মৃৎশিল্পী

আমি দেবতা বানাই। দেবতা আমাকে বানায়নি।

পর্ব ৮৪ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

শান্তি রানীর হাত ভেজা। মাটি লেগে আছে।

এই মাটি সাধারণ মাটি না। নদীর পলি, খড়ের গুঁড়ো, তুষ, আর একটু আঠালো কাদা মিশিয়ে তৈরি। অনুপাত জানতে হয়। বেশি পলি দিলে ফাটবে। কম দিলে ভাঙবে। খড় বেশি হলে পুড়বে না ঠিকমতো। এই অনুপাত শান্তি রানী জানে। তার মা জানত। তার মার মা জানত। পাঁচ পুরুষ ধরে এই পরিবার মাটি মাখে।

সকাল ছয়টা। শান্তি রানী উঠোনে বসে আছে। সামনে একটা কাঠের ফ্রেম। ফ্রেমের ওপর একটা আকৃতি তৈরি হচ্ছে। এখনো চেনা যাচ্ছে না কী হবে। কিন্তু শান্তি রানী জানে। এটা দুর্গার ডান হাত হবে। যে হাতে ত্রিশূল থাকবে। যে হাত অসুরকে বধ করবে।

শান্তি রানীর বয়স আটচল্লিশ। বিয়ে হয়েছিল আঠারোতে। স্বামী গোপাল ছিল মিস্ত্রি, দেয়াল গাঁথত। তিন বছর আগে বাঁশের মাচা থেকে পড়ে গোপালের কোমর ভেঙেছে। এখন হাঁটতে পারে, কিন্তু কাজ করতে পারে না। সংসার শান্তি রানীর কাঁধে।

মেয়ে ঝুমা। বিশ বছর। কলেজে পড়ে। ছেলে বিকাশ। পনেরো। দশম শ্রেণি। স্বামী বিছানায়। চারটা প্রাণ। শান্তি রানীর দুটো হাত।

এই দুটো হাত ছোট। আঙুল সরু। কিন্তু শক্ত। মাটি মথার শক্তি আছে। গাঁট শক্ত, কবজি শক্ত। চল্লিশ বছর মাটি মেখে হাতের চামড়া মোটা হয়ে গেছে। কিন্তু স্পর্শ সূক্ষ্ম রয়ে গেছে। দেবীর ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটাতে কতটুকু মাটি লাগে, সেটা শান্তি রানীর আঙুল জানে। মস্তিষ্ক ভাবার আগেই আঙুল করে ফেলে।

দুর্গাপূজা। বছরের সবচেয়ে বড় কাজ।

ছয় মাস আগে থেকে শুরু। বৈশাখে ফ্রেম বানায়। জ্যৈষ্ঠে মাটির কাজ শুরু। আষাঢ়-শ্রাবণে শরীর তৈরি। ভাদ্র-আশ্বিনে রঙ আর সাজসজ্জা। শারদীয়ায় পূজা। তারপর বিসর্জন।

ছয় মাসের কাজ। একদিনে নদীতে ভাসিয়ে দেয়।

বিসর্জনের দিন শান্তি রানী যায় না নদীতে। ঘরে থাকে। কেন যায় না কেউ জিজ্ঞেস করে না। হয়তো ভাবে, ক্লান্ত। হয়তো ভাবে, কাজ আছে। কিন্তু আসল কারণ শান্তি রানী কাউকে বলেনি। ছয় মাস ধরে যাকে বানিয়েছে, তাকে ডুবতে দেখা কঠিন। জানে, এটাই নিয়ম। জানে, দেবী আবার আসবেন। তবু দেখা কঠিন। তাই দেখে না।

শান্তি রানী এটা নিয়ে ভাবে না। ভাবার অভ্যাস নেই। দেবতা বানানো হয় পূজার জন্য। পূজা শেষ হলে দেবতা যান। আবার আসবেন পরের বছর। আর শান্তি রানী আবার বানাবে। চক্র।

এবার পাঁচটা মূর্তি বানাচ্ছে। পাঁচটা পূজামণ্ডপের জন্য। বড় একটা, চার ফুট উচ্চতা, সপরিবার দুর্গা। বাকি চারটা ছোট। দুই ফুট। শুধু দুর্গা, একক।

বড়টার দাম পঁচিশ হাজার। ছোটগুলো পাঁচ হাজার করে। মোট পঁয়তাল্লিশ হাজার। ছয় মাসের কাজে পঁয়তাল্লিশ হাজার। মাসে সাড়ে সাত হাজার। এর থেকে মাটি, রঙ, খড়, কাঠ, পরিবহন খরচ বাদ। হাতে থাকে পঁচিশ-ত্রিশ হাজার। ছয় মাসের।

পূজামণ্ডপের কমিটি অ্যাডভান্স দেয় দশ হাজার। বাকিটা পূজার পর। কখনো কখনো পূজার পরেও দেয় না। বলে, "চাঁদা কম উঠেছে। পরে দেব।" পরে মানে কখনো কখনো দুই মাস। কখনো তিন মাস। শান্তি রানী ধরতে যায় না। যেতে লজ্জা লাগে। যেতে ভয়ও লাগে। পূজামণ্ডপের কমিটি বড় মানুষদের। তাদের কাছে ধরতে যাওয়া মানে ভিক্ষা চাওয়ার মতো। শান্তি রানী ভিক্ষুক না। শান্তি রানী শিল্পী। কিন্তু শিল্পী আর ভিক্ষুকের মধ্যে তফাৎটা কোথায়, সেটা মাঝে মাঝে শান্তি রানী বুঝতে পারে না।

বাকি ছয় মাস কী করে শান্তি রানী?

পুতুল বানায়। মাটির পুতুল। ঘোড়া, হাতি, পাখি, রাজা-রানী, কৃষ্ণ-রাধা। ছোট ছোট, হাতের তালুতে ধরে যায়। একটা পুতুল বানাতে আধ ঘণ্টা। রঙ করতে আরো আধ ঘণ্টা। দাম বিশ টাকা।

মেলায় বিক্রি করে। পৌষ মেলা, বৈশাখী মেলা, গ্রামে গঞ্জে যে মেলা বসে। একটা চাটাই বিছিয়ে পুতুল সাজিয়ে বসে। দিনে তিরিশ-চল্লিশটা বিক্রি হলে ভালো দিন। দশটা বিক্রি হলে সাধারণ দিন। কিছু বিক্রি না হলে ফেরত আসে।

প্লাস্টিকের পুতুল এসে গেছে। চায়নিজ। রঙিন, চকচকে, সস্তা। দশ টাকায় পাওয়া যায়। শিশুরা প্লাস্টিক চায়। মাটির পুতুল হাতে নিলে ভাঙে। প্লাস্টিকের ভাঙে না। মায়েরা প্লাস্টিক কেনে। সস্তা, টেকসই। মাটির পুতুল কেনে বুড়োরা। নস্টালজিয়া। কিন্তু বুড়োরা কতটুকু কেনে?

শান্তি রানী প্লাস্টিকের পুতুল দেখলে কিছু বলে না। চুপ থাকে। ভেতরে কিছু একটা মোচড় দেয়, কিন্তু মুখে আনে না।

মনে মনে ভাবে, প্লাস্টিক মাটিতে মেশে না। মাটির পুতুল মাটিতে ফেরে। যেখান থেকে এসেছিল সেখানে যায়। প্লাস্টিক কোথাও যায় না। চিরকাল পড়ে থাকে। কিন্তু মানুষ চিরকাল চায়। ক্ষণিকের জিনিস চায় না।

শান্তি রানী হিন্দু। বাংলাদেশে হিন্দু।

এটা নিয়ে সে বেশি কথা বলে না। কী বলবে? কীভাবে বলবে? কাকে বলবে?

তাদের পাড়ায় চৌদ্দটা হিন্দু পরিবার ছিল। এখন আটটা। ছয়টা পরিবার চলে গেছে। কেউ ভারতে, কেউ ঢাকায়, কেউ কোথায় কেউ জানে না। চলে গেছে মানে চলে গেছে। জমি বিক্রি করে কেউ, ফেলে রেখে কেউ। ফেলে রাখা জমিতে অন্যরা ঢুকে পড়েছে। শান্তি রানী দেখেছে। কিছু বলেনি।

২০২১-এ কুমিল্লায় যা হয়েছিল তার খবর এখানেও এসেছিল। পাড়ায় কিছু হয়নি। কিন্তু ভয় ছিল। তিন দিন শান্তি রানী দরজা বন্ধ করে ঘরে ছিল। গোপাল বলেছিল, "কিছু হবে না। এখানকার মানুষ ভালো।" শান্তি রানী জানে মানুষ ভালো। কিন্তু ভালো মানুষও চুপ থাকে। চুপ থাকাটা কখনো কখনো খারাপের চেয়ে খারাপ।

পূজার সময় সবাই শান্তি রানীকে চেনে। পূজামণ্ডপের কমিটির লোকেরা আসে। চা খাওয়ায়। ভালো ব্যবহার করে। "শান্তি দি, মূর্তি কেমন হচ্ছে? এবার একটু বড় করো। গত বছরের চেয়ে ভালো করো।" শান্তি রানী হাসে, বলে, "চেষ্টা করব।"

পূজার পর কেউ জিজ্ঞেস করে না শান্তি রানী কেমন আছে। কেউ আসে না। ছয় মাস নীরবতা। তারপর আবার, "শান্তি দি, এবার কবে শুরু করবে?"

পূজার সময় সবাই আমাকে চেনে। পূজার পর আমি অদৃশ্য।

শান্তি রানীর পাড়ায় একজন মুসলমান প্রতিবেশী আছে, করিম চাচা। করিম চাচা বুড়ো, ভালো মানুষ। পূজার সময় শান্তি রানীকে বলে, "শান্তি, মূর্তি কত সুন্দর হইছে এবার।" পূজার পরও মাঝে মাঝে আসে। চা খায়। গোপালের খবর নেয়। বলে, "কিছু লাগলে কও।" শান্তি রানী জানে, করিম চাচা সত্যি বলে। কিন্তু করিম চাচা একজন। পাড়ায় বাকি সবাই ভালো, কিন্তু ভালো হওয়া আর পাশে থাকা এক না। ভালো মানুষ দূর থেকে ভালো থাকে। কাছে আসে কম।

গোপালের ওষুধ কিনতে হয় প্রতি মাসে।

কোমরের ব্যথার ওষুধ। তিনটা ওষুধ। মোট সাতশো টাকা। ডাক্তার বলেছে অপারেশন লাগবে। খরচ দুই লাখ। দুই লাখ টাকা শান্তি রানীর কাছে একটা সংখ্যা, বাস্তব না। দুই লাখ মানে চার বছরের মূর্তি বানানোর রোজগার। চার বছর কিছু না খেয়ে, কিছু না কিনে, শুধু জমালে। অসম্ভব।

তাই গোপাল ওষুধ খায়। ব্যথা কমে। পুরো যায় না। গোপাল চুপচাপ শুয়ে থাকে। মাঝে মাঝে উঠোনে এসে বসে শান্তি রানীকে কাজ করতে দেখে। কিছু বলে না। বলার কিছু নেই।

গোপাল আগে রোজ মসজিদে যেত। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। হিন্দু হয়ে মসজিদে যেত না, তবে মিস্ত্রি হিসেবে মসজিদ বানাত। বাংলাদেশে মসজিদ বানানোর কাজে হিন্দু মিস্ত্রি অনেক। গোপাল ভালো মিস্ত্রি ছিল। তার বানানো দেয়াল সোজা থাকত। গোপাল বলত, "দেয়াল সোজা না হলে ঘর টেকে না। ঘর টেকে না তো মানুষ টেকে না।"

এখন গোপাল নিজেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

বিকাশ মাঝে মাঝে বাবাকে ধরে উঠোনে নিয়ে আসে। গোপাল একটা চেয়ারে বসে দেখে শান্তি রানী কাজ করছে। মাটি মাখছে, ফ্রেমে লাগাচ্ছে, আঙুল দিয়ে মসৃণ করছে। গোপাল একসময় শক্ত দেয়াল বানাত। শান্তি রানী নরম মূর্তি বানায়। দুজনেই মাটির সাথে কাজ করে। দুজনেই হাত দিয়ে তৈরি করে। কিন্তু গোপালের হাত এখন কাঁপে। ইট তুলতে পারে না। শান্তি রানীর হাত স্থির। এখনো স্থির।

গোপাল বলে, "তোর হাতে জাদু আছে।"

শান্তি রানী হাসে। জাদু না। অভ্যাস। চল্লিশ বছরের অভ্যাস। আট বছর বয়সে মায়ের সাথে প্রথম মাটি ছুঁয়েছিল। তখন থেকে।

দুর্গার মুখ আঁকা সবচেয়ে কঠিন।

চোখ। দুটো চোখ। বড়, প্রশস্ত, সামান্য তির্যক। চোখের মণিতে একটা আলোর বিন্দু। এই বিন্দুটা থাকলে দেবীর চোখ জীবন্ত হয়। না থাকলে মাটি থেকে যায়।

শান্তি রানী চোখ আঁকে শেষে। সব কাজ হয়ে যাওয়ার পর। শরীর, হাত, অস্ত্র, গয়না, কাপড়ের ভাঁজ, সব শেষ। তারপর চোখ। এটাকে বলে "চক্ষুদান"। চোখ দেওয়া মানে প্রাণ দেওয়া।

শান্তি রানী যখন চোখ আঁকে তখন কাঁপে না। হাত স্থির। নিশ্বাস ধীর। পুরো পৃথিবী চুপ। শুধু তুলি আর মাটি। একটা টান। তারপর আরেকটা। তারপর বিন্দু। ব্যস। দেবী তাকাচ্ছেন।

গোপাল বলে, "তুই যখন চোখ আঁকিস, তোর চেহারা বদলে যায়। তুই তখন অন্য কেউ।"

শান্তি রানী হাসে। অন্য কেউ না। সে নিজেই। শুধু এই মুহূর্তটায় সে পুরোটা নিজে। বাকি সময় সংসার, খরচ, ভয়, অনিশ্চয়তা। চোখ আঁকার সময় কিছু নেই। শুধু মাটি আর সে।

মেয়ে ঝুমা বলে, "মা, তুমি কবে থামবে?"

ঝুমা কলেজে পড়ে। ইংরেজি অনার্স। ভালো ছাত্রী। ঝুমার লজ্জা আছে মায়ের কাজ নিয়ে। বলে না, কিন্তু শান্তি রানী বোঝে। ঝুমা কখনো বন্ধুদের বলে না মা মূর্তি বানায়। বলে, "মা ব্যবসা করে।" কী ব্যবসা জিজ্ঞেস করলে ঘুরিয়ে যায়।

শান্তি রানী কিছু বলে না। মেয়ে পড়ুক। চাকরি করুক। মেয়ের হাতে মাটি লাগুক না। মেয়ের হাতে কলম থাকুক, কম্পিউটার থাকুক।

কিন্তু মাঝে মাঝে শান্তি রানী ভাবে, ঝুমার পর কে বানাবে? বিকাশ বানাবে না। বিকাশ ছেলে, তাও পারত, কিন্তু বিকাশের আগ্রহ নেই। বিকাশ ক্রিকেট খেলে, ফোনে ভিডিও দেখে। মাটি ছোঁয় না।

পাঁচ পুরুষের শিল্প শান্তি রানীতে শেষ হবে। এর পর কে দুর্গার চোখ আঁকবে?

হয়তো কেউ আঁকবে। অন্য কেউ। অন্য কোনো পরিবার। অথবা হয়তো ফাইবারগ্লাসের মূর্তি আসবে। কলকাতা থেকে আমদানি হবে। চকচকে, মসৃণ, একই ছাঁচে শত শত। হাতের ছোঁয়া থাকবে না। মাটির গন্ধ থাকবে না।

শান্তি রানী মাথা ঝাঁকাল। এসব ভাবে লাভ নেই। এখন সামনে কাজ আছে। দুর্গার ডান হাত শেষ করতে হবে। ত্রিশূল বসাতে হবে।

কিন্তু একটা কথা শান্তি রানীকে কুরে কুরে খায়। ঝুমা লজ্জা পায়। নিজের মায়ের কাজ নিয়ে লজ্জা পায়। এটা শান্তি রানীকে বলেনি কেউ। বলার দরকার নেই। মা বোঝে। মায়ের চোখ দুর্গার চোখের মতো। সব দেখে। সব জানে। কিন্তু কিছু বলে না।

একদিন ঝুমার কলেজের একটা মেয়ে এসেছিল বাসায়। উঠোনে মূর্তি দেখে বলেছিল, "তোর মা এগুলো বানায়? কী সুন্দর!" ঝুমার মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। সুন্দর বলল, তবু লজ্জা। কারণ সুন্দর হলেও এটা গরিবের কাজ। হাতে মাটি মাখা কাজ। কলেজের মেয়েদের মা অফিসে যায়, দোকান চালায়, টিউশনি করে। মূর্তি বানায় না।

শান্তি রানী সেদিন উঠোন থেকে মুখ ফিরিয়ে কাজ করেছিল। মেয়ের সামনে মুখ দেখাতে চায়নি। মেয়ে লজ্জা পাক, কিন্তু মা যেন আরো লজ্জার কারণ না হয়।

রাতে শান্তি রানী উঠোনে বসে আছে।

সামনে মূর্তি। চাঁদের আলোতে অর্ধসম্পূর্ণ দুর্গা। শরীর আছে, হাত আছে, কিন্তু মুখ এখনো মসৃণ মাটি। চোখ নেই। নাক আছে, ঠোঁট আছে, কিন্তু চোখ নেই। চোখ শেষে হবে।

গোপাল ঘরে শুয়ে আছে। ছেলেমেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। পাড়া নিশ্চুপ। দূরে কুকুর ডাকছে।

শান্তি রানী মূর্তির দিকে তাকাল। মূর্তি তাকাতে পারে না। চোখ নেই এখনো। কিন্তু শান্তি রানীর মনে হলো, মূর্তি তাকাচ্ছে। চোখ ছাড়াই দেখছে। কী দেখছে? একজন ক্লান্ত মেয়েলোককে। মাটিমাখা হাত। ফাটা পায়ের চামড়া। চুলে ধুলো। এই মেয়েলোক তাকে বানাচ্ছে। তাকে প্রাণ দেবে। তারপর নদীতে ভাসাবে।

আমি দেবতা বানাই। দেবতা আমাকে বানায়নি।

শান্তি রানী উঠল। হাত ধুল। পানিতে মাটি গলে গেল। পরিষ্কার হাত। কাল সকালে আবার মাটি লাগবে। আবার ভাঙবে, আবার গড়বে।

ঘরে ঢুকল। পাশে গোপাল ঘুমাচ্ছে। শান্তি রানী চোখ বন্ধ করল। ঘুম আসার আগে মনে হলো, দেবীর চোখ কেমন হবে এবার। বড়? ছোট? তির্যক? সোজা?

ঘুমের মধ্যে দেখল, দুর্গা তার দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু দুর্গার চোখে করুণা নেই। শুধু দেখছে। যেভাবে মানুষ পিঁপড়া দেখে। দেখে, কিন্তু কিছু করে না।

ভোরে ঘুম ভাঙল। উঠোনে গেল। মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। কাল রাতের চাঁদের আলো নেই। সকালের ধূসর আলো। মূর্তি ধূসর দেখাচ্ছে। অসম্পূর্ণ। অপেক্ষায়।

শান্তি রানী হাত ধুয়ে মাটি তুলল। ভেজা, ঠান্ডা, চেনা। আবার শুরু। আবার দুর্গা। আবার ছয় মাস। আবার পঁচিশ হাজার টাকা। আবার অদৃশ্য হওয়া।

উঠোনের কোণে তুলসীগাছ। প্রতিদিন সকালে শান্তি রানী তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালায়। আজও জ্বালাল। ছোট একটা আলো। ঘি দিয়ে। আলোটা কাঁপছে। বাতাসে। কিন্তু নেভেনি। এখনো জ্বলছে।