বই বাঁধাই

আমি এমন একটা পেশায় আছি যেটা দুইদিক থেকে মরছে

পর্ব ৮২ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আজিজের দোকানে আঠার গন্ধ।

ফেভিকল, গাম আরবি, আর একটা বিশেষ আঠা যেটা আজিজ নিজে বানায়। ময়দা, পানি, সামান্য ভিনেগার। ফুটিয়ে ফুটিয়ে ঘন করে। এই আঠায় বই বাঁধলে পঞ্চাশ বছর টেকে। আজিজের বাবা শিখিয়েছিল। বাবার বাবা শিখিয়েছিল তার বাবাকে। চার পুরুষের আঠার রেসিপি। কিন্তু এখন কে চায় পঞ্চাশ বছর টেকা বই? মানুষ চায় দুদিনের পিডিএফ।

বাংলাবাজার। ঢাকার বইয়ের রাজধানী। গলির ভেতরে গলি, গলির ভেতরে দোকান, দোকানের ভেতরে বই। এখানে বাতাসেও কাগজের গন্ধ মেশানো। আজিজের দোকান একটা চিপা জায়গায়। ছয় ফুট চওড়া, দশ ফুট লম্বা। দুইপাশে তাক। তাকে বাঁধাই করা বই, বাঁধাই হবে এমন বই, বাঁধাইয়ের উপকরণ। মাঝখানে একটা টেবিল। টেবিলে একটা কাটিং বোর্ড, ছুরি, রুলার, সুই, সুতা, আঠা। এটুকুই আজিজের পৃথিবী।

সকাল নয়টায় দোকান খোলে। রাত নয়টায় বন্ধ করে। বারো ঘণ্টা। এর মধ্যে কখনো পনেরোটা বই বাঁধে, কখনো পাঁচটা, কখনো একটাও না। কাজ না থাকলে আজিজ নিজের বইগুলো ঠিক করে। তাকে সাজায়। উপকরণ গোছায়। সুই-সুতা গুনে। আঠা চেক করে। প্রস্তুত থাকে। যেন যেকোনো মুহূর্তে একশো বই আসবে। আসে না। কিন্তু প্রস্তুত থাকে।

আজিজের বয়স বায়ান্ন। শরীরে এখনো জোর আছে। কিন্তু চোখ দুর্বল হচ্ছে। বাঁধাইয়ের কাজে চোখ লাগে। সুই-সুতায় সেলাই করতে চোখ লাগে। সোনার ফিল্ম দিয়ে অক্ষর বসাতে চোখ লাগে। আজিজ এখন চশমা পরে। চশমার ওপর আরেকটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস।

আজিজ সকালে যে বইটা হাতে নিল সেটা পুরনো। ১৯৫৮ সালের। একটা কবিতার বই। মলাট ছিঁড়ে গেছে। পৃষ্ঠা বেরিয়ে আসছে। মলাটের রঙ একসময় নীল ছিল, এখন ধূসর। কিন্তু ভেতরের অক্ষর স্পষ্ট। লেটারপ্রেসে ছাপা। অক্ষরগুলো কাগজের গায়ে একটু বসে গেছে, আঙুল দিয়ে ছুঁলে টের পাওয়া যায়।

একজন বুড়ো মানুষ এনেছেন। বলেছেন, "এটা আমার বাবার বই। বাবা নেই। বই আছে। ভালো করে বেঁধে দেন।"

আজিজ বইটা বুকের কাছে ধরে দেখল। পৃষ্ঠাগুলো গুনল। একশো আটাশ পৃষ্ঠা। কয়েকটায় পোকা ধরেছে। কিন্তু বাঁচানো যাবে। মলাট নতুন করে বানাতে হবে। রেক্সিন দিয়ে। মলাটের ভেতরে শক্ত বোর্ড। সেলাই নতুন করে করতে হবে। সুতো দিয়ে, হাতে, পুরনো পদ্ধতিতে।

পঞ্চাশ টাকা নেবে।

পঞ্চাশ টাকায় একটা বই দ্বিতীয় জীবন পায়। আজিজ এটা বিশ্বাস করে। বই বাঁধাই মানে বইকে বাঁচানো। কাগজ পচে, মলাট ভাঙে, সুতো ছেঁড়ে। কিন্তু বাঁধাই করলে আরেকটা প্রজন্ম পড়তে পারে। আজিজ বই বাঁধে না, বই বাঁচায়।

কিন্তু কে বাঁচাবে আজিজকে?

