ঢোলবাদক
ঢোল বাজায় আমি। কিন্তু কে শোনে?
১
কানাইয়ের কাঁধে একটা দাগ আছে। বাম কাঁধে। গোলাকার। চামড়া কালো হয়ে গেছে। পুরু।
এটা ঢোলের দাগ। পনেরো কেজি ঢোল কাঁধে ঝুলিয়ে ছয় ঘণ্টা বাজালে কাঁধে যা হয়। চল্লিশ বছর ধরে এই দাগ তৈরি হয়েছে। প্রথম প্রথম ব্যথা করত। কাঁধ ফুলে যেত। ঘরে ফিরে বউ সরষের তেল মালিশ করে দিত। তারপর অভ্যাস হয়ে গেল। ব্যথা আছে, কিন্তু ব্যথা অনুভব নেই। শরীর শিখে গেছে ব্যথা উপেক্ষা করতে।
কানাইয়ের বয়স ষাট। চুল পাকা। শরীর রোগা। কিন্তু হাত শক্ত। ঢোলে যে বাড়ি মারে সেটা পুরো বাহু থেকে আসে। কবজি, কনুই, কাঁধ, সব একসাথে। ধাপ। ধাতাধাপ। ধাতাধিন। একটা ছন্দ আছে। এই ছন্দটা কানাইয়ের রক্তে।
বাবা নিতাই ঢোল বাজাত। বাবার বাবাও। কানাই দশ বছর বয়সে প্রথম ঢোল ধরে। বাবা বলেছিল, "ঢোলটা তোর শরীরের অংশ করে নে। তারপর আর ভাবতে হবে না, হাত নিজে বাজাবে।"
হাত নিজেই বাজায়। চল্লিশ বছর পর কানাইকে ভাবতে হয় না কোন তাল বাজাবে। শরীর জানে। বিয়ের তাল, পূজার তাল, মেলার তাল, শোকের তাল। প্রতিটা আলাদা। প্রতিটার আলাদা ভাষা।
২
একসময় কানাই বছরে দুইশো বিয়ে বাজাত।
পুরান ঢাকা, নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার। বিয়ের মৌসুমে রোজ দুই-তিনটা। গায়ে হলুদে একটা, বিয়ের রাতে একটা, বরযাত্রায় একটা। কানাইয়ের দল ছিল। ঢোল, শানাই, কাঁসর। পাঁচজন। সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত। ছয় ঘণ্টা।
বিয়ের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বাজাত। রাস্তায়। লোকে ভিড় করত। ছেলেরা নাচত। বুড়োরা হাত তালি দিত। কানাইয়ের ঢোলের তালে পুরো পাড়া জেগে থাকত।
পাঁচশো টাকা রাতে। পাঁচজনে ভাগ। কানাইয়ের ভাগে দুইশো। দুইশো বিয়ে মানে চল্লিশ হাজার টাকা বছরে। শুধু বিয়ে থেকে। এর বাইরে পূজা, মেলা, বনভোজন। মোট ষাট-সত্তর হাজার। মাসে পাঁচ-ছয় হাজার। বিশ বছর আগে এটা খারাপ ছিল না।
তারপর ডিজে এলো।
একটা স্পিকার। একটা মিক্সার। একটা ল্যাপটপ। একটা ছেলে। ব্যস। পুরো রাতের মিউজিক। হিন্দি গান, বাংলা গান, ইংরেজি গান, যা চাও। ভলিউম এত জোরে যে কানের পর্দা ফাটে। কিন্তু লোকে চায়। তরুণরা চায়। বিয়ের বাড়ি মানে ডিজে।
ডিজের দাম? তিন-পাঁচ হাজার রাতে। কানাইয়ের দলের চেয়ে কম না। কিন্তু ডিজে হিন্দি গান বাজায়। কানাই ঢোল বাজায়। তরুণরা হিন্দি গানে নাচতে চায়। ঢোলে না।
দুইশো বিয়ে থেকে ত্রিশে নেমেছে। বছরে ত্রিশ। মাসে আড়াই। কিছু মাস শূন্য।
৩
কানাইয়ের দল ভেঙে গেছে।
শানাইওয়ালা রশিদ মারা গেছে। তিন বছর আগে। ফুসফুসে সমস্যা ছিল। সারাজীবন ফুঁ দিয়ে শানাই বাজিয়েছে, ফুসফুস শেষ হয়ে গেছে। কাঁসরওয়ালা জব্বার রিকশা চালায় এখন। বাকি দুইজন ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে।
কানাই এখন একা বাজায়। ঢোল একটা, কানাই একটা। যে বিয়ে পায় সেখানে একাই যায়। একা ঢোল বাজায়। শানাই নেই, কাঁসর নেই। শুধু ধাপ ধাতাধাপ ধাতাধিন। একটু অসম্পূর্ণ লাগে। ঢোল একা বাজে, কিন্তু ঢোল একা বাজার জন্য না। ঢোল দলের বাদ্য। সঙ্গ চায়।
পাঁচশো টাকা পায় রাতে। পুরোটা নিজের। কিন্তু পুরোটা নিজের হলেও আগের দুইশো থেকে ভালো লাগে না। আগে দুইশো পেত, কিন্তু পাশে রশিদের শানাই ছিল। রশিদের শানাই কানাইয়ের ঢোলকে সম্পূর্ণ করত। এখন পাঁচশো, কিন্তু অসম্পূর্ণ।
৪
ছেলে মন্টু তবলা শিখেছিল।
কানাই শিখিয়েছিল। মন্টু ভালো বাজাত। তিন বছর শিখল। তারপর ছেড়ে দিল।
"কেন ছাড়লি?"
"বাবা, তবলা বাজিয়ে কী হবে? পেট ভরে না।"
মন্টু এখন পাঠাও রাইডার। বাইক চালায়। মাসে বারো-পনেরো হাজার আসে। কানাইয়ের সারা বছরের আয়ের সমান মন্টুর চার মাসে হয়ে যায়।
মন্টু ভুল বলেনি। তবলা বাজিয়ে পেট ভরে না। ঢোল বাজিয়েও ভরে না। কানাই জানে। কিন্তু পেট ভরানোই তো সব না। কানাই এটা মন্টুকে বলতে পারে না। বললে মন্টু হাসবে। বলবে, "বাবা, পেট না ভরলে বাকি সব শূন্য।"
মন্টু ঠিকই বলে। পেট না ভরলে বাকি সব শূন্য। কিন্তু কানাইয়ের ভেতরে একটা জায়গা আছে যেটা পেট ভরলেও খালি থাকে। সেটা ঢোল ভরায়। মন্টু এটা বোঝে না। হয়তো বোঝার দরকারও নেই।
ছেলে বলে, বাবা, তোমার ঢোলে পেট ভরে না। আমার বাইকে ভরে।
কানাই কিছু বলে না। ছেলে ঠিক আছে। ছেলের পেট ভরুক। ছেলের সংসার চলুক। ঢোল কানাইয়ের। মরবে কানাইয়ের সাথে।
মন্টুর বিয়ে হয়েছে গত বছর। বউ সুমি। সুমি ভালো মেয়ে। কানাইকে বাবা বলে ডাকে। কিন্তু সুমি একবার বলেছিল, "বাবা, ঢোলটা এত জোরে বাজান কেন? বাচ্চা ঘুমাতে পারে না।" কানাইয়ের নাতি হয়েছে। ছয় মাসের। ঘরে বাচ্চার কান্না, কানাইয়ের ঢোল, দুটো একসাথে চলে না।
কানাই তারপর থেকে ঘরে জোরে বাজায় না। আলতো বাজায়। অথবা বাজায় না।
৫
আজ কোনো বিয়ে নেই। কোনো পূজা নেই। কোনো মেলা নেই।
কানাই ঘরে বসে আছে। সামনে ঢোল। মেঝেতে। ঢোলের চামড়া পুরনো। দড়ি দিয়ে টানা। দড়িগুলো ক্ষয়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। বদলাতে হবে। কিন্তু ভালো দড়ি দুইশো টাকা। চামড়া বদলাতে পাঁচশো। এখন না।
কানাইয়ের ঘর একটা। টিনের। ভাড়া তিন হাজার। স্ত্রী মালতি রান্নাঘরে আছে। মালতি পাড়ায় কাপড় সেলাই করে। মাসে তিন-চার হাজার আসে। দুইজনে মিলে সাত-আট হাজার। ঢাকায়।
কানাই ঢোলটা কোলে তুলে নিল। কাঁধে ঝুলাল না। কোলে রাখল। বাচ্চাকে কোলে রাখার মতো।
হাত দিয়ে একটা আলতো বাড়ি মারল। ধুম। ঘরের দেয়ালে শব্দ ধাক্কা খেল। ফিরে এলো।
আরেকটা। ধুম।
তারপর তাল ধরল। আস্তে আস্তে। ধিন ধিন ধা। ধিন ধিন ধা। বিয়ের তাল না। পূজার তাল না। এটা কোনো তাল না। এটা শুধু বাজানো। কারো জন্য না। নিজের জন্য।
মালতি রান্নাঘর থেকে উঁকি দিল। দেখল, কানাই চোখ বন্ধ করে বাজাচ্ছে। মালতি ফিরে গেল। কিছু বলল না। এটা সে আগেও দেখেছে। কানাই মাঝে মাঝে এমন বাজায়। কেউ ডাকেনি, কোনো অনুষ্ঠান নেই, কিন্তু বাজায়। মালতি জানে, এটা কানাইয়ের শ্বাসের মতো। বন্ধ করলে মরবে।
৬
গত সপ্তাহে একটা বিয়েতে গিয়েছিল।
নবাবগঞ্জে। পুরনো কাস্টমার। বাড়ির বুড়ো মানুষটা বলেছিল, "কানাই ভাই ছাড়া আমার ছেলের বিয়ে হবে না। ডিজে থাকবে, কিন্তু কানাই ভাইও থাকবে।"
কানাই গেল। ঢোল কাঁধে। সন্ধ্যা সাতটায়। বিয়ের বাড়ি সাজানো। লাইট, ফুল, শামিয়ানা। একপাশে ডিজের সেটআপ। বিশাল স্পিকার। ঝলমলে লাইট। ডিজে ছেলেটা হেডফোন গলায় ঝুলিয়ে ল্যাপটপের সামনে।
অন্য পাশে কানাই। ঢোল একটা। কানাই একটা।
ডিজে শুরু করল। হিন্দি গান। স্পিকারের আওয়াজে মাটি কাঁপল। তরুণরা নাচতে শুরু করল। কানাই দাঁড়িয়ে আছে। তার পালা আসেনি।
বুড়ো মানুষটা এলো। বলল, "কানাই ভাই, বাজাও।"
কানাই ঢোল কাঁধে তুলল। বাজাতে শুরু করল। কিন্তু ডিজের আওয়াজে ঢোল শোনা যাচ্ছে না। কানাই জোরে বাজাল। ডিজে আরো জোরে। কানাই আরো জোরে। কিন্তু পনেরো কেজি ঢোল আর দুটো হাত কিলোওয়াটের স্পিকারের সাথে পারে না।
কিছু বুড়ো মানুষ কানাইয়ের কাছে এলো। তারা শুনতে পেল। তারা মাথা দোলাল। তালে তালে। কিন্তু তরুণরা ডিজের কাছে। ঢোলের কাছে কেউ নেই।
কানাই দুই ঘণ্টা বাজাল। তারপর থামল। কাঁধ ব্যথা করছে। ষাট বছরের কাঁধে পনেরো কেজি দুই ঘণ্টা। যথেষ্ট।
একটা ছোট ছেলে এসে দাঁড়িয়েছিল কানাইয়ের সামনে। পাঁচ-ছয় বছর। বিয়ের বাড়ির কেউ। ছেলেটা ঢোলের দিকে তাকিয়ে ছিল, মুখ হাঁ করে। কানাই একটা তাল বাজিয়ে দেখাল। ছেলেটা হাত তালি দিল। লাফাল। কানাই আরেকটা বাজাল। ছেলেটা নাচল।
ছেলেটার মা এসে হাত ধরে নিয়ে গেল। বলল, "চলো, ওদিকে গান হচ্ছে।" ওদিকে মানে ডিজের দিকে। ছেলেটা চলে গেল। কিন্তু একবার পেছন ফিরে তাকাল।
কানাই দেখল। ছেলেটার চোখে সেই জিনিসটা আছে। যেটা কানাইয়ের দশ বছর বয়সে ছিল। কিন্তু ছেলেটা বড় হয়ে ঢোল ধরবে না। ডিজে হবে হয়তো। অথবা পাঠাও রাইডার। অথবা অন্য কিছু। ঢোল না।
বুড়ো মানুষটা পাঁচশো টাকা দিল। বলল, "আসবেন আবার। আমার ছোট ছেলের বিয়েতে।"
কানাই টাকা পকেটে রাখল। হাঁটতে শুরু করল। পেছনে ডিজের বিট। বুম বুম বুম। মাটি কাঁপছে। কানাই হাঁটছে। ঢোল কাঁধে।
ডিজে বাটন চাপে। কানাই ঘাম ঝরায়। কিন্তু বাটনের দাম বেশি।
৭
রাতে কানাই ঘরে ফিরে ঢোলটা কোণায় রাখল।
মালতি ভাত দিল। কানাই খেল। চুপচাপ।
"কত পেলে?"
"পাঁচশো।"
মালতি কিছু বলল না। পাঁচশো টাকা। ছয় ঘণ্টা বাড়ির বাইরে, যাতায়াত বাদ দিলে চার ঘণ্টা বাজানো, পনেরো কেজি কাঁধে। ঘণ্টায় একশো পঁচিশ টাকা। রিকশাওয়ালার চেয়ে কম।
কানাই শুতে গেল। ঘরটা ছোট। একটা বিছানা, একটা আলমারি, কোণায় ঢোল। ঢোলটা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কানাই জানে ওটা ওখানে আছে। সবসময় আছে।
ঘুম আসছে না। কানাই উঠে বসল। পায়ে পায়ে ঢোলের কাছে গেল। ঢোলটা কোলে নিল। আঙুলের ডগা দিয়ে চামড়ায় ছোঁয়াল। মারল না। শুধু ছুঁল।
চামড়াটা ঠান্ডা। মসৃণ জায়গায় মসৃণ, যেখানে বাড়ি পড়ে সেখানে একটু রুক্ষ। ঢোলের শরীরেও দাগ আছে। কানাইয়ের কাঁধে যেমন দাগ, ঢোলের চামড়ায়ও তেমন।
ঢোল বাজায় আমি। কিন্তু কে শোনে?
কানাই ঢোলটা নামিয়ে রাখল। বিছানায় ফিরে গেল। মালতি ঘুমাচ্ছে।
বাইরে রাস্তায় কোথাও একটা ডিজে বাজছে। দূরে। বুম বুম বুম। বেজ গিটারের তাল মাটির ভেতর দিয়ে আসছে। কানাইয়ের ঘরের মেঝে কাঁপছে। আস্তে। টের পাওয়া যায় কোনোমতে।
কানাই চোখ বন্ধ করল। কানে ডিজের বিট। বুকে ঢোলের তাল। দুটো মেশে না। কোনোদিন মেশেনি।
কানাই ভাবল, বাবা নিতাই বেঁচে থাকলে কী বলত? হয়তো বলত, "বাজা। কেউ শুনুক আর না শুনুক, তুই বাজা।" নিতাই এমনই ছিল। শ্মশানেও ঢোল বাজাত। কারো শেষকৃত্যে। সেই ঢোলের তাল ছিল আলাদা। ধীর। ভারী। একটা বাড়ি, তারপর দীর্ঘ নীরবতা, তারপর আরেকটা বাড়ি। যেন মৃত্যুর পদক্ষেপ গুনছে।
কানাই সেই তালটা জানে। কিন্তু বাজায় না। বাজানোর দরকার পড়ে না। শ্মশানে এখন ঢোল বাজে না। মাইকে গান বাজে। অথবা কিছুই বাজে না। নীরবতা।
ঘুম এলো। ঘুমের মধ্যে কানাইয়ের আঙুল নড়ল। ধিন ধিন ধা। ধিন ধিন ধা। শরীর বাজাচ্ছে। ঘুমের মধ্যেও।