সাইকেল মেকানিক
মরা পেশা শিখিয়ে কী হবে?
১
রাস্তার পাশে বসে। একটা বটগাছের তলায়। সামনে একটা বাতাসের পাম্প। একটা পানির বালতি। কিছু টুকরো রাবার। একটা আঠার টিউব। কয়েকটা রেঞ্চ। একটা টায়ার লিভার। একটা পুরনো ছুরি, রাবার কাটার জন্য।
এটাই দোকান।
ছাউনি নেই। বৃষ্টি হলে গাছের তলায় দাঁড়ায়। রোদ হলে গাছের ছায়ায় বসে। গাছটাই দোকান। গাছটাই ছাদ। গাছটাই ঠিকানা। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে বটতলায়। এটাই ঠিকানা। নম্বর নেই। গলি নেই। শুধু বটতলা।
মাসুদ সাইকেল ঠিক করে। পাংচার সারায়। চেইন লাগায়। ব্রেক অ্যাডজাস্ট করে। স্পোক টানটান করে। বিয়ারিং বদলায়। টায়ার বদলায়। হাব ওভারহল করে। ফ্রি-হুইল খুলে পরিষ্কার করে। পেডাল বদলায়। হ্যান্ডেলবার সোজা করে। সব করে। প্রতিটা কাজ হাতে শেখা। বাবার কাছে শেখা। বাবার বাবার কাছে শেখা। তিন প্রজন্মের হাত।
কিন্তু কাজ নেই।
২
দশ বছর আগে এই রাস্তায় সাইকেল ছিল। সারাদিন সাইকেল যেত। স্কুলের ছেলেরা সাইকেলে। বাজারের মানুষ সাইকেলে। মাঠে যাওয়া কৃষক সাইকেলে। ডাক্তারের কাছে যাওয়া রোগী সাইকেলে। ডাকপিয়ন সাইকেলে। মাস্টারমশাই সাইকেলে।
সাইকেল ছিল গরিবের ঘোড়া। তেল লাগে না। লাইসেন্স লাগে না। ট্যাক্স লাগে না। ইনস্যুরেন্স লাগে না। শুধু পা চালাও। পা থাকলেই সাইকেল চলে।
মাসুদ তখন দিনে পাঁচশো টাকা কামাত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাইন লেগে থাকত। একটা পাংচার সারাতে বিশ টাকা। দিনে পঁচিশ-ত্রিশটা পাংচার। ব্রেক, চেইন, স্পোক ধরলে আরো বেশি। পাঁচশো টাকা অনায়াসে। কখনো সাতশো। ভালো দিনে এক হাজার।
বৃষ্টির দিনে বেশি পাংচার হতো। কাঁদা ঢুকত টায়ারে। কাঁচ ঢুকত। পেরেক ঢুকত। কাঁটা ঢুকত। বৃষ্টি মাসুদের বন্ধু ছিল। বৃষ্টি মানে কাজ। রোদ মানে কম কাজ।
সাইকেল যখন গরিবের ঘোড়া ছিল, আমি ঘোড়ার ডাক্তার ছিলাম, মাসুদ বলে। এখন ঘোড়া বদলে গেছে।
৩
মোটরসাইকেল এলো। বাজাজ, হিরো, টিভিএস। কিস্তিতে পাওয়া যায়। মাসে তিন হাজার টাকা দিলে মোটরসাইকেল। ডাউন পেমেন্ট বিশ হাজার। বাকি কিস্তি। তিন বছরে শোধ। সাইকেলে ঘাম হয়, পা ব্যথা হয়, ধীরে যায়। মোটরসাইকেলে বাতাস লাগে, জোরে যায়, পা চালাতে হয় না।
গরিবও মোটরসাইকেল কেনে এখন। ধানের টাকা দিয়ে কিস্তি দেয়। গরু বেচে ডাউন পেমেন্ট দেয়। মোটরসাইকেল স্ট্যাটাস। সাইকেল দারিদ্র্য। সাইকেল চালালে মানুষ বলে গরিব। মোটরসাইকেল চালালে বলে চলে। কেউ দরিদ্র দেখাতে চায় না। সবাই চলে দেখাতে চায়। চলা মানে ইজ্জত। না চলা মানে অপমান।