আজিজ বইটার পৃষ্ঠাগুলো আলাদা করল। সাবধানে। একটা একটা করে। পোকা ধরা পৃষ্ঠাগুলো আলাদা রাখল। এগুলোতে জাপানি টিস্যু পেপার দিয়ে প্যাচ করতে হবে। জাপানি টিস্যু পেপার পাতলা, কিন্তু শক্ত। এটা বাংলাবাজারে একজনই বিক্রি করে। আবদুর রহিম। সে আবার পাকিস্তান থেকে আনায়। দাম বেশি। কিন্তু পুরনো বইয়ের জন্য এটা ছাড়া বিকল্প নেই।

আজিজ সুই বের করল। সুতো কাটল। দাঁত দিয়ে সুতোর মাথা সরু করল। সুইয়ের চোখে ভরল। প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শুরু। একটা একটা করে সেলাই। ছন্দে। যেভাবে বাবা শিখিয়েছিল। সুই ঢোকে, সুই বের হয়, সুতো টানা হয়, আবার সুই ঢোকে। একটা ধ্যানের মতো। দোকানের বাইরে রাস্তার শব্দ, হর্ন, হকারের ডাক, সব মিলিয়ে যায়। শুধু সুই আর সুতো আর কাগজ।

থিসিস বাইন্ডিং ছিল আজিজের রুটি-রুজির মূল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আসত। এমএ, এমফিল, পিএইচডি। থিসিস লেখা শেষ, এখন বাঁধাই করতে হবে। পাঁচ কপি, সাত কপি, দশ কপি। হার্ড বাইন্ডিং। রেক্সিনের মলাট, সোনালি অক্ষরে নাম আর শিরোনাম। একটা থিসিসের পাঁচ কপি বাঁধাই: আটশো থেকে হাজার টাকা।

সিজনে, মানে মে-জুন আর নভেম্বর-ডিসেম্বরে, রোজ দশ-পনেরোটা থিসিস আসত। আজিজ সারারাত কাজ করত। ছেলে শাহিন সাহায্য করত। বউ হালিমা আঠা বানিয়ে রাখত।

তিন বছর আগে বদলে গেল।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইন সাবমিশন চালু করল। পিডিএফ আপলোড করো, হয়ে গেল। প্রিন্ট করার দরকার নেই। বাঁধাইয়ের দরকার নেই। কিছু বিভাগ এখনো হার্ড কপি চায়, কিন্তু সেটা দুই কপি, পাঁচ না। আর ছাত্ররা সস্তায় বাঁধাই খোঁজে। স্পাইরাল বাইন্ডিং। দশ টাকা। মেশিনে হয়। হাতের কাজ লাগে না।

আজিজের থিসিস বাইন্ডিং মাসে দুই-তিনটায় নেমে এসেছে।

একটা ছেলে গত সপ্তাহে এসেছিল। এমএ থিসিস। বাংলা বিভাগ। বলল, "চাচা, পাঁচ কপি বাঁধাই করবেন?" আজিজ খুশি হয়ে গিয়েছিল। তারপর ছেলেটা বলল, "স্পাইরাল হলে কত?" আজিজ বলল, "হার্ড বাইন্ডিং করো। থিসিস হার্ড বাইন্ডিংয়ে হয়।" ছেলেটা বলল, "চাচা, টাকা নাই। স্পাইরাল করেন।" আজিজের কাছে স্পাইরাল মেশিন নেই। ছেলেটা পাশের দোকানে গেল।

লাইব্রেরির কাজ আছে কিছু। পুরনো বই মেরামত। কিন্তু লাইব্রেরিরও বাজেট নেই। গত বছর জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে একটা কাজ পেয়েছিল। একশো বইয়ের বাঁধাই। টেন্ডারে দাম কমিয়ে কমিয়ে পেয়েছিল। প্রতিটা ত্রিশ টাকায়। খরচ বাদ দিলে লাভ প্রায় শূন্য। কিন্তু আজিজ নিয়েছিল। কাজ না করলে হাত শক্ত হয়ে যায়। আর কিছু না হোক, বই ছোঁয়া যায়।

