বাউল গায়ক

একতারায় সুর বাঁধি, মনে সুর নেই

পর্ব ৮৬ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

করিম ফকিরের একতারা পুরনো। তারটা তিনবার বদলেছে। কাঠটা বদলায়নি। বাঁশের না, কাঠের। শিমুল কাঠ। হালকা। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তার গুরু বানিয়ে দিয়েছিলেন। গুরু মরেছেন বারো বছর আগে। একতারাটা বেঁচে আছে।

করিম নিজেও বেঁচে আছে। বয়স ষাট কি পঁয়ষট্টি, সে নিজে জানে না। জন্ম সার্টিফিকেট নেই। ভোটার আইডিতে লেখা ১৯৬৫। সেটা ঠিক কি না সে বলতে পারবে না। "মা বলতেন আমি বর্ষাকালে জন্মেছি। কোন বর্ষা সেটা মা-ও জানতেন না।"

সে গান গায়। লালনের গান। শাহ আবদুল করিমের গান। হাসন রাজার গান। নিