রিকশা পেইন্টার

আমার ছবি মিউজিয়ামে থাকে। আমি রাস্তায় থাকি।

পর্ব ৮৩ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আলাউদ্দিনের হাতে তুলি। তুলিতে লাল রঙ। রিকশার পেছনের প্যানেলে একটা ময়ূর আঁকছে।

ময়ূরের লেজ ছড়ানো। নীল, সবুজ, সোনালি। প্রতিটা পালকে একটা করে চোখ। চোখগুলো জীবন্ত। রাস্তার লোকে দেখলে বলবে, ময়ূরটা এইমাত্র লেজ মেলেছে। কিন্তু আলাউদ্দিন জানে, ময়ূরটা কাল শুকিয়ে গেলে কেউ তাকাবে না। রিকশার পেছনে কে দেখে? যাত্রী বসে সামনে তাকায়। রাস্তার লোক রিকশা দেখে, ছবি দেখে না।

আলাউদ্দিনের বয়স পঁয়তাল্লিশ। তিরিশ বছর ধরে রিকশায় ছবি আঁকে। বারো বছর বয়সে ওস্তাদ কালাম মিয়ার কাছে শিখতে গিয়েছিল। কালাম মিয়া পুরান ঢাকার কিংবদন্তি। তার আঁকা রিকশা একসময় সারা ঢাকা চলত। তাজমহল, লালবাগ কেল্লা, সিনেমার দৃশ্য, ফুল-পাখি-নদী। প্রতিটা রিকশা একটা ক্যানভাস। রাস্তাই গ্যালারি।

কালাম মিয়া মারা গেছেন ২০১৮-তে। তার ছাত্র ছিল সাতজন। এখন আঁকে তিনজন। বাকিরা অন্য কাজে চলে গেছে। একজন মুদি দোকান দিয়েছে। একজন রং মিস্ত্রি হয়েছে, দেয়ালে রঙ করে, বিল্ডিংয়ের। একজন ঢাকা ছেড়েই চলে গেছে।

আলাউদ্দিন আছে। ছাড়তে পারে না। হাত ছাড়ে না। ওস্তাদের কথা মনে পড়ে। কালাম মিয়া বলতেন, "রিকশার ছবি শেষ হবে। কিন্তু যে এঁকেছে তার হাত শেষ হবে না। হাত মনে রাখে।" আলাউদ্দিনের হাত মনে রাখে। তিরিশ বছরের প্রতিটা প্যানেল, প্রতিটা রঙ, প্রতিটা তুলির টান।

রিকশার প্যানেল একটা ছোট পৃথিবী।

তিন ফুট বাই দুই ফুট। এই জায়গায় আলাউদ্দিন সব আঁকে। তাজমহল আঁকে, যেটা সে কোনোদিন দেখেনি। কক্সবাজারের সমুদ্র আঁকে, যেটা সে একবার দেখেছে, ছেলেবেলায়, বাবার সাথে। সুন্দরবনের বাঘ আঁকে। বাঘ দেখেনি কোনোদিন। ছবি দেখেছে।

সিনেমার দৃশ্য আঁকত আগে। মান্না, শাকিব খান, ডিপজল। নায়ক-নায়িকা পাশাপাশি, ব্যাকগ্রাউন্ডে ফুল। এখন সিনেমার দৃশ্য কম চায় লোকে। ফুল-পাখি বেশি চায়। কেউ কেউ মসজিদ চায়। কেউ গ্রামের দৃশ্য, নদী, পালতোলা নৌকা, ধানক্ষেত।

প্রতিটা প্যানেলে তিন-চার ঘণ্টা লাগে। রঙ মেশানো, স্কেচ করা, রঙ করা, ডিটেইল বসানো। এনামেল পেইন্ট ব্যবহার করে। উজ্জ্বল রঙ। রিকশার ছবিতে মৃদু রঙ চলে না। চোখে লাগতে হবে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখেও চোখ আটকাতে হবে। এটাই রিকশা শিল্পের নিয়ম। ওস্তাদ শিখিয়েছিলেন, "রিকশার ছবি গ্যালারির ছবি না। রিকশার ছবি রাস্তার ছবি। রাস্তায় মানুষ থামে না। তুই এমন আঁকবি যেন থামে।"

আলাউদ্দিন থামানোর মতো আঁকে। কিন্তু রাস্তায় রিকশাই থামছে।

কালাম মিয়া বলতেন, "ছবি আঁকা মানে দুনিয়াকে সুন্দর করা। দুনিয়া কুৎসিত, তাই ছবি দরকার।" আলাউদ্দিন দুনিয়া সুন্দর করে। দুইশো টাকায়। প্রতিটা রিকশা একটু সুন্দর হয়ে রাস্তায় নামে। রাস্তাটা একটু সুন্দর হয়। কিন্তু কেউ লক্ষ করে না। সুন্দর যখন সর্বত্র, তখন সুন্দর অদৃশ্য হয়ে যায়।

একটা প্যানেলের দাম দুইশো টাকা।

আলাউদ্দিন ভাবে, দুইশো টাকা। তিন-চার ঘণ্টার কাজ। রঙের খরচ বাদ দিলে হাতে থাকে একশো পঞ্চাশ। ঘণ্টায় চল্লিশ টাকা। একজন রিকশাওয়ালা ঘণ্টায় এর চেয়ে বেশি কামায়।

রিকশার মালিকরা দাম বাড়াতে চায় না। বলে, "দুইশোর বেশি দিলে আমি প্লেইন রিকশা চালাব। ছবি ছাড়া।" কিছু মালিক ইতিমধ্যে প্লেইন রিকশা চালাচ্ছে। সবুজ বা নীল রঙের একটা কোট দিয়ে শেষ। ছবি নেই। আলাউদ্দিন এরকম রিকশা দেখলে কষ্ট পায়। মনে হয় একটা চেহারা মুছে ফেলা হয়েছে।

গত মাসে একটা মজার ঘটনা ঘটল। একটা বিদেশি মেয়ে এসেছিল। ক্যামেরা নিয়ে। আলাউদ্দিনের আঁকা একটা রিকশার ছবি তুলল। অনেকগুলো ছবি। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে। তারপর আলাউদ্দিনের ছবি তুলল। আলাউদ্দিনকে তুলি হাতে ধরতে বলল। আলাউদ্দিন ধরল।

মেয়েটা বলল, সে একটা বইয়ের জন্য ছবি তুলছে। রিকশা আর্ট নিয়ে বই। ইংরেজিতে। ইউরোপে ছাপা হবে।

আলাউদ্দিন জিজ্ঞেস করল, "আমার নাম থাকবে?"

মেয়েটা বলল, "অবশ্যই। আপনি আর্টিস্ট।"

আর্টিস্ট। শব্দটা আলাউদ্দিনের কানে অচেনা লাগল। সে তো রিকশা পেইন্টার। ঢাকার রাস্তায় কেউ বলে না আর্টিস্ট। বলে, "ওই যে রিকশায় রঙ করে।"

মেয়েটা আলাউদ্দিনকে পাঁচশো টাকা দিয়েছিল। ছবি তোলার জন্য। আলাউদ্দিন নিতে চায়নি। মেয়েটা জোর করল। বলল, "এটা আপনার সময়ের জন্য।" আলাউদ্দিন নিল। পাঁচশো টাকা। দুইটা প্যানেলের সমান। ছবি তুলতে দিল বলে।

ইউরোপে বই ছাপা হবে। আলাউদ্দিনের ছবি থাকবে। আলাউদ্দিন বইটা কোনোদিন দেখবে না। ইংরেজি পড়তে পারে না। ইউরোপ কোথায় ঠিক জানে না। কিন্তু কোথাও তার কাজের একটা ছাপ থাকবে। একটা প্রমাণ যে সে ছিল। আঁকত। রিকশায় ময়ূর আঁকত।