বিকেলে দোকানে একটা কাজও এল না।

আজিজ বসে আছে। সামনে আঠার পাত্র। পাশে সুই-সুতা। কাটিং বোর্ডে কোনো বই নেই। খালি বোর্ড। খালি টেবিল। খালি সময়।

পাশের দোকান ফটোকপির। সারাদিন মেশিন চলছে। ঘটঘট ঘটঘট। কাস্টমারের লাইন। ছাত্ররা নোটস কপি করাচ্ছে। দশ পৃষ্ঠা দশ টাকা। মেশিনে তিন মিনিট। ওপাশে আরেকটা দোকান। ল্যামিনেশন আর স্পাইরাল বাইন্ডিং। প্লাস্টিকের মলাট, প্লাস্টিকের স্পাইরাল। পাঁচ মিনিটে হয়ে যায়। মেশিনের কাজ। হাতের কাজ না।

আজিজ প্লাস্টিক ঘৃণা করে। প্লাস্টিকের মলাটে বই বাঁধা মানে বইকে অপমান করা। চামড়া লাগবে, অথবা রেক্সিন, অথবা ভালো কাপড়। ভেতরে বোর্ড, হাতে সেলাই, মলাটে সোনালি অক্ষর। একটা বই বাঁধতে আজিজের ঘণ্টা লাগে। মেশিনে পাঁচ মিনিট।

কিন্তু ঘণ্টায় বাঁধা বইটা পঞ্চাশ বছর বাঁচে। পাঁচ মিনিটে বাঁধা বইটা পাঁচ মাস।

এটা কাউকে বলে লাভ নেই। কেউ পঞ্চাশ বছর চায় না। সবাই চায় এখন। সস্তায়। দ্রুত।

আজিজ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাবাজারের রাস্তা দেখল। ছাত্ররা হাঁটছে। হাতে বই নেই। পকেটে ফোন। ফোনে সব আছে। বই আছে, নোট আছে, পরীক্ষার প্রশ্ন আছে। কাগজ লাগে না। মলাট লাগে না। আঠা লাগে না।

আজিজ ভেতরে ঢুকে একটা চা বানাল। একটা ছোট স্টোভ আছে দোকানে। কেটলি আছে। চায়ের পাতা, চিনি, গুঁড়ো দুধ। এটুকু বিলাসিতা আজিজ রাখে। কাজ না থাকলে চা থাকে। চা খেতে খেতে আঠার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে বসে থাকে। অপেক্ষা করে। কেউ আসবে। কোনো একটা বই নিয়ে আসবে। বলবে, "এটা বেঁধে দেন।" আজিজ বলবে, "দেন।" আর বই পাবে বাঁচার সুযোগ। আর একটু।

গত মাসে বড় অর্ডার এসেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি। পুরনো বই রিস্টোর করতে হবে। পাঁচশো বই। ব্রিটিশ আমলের কিছু, পাকিস্তান আমলের কিছু, মুক্তিযুদ্ধের আগের কিছু। পুরনো বাংলা, পুরনো ইংরেজি। কিছু আরবি, কিছু ফারসি। মলাট ভাঙা, পৃষ্ঠা হলুদ, কিছু পৃষ্ঠা ভিজে জমাট লেগে গেছে।

আজিজ দেখে চোখ উজ্জ্বল হয়ে গিয়েছিল। এই কাজ সে ছাড়া বাংলাবাজারে কেউ পারবে না। পুরনো বই রিস্টোর করা আলাদা শিল্প। পৃষ্ঠা আলগা করা, শুকানো, পোকার গর্ত মেরামত করা, নতুন করে সেলাই, মলাট তৈরি। প্রতিটা বইকে রোগী মনে করে চিকিৎসা করতে হয়।

দুই মাস লেগেছিল। আজিজ আর শাহিন, দুইজনে, সকাল থেকে রাত। পাঁচশো বই। প্রতিটা হাতে ধরেছে, প্রতিটার ক্ষত দেখেছে, প্রতিটাকে সারিয়েছে।