তারপর ই-বাইক এলো। ব্যাটারির বাইক। চার্জ দিলেই চলে। তেলের খরচ নেই। কিলোমিটারে এক টাকা। মোটরসাইকেলে পাঁচ টাকা। শব্দ নেই। ধোঁয়া নেই। পরিবেশবান্ধব।
ই-বাইক চালায় যারা, তারা মেকানিকের কাছে যায় না। সার্ভিস সেন্টারে যায়। কম্পিউটার দিয়ে চেক করে। সফটওয়্যার আপডেট করে। মাসুদের রেঞ্চ দিয়ে ই-বাইক ঠিক হয় না। ই-বাইকের ভেতরে রেঞ্চ ঢোকে না। ই-বাইকের ভেতরে সার্কিট বোর্ড আছে। সার্কিট বোর্ড রেঞ্চে ঠিক হয় না। সার্কিট বোর্ড আনিসের জন্য। মাসুদের জন্য না।
৪
এখন দিনে দুই-তিনটা সাইকেল আসে। কোনোদিন একটা। কোনোদিন কিছু না। শূন্য।
পাংচার বিশ টাকা। ব্রেক তিরিশ টাকা। চেইন লাগানো পঞ্চাশ। দিনে দেড়শো-দুইশো টাকা। কোনোদিন একশো। কোনোদিন শূন্য। শূন্য মানে সারাদিন বসে থাকা। রাতে খালি হাতে বাড়ি ফেরা।
বিশ টাকার পাংচার। বিশ টাকায় কী হয়। একটা চায়ের দাম পনেরো টাকা। একটা পাংচার সারালে একটা চা আর পাঁচ টাকা বাকি। পাঁচ টাকায় কিছু হয় না। পাঁচ টাকা মাটিতে পড়ে থাকলে কেউ তুলবে কি না সন্দেহ।
মাসুদ বসে থাকে বটগাছের তলায়। সামনে দিয়ে মোটরসাইকেল যায়। ই-বাইক যায়। অটো যায়। সিএনজি যায়। ট্রাক যায়। বাস যায়। মাঝে মাঝে একটা সাইকেল যায়। পুরনো, মরচে ধরা, চেইন ঝুলে যাওয়া। রিমে টায়ার আলগা। প্যাডেলে রাবার নেই, লোহার প্যাডেল, পায়ে কাটে। যার মোটরসাইকেল কেনার সামর্থ্য নেই, সে এখনো সাইকেল চালায়।
মাসুদের কাস্টমার এখন শুধু সেই মানুষগুলো। যারা সবচেয়ে গরিব। গরিবের মধ্যেও যারা সবচেয়ে গরিব।
গরিবের ডাক্তার হয়ে গেছি, মাসুদ বলে। গরিব কমলে ডাক্তারও শেষ।
কিন্তু গরিব কমছে না। বাড়ছে। তবু সাইকেল কমছে। গরিবও এখন মোটরসাইকেল কেনে। ধার করে কেনে। সুদে কেনে। কিন্তু কেনে। সাইকেল চালানো লজ্জা হয়ে গেছে। লজ্জা দারিদ্র্যের চেয়ে শক্তিশালী। লজ্জা ক্ষুধার চেয়ে শক্তিশালী। লজ্জা সবচেয়ে শক্তিশালী।
৫
মাসুদের ছেলে রাকিব। বাইশ বছর। মোটরসাইকেল চালায়। বাজাজ পালসার। কিস্তিতে কেনা। লাল রঙ। চকচক করে।
রাকিব জানে না সাইকেলের পাংচার কীভাবে সারাতে হয়। টিউব কীভাবে বের করতে হয় জানে না। টায়ার লিভার কীভাবে ধরতে হয় জানে না। আঠা কীভাবে লাগাতে হয় জানে না। রাবারের টুকরো কীভাবে কাটতে হয় জানে না। সাইকেলের চেইন কীভাবে খুলতে হয় জানে না। জানার দরকারও নেই।
রাকিব কাপড়ের দোকানে কাজ করে। মাসে দশ হাজার। মোটরসাইকেলের কিস্তি তিন হাজার। বাকি সাত হাজার। সাত হাজারে রাকিব চলে। মাসুদের দুইশো টাকার দিনের চেয়ে রাকিবের দশ হাজার অনেক বেশি। কিন্তু রাকিবের খরচও বেশি। মোটরসাইকেলের তেল, রক্ষণাবেক্ষণ, কিস্তি, ফোনের বিল, কাপড়। সব মিলিয়ে রাকিবেরও চলে না। বাপ-ছেলে দুইজনেরই চলে না। কিন্তু রাকিবের মোটরসাইকেল আছে। স্ট্যাটাস আছে।
মাসুদ শেখায়নি। ইচ্ছে করে শেখায়নি।
ছেলেকে শেখাইনি, মাসুদ বলে। মরা পেশা শিখিয়ে কী হবে।
মরা পেশা।
মরা পেশা। শব্দটা মাসুদ নিজে তৈরি করেছে। কেউ শেখায়নি। অভিধানে নেই। কিন্তু সত্য। পেশাটা মরে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে। দশ বছর আগে শুরু হয়েছে। আরো দশ বছর পরে সম্পূর্ণ শেষ হবে।
মাসুদ শেষ প্রজন্মের সাইকেল মেকানিক। তার পরে কেউ নেই। কেউ শিখবে না। কেউ শেখাবে না। কোনো ইউটিউব ভিডিও নেই সাইকেল পাংচার সারানোর। কেউ বানায়নি। বানানোর দরকার নেই। কে দেখবে।
৬
মাসুদের বউ জরিনা কাজ করে। অন্যের বাড়িতে। বাসন মাজে, কাপড় ধোয়, ঘর ঝাড়ু দেয়। তিনটা বাড়িতে কাজ করে। মাসে ছয় হাজার টাকা। মাসুদের দুইশো টাকার চেয়ে জরিনার ছয় হাজার বেশি। মাসুদ জানে। জরিনাও জানে। কিন্তু কেউ বলে না।
জরিনা কখনো বলে না তুমি কম কামাও। বলার দরকার নেই। সংসার চলে জরিনার টাকায়। মাসুদের টাকা বোনাস। আগে মাসুদের টাকায় সংসার চলত। জরিনা ঘরে থাকত। এখন উলটো।
মাসুদ এটা নিয়ে ভাবে। বটগাছের তলায় বসে ভাবে। একজন পুরুষ যখন তার পরিবারের খরচ চালাতে পারে না, তখন সে কী। শুধু মানুষ। পুরুষ না। গ্রামে পুরুষ মানে যে কামায়। যে কামায় না সে পুরুষ না। মাসুদ কামায়। কিন্তু কম। কমও পুরুষ না।
মাসুদ এসব ভাবনা ঝেড়ে ফেলে। বটগাছের পাতা ঝরে পড়ে। মাসুদের ভাবনাও ঝরে পড়ে। বাতাসে উড়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে আবার আসে। ভাবনা পাতার মতো। ঝরে, আবার গজায়।
মাসুদের হাতের তালুতে ক্যালাস আছে। পাম্প চালাতে চালাতে হয়েছে। হাজার হাজার পাম্প চালিয়েছে। হাজার হাজার পাংচার সারিয়েছে। সেই হাতে এখন কাজ নেই। কিন্তু ক্যালাস আছে। ক্যালাস মোছে না। ক্যালাস সাক্ষী। বলে এই হাতে একদিন কাজ ছিল।
৭
মাসুদের পাম্পটা পুরনো। কাস্ট আয়রনের। ভারী। হাতে চালাতে হয়। ওপরে-নিচে। ওপরে-নিচে। একটা সাইকেলের চাকায় হাওয়া ভরতে পঞ্চাশবার চালাতে হয়। পঞ্চাশবার মানে পঞ্চাশবার ওপরে-নিচে। হাত ব্যথা হয়।
