ফটোগ্রাফার
ফটোগ্রাফি শিল্প। কিন্তু ক্লায়েন্ট শিল্প বোঝে না।
১
স্টুডিওটা ছিল বাজারের মোড়ে। ছোট ঘর। দশ বাই আট ফুট। একটা ক্যামেরা, একটা ব্যাকড্রপ, দুইটা লাইট। আকাশি রঙের ব্যাকড্রপ, পাসপোর্ট সাইজের জন্য। লাল রঙের ব্যাকড্রপ, পারিবারিক ছবির জন্য।
পাসপোর্ট সাইজ ছবি তুলত। ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ছবি। স্কুলের ছবি। পরিবারের গ্রুপ ফটো। ফ্রেম করে দিত। দেয়ালে ঝোলানোর জন্য।
মানুষ আসত। চেয়ারে বসত। সোজা তাকাত। মিলন বলত হাসেন। ক্লিক। ব্যস।
ছবি প্রিন্ট করত মেশিনে। ভেজা ছবি শুকাত। কাস্টমার অপেক্ষা করত। পনেরো মিনিটে ছবি পেত। ফ্রেমে লাগিয়ে দিত। কাস্টমার ছবি দেখে হাসত অথবা ভ্যাবাচ্যাকা খেত। ক্যামেরায় মানুষ অন্যরকম দেখায়। আয়নায় যেমন দেখে, ক্যামেরায় তেমন দেখে না। ক্যামেরা সত্যি বলে। আয়না অভ্যাস বলে।
সেই দিন শেষ।
স্মার্টফোন এসেছে। সবার হাতে ক্যামেরা। সবাই ফটোগ্রাফার। পাসপোর্ট সাইজ ছবি মোবাইলে তুলে প্রিন্ট করে কম্পিউটারের দোকানে। দশ টাকায়। ন্যাশনাল আইডির ছবি অনলাইনে আপলোড করে। স্টুডিওতে কে আসবে। কেন আসবে। স্টুডিও মানে পুরনো জমানা। পুরনো মানে অচল।
মিলন স্টুডিও বন্ধ করল। ব্যাকড্রপ ভাঁজ করে রাখল। লাইট বিক্রি করল। ছোট ঘরটা ছেড়ে দিল। ভাড়া দিতে পারছিল না।
বিয়ের ফটোগ্রাফি ধরল। বিয়েতে স্মার্টফোনে ছবি তোলে সবাই। কিন্তু প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার রাখে। ঐতিহ্য। স্ট্যাটাস। প্রফেশনাল ক্যামেরার ছবি আলাদা, এটা মানুষ এখনো বিশ্বাস করে। কতদিন বিশ্বাস করবে জানে না মিলন। স্মার্টফোনের ক্যামেরা প্রতি বছর ভালো হচ্ছে। একদিন প্রফেশনাল ক্যামেরার সমান হবে। সেদিন মিলনের আর কোনো কাজ থাকবে না।
২
ক্যামেরার দাম এক লাখ টাকা। ক্যানন। সেকেন্ড হ্যান্ড কিনেছে। পুরনো মালিক বিদেশ যাচ্ছিল, সস্তায় দিয়েছে। ভালো কন্ডিশন। শাটার কাউন্ট কম।
দুইটা লেন্স। ৫০ এমএম প্রাইম, ব্লার ভালো আসে, পোর্ট্রেটের জন্য। ২৪-৭০ জুম, গ্রুপ ফটোর জন্য, হলরুমের জন্য। ফ্ল্যাশ দুইটা। ডিফিউজার। ট্রাইপড। মনোপড। মেমোরি কার্ড তিনটা। ব্যাটারি দুইটা। সব মিলিয়ে দেড় লাখ টাকার সরঞ্জাম। ব্যাগে ভরে কাঁধে ঝোলায়। ভারী। কাঁধ ব্যথা হয়।
ল্যাপটপ বারো বছরের পুরনো। এইচপি। স্ক্রিনের একটা কোণা হলুদ হয়ে গেছে। ব্যাকলাইট মরে যাচ্ছে। কি-বোর্ডের তিনটা কি কাজ করে না। ফ্যান শব্দ করে। ঘরঘর। যেন ল্যাপটপ হাঁপাচ্ছে।
ফটোশপ খুলতে চার মিনিট লাগে। একটা ছবি এডিট করতে তিরিশ সেকেন্ড ল্যাগ। প্রতিটা ব্রাশ স্ট্রোকে অপেক্ষা। রেন্ডার হতে হতে মিলন চা খায়। চা শেষ হয়। রেন্ডার শেষ হয় না।
ক্যামেরা এক লাখ টাকার। ল্যাপটপ ভাঙা। ফটো ভালো, এডিট ধীরে।
নতুন ল্যাপটপ কিনতে চায়। পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে। পঞ্চাশ হাজার মিলনের কাছে নেই। কিস্তিতে কিনলে সুদ গুনতে হবে। সুদ দেওয়ার সামর্থ্য নেই। ভাঙা ল্যাপটপেই চালায়। ভাঙা জিনিস দিয়ে সুন্দর জিনিস বানায়। এটাই গরিবের শিল্প।
৩
বিয়ের দিন। মিলন সকালে যায়। গায়ে হলুদ থেকে শুরু। রঙের ছড়াছড়ি। হলুদ মেখে সবাই হাসে, নাচে, গান গায়। মিলন ছবি তোলে।
তারপর আকদ। গম্ভীর মুহূর্ত। কাজী পড়ে। বর কবুল বলে। সাক্ষী সই করে। মিলন ছবি তোলে।
তারপর বৌভাত। তারপর রিসেপশন। সকাল থেকে রাত। বারো-চৌদ্দ ঘণ্টা। দাঁড়িয়ে থাকে। হাঁটু ব্যথা হয়। পিঠ ব্যথা হয়। ঘাড় শক্ত হয়ে যায়। কিন্তু ক্যামেরা নামায় না। ক্যামেরা নামালে মুহূর্ত হারাবে। মুহূর্ত আর ফেরে না।
পনেরোশো ছবি তোলে। প্রতিটা মুহূর্ত। কনে সাজছে। বর নার্ভাস। মা কাঁদছে। বাবা দূরে দাঁড়িয়ে, মুখ শক্ত, কিন্তু চোখ লাল। বন্ধুরা টিজ করছে। ছোট বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে। মিলন সব ধরে রাখে। ক্যামেরায়। একদিনের জীবন, পনেরোশো ফ্রেমে।
পনেরোশো ছবি থেকে পাঁচশো বাছাই করে। কোনটা রাখবে, কোনটা ফেলবে। প্রতিটা ছবিতে কিছু আছে। কিন্তু সব দেওয়া যায় না। ক্লায়েন্ট হাজারটা ছবি দেখবে না।
পাঁচশো এডিট করে। রঙ ঠিক করে। আলো ঠিক করে। ক্রপ করে। স্কিন টোন সমান করে। পিম্পল মুছে। দাঁত সাদা করে। চোখের সাদা অংশ সাদা করে। একটা ছবি এডিট করতে তিন মিনিট নতুন ল্যাপটপে হতো। ভাঙা ল্যাপটপে পাঁচ মিনিট। পাঁচশো ছবি। পাঁচশো গুণ পাঁচ। আড়াই হাজার মিনিট। বিয়াল্লিশ ঘণ্টা।
মিলন দুই দিনে এডিট করতে পারে না। তিন দিন লাগে। রাত তিনটা পর্যন্ত বসে থাকে। ল্যাপটপের ফ্যান গর্জন করে। চোখ জ্বলে। ঘাড় শক্ত হয়ে যায়। পিঠে ব্যথা। আঙুল ব্যথা। মাউসে ক্লিক করতে করতে তর্জনীর গিঁট ফুলে যায়।
৪
তিন দিন পরে ছবি দেয়। গুগল ড্রাইভে আপলোড করে লিংক পাঠায়। ক্লায়েন্ট দেখে। মেসেজ আসে।
রঙটা একটু উজ্জ্বল করেন।
মিলন উজ্জ্বল করে। স্যাচুরেশন বাড়ায়। ব্রাইটনেস বাড়ায়। আবার আপলোড করে। আবার অপেক্ষা। আবার মেসেজ।
একটু কম করেন। বেশি হয়ে গেছে। ন্যাচারাল লাগছে না।
মিলন কম করে। আবার আপলোড। আবার অপেক্ষা। আবার মেসেজ।
আগেরটাই ভালো ছিল।
মিলন আগেরটা পাঠায়। সেটাই তো প্রথমে দিয়েছিল। পুরো চক্র। শুরুতে ফেরত। এক ঘণ্টা সময় নষ্ট। দুইবার আপলোড। দুইবার ডাউনলোড। দুইবার এডিট। তিনবার রেন্ডার। ভাঙা ল্যাপটপে তিনবার রেন্ডার মানে পঁয়তাল্লিশ মিনিট অপেক্ষা।
কিন্তু ক্লায়েন্টকে কিছু বলে না। বললে ক্লায়েন্ট চলে যাবে। রিভিউ দেবে খারাপ। ফেসবুকে লিখবে কাজ ভালো না, ব্যবহার খারাপ, দাম বেশি। একটা খারাপ রিভিউ দশটা ভালো রিভিউ মারে। একজন অসন্তুষ্ট ক্লায়েন্ট দশজনকে বলে। একজন সন্তুষ্ট ক্লায়েন্ট কাউকে বলে না। সন্তোষ চুপ থাকে। অসন্তোষ চেঁচায়।
৫
বিয়ের ফটোগ্রাফির দাম দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার। ইভেন্টের সাইজ অনুযায়ী। ছোট বিয়ে দুই হাজার। বড় বিয়ে পাঁচ।
পাঁচ হাজারে কতটুকু লাভ। যাতায়াত পাঁচশো। ব্যাটারি চার্জ, মেমোরি কার্ড অবচয়, প্রিন্ট, সব মিলিয়ে আরো পাঁচশো। বাকি চার হাজার। বারো ঘণ্টা শুটিং। বিয়াল্লিশ ঘণ্টা এডিটিং। রিভিশন আরো দুই ঘণ্টা। মোট ছাপ্পান্ন ঘণ্টা কাজে চার হাজার টাকা। ঘণ্টায় একাত্তর টাকা।
ফটোগ্রাফি শিল্প, মিলন বলে। কিন্তু ক্লায়েন্ট শিল্প বোঝে না। ক্লায়েন্ট সস্তা বোঝে।
সস্তা মানে কম দাম না। সস্তা মানে কম মূল্য। কম মূল্য মানে কম সম্মান। কম সম্মান মানে যখন খুশি ফোন করা। রাত দশটায় মেসেজ। সকাল সাতটায় মিসড কল। ছুটির দিনে রিমাইন্ডার। কবে দেবেন। কবে দেবেন। কবে দেবেন।
মিলন বলে তিন দিন। ক্লায়েন্ট বলে দুই দিনে হবে না। মিলন বলে চেষ্টা করব। চেষ্টা মানে ঘুম কমানো। ঘুম কমালে চোখ ফোলে। চোখ ফোললে এডিট ভুল হয়। ভুল হলে রিভিশন বাড়ে। রিভিশন বাড়লে সময় বাড়ে। চক্র।
৬
মিলনের বউ শিউলি। শিউলি বলে নতুন ল্যাপটপ কেনো। মিলন বলে টাকা কোথায়। শিউলি বলে জমাও। মিলন বলে জমানোর পরে খাব কী।
শিউলি জানে এই তর্কের শেষ নেই। চুপ হয়ে যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে বলে। কারণ শিউলি দেখে মিলন রাত তিনটায় জেগে আছে। চোখ লাল। ঘাড় ব্যথা। ভাঙা ল্যাপটপের সামনে বসে আছে। ল্যাপটপের ফ্যানের আওয়াজে শিউলির ঘুম ভাঙে। তারপর আর ঘুমাতে পারে না। শুয়ে থাকে। চোখ বন্ধ করে। কিন্তু ফ্যানের ঘরঘর শব্দ কানে ঢোকে।
মিলনের ছেলে সাব্বির। পাঁচ বছর। সাব্বির মিলনের ক্যামেরা নিয়ে খেলতে চায়। মিলন দেয় না। এক লাখ টাকার ক্যামেরা। পড়ে গেলে শেষ। সাব্বির কাঁদে। মিলন বলে বড় হলে দেব। সাব্বির বলে কত বড়। মিলন বলে অনেক বড়।
মিলন ভাবে সাব্বির বড় হলে কী হবে। ফটোগ্রাফার হবে না সম্ভবত। ততদিনে ফটোগ্রাফি বলে কিছু থাকবে কি না সন্দেহ। এআই ছবি বানাবে। ক্যামেরার দরকার হবে না। মানুষের দরকার হবে না। মেশিন বানাবে সুখী মুখ। মেশিন বানাবে নকল হাসি। মিলন যা করে, মেশিনও করবে। শুধু দ্রুত করবে। সস্তায় করবে।