আলাউদ্দিন শুনেছে, তার আঁকা রিকশার প্যানেল ঢাকার একটা গ্যালারিতে বিক্রি হয়।

পাঁচ হাজার টাকা। একটা প্যানেল। যেটা সে দুইশো টাকায় এঁকেছিল। কেউ কিনে নিয়ে গেছে। ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেয়ালে ঝুলিয়েছে। গ্যালারিতে সাদা দেয়াল, স্পটলাইট, পাশে একটা কার্ডে লেখা: "ঢাকা রিকশা আর্ট, অ্যানোনিমাস আর্টিস্ট"।

অ্যানোনিমাস। মানে বেনামি। আলাউদ্দিনের নাম নেই। প্যানেলের পেছনে সে সাইন করে, ছোট করে, "আলা" লেখে। কিন্তু ফ্রেমে বাঁধলে পেছন দেখা যায় না।

আলাউদ্দিন গ্যালারিতে কোনোদিন যায়নি। ধানমন্ডিতে, গুলশানে গ্যালারি আছে শুনেছে। সেখানে ঠান্ডা ঘরে ছবি ঝুলছে। লোকে ওয়াইন খেতে খেতে দেখে। পাঁচ হাজার, দশ হাজার, কখনো লাখ টাকা দিয়ে কেনে। আলাউদ্দিনের ছবি সেখানে থাকে। আলাউদ্দিন থাকে পুরান ঢাকার একটা ভাড়া ঘরে। টিনের চাল। একটা ঘরে বউ, তিন ছেলেমেয়ে, আলাউদ্দিন।

আমার ছবি মিউজিয়ামে থাকে। আমি রাস্তায় থাকি।

এটা আলাউদ্দিন কাউকে বলেনি। বলার লোক নেই। বললে কী হবে? কেউ দাম বাড়াবে না। কেউ গ্যালারি থেকে টাকা এনে দেবে না। দুনিয়া এভাবেই চলে। যে আঁকে সে পায় না। যে বেচে সে পায়।

আলাউদ্দিন একবার ভেবেছিল নিজেই গ্যালারিতে যাবে। নিজের ছবি নিয়ে। বলবে, "এগুলো আমার আঁকা। বিক্রি করুন।" কিন্তু যায়নি। কী পরে যাবে? লুঙ্গি-গেঞ্জি পরে গ্যালারিতে? হাতে রঙের দাগ নিয়ে? গ্যালারির মানুষেরা কী ভাববে? হয়তো দারোয়ান ঢুকতেই দেবে না।

আলাউদ্দিন জানে, শিল্প আর শিল্পীর মধ্যে একটা দেয়াল আছে। শিল্প দেয়ালে ঝুলে। শিল্পী দেয়ালের বাইরে থাকে।

আলাউদ্দিনের বউ জরিনা কাপড়ের কারখানায় কাজ করে। সকাল আটটায় যায়, সন্ধ্যা সাতটায় ফেরে। মাসে আট হাজার। আলাউদ্দিনের আয়ের চেয়ে বেশি কিছু মাসে। এটা আলাউদ্দিন জানে। জরিনাও জানে। কেউ মুখে বলে না।

জরিনা বলে না, "তুমি আর্টিস্ট, তবু আমার চেয়ে কম কামাও।" বলে না, কারণ জরিনা বোঝে, আলাউদ্দিনকে এটা বলা মানে তাকে ভেঙে ফেলা। আলাউদ্দিনের অহংকার একটাই: সে আঁকতে পারে। রঙ দিয়ে পৃথিবী বানাতে পারে। এই অহংকারটা থাকলে মানুষটা দাঁড়িয়ে থাকে। না থাকলে ভেঙে পড়বে।

কিন্তু রাতে, যখন ছেলেমেয়ে ঘুমিয়ে যায়, জরিনা আস্তে করে বলে, "লিপির শ্বশুরবাড়ি থেকে ফোন এসেছিল। ঈদে কিছু পাঠাতে হবে।" অথবা, "রাসেলের কোচিংয়ের টাকা দিতে হবে।" অথবা, "বাসার ভাড়া দুইশো বাড়িয়েছে।"

আলাউদ্দিন শোনে। চুপ থাকে। তারপর বলে, "দেখি।" দেখি মানে জানি না। দেখি মানে চেষ্টা করব। দেখি মানে একটা প্যানেল বেশি আঁকব। দুইশো টাকা বেশি আসবে। কিন্তু দুইশো টাকায় কতটুকু হয়?

ঢাকায় রিকশা নিষিদ্ধ হচ্ছে। কিছু কিছু রাস্তায়।

গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির বড় রাস্তায় রিকশা চলে না। আগে চলত। এখন ব্যারিকেড দিয়ে আটকে রাখে। রিকশাওয়ালারা গলি দিয়ে যায়। মূল রাস্তায় গাড়ি, বাস, সিএনজি। রিকশা গরিবের বাহন। গরিবের বাহন বড় রাস্তায় চলবে না।

প্রতিটা রিকশা নিষিদ্ধ হওয়া মানে আলাউদ্দিনের একটা ক্যানভাস হারিয়ে যাওয়া।

ঢাকায় কত রিকশা আছে কেউ জানে না। কেউ বলে আট লাখ, কেউ বলে দশ লাখ। লাইসেন্স আছে আশি হাজারের। বাকি সব অবৈধ। অবৈধ রিকশায়ও ছবি থাকে। আলাউদ্দিন জিজ্ঞেস করে না রিকশা বৈধ কি না। সে শুধু আঁকে।

কিন্তু রিকশা কমছে। ব্যাটারিচালিত রিকশা আসছে। সেগুলোতে প্যানেল নেই। ফাইবারগ্লাসের বডি। মসৃণ। ছবি আঁকার জায়গা নেই। কিছু কিছুতে স্টিকার লাগায়। প্রিন্টেড স্টিকার। ফুল, পাখি, তারকার ছবি। মেশিনে ছাপা। আলাউদ্দিনের হাতের দরকার নেই।

শহর রিকশা চায় না। রিকশার শিল্প চায়। শিল্পী চায় না।

UNESCO বলেছে ঢাকার রিকশা পেইন্টিং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আলাউদ্দিন এটা জানে না। জানলে কী করত? UNESCO তাকে টাকা দেয় না। ঐতিহ্য পেটে লাগে না।

আলাউদ্দিন একটা জিনিস দেখেছে। নতুন রিকশায় কেউ কেউ এলইডি লাইট লাগায়। রাতে জ্বলে। নীল, লাল, সবুজ। ঝিকমিক করে। লোকে সেদিকে তাকায়। আলাউদ্দিনের আঁকা ময়ূরের দিকে তাকায় না। লাইটের দিকে তাকায়।

আলো সস্তা। রঙ দামি। আলো কেনা যায়, রঙ আঁকা যায় না। যে কেউ লাইট লাগাতে পারে। আঁকতে পারে না যে কেউ। কিন্তু রাস্তায় আলো জেতে। রঙ হারে।

আলাউদ্দিন এটা নিয়ে রাগ করে না। রাগ করে লাভ কী? রাস্তা বদলাচ্ছে, রিকশা বদলাচ্ছে, আলো বদলাচ্ছে। শুধু আলাউদ্দিন বদলাচ্ছে না। তুলি হাতে বসে আছে। বারো বছর বয়সের মতো।

সন্ধ্যায় আলাউদ্দিন তুলি ধুচ্ছে।

কেরোসিনে ডুবিয়ে রঙ ছাড়াচ্ছে। প্রতিটা তুলি আলাদা আলাদা ধোয়। পাতলা তুলি, মোটা তুলি, গোল মাথা, চ্যাপ্টা মাথা। বারোটা তুলি। বারো বছর বয়সে প্রথম তুলি হাতে নিয়েছিল। তারপর থেকে প্রতিদিন। একদিনও বাদ যায়নি।

বড় ছেলে বাবুল গার্মেন্টসে কাজ করে। মেয়ে লিপি বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ছেলে রাসেল দশম শ্রেণিতে পড়ে।

রাসেল একদিন বলেছিল, "বাবা, আমাকে আঁকা শেখাও।"

আলাউদ্দিনের বুক ভরে গিয়েছিল। কিন্তু মুখে বলল, "তুই পড়। আঁকা শিখে কী করবি? রিকশায় ছবি আঁকবি? তারচেয়ে পড়ালেখা কর। চাকরি কর। অফিসে বস।"

রাসেল পড়ছে। আর আঁকার কথা বলে না।

আলাউদ্দিন মাঝে মাঝে ভাবে, ভুল করল কি না। ছেলেকে শেখালে ছেলে আরো ভালো আঁকত। আলাউদ্দিনের চেয়ে ভালো। কিন্তু তারপর? ছেলেও দুইশো টাকায় প্যানেল আঁকত? ছেলেরও হাতে কালি লাগত? ছেলেরও নাম "অ্যানোনিমাস" থাকত?

না। ছেলে অন্য কিছু হবে। যেকোনো কিছু। শুধু রিকশা পেইন্টার না।

কিন্তু কখনো কখনো, যখন আলাউদ্দিন একটা প্যানেল শেষ করে, রঙ শুকাতে রোদে রাখে, তখন দেখে, একটা ছায়া পড়ছে। রাসেল দাঁড়িয়ে দেখছে। চুপচাপ। কিছু বলছে না। শুধু দেখছে। আলাউদ্দিন দেখেও না দেখার ভান করে। মনে মনে ভাবে, ছেলের চোখে সেই জিনিসটা আছে। যেটা আলাউদ্দিনের বারো বছর বয়সে ছিল। যেটা কালাম মিয়া দেখে বলেছিলেন, "ধর তুলি।"

কিন্তু আলাউদ্দিন বলবে না "ধর তুলি।" কখনো না।

রাতে আলাউদ্দিন একটা কাজ করে যেটা কেউ জানে না।

ঘরের কোণায় একটা পুরনো টিনের বাক্স আছে। তার ভেতরে কাগজ। সাদা কাগজে ছবি আঁকা। রিকশার জন্য না। নিজের জন্য। কেউ দেখবে না। কেউ কিনবে না। কেউ পাঁচ হাজারে গ্যালারিতে ঝুলাবে না।

এগুলো আলাউদ্দিনের নিজের ছবি। বুড়িগঙ্গার ভোর। পুরান ঢাকার গলি। চকবাজারের রাতের আলো। একটা পাখি, যেটা রোজ তার জানালায় বসে। বউয়ের মুখ, ঘুমের মধ্যে।

এগুলোতে এনামেল পেইন্ট ব্যবহার করে না। জলরঙ। মৃদু। রাস্তার ছবি না। ঘরের ছবি। চোখে লাগার দরকার নেই। মনে লাগলেই হলো।

আলাউদ্দিন টিনের বাক্স খুলল। আজকের ছবিটা ভেতরে রাখল। কাগজের ওপর কাগজ। কত ছবি জমেছে গোনেনি। হয়তো শখানেক। হয়তো বেশি।

বাক্সটা বন্ধ করল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। বউ পাশে ঘুমাচ্ছে। ছোট ছেলে অন্য পাশে।

আলাউদ্দিনের হাতে এখনো রঙের গন্ধ। কেরোসিন দিয়ে ধুয়েছে, তবু আছে। তিরিশ বছরের রঙ চামড়ার ভেতরে ঢুকে গেছে।

টিনের বাক্সের ছবিগুলো কেউ কোনোদিন দেখবে কি না আলাউদ্দিন জানে না। হয়তো সে মারা যাওয়ার পর কেউ বাক্সটা খুলবে। হয়তো ফেলে দেবে। হয়তো কেউ একটা ছবি দেখে থামবে। বলবে, "এটা কে এঁকেছিল?"

কেউ উত্তর দেবে না। কারণ পেছনে সাইন নেই। এগুলো নিজের ছবি। নিজের ছবিতে সাইন লাগে না।

বাইরে রাস্তায় একটা রিকশা গেল। ঘণ্টি বাজল। টুংটাং। আলাউদ্দিন চিনতে পারল না ছবিটা কার আঁকা। অন্ধকারে দেখা যায় না। হয়তো তার আঁকা। হয়তো না।

রিকশা চলে গেল। রাস্তা ফাঁকা। আলাউদ্দিন ঘুমাল।