পেয়েছিল পঁচিশ হাজার টাকা। বই প্রতি পঞ্চাশ।

পাঁচশো বইয়ের মধ্যে একটা বই ছিল, ১৮৯৭ সালের। ইংরেজিতে লেখা। বাংলার নদী নিয়ে। ব্রিটিশ কোনো অফিসার লিখেছিলেন। পৃষ্ঠাগুলো হলুদ। কিছু পৃষ্ঠায় হাতে আঁকা নদীর মানচিত্র। আজিজ সেই বইটা হাতে নিয়ে কাঁপছিল। একশো উনত্রিশ বছরের বই। কত হাত ধরেছে এই বই। কত চোখ পড়েছে। এখন আজিজের হাতে।

আজিজ সেই বইটা সবচেয়ে সাবধানে বেঁধেছিল। সবচেয়ে ভালো আঠা দিয়ে। সবচেয়ে ভালো সুতো দিয়ে। টাকার জন্য না। বইটার জন্য।

তারপর? নীরবতা। আর কোনো অর্ডার আসেনি ওই মাপের। আজিজ অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা ছাড়া আর কী করবে?

হালিমা বলে, "চাল শেষ।"

আজিজ পকেট থেকে টাকা বের করল। তিনশো টাকা আছে। চাল কিনলে দুইশো যাবে। একশো থাকবে। পরশু দোকানের ভাড়া।

ভাড়া দেড় হাজার। দোকান ছোট, ভাড়া কম। কিন্তু কম ভাড়াও দিতে কষ্ট হয় যখন আয় কম। গত মাসে আজিজ পুরো মাসে সাত হাজার টাকা কামিয়েছে। এর থেকে ভাড়া, উপকরণ, বাসার খরচ। হিসেব মেলে না। হিসেব মেলার কথাও না।

হালিমা বুঝে। হালিমা আজিজের বউ, ত্রিশ বছরের সংসার। হালিমা জানে, আজিজকে বাঁধাই থেকে সরানো যাবে না। তাই হালিমা নিজে রাস্তায় নেমেছে। পাড়ায় কাঁথা সেলাই করে বিক্রি করে। মাসে তিন-চার হাজার আসে। এটা দিয়ে চাল-ডাল হয়।

আজিজ জানে হালিমা কষ্ট করছে। কিন্তু কী করবে? অন্য কাজ জানে না। জানলেও করতে পারবে না। হাত সুই ছাড়া অন্য কিছু ধরতে চায় না।

শাহিন বলে, "বাবা, অন্য কিছু করো।"

শাহিন বাঁধাই শিখেছে। কিন্তু শাহিন বোঝে, বাঁধাইতে ভবিষ্যৎ নেই। শাহিন এখন পাশের দোকানে ফটোকপির কাজ করে। মেশিন চালায়। মাসে পনেরো হাজার পায়। আজিজের চেয়ে বেশি।

"অন্য কিছু কী করব? আমি সারাজীবন বই বেঁধেছি।"

"প্রিন্ট শপ দাও। ফটোকপি, প্রিন্ট, ল্যামিনেশন। মেশিন কিনতে পঞ্চাশ হাজার লাগবে। আমি জোগাড় করব।"

আজিজ ছেলের দিকে তাকাল। ছেলে ভালো। বুদ্ধিমান। ব্যবহারিক। কিন্তু ছেলে বোঝে না যে কিছু কিছু কাজ শুধু পেটের জন্য না। হাতের জন্য। আজিজের হাত সুই-সুতায় অভ্যস্ত। মেশিনের বাটনে না।

"দেখি," আজিজ বলল। এটা তার "না" বলার ভদ্র উপায়।

শাহিন বুঝল। কিন্তু কিছু বলল না। পরে আবার বলবে। শাহিন জানে, বাবার একগুঁয়েমি ভালোবাসা দিয়ে বাঁধা। বই ভালোবাসে, তাই ছাড়তে পারে না। কিন্তু ভালোবাসা পেট ভরায় না।

আজিজ মাঝে মাঝে ভাবে, শাহিনকে ঠিকমতো শেখাতে পারল কি না। শাহিন বাঁধাই পারে, কিন্তু করে না। পারাটা থাকবে তার হাতে। কোনোদিন দরকার হলে করতে পারবে। কিন্তু দরকার হবে কি? কে জানে। হয়তো একদিন পিডিএফ থাকবে না। হয়তো একদিন মানুষ আবার কাগজে ফিরবে। হয়তো না। আজিজ ভবিষ্যৎ পড়তে পারে না। শুধু পুরনো বই পড়তে পারে।