নতুন পাম্প আছে বাজারে। ইলেকট্রিক। প্লাগ লাগাও, বোতাম টেপো, হাওয়া ভরে। কিন্তু মাসুদের বিদ্যুৎ নেই। বটগাছের তলায় বিদ্যুৎ কোথা থেকে আসবে। সোলার প্যানেল কিনতে পারে। কিন্তু সোলার প্যানেল কিনে ইলেকট্রিক পাম্প চালালে কত খরচ। পাঁচ হাজার। পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে কি দিনে দশ টাকার পাম্পিং করার জন্য পাম্প কেনা যায়। যায় না। হিসাব মেলে না।
মাসুদের পাম্পের হাতলে তার হাতের ছাপ আছে। লোহা ক্ষয়ে গেছে হাতের আকারে। বিশ বছর ধরে একই হাত একই জায়গায়। লোহা জানে মাসুদের হাতের মাপ। হাতও জানে লোহার আকার। দুইজন পরিচিত। দুইজন বন্ধু। মানুষ আর যন্ত্রের বন্ধুত্ব। কেউ বোঝে না। বোঝার দরকার নেই।
পাম্পটা যেদিন ভাঙবে, সেদিন মাসুদের শেষ দিন। নতুন পাম্প কেনার টাকা নেই। পুরনো পাম্পই শেষ পাম্প।
মাসুদ পাম্পের হাতলে হাত রাখে। ঠান্ডা লোহা। পরিচিত ঠান্ডা। এই ঠান্ডায় একটা উষ্ণতা আছে। অভ্যাসের উষ্ণতা।
৮
বটগাছটা পুরনো। শতবর্ষী। ঝুরি নেমেছে। ঝুরিগুলো মোটা হয়ে গেছে। গুঁড়ি বিশাল। চারজন হাত ধরলে ঘেরা যাবে।
মাসুদের বাবাও এই গাছের তলায় বসত। মাসুদের বাবা সাইকেলের আগে রিকশার চাকা ঠিক করত। রিকশার চেইন লাগাত। রিকশার বিয়ারিং বদলাত। তার আগে ঘোড়ার গাড়ির চাকায় লোহার বেড় লাগাত। ঘোড়ার নাল ঠিক করত।
তারপর ঘোড়া গেল। রিকশা এলো। তারপর রিকশা কমল। সাইকেল বাড়ল। মাসুদ সাইকেল ধরল। এখন সাইকেল যাচ্ছে।
তিন প্রজন্ম। তিনটা বাহন। তিনটাই মরে গেছে বা মরছে। বটগাছটা আছে। গাছের বয়স বাড়ে, কিন্তু গাছ আউটডেটেড হয় না। গাছের টেকনোলজি বদলায় না। পাতা, ডাল, ছায়া, এটাই গাছের টেকনোলজি। হাজার বছর ধরে একই। আপডেট লাগে না। সফটওয়্যার লাগে না। শুধু মাটি লাগে। পানি লাগে। রোদ লাগে।
মাসুদ গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে। পিঠ ছোঁয় গুঁড়ি। গুঁড়ি শক্ত, রুক্ষ, উষ্ণ। গাছের শরীরের উষ্ণতা। মাসুদের পিঠও উষ্ণ। দুইটা উষ্ণ শরীর পরস্পরকে ছুঁয়ে আছে। একটা মানুষের, একটা গাছের। গাছ টের পায় কি না মাসুদ জানে না। মাসুদ টের পায়।
৭
সামনে খালি রাস্তা। মোটরসাইকেল যায়, ধুলো ওড়ে, আওয়াজ হয়, চলে যায়। ই-বাইক যায়, নিঃশব্দে, ছায়ার মতো। অটো যায়, ঝনঝন করে। মাসুদ বসে থাকে।
রেঞ্চগুলো পাশে পড়ে আছে। পাম্পটা দাঁড়িয়ে আছে। বালতির পানি গরম হয়ে গেছে রোদে। আঠার টিউবের মুখ শুকিয়ে গেছে। রাবারের টুকরোগুলো একটা পলিথিনে রাখা। পলিথিনটাও পুরনো। ফাটা।
কেউ আসবে না জানে মাসুদ। তবু বসে থাকে। বসা ছাড়া আর কিছু করার নেই। বাড়ি গেলে বউ জিজ্ঞেস করবে কত হলো। কম হলো বলতে হবে। বউয়ের মুখ কালো হবে। বউ চুলায় ভাত চড়াবে। ডাল হবে। শুধু ডাল। সবজি নেই। মাছ নেই। সেটার চেয়ে বটগাছের তলায় বসে থাকা ভালো।
