চ এখানে অচল। আনিসের হাতুড়ি এখানে অচল। এখানে সোল্ডারিং আয়রন লাগে। মাল্টিমিটার লাগে। অসিলোস্কোপ লাগে। আনিসের কোনোটাই নেই।

আনিস বলল ভাই এটা আমার কাজ না। সার্ভিস সেন্টারে যান।

মালিক চলে গেল। আনিস তাকিয়ে থাকল ই-বাইকের দিকে। এটাই ভবিষ্যৎ। এটাই সেই জিনিস যেটা আনিসের কাজ কেড়ে নেবে। ধীরে ধীরে। মোটরসাইকেল কমবে। ই-বাইক বাড়বে। কার্বুরেটর যাবে। সার্কিট বোর্ড আসবে।

আনিস কি সার্কিট বোর্ড শিখবে। শিখতে পারবে। ইউটিউবে আছে। কিন্তু টুল কিনতে হবে। সোল্ডারিং আয়রন, হিট গান, পাওয়ার সাপ্লাই। দশ হাজার টাকা। দশ হাজার টাকা কোথায়।

সব কিছু শেখা যায়। কিন্তু সব কিছু কেনা যায় না।

রাতে মোবাইলে ইউটিউব দেখে। নতুন মডেলের সার্ভিস ম্যানুয়াল। ফুয়েল ইনজেকশন সিস্টেম। ইলেকট্রনিক ইগনিশন। ইসিইউ ম্যাপিং। সেন্সর ক্যালিব্রেশন।

পুরনো কার্বুরেটর আনিস চোখ বন্ধে ঠিক করতে পারে। কার্বুরেটর সহজ। যান্ত্রিক। হাতে ধরা যায়, চোখে দেখা যায়। নতুন ইঞ্জিনে কম্পিউটার আছে। সেন্সর আছে। এরর কোড আছে। ওবিডি স্ক্যানার লাগে। একটা স্ক্যানারের দাম পাঁচ হাজার। কিনতে হবে। না কিনলে পাঁচ বছর পরে কাজ থাকবে না।

আনিস শেখে। রাত দুইটায় ঘুমায়। সকাল সাতটায় গ্যারেজ খোলে। পাঁচ ঘণ্টা ঘুম। চোখ লাল থাকে। কিন্তু হাত ঠিক থাকে। হাতে ভুল হয় না। ঘুম কম হলেও হাত ঠিক কাজ করে। হাত আলাদা প্রাণী। হাত ক্লান্ত হয় না।

ক্লাস নাইনে স্কুল ছেড়েছিল। কিন্তু পড়া ছাড়েনি। শুধু ক্লাসরুম বদলেছে। ক্লাসরুম এখন ইউটিউব। শিক্ষক এখন ইউটিউব। পাঠ্যবই এখন সার্ভিস ম্যানুয়াল। পরীক্ষা এখন প্রতিটা ইঞ্জিন।

পাশ করা মানে ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়া। ফেল করা মানে কাস্টমার চলে যাওয়া। মার্কশিট নেই। সার্টিফিকেট নেই। শুধু ইঞ্জিনের আওয়াজ আছে। সেটাই প্রমাণ। সেটাই সার্টিফিকেট।

আনিস এখনো ফেল করেনি। একদিন করবে হয়তো। নতুন প্রযুক্তি যেদিন আনিসের হাতকে হারাবে, সেদিন আনিস ফেল করবে।

কিন্তু সেদিন আসেনি এখনো। আনিসের হাত এখনো চলছে। কালো হাত। গ্রিজমাখা হাত। কিন্তু চলছে।

সকালে গ্যারেজ খোলে। প্রথম কাজ চা। রাস্তার চায়ের দোকান থেকে দশ টাকার চা। চায়ের কাপে আনিসের আঙুলের কালো দাগ লাগে। চায়ের কাপে গ্রিজের ছাপ। চা-ওয়ালা কিছু বলে না। অভ্যস্ত।

চা শেষ হলে প্রথম কাস্টমার। অথবা কোনো কাস্টমার নেই। তখন বসে থাকে। বসে থাকার মধ্যেও কাজ আছে। পুরনো পার্টস পরিষ্কার করে। টুল গুছিয়ে রাখে। গ্যারেজের মেঝে ঝাড়ু দেয়। তেলের দাগ মোছে। তেল কখনো পুরোপুরি মোছে না। নতুন তেল পুরনো দাগের ওপরে পড়ে। স্তরে স্তরে তেল। গ্যারেজের মেঝে তেলের ইতিহাস।

আনিস মোটরসাইকেল জিন্দা করে। কিন্তু আনিসকে কে জিন্দা করবে। আনিসকে জিন্দা করে ছেলের হাসি। বউয়ের রান্না। ইঞ্জিনের প্রথম ধকধক। আর চায়ের প্রথম চুমুক। এটুকুতেই চলে। এটুকুই যথেষ্ট।