বিউটি পার্লার কর্মী

ওদের সুন্দর করি, নিজে আয়নায় তাকাই না।

পর্ব ৭৯ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সকাল দশটায় পার্লার খোলে। নাজমা আসে নয়টায়। বাসা থেকে হেঁটে আসে। রিকশার ভাড়া বাঁচায়। পনেরো মিনিটের রাস্তা। গরমে ঘাম হয়। বৃষ্টিতে ভিজে। শীতে কাঁপে। পার্লারে ঢুকে প্রথম কাজ নিজেকে গোছানো। ঘাম মুছে, চুল বেঁধে, শাড়ি ঠিক করে।

তারপর মেঝে ঝাড়ু দেয়। তোয়ালে ভাঁজ করে। ক্রিমের জার সাজায়। ব্রাশ ধোয়। ম্যাগাজিন গুছিয়ে রাখে। আয়না মোছে।

আয়না মুছতে গিয়ে নিজের মুখ দেখে। চোখের নিচে কালি। ঠোঁট ফাটা। গাল শুকনো। চামড়ায় টান ধরেছে। এসি সারাদিন চলে। চামড়ার আর্দ্রতা টেনে নেয়। এসি কাস্টমারের আরামের জন্য। নাজমার আরাম না, নাজমার ক্ষতি।

ওদের সুন্দর করি, নিজে আয়নায় তাকাই না, নাজমা বলে।

কথাটা সত্য। তবু প্রতিদিন তাকাতে হয়। আয়না মুছতে গেলে নিজের মুখ এড়ানো যায় না। আয়না নির্বিচার। যে মোছে তাকেও দেখায়।

থ্রেডিং। সুতো দিয়ে ভ্রুর লোম তোলে। দুই হাতে সুতো ধরে। মুখে একটা মাথা কামড়ে ধরে। টানে। লোম ওঠে। কাস্টমারের চোখে পানি আসে। নাজমা বলে একটু সহ্য করেন।

প্রতিদিন একই কথা। একই সুতো। একই টান। একই চোখের পানি। সুতোটা পাতলা, সাদা। কিন্তু এই সুতোতেই নাজমার দিন বাঁধা। সুতো ছিঁড়লে দিন ছিঁড়বে।

ওয়াক্সিং। গরম মোম লাগায় হাতে, পায়ে, বগলে। তাপমাত্রা ঠিক রাখতে হয়। বেশি গরম হলে চামড়া পুড়বে। কম গরম হলে লোম উঠবে না। এই ঠিক তাপমাত্রাটা নাজমার আঙুলে আছে। থার্মোমিটার নেই। আঙুলই থার্মোমিটার। পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা। পাঁচ বছরের আঙুল।

মোম লাগায়। কাপড় বসায়। ঝটকায় টানে। লোম ওঠে। কাস্টমার চিৎকার করে। নাজমা বলে শেষ হয়ে গেছে। আবার লাগায়। আবার টানে। আবার চিৎকার। চিৎকারটা প্রতিদিন শোনে। অভ্যাস হয়ে গেছে। যেমন ডাক্তার রক্ত দেখে অভ্যস্ত, নাজমা চিৎকার শুনে অভ্যস্ত।

ফেসিয়াল। মুখে ক্রিম লাগায়। ম্যাসাজ করে। গোল গোল ঘোরায় আঙুল। কপালে, গালে, চোয়ালে, নাকের পাশে। স্টিম দেয়। ব্ল্যাকহেড বের করে। একটা একটা করে। ধৈর্য ধরে। প্যাক দেয়। শুকাতে দেয়। তুলে নেয়।

এক ঘণ্টা ধরে একটা মুখ নিয়ে কাজ করে। সেই মুখের প্রতিটা ছিদ্র চেনে নাজমা। কোথায় তেল জমে, কোথায় শুষ্ক, কোথায় দাগ, কোথায় বলিরেখা শুরু হচ্ছে। অন্য মানুষের মুখ নাজমার চেনা। নিজের মুখের ছিদ্রের খবর রাখে না। রাখার সময় নেই। সময় সব কাস্টমারের মুখে চলে যায়।