তখন মিলন কী করবে। মিলন জানে না। সেই চিন্তাটা বদরুলের করাতের মতো। রাতে মাথায় ঘুরে। থামে না।
মিলনের বাবা ছিল সিনেমা হলের প্রজেক্টর অপারেটর। ফিল্ম রিল ঘোরাত। তারপর ডিজিটাল প্রজেক্টর এলো। বাবার কাজ গেল। বাবা রিকশা চালাত তারপর। মিলন ভাবে সে কী চালাবে। রিকশাও এখন অটো হয়ে যাচ্ছে।
প্রতি প্রজন্মে একটা পেশা মরে। বাবার প্রজেক্টর মরেছে। মিলনের স্টুডিও মরেছে। পরের কী মরবে। বিয়ের ফটোগ্রাফি। সেটাও মরবে। সময়ের ব্যাপার।
৭
একবার এক বিয়েতে গেল মিলন। বড় বিয়ে। রাধিসন হোটেল। শ্যান্ডেলিয়ার ঝুলছে। ফুলের সাজ। ব্যান্ড পার্টি। খাবারের স্টল বিশটা। একটা বিয়েতে বিশ-পঁচিশ লাখ টাকা খরচ।
মিলনের চার্জ পাঁচ হাজার।
বিশ লাখের বিয়েতে পাঁচ হাজারের ফটোগ্রাফার। মোট বাজেটের শূন্য দশমিক দুই পাঁচ শতাংশ। শূন্য দশমিক দুই পাঁচ শতাংশ দিয়ে মিলন ধরে রাখবে সেই বিয়ের সব স্মৃতি। ফুল শুকিয়ে যাবে। খাবার হজম হবে। গান ভুলে যাবে। শুধু ছবি থাকবে। মিলনের তোলা ছবি।
হোটেলের ওয়েটার মিলনকে একটা প্লেট দিয়েছিল। খাবার। বিরিয়ানি, কাবাব, সালাদ। মিলন একটা কোণে দাঁড়িয়ে খেয়েছিল। দাঁড়িয়ে। চেয়ার নেই। চেয়ার অতিথিদের জন্য। মিলন অতিথি না। মিলন শ্রমিক। শ্রমিক দাঁড়িয়ে খায়।
বিরিয়ানি ভালো ছিল। কাবাব নরম ছিল। মিলনের জীবনে এমন খাবার কমই আসে। সে ছবি তুলতে এসেছিল, খেতে না। কিন্তু খাবারটা ভালো ছিল। মিলন সেটাও মনে রেখেছে। ক্লায়েন্ট মনে রাখবে না কে ছবি তুলেছিল। মিলন মনে রাখবে কে বিরিয়ানি দিয়েছিল।
৮
রাত তিনটা। ল্যাপটপের আলো মুখে পড়েছে। নীলচে সাদা আলো। চোখের নিচে কালি। ঘরে সবাই ঘুমাচ্ছে। বউ ঘুমাচ্ছে। ছেলে ঘুমাচ্ছে।
মিলন ফটোশপে ব্রাশ চালাচ্ছে। একটা মেয়ের মুখ। বিয়ের মেয়ে। মুখে হাসি। মিলন হাসিটা আরো উজ্জ্বল করছে। দাঁত সাদা করছে। চোখে আলো বাড়াচ্ছে। ত্বক মসৃণ করছে। একটা ছোট দাগ ছিল চোখের কোণে, মুছে দিচ্ছে। একটা বলিরেখা ছিল কপালে, হালকা করছে।
আসল মেয়েটার মুখে দাগ ছিল। এডিটে নেই। আসল আলো ম্লান ছিল। এডিটে উজ্জ্বল। আসল রঙ ফ্যাকাশে ছিল। এডিটে সোনালি।
মিলন বাস্তব বদলায়। প্রতিটা ছবিতে বাস্তব একটু বদলায়। একটু উজ্জ্বল করে। একটু মসৃণ করে। একটু রঙিন করে। কেউ আসল ছবি চায় না। আসল ছবিতে দাগ আছে। ছায়া আছে। ক্লান্তি আছে। ঘাম আছে। বিরক্তি আছে। এডিট করা ছবিতে কিছু নেই। শুধু সুখ। পরিষ্কার, ঝকঝকে, অসম্ভব সুখ।
মিলন সুখ বিক্রি করে। পিক্সেলে পিক্সেলে বানানো সুখ। যে সুখ কখনো ছিল না, কিন্তু ছবিতে আছে। বিশ বছর পরে এই ছবি দেখে ক্লায়েন্ট ভাববে কী সুন্দর দিন ছিল। আসলে সেদিন গরম ছিল। ঘাম হচ্ছিল। শাশুড়ি রাগ করছিল। খাবার ঠান্ডা হয়ে গেছিল। ক্যাটারারের সাথে ঝগড়া হয়েছিল।
কিন্তু ছবিতে সেসব নেই। ছবিতে শুধু হাসি। ছবি মিথ্যাবাদী। সুন্দর মিথ্যাবাদী।
৭
ফাইল সেভ করে। ল্যাপটপ হ্যাং হয়। পাঁচ মিনিট অপেক্ষা। স্ক্রিনে ঘড়ির আইকন ঘুরছে। ঘুরছে। ঘুরছে। মিলন ভয় পায়। ক্র্যাশ হলে সব হারাবে। আনসেভড ওয়ার্ক। দুই ঘণ্টার কাজ।
সেভ হয়। মিলন নিশ্বাস ছাড়ে।
ল্যাপটপ বন্ধ করে। ফ্যান থামে। ঘর চুপ হয়ে যায়। শুধু ঘড়ির টিকটিক। আর মশার গুনগুন। আর বউয়ের নিশ্বাসের শব্দ।
বিছানায় শোয়। চোখ বন্ধ করে। চোখের পেছনে ফটোশপের ইন্টারফেস ভাসে। ব্রাশ টুল। লেয়ার প্যানেল। হিস্টোগ্রাম। কার্ভস ডায়ালগ। ঘুমের মধ্যেও এডিট করে মিলন। স্বপ্নেও রঙ ঠিক করে। স্বপ্নেও ক্লায়েন্ট বলে একটু উজ্জ্বল করেন। স্বপ্নেও মিলন বলে জি।
সকালে উঠে আবার ল্যাপটপ খোলে। ল্যাপটপ ধীরে ধীরে জাগে। বুড়ো মানুষের মতো। হাড় মটকায়। গিঁট ফোটে। তারপর উঠে বসে। ডেস্কটপ আসতে তিন মিনিট।
আরো তিনশো ছবি বাকি। ক্লায়েন্ট মেসেজ দিয়েছে। কবে পাব। মিলন লেখে কাল রাতের মধ্যে। ক্লায়েন্ট লেখে ওকে। তিনটা হাসির ইমোজি।
তিনটা হাসির ইমোজি। মিলন জানে এই হাসি আসল না। ইমোজি আসল হয় না। ঠিক যেমন এডিট করা ছবি আসল হয় না। সবাই নকল হাসি বিনিময় করে। মিলন ছবিতে। ক্লায়েন্ট মেসেজে। কেউ কাউকে আসল মুখ দেখায় না।
আসল মুখ দেখালে কেউ টাকা দেবে না। আসল মুখে দাগ আছে। ক্লান্তি আছে। বয়স আছে। কেউ দাগ কিনতে চায় না। কেউ ক্লান্তি কিনতে চায় না। সবাই সুখ কিনতে চায়।
মিলন বানায়। ভাঙা ল্যাপটপে। রাত তিনটায়। লাল চোখে। ব্যথা ঘাড়ে। সুখ বানায়। অন্যের জন্য।
মিলনের নিজের বিয়ের ছবি আছে। একটাও এডিট করা না। কেউ এডিট করেনি। মিলন নিজে করেনি। সময় ছিল না। ইচ্ছাও ছিল না। আসল ছবি রেখে দিয়েছে। আসল আলো। আসল রঙ। আসল হাসি। অথবা আসল ক্লান্তি। যেটাই হোক, আসল।
মিলনের বিয়ের ছবিতে মিলন হাসছে না। শিউলি হাসছে। মিলনের মুখে একটা অদ্ভুত ভাব। ভয় না, উদ্বেগ না, চিন্তা না। শুধু সত্যি। একজন মানুষের সত্যি মুখ। কোনো ফিল্টার নেই। কোনো এডিট নেই। কোনো ব্রাইটনেস অ্যাডজাস্টমেন্ট নেই।
সেই ছবিটা মিলনের সবচেয়ে প্রিয়। কারণ সেটাই একমাত্র সত্যি ছবি। বাকি সব মিথ্যা। সুন্দর, উজ্জ্বল, রঙিন মিথ্যা।