রাতে দোকান বন্ধ করার আগে আজিজ একটা বই হাতে নিল।

সেই সকালের বইটা। ১৯৫৮ সালের কবিতার বই। বাঁধাই শেষ হয়েছে। নতুন মলাট, গাঢ় নীল রেক্সিন, মলাটের ওপর সোনালি অক্ষরে নাম। সেলাই হাতে করা, আজিজের বিশেষ সুতো দিয়ে, আজিজের বিশেষ আঠা দিয়ে। বইটা এখন শক্ত। আরো পঞ্চাশ বছর বাঁচবে।

আজিজ বইটা খুলল। প্রথম পৃষ্ঠায় কালিতে লেখা: "আমার ছেলে আমিনকে দিলাম। পড়িস। ৩রা মার্চ, ১৯৬২।"

কারো বাবা কারো ছেলেকে বই দিয়েছিল। চৌষট্টি বছর আগে। সেই ছেলে এখন বুড়ো। সেই বুড়ো বইটা আজিজের কাছে এনেছে। বই টিকে আছে। মানুষ যাচ্ছে।

আজিজ বইটা কাপড় দিয়ে মুছল। তাকে রাখল।

কাল বুড়ো মানুষটা আসবে বই নিতে। পঞ্চাশ টাকা দেবে। আজিজ বইটা তার হাতে দেবে। বুড়ো মানুষটা হয়তো বইটা খুলবে, বাবার হাতের লেখা দেখবে, চোখ ভিজবে। হয়তো ভিজবে না। কে জানে। আজিজ জানে না। আজিজ শুধু বাঁধাই করে। বাকিটা বইয়ের আর পাঠকের মধ্যকার ব্যাপার।

দোকানে আরো কিছু বই পড়ে আছে। কারো আসেনি নিতে। কেউ কেউ বাঁধাই দিয়ে ভুলে যায়। কিছু বই বছরের পর বছর তাকে পড়ে থাকে। আজিজ ফেলে দেয় না। বই ফেলা যায় না। বই জমে যায়। দোকানটা ছোট, তাকগুলো ভারী, কিন্তু আজিজ কোনো বই ফেলেনি কোনোদিন।

বই পড়া কমেছে। বই বাঁধাই আরও কমেছে। আজিজ এমন একটা পেশায় আছে যেটা দুইদিক থেকে মরছে। পড়ার দিক থেকে মরছে, ছাপার দিক থেকে মরছে। মাঝখানে আজিজ, সুই হাতে, অপেক্ষায়।

দোকানের শাটার নামাল। তালা লাগাল। বাংলাবাজারের গলিতে অন্ধকার। দূরে একটা প্রেসের আলো জ্বলছে। কেউ রাতের শিফটে ছাপছে। ঘটঘট আওয়াজ।

আজিজ হাঁটতে লাগল। বাংলাবাজারের গলি চেনা। তিরিশ বছর ধরে চেনা। প্রতিটা দোকান চেনা। কোনটা বই বিক্রি করে, কোনটা ছাপে, কোনটা বাঁধে। বাঁধে এমন দোকান আগে সাতটা ছিল এই গলিতে। এখন দুইটা। আজিজের আর আরেকটা, সেটাও বন্ধ হওয়ার পথে।

আঠার গন্ধ তার শার্টে লেগে আছে। বাসায় গেলেও থাকবে। ঘুমের মধ্যেও থাকবে।

হালিমা জেগে আছে। আজিজ ঢুকতেই বলল, "খাবে?"

"খেয়ে এসেছি।"

মিথ্যা। খায়নি। কিন্তু হালিমার জন্য রাখা ভাতে ভাগ বসাতে চায় না। হালিমা জানে মিথ্যা। কিন্তু কিছু বলে না।

সকালে উঠে আবার ওই দোকানে যাবে। আবার আঠা গরম করবে। আবার অপেক্ষা করবে। বই আসবে কি না জানে না। কিন্তু আজিজ যাবে। যাওয়া ছাড়া আর কিছু জানে না।