মাসে আট হাজার টাকা বেতন। দশ ঘণ্টা কাজ। সকাল দশটা থেকে রাত আটটা। সপ্তাহে একদিন ছুটি, মঙ্গলবার। কিন্তু ছুটির দিনে বিয়ের কাজ থাকলে যেতে হয়। বিয়ের সিজনে ছুটি নেই। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। প্রতি সপ্তাহে তিন-চারটা বিয়ে। ম্যাডাম বলে যেতে হবে। না বললে চাকরি যাবে।

আট হাজার টাকার চাকরি। আট হাজার টাকা হারানোর ভয়ে মঙ্গলবারও কাজ করে নাজমা।

আট হাজার টাকায় কী হয়। বাড়ি ভাড়া তিন হাজার। কড়াইল বস্তির একটা ঘর। দশ বাই আট ফুট। একটা খাট, একটা চুলা, একটা আলনা। বাকি পাঁচ হাজারে মাস চালাতে হয়। চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, বাচ্চার দুধ।

নাজমার একটা মেয়ে। তিন বছর। রুমা। বস্তির একটা মেয়ে দেখে রাখে, মাসে পনেরোশো টাকায়। পাঁচ হাজার থেকে পনেরোশো বাদ। বাকি সাড়ে তিন হাজার। সাড়ে তিন হাজারে মাস।

নাজমার স্বামী অটো চালায়। তার আয় অনিয়মিত। কোনো মাসে আট হাজার, কোনো মাসে পাঁচ, কোনো মাসে তিন। পুলিশকে দিতে হয়। ট্রাফিককে দিতে হয়। তেল কিনতে হয়। অটোর ভাড়া দিতে হয়, অটো নিজের না। সব বাদ দিলে কিছু থাকে, কিছু থাকে না।

দুজনে মিলে পনেরো-ষোলো হাজার। ঢাকায় এই টাকায় চলে, কিন্তু বাঁচে না। চলা আর বাঁচা আলাদা। চলা মানে খায়, ঘুমায়, কাজে যায়। বাঁচা মানে হাসে, স্বপ্ন দেখে, আশা রাখে। নাজমা চলে। বাঁচে কি না সেটা ভাবার সময় নেই।

নাজমার হাত সারাদিন অন্যের শরীর ছোঁয়। অন্যের মুখ, হাত, পা, ঘাড়, পিঠ। দশ ঘণ্টা ধরে অন্যের শরীরে হাত বোলায়।

কতজনের মুখ ছুঁয়েছে নাজমা। হিসাব নেই। প্রতিদিন আট-দশজন। মাসে আড়াইশো। বছরে তিন হাজার। পাঁচ বছরে পনেরো হাজার মুখ। পনেরো হাজার মুখের প্রতিটা ছিদ্র, প্রতিটা দাগ, প্রতিটা বলিরেখা নাজমার আঙুলে আছে।

কিন্তু নাজমার নিজের মুখে কেউ হাত দেয় না। নিজেও দেয় না। রাতে বাসায় গিয়ে রান্না করে। কাটাকুটি করে। মশলা বাটে। হাতে হলুদের দাগ। পেঁয়াজের গন্ধ। রসুনের গন্ধ।

পার্লারে ল্যাভেন্ডার, রোজমেরি, টি-ট্রি অয়েল। বাসায় হলুদ, জিরা, ধনেপাতা। দুই জগতের গন্ধ। একটা সুগন্ধি, একটা মশলাদার। নাজমা দুইটাই বহন করে। শরীরে দুইটা গন্ধ মেশে। সকালে সুগন্ধি, রাতে মশলা। দুইটা জীবন। একটা শরীরে।

একদিন একটা বিয়ের কাজ আসল। মেয়ের বাবা বড়লোক। গুলশানে বাসা। পাঁচ তলা। লিফট আছে। দারোয়ান আছে। গাড়ি আছে গ্যারেজে। বাগান আছে। বাগানে মালি আছে।

ম্যাডাম নিজে গেল। কার নিয়ে। নাজমাকে নিয়ে গেল। সাজানোর চার্জ পনেরো হাজার টাকা।

মেয়েটা সুন্দর। চামড়া পরিষ্কার। নাক সোজা। চোখ বড়। ঠোঁট পাতলা। সুন্দরের সংজ্ঞা এটাই। কিন্তু ম্যাডাম আরো সুন্দর করবে।

ফাউন্ডেশন। কনসিলার। কনট্যুর। হাইলাইটার। আইশ্যাডো। আইলাইনার। মাসকারা। লিপস্টিক। ব্লাশ। সেটিং স্প্রে। স্তরে স্তরে রঙ। মুখটা ক্যানভাস। ম্যাডাম আঁকে। নাজমা ব্রাশ ধরে, ক্রিম মেশায়, পাউডার ঝাড়ে, চুল সেট করে, পিন লাগায়। নাজমা সহকারী। ম্যাডাম শিল্পী। শিল্পীর নাম থাকে। সহকারীর থাকে না।

তিন ঘণ্টা লাগল।

মেয়েটা আয়নায় দেখল। হাসল। মা কাঁদল। বাবা বলল অসাধারণ। ফটোগ্রাফার ছবি তুলল। সবাই খুশি।

ম্যাডাম নাজমাকে পাঁচশো টাকা বোনাস দিল। পনেরো হাজারের কাজে পাঁচশো। ম্যাডাম পেল চৌদ্দ হাজার পাঁচশো। নাজমা পেল পাঁচশো। অনুপাত ঊনত্রিশ ভাগের একভাগ।

ওর মুখে আমার শিল্প, নাজমা বলে। আমার মুখে ওর টাকার অভাব।

নাজমা পাঁচশো টাকা ব্যাগে রাখল। মনে হলো বোনাস না, ভিক্ষা। কিন্তু ভিক্ষা ফেরায় কে। পাঁচশো টাকা পাঁচশো টাকাই। ভিক্ষা হোক বোনাস হোক, চালের দাম একই। চাল জানে না টাকা কোথা থেকে এসেছে।

নাজমা জানে এটা শিল্প। মুখে রঙ লাগানো শিল্প। ভ্রুর আকার দেওয়া শিল্প। চুলের স্টাইল করা শিল্প।

সব ক্লায়েন্টের মুখ আলাদা। সব মুখে একই কৌশল চলে না। কোন মুখে কোন শেড, কোন কনট্যুর, কোন হাইলাইট, এটা বুঝতে হয়। চোখ দেখতে হয়। হাড়ের গঠন দেখতে হয়। ত্বকের টোন দেখতে হয়। আন্ডারটোন দেখতে হয়। ওয়ার্ম না কুল। গোল্ড না সিলভার। এটা যান্ত্রিক না। শৈল্পিক।

কিন্তু এই শিল্পের কোনো স্বীকৃতি নেই। কেউ বলে না নাজমা একজন শিল্পী। বলে বিউটি পার্লারের মেয়ে। পার্লারের মেয়ে মানে ক্রিম লাগায়, লোম তোলে। শিল্প না, সেবা। সেবা মানে চাকরানি।

সেবা শব্দটা সুন্দর। কিন্তু সেবিকার জীবন সুন্দর না। সেবা দেওয়া মানে নিজেকে মুছে ফেলা। কাস্টমারের সামনে হাসি, ভেতরে ক্লান্তি। কাস্টমারের সামনে নম্র, ভেতরে রাগ। কাস্টমারের সামনে সুন্দর কথা, ভেতরে গালি।

কিন্তু গালি বের হয় না। গালি গিলে ফেলে। গালি গিললে পেট জ্বলে। কিন্তু চাকরি থাকে।

রাতে বাসায় একটা আয়না আছে। ছোট। দেয়ালে ঝোলানো। ফাটা। মাঝখানে একটা রেখা আছে। আয়নাটা দুইভাগ করেছে। নাজমার মুখ দুইভাগ হয়ে দেখায়। বাঁদিকটা একটু ওপরে। ডানদিকটা একটু নিচে। ভাঙা আয়নায় ভাঙা মুখ।

একটা নতুন আয়না কিনতে দুইশো টাকা। দুইশো টাকা নেই। ভাঙা আয়নাতেই চলে। ভাঙা সব কিছুতেই চলে। ভাঙা চুলা, ভাঙা খাট, ভাঙা আয়না, ভাঙা জীবন।

পার্লারের আয়না বড়। পরিষ্কার। আলো পড়ে। রিং লাইট আছে, সফট বক্স আছে। কাস্টমার সেই আয়নায় দেখে নতুন মুখ। সুন্দর মুখ। নাজমার বানানো মুখ। কাস্টমার খুশি হয়ে সেলফি তোলে। ইনস্টাগ্রামে দেয়। লাইক পায়। কমেন্ট পায়। কেউ জিজ্ঞেস করে না কে এই মুখ বানাল। কার আঙুল এই ভ্রু সাজাল। কার হাত এই চুল বাঁধল।

নাজমা পার্লারের আয়নায় তাকায় না। তাকালে দেখবে নিজের ডার্ক সার্কেল, ফাটা ঠোঁট, রুক্ষ চামড়া। পার্লারে সারাদিন সুন্দর মুখ দেখতে দেখতে নিজের মুখটা আরো কুৎসিত লাগে। তুলনা। তুলনাই সব নষ্ট করে। তুলনা না থাকলে কেউ অসুন্দর না। তুলনা থাকলে সবাই অসুন্দর।

পার্লারে আরো দুইজন কাজ করে। সুমি আর তাসলিমা। সুমি নতুন, ছয় মাস হয়েছে। তাসলিমা পুরনো, নাজমার আগে থেকে। তিনজনে মিলে কাজ ভাগ করে। সুমি থ্রেডিং আর ওয়াক্সিং। তাসলিমা হেয়ারকাট আর স্ট্রেইটেনিং। নাজমা ফেসিয়াল আর মেকআপ।

তিনজনের বেতন একই। আট হাজার। তাসলিমা পনেরো বছর ধরে কাজ করে। আট হাজার। নাজমা পাঁচ বছর। আট হাজার। সুমি ছয় মাস। আট হাজার। অভিজ্ঞতার কোনো দাম নেই। পনেরো বছরের দক্ষতা আর ছয় মাসের দক্ষতা একই দামে বিক্রি হয়।

তাসলিমা একবার বেতন বাড়াতে বলেছিল। ম্যাডাম বলেছিল পারব না। তাসলিমা বলেছিল তাহলে অন্য জায়গায় যাব। ম্যাডাম বলেছিল যাও। তাসলিমা যায়নি। অন্য জায়গাতেও আট হাজার। কোথাও বেশি নেই। পার্লারের মেয়েদের বেতন সব জায়গায় একই। যেন কোনো আইন আছে। আইন নেই। কিন্তু নিয়ম আছে। অলিখিত নিয়ম। গরিবের বেতন বাড়ে না। যত বছরই কাজ করুক।

দুপুরে তিনজন একসাথে খায়। পার্লারের পেছনে একটা ছোট ঘর। সেখানে বসে। টিফিন বক্স খোলে। ভাত, ডাল, আলুভর্তা। তিনজনের তিনটা বক্সে একই খাবার। আলাদা রান্না, একই উপকরণ। গরিবের মেনু সব জায়গায় একই।

খেতে খেতে কথা বলে। সুমি বলে স্বামীর কথা। তাসলিমা বলে ছেলের পরীক্ষার কথা। নাজমা চুপ থাকে। শোনে। নাজমা কথা কম বলে। শোনে বেশি। বলার কিছু নেই। সবার জীবন একই রকম। একই গরিবি, একই ক্লান্তি, একই স্বপ্নহীনতা। আলাদা করে বলার কী আছে।

একদিন একটা কাস্টমার এলো। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। সুন্দর। কিন্তু কাঁদছে। চোখ ফোলা। নাক লাল। ম্যাডাম বলল কী হয়েছে। মেয়েটা বলল কিছু না। শুধু ফেসিয়াল করবে।

নাজমা ফেসিয়াল করল। মেয়েটার মুখে হাত দিয়ে বুঝল চামড়া শুষ্ক। ঠিকমতো খায় না। ঘুমায় না। স্ট্রেস। নাজমা কিছু বলল না। কাস্টমারের ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলা যায় না। কাস্টমার টাকা দেয়, সেবা নেয়। ব্যস। আবেগ বিনিময় হয় না।

ফেসিয়াল শেষে মেয়েটা আয়নায় দেখল। হাসল। ক্লান্ত হাসি। বলল ভালো হয়েছে। টাকা দিল। চলে গেল।