গাছের ছায়ায় ক্ষুধা কম লাগে। গাছের ছায়ায় লজ্জা কম লাগে। গাছের ছায়ায় সময় অন্যভাবে চলে। ধীরে। একটু কম নিষ্ঠুরভাবে।
গাছ কিছু জিজ্ঞেস করে না। গাছ শুধু ছায়া দেয়। বিনা শর্তে। ছায়ার কোনো কিস্তি নেই। ছায়ার কোনো সুদ নেই।
বিকেলে এক বৃদ্ধ আসে। কাঁপা হাতে সাইকেল ঠেলে। চাকায় হাওয়া নেই। মাসুদ উঠে দাঁড়ায়। পাম্প ধরে। হাওয়া ভরে। চাকা শক্ত হয়। বৃদ্ধ হাত দিয়ে চেপে দেখে। হাসে। দশ টাকা দেয়। মাসুদ নেয়।
দশ টাকা পকেটে রাখে। দিনের প্রথম আয়। দিনের শেষ আয়।
বৃদ্ধ চলে যায়। সাইকেলের চাকা ঘুরে। টায়ার রাস্তায় দাগ রেখে যায়। দাগটা ধুলোয় মিশে যায়। কিছুক্ষণ পরে দাগ নেই। সাইকেল নেই। বৃদ্ধ নেই। শুধু রাস্তা আছে। মাসুদ আছে। বটগাছ আছে।
রাস্তা থাকবে। বটগাছ থাকবে। মাসুদ থাকবে কিনা জানে না। থাকলেও কী হবে। না থাকলেও কী হবে। গাছ ছায়া দেবে। কাউকে না কাউকে। মাসুদকে না হলে অন্য কাউকে।
ছায়ার কোনো মালিক নেই।
মাসুদ মাঝে মাঝে ভাবে পেশা বদলাবে। কিন্তু কী করবে। পঞ্চাশ বছর বয়সে কোন পেশায় যাবে। রিকশা চালাতে পারে। কিন্তু রিকশাও যাচ্ছে। অটো আসছে। ভ্যান চালাতে পারে। কিন্তু ভ্যানও কমছে। দিনমজুরি করতে পারে। ইট ভাঙতে পারে। মাটি কাটতে পারে। কিন্তু শরীর সায় দেয় না। হাঁটু ব্যথা। কোমর ব্যথা। বিশ বছর মাটিতে বসে বসে হাঁটু শেষ।
মাসুদ কিছু বদলাবে না। বটগাছের তলায় বসে থাকবে। যতদিন একটা সাইকেলও চলে, ততদিন বসবে। শেষ সাইকেলটা যেদিন থামবে, সেদিন মাসুদও থামবে।
কিন্তু বটগাছ থামবে না। বটগাছ কারো জন্য থামে না। বটগাছ শুধু বাড়ে। ঝুরি নামায়। ডাল ছড়ায়। ছায়া দেয়।
ঘোড়া গেছে। রিকশা গেছে। সাইকেল যাচ্ছে। মানুষ যাচ্ছে। বটগাছ আছে।
সন্ধ্যায় মাসুদ পাম্প গুটিয়ে রাখে। রেঞ্চ পলিথিনে মোড়ায়। বালতির পানি ফেলে দেয়। আঠার টিউবে ঢাকনা লাগায়। রাবারের টুকরো পকেটে ভরে। সব গুছিয়ে একটা ব্যাগে রাখে। কাঁধে ঝোলায়। হেঁটে বাড়ি যায়।
পেছনে বটগাছ দাঁড়িয়ে থাকে। অন্ধকারে। একা। কেউ নেই। শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার আওয়াজ। আর বাতাসে পাতা নড়ার শব্দ। বটগাছ অপেক্ষা করে। সকালে মাসুদ আবার আসবে। আবার হেলান দেবে। আবার বসবে। আবার অপেক্ষা করবে।
গাছ আর মানুষ দুইজনে অপেক্ষা করে। গাছ অপেক্ষা করে মাসুদের জন্য। মাসুদ অপেক্ষা করে সাইকেলের জন্য।
সাইকেল আসে না। মাসুদ আসে।
এটুকুই।