প্রিন্টিং প্রেস শ্রমিক
কাগজ কমছে। কালি কমছে। চাকরি কমছে। শুধু কষ্ট কমছে না।
১
জাহাঙ্গীরের হাতে কালি লেগে আছে। তিরিশ বছর ধরে লেগে আছে।
সাবান দিয়ে ঘষলে যায় না। কেরোসিন দিয়ে ঘষলে একটু যায়। কিন্তু পরদিন আবার লাগে। তাই জাহাঙ্গীর ঘষা ছেড়ে দিয়েছে। কালি তার চামড়ার অংশ হয়ে গেছে। আঙুলের ছাপে কালি, নখের ভেতরে কালি, হাতের রেখায় কালি। হাত দেখে ভাগ্য বলা যায় না, কারণ রেখা দেখা যায় না।
সকাল সাড়ে সাতটা। বাবুবাজারের গলিতে প্রেসটা। সাইনবোর্ড নেই। ছিল একসময়, "মডার্ন অফসেট প্রিন্টিং প্রেস"। বোর্ডটা পড়ে গেছে ২০১৮-তে। মালিক নতুন বোর্ড লাগায়নি। খরচ করতে চায় না। বোর্ড ছাড়াই চলছে। যারা আসে তারা জানে।
জাহাঙ্গীর শাটার তুলল। ভেতরে অন্ধকার। একটা সুইচ টিপল। টিউবলাইট কিছুক্ষণ কাঁপল, তারপর জ্বলল। আলোতে মেশিনটা দেখা গেল।
হাইডেলবার্গ অফসেট। জার্মান মেশিন। ১৯৯২ সালে কেনা। সেকেন্ড হ্যান্ড। তখনই পুরনো ছিল। এখন প্রাচীন। কিন্তু চলে। জাহাঙ্গীর চালায়।
পাশে আরেকটা মেশিন। ডিজিটাল। চায়নিজ। ২০১৯-এ কেনা। এটাও জাহাঙ্গীর চালায়।
দুটো মেশিন চালাতে পারে বলে জাহাঙ্গীর টিকে আছে। বাকি ছয়জন পারত না। তারা চলে গেছে।
২
তিরিশ বছর আগে এই প্রেসে বারোজন কাজ করত।
কম্পোজিটর ছিল তিনজন। সিসার অক্ষর সাজাত। প্রতিটা অক্ষর আলাদা, ছোট ছোট ধাতুর টুকরো, উলটো করে সাজাতে হতো। বাংলা অক্ষর, যুক্তাক্ষর, মাত্রা, ফলা। একটা পৃষ্ঠা কম্পোজ করতে ঘণ্টা লাগত। কম্পোজিটরদের চোখ ছিল ঈগলের মতো। তারা উলটো অক্ষর পড়তে পারত, যেমন আয়নায় পড়ে।
প্রুফরিডার ছিল একজন। নাম হারুন ভাই। মোটা চশমা। একটা ভুল বানান তার চোখ এড়াত না। বলত, "বানান ভুল হলে বই মরে যায়।"
মেশিনম্যান ছিল দুইজন। জাহাঙ্গীর আর সামসুল। কালি মেশানো, কাগজ ফিড করা, প্রেসার ঠিক করা, রেজিস্ট্রেশন মেলানো। অফসেট মেশিনে চারটা রঙ আলাদা আলাদা ছাপতে হয়। চারবার কাগজ ঢোকে, চারবার বের হয়। প্রতিবার ঠিক জায়গায় না পড়লে ছবি ঝাপসা।
বাঁধাইকর ছিল তিনজন। ভাঁজ, সেলাই, গাম, কাটিং। হাতে।
আর ছিল দুইজন হেল্পার। কাগজ বহন, ডেলিভারি, চা আনা।
এখন আছে জাহাঙ্গীর। একা।
কম্পোজিটর লাগে না। কম্পিউটারে কম্পোজ হয়। কাস্টমার নিজেই ফাইল দেয়। পিডিএফ।
প্রুফরিডার লাগে না। কাস্টমার নিজে দেখে নেয়। অথবা দেখে না। ভুল থাকলে থাকে।
বাঁধাইকর লাগে না। অটো বাইন্ডিং মেশিন আছে। ছোট একটা। সেটাও জাহাঙ্গীর চালায়।
হেল্পার লাগে না। জাহাঙ্গীর নিজেই কাগজ বহন করে। চা নিজেই বানায়।
সামসুল গেছে ২০১৫-তে। ডিজিটাল মেশিন এল, অফসেটের কাজ কমল, দুইজন মেশিনম্যানের দরকার রইল না। মালিক বলল, "একজন থাকবে।" জাহাঙ্গীর থাকল। কারণ জাহাঙ্গীর ডিজিটাল শিখতে রাজি হয়েছিল। সামসুল বলেছিল, "আমি অফসেটের লোক। ডিজিটাল আমার কাম না।" সামসুল চলে গেল।
হারুন ভাই অবসর নিলেন ২০১৭-তে। চোখ আর কাজ করে না। শেষদিন বললেন, "বানানের দরকার নাই আর। কেউ পড়ে না তো, ভুল ধরবে কে?"
৩
জাহাঙ্গীর কাগজের স্তূপ থেকে আজকের অর্ডার বের করল।
একটা বিয়ের কার্ড। পাঁচশো কপি। ডিজিটালে হবে। একটা দোকানের হ্যান্ডবিল। এক হাজার কপি। ডিজিটালে হবে। একটা স্কুলের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। দুইশো কপি। ফটোকপিতে হবে। কিন্তু ফটোকপির মেশিন নষ্ট, তাই ডিজিটালে ছাপবে। খরচ বেশি পড়বে। মালিক বলেছে ফটোকপির দামে দিতে, নইলে কাস্টমার চলে যাবে।
একসময় এই প্রেসে সংবাদপত্র ছাপা হতো।
দৈনিক সোনার বাংলা। স্থানীয় পত্রিকা। ষোলো পৃষ্ঠা। রোজ রাত দশটায় ফাইনাল কপি আসত। সারারাত ছাপা হতো। সকাল পাঁচটায় হকারদের কাছে যেত। জাহাঙ্গীরের রাতের শিফট ছিল এটা। কালিতে ভেজা কাগজের গন্ধ, মেশিনের ছন্দময় ঘটঘট আওয়াজ, ভোরের আজানের সাথে শেষ কপি বের হওয়া। একটা ছন্দ ছিল। একটা অর্থ ছিল। মানুষ সকালে উঠে এই কাগজ পড়বে, এই ভেবে একটা গর্ব ছিল।
সোনার বাংলা বন্ধ হয়ে গেছে ২০২১-এ। মালিক অনলাইনে গেছে। ফেসবুক পেজ। ছাপার দরকার নেই।
তার আগেই পৃষ্ঠা কমে গিয়েছিল। ষোলো থেকে বারো। বারো থেকে আট। আট থেকে চার। শেষে চারও রাখতে পারেনি।
জাহাঙ্গীর মাঝে মাঝে ভাবে, পৃষ্ঠা কমে যাওয়াটা একটা রোগের মতো। শরীর শুকিয়ে যায়। হাড় বের হয়ে আসে। তারপর একদিন থামে।
৪
বেতন দশ হাজার টাকা।
মালিক হাসান সাহেব। ভালো মানুষ, দুষ্ট না, কিন্তু ব্যবসা ভালো না। বলেন, "জাহাঙ্গীর, আমি নিজেও টানতে পারি না। তোকে দশ দিই, সেটাও কষ্ট করে দিই।" জাহাঙ্গীর জানে এটা সত্য। প্রেসে কাজ কমেছে। যে কাজ আসে তার দামও কমেছে। বিয়ের কার্ড, ভিজিটিং কার্ড, হ্যান্ডবিল। ছোট ছোট কাজ। বড় কাজ নেই। বই ছাপা বন্ধ হয়ে গেছে বহুদিন। প্রকাশকরা নিজেদের প্রেসে ছাপায়, অথবা বড় প্রেসে যায়। ছোট প্রেসে আসে না।
জাহাঙ্গীরের সংসারে পাঁচজন। বউ রওশন। তিন ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে ফারুক, গার্মেন্টসে কাজ করে, সে আলাদা থাকে। মেয়ে তানিয়া, দশম শ্রেণি। ছোট ছেলে সোহেল, সপ্তম শ্রেণি।
দশ হাজার টাকায় মাস চলে না। রওশন পাড়ায় দুটো বাসায় রান্নার কাজ করে। পাঁচ হাজার পায়। মোট পনেরো হাজার। ঢাকায় পনেরো হাজারে পাঁচজন। হিসেবটা যেভাবেই করো, ঘাটতি থাকে।
জাহাঙ্গীর কখনো কখনো রাতে অন্য প্রেসে কাজ করে। ফ্রিল্যান্স। ঘণ্টায় একশো টাকা। যদি কাজ পায়। সবসময় পায় না।
৫
দুপুরে খাওয়ার সময় জাহাঙ্গীর মেশিনের পাশে বসে ভাত খায়।
রওশন টিফিন বক্স দিয়ে দেয় সকালে। ভাত, ডাল, কখনো একটা ডিম, কখনো আলু ভর্তা। জাহাঙ্গীর টিফিন বক্স খুলে মেশিনের গায়ে হেলান দিয়ে বসে। অফসেট মেশিনটার গায়ে। ডিজিটালটায় না। অফসেটটা পুরনো বন্ধুর মতো। গায়ে তেলের গন্ধ, ধাতুর শীতলতা, তিরিশ বছরের পরিচিত স্পর্শ।
জাহাঙ্গীর মেশিনের সাথে কথা বলে না। কিন্তু মেশিনকে চেনে। কোন বিয়ারিংয়ে আওয়াজ হলে বোঝে। কোন রোলার শুকিয়ে গেলে বোঝে। মেশিনের শরীরের ভাষা পড়তে পারে। ডাক্তার যেমন রোগী দেখে, জাহাঙ্গীর তেমন মেশিন দেখে।
অফসেটে কাজ এখন মাসে দুই-তিনটা। কোনো মাস শূন্য। ডিজিটালে রোজ কিছু না কিছু আসে। কিন্তু ডিজিটাল যে কেউ চালাতে পারে। বাটন চাপা। ফাইল দাও, প্রিন্ট চাপো, কাগজ বের হয়। এতে তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা লাগে না। এতে শিল্প লাগে না।
অফসেটে শিল্প ছিল। কালির ঘনত্ব হাতে বোঝা। কাগজের আর্দ্রতা নাকে বোঝা। চাপের মাত্রা কানে বোঝা। পুরো শরীর দিয়ে ছাপা হতো। ডিজিটালে শুধু চোখ লাগে। বাকি শরীর বেকার।
জাহাঙ্গীর ভাতের শেষ মুঠো মুখে দিল। টিফিন বক্স বন্ধ করল।
৬
বিকেলে হাসান সাহেব এলেন।
ক্লান্ত চেহারা। চোখের নিচে কালি। কালি না, ছায়া। ক্লান্তির ছায়া।
"জাহাঙ্গীর, একটা কথা বলি।"
জাহাঙ্গীর মেশিন থামাল। জানে, হাসান সাহেব যখন "একটা কথা বলি" বলেন, কথাটা ভালো হয় না।
"প্রেস বিক্রি করার কথা ভাবছি।"
জাহাঙ্গীর চুপ।
"লোকসান যাচ্ছে। ভাড়া তিরিশ হাজার। কাজ আসে বিশ-পঁচিশ হাজারের। তোমার বেতন দশ। বিদ্যুৎ, কাগজ, কালি। মাসে পনেরো-বিশ হাজার লস। কতদিন?"
জাহাঙ্গীর কিছু বলল না। কী বলবে? মালিকের হিসেবে ভুল নেই।
"চেষ্টা করছি একটা পার্টি পেতে। জায়গাটা ভালো। বাবুবাজার। দোকান হিসেবে ভালো ভাড়া পাবে।"
"আমি কী করব?" জাহাঙ্গীর জিজ্ঞেস করল। গলার স্বর সমান। ভেঙে পড়েনি। ত্রিশ বছরে একটা জিনিস শিখেছে: ভেঙে পড়ে লাভ নেই।
হাসান সাহেব বললেন, "অন্য প্রেসে কাজ খোঁজো। তোমার মতো লোকের কাজ পাওয়া উচিত। তুমি অফসেটও পারো, ডিজিটালও পারো।"
জাহাঙ্গীর মাথা নাড়ল। জানে, অফসেট পারা এখন অতিরিক্ত যোগ্যতা না, অপ্রয়োজনীয় যোগ্যতা। আর ডিজিটাল পারে এমন কাউকে পেতে দশ মিনিট লাগে। যেকোনো ছেলে পারে।
হাসান সাহেব চলে গেলেন। জাহাঙ্গীর মেশিন আবার চালু করল। বিয়ের কার্ডের পরের ব্যাচ। সোনালি কালিতে নাম ছাপা হচ্ছে। দুটো নাম পাশাপাশি। একটা নতুন জীবন শুরু হচ্ছে। জাহাঙ্গীরের জীবনটা শেষ হচ্ছে কি না সে জানে না।
৭
রাতে বাসায় ফিরে জাহাঙ্গীর চুপচাপ খেল।
রওশন বুঝল কিছু হয়েছে। কিন্তু জিজ্ঞেস করল না। জাহাঙ্গীর বলবে যখন বলবে। তিরিশ বছরের সংসারে এটুকু বোঝাবুঝি হয়ে গেছে।
তানিয়া পরীক্ষার পড়া পড়ছে। সোহেল ফোনে গেম খেলছে। জাহাঙ্গীর ছাদে গেল। একটা বিড়ি ধরাল।
ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না। আলো আর ধোঁয়া মিলে একটা হলদে পর্দা তৈরি করেছে। জাহাঙ্গীর তারা খোঁজে না। সে নিচে তাকায়। রাস্তায় রিকশা, সিএনজি, মানুষ। সব চলছে। কিছুই থামে না।
সে ভাবে, তিরিশ বছর আগে যখন প্রথম প্রেসে ঢুকেছিল, তখন কত কিছু শিখতে হয়েছিল। সিসার অক্ষর চেনা। কালির ঘনত্ব বোঝা। মেশিনের তাপমাত্রা হাতে অনুভব করা। প্রতিটা জ্ঞান শরীরে জমা হয়েছে। হাতে, নাকে, কানে, চোখে। পুরো শরীরটা একটা ছাপাখানা হয়ে গেছে।
এখন সেই শরীরের দাম দশ হাজার টাকা। শীঘ্রই শূন্য হবে।
বিড়িটা শেষ। জাহাঙ্গীর নিচে নামল।
রওশন রান্নাঘর গুছাচ্ছে। জাহাঙ্গীর বলল, "প্রেস বিক্রি হবে।"
রওশন হাতের কাজ থামাল না। বলল, "কবে?"
"জানি না। মাস দুয়েকের মধ্যে।"
"তারপর?"
"খুঁজতে হবে।"
রওশন গ্লাসে পানি ঢেলে জাহাঙ্গীরের সামনে রাখল। আর কিছু বলল না। কী বলবে? জাহাঙ্গীরও জানে না, সেও জানে না।
জাহাঙ্গীর পানি খেল। মনে মনে বলল, কাগজ কমছে। কালি কমছে। চাকরি কমছে। শুধু কষ্ট কমছে না।
ঘুমাতে গেল। হাতের কালি বালিশে লাগল। রওশন কাল ধোবে। পরশু আবার লাগবে। অথবা লাগবে না। কে জানে।