নাজমা ভাবল মেয়েটার কী হয়েছে। তারপর ভাবনা থামাল। ভাবার সময় নেই। পরের কাস্টমার এসে গেছে। পরের মুখ। পরের ছিদ্র। পরের দাগ।

পার্লারে মানুষ আসে সুন্দর হতে। কিন্তু কেউ কেউ আসে লুকাতে। দাগ লুকাতে। কান্না লুকাতে। ক্লান্তি লুকাতে। মেকআপ ঢাল। মেকআপ মুখোশ। মেকআপের নিচে আসল মুখ। আসল মুখে কী আছে সেটা শুধু নাজমা জানে। কারণ নাজমার আঙুল আসল মুখ ছুঁয়েছে। মেকআপের আগে।

১০

রাত আটটায় পার্লার বন্ধ হয়। নাজমা বের হয়। রাস্তায় আলো। দোকানের আলো। গাড়ির আলো। মোবাইলের আলো। সবাই তাড়াহুড়ো করছে। নাজমা হেঁটে যায়। পায়ে ব্যথা। সারাদিন দাঁড়িয়ে কাজ। পায়ের পাতা ফুলে গেছে। স্যান্ডেলের ফিতা কাটছে পায়ে। গোড়ালি ফেটে গেছে। ক্রিম লাগায় না। ক্রিম কেনে না। পার্লারে যত ক্রিম, কোনোটাই নাজমার জন্য না।

বাসায় ঢোকে। মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। স্বামী এখনো আসেনি। চুলায় ভাত চড়ায়। ডাল বসায়। আলু কাটে। পেঁয়াজ কাটে। চোখে পানি আসে। পেঁয়াজের জন্য। শুধু পেঁয়াজের জন্য। অন্য কোনো কারণ নেই। পেঁয়াজ কাটলে চোখে পানি আসে। এটা রসায়ন। আবেগ না।

রান্না শেষ। একা খায়। স্বামীর জন্য ঢেকে রাখে। মেয়ের পাশে শোয়। মেয়ের মুখে হাত দেয়। নরম মুখ। তিন বছরের মুখ। কোনো ক্রিম লাগেনি এই মুখে। কোনো ফাউন্ডেশন লাগেনি। কোনো কনসিলার। এটাই আসল সৌন্দর্য। যেটা বানাতে হয় না। যেটা কিনতে হয় না। যেটা আছে।

নাজমা মেয়ের মুখে আঙুল বোলায়। একই আঙুল যেটা সারাদিন কাস্টমারের মুখে ক্রিম লাগিয়েছে। কিন্তু এই স্পর্শ আলাদা। এই স্পর্শে টাকা নেই। সেবা নেই। শুধু ভালোবাসা আছে।

ভালোবাসার কোনো দাম নেই। মানে ভালোবাসা বিক্রি হয় না। মানে ভালোবাসা ফ্রি। গরিবের কাছে সবচেয়ে দামি জিনিস ফ্রি।

অন্যের সৌন্দর্যে নিজের হাতের ছাপ। নিজের মুখে সময়ের ছাপ। দুইটা ছাপ। একটা দেখা যায়। একটা দেখা যায় না।

যেটা দেখা যায় না, সেটাই গভীর।

নাজমা মাঝে মাঝে ভাবে নিজের পার্লার খুলবে। নিজে ম্যাডাম হবে। নিজের হাতে তৈরি করা সৌন্দর্যের পুরো দাম নিজে পাবে। পনেরো হাজারের কাজে পনেরো হাজার।

কিন্তু পার্লার খুলতে কত টাকা লাগে। জায়গা ভাড়া। আসবাবপত্র। আয়না। চেয়ার। প্রোডাক্ট। লাইসেন্স। সব মিলিয়ে দুই-তিন লাখ। দুই-তিন লাখ নাজমার কাছে স্বপ্ন না, রূপকথা। স্বপ্ন সত্যি হতে পারে। রূপকথা হয় না।

নাজমা রূপকথা ভাবে না। নাজমা কাজ করে।

সকাল নয়টায় আসে। রাত আটটায় যায়। মাঝখানে অন্যের মুখ সাজায়। নিজের মুখ ভোলে।

এটাই জীবন। এটাই যেভাবে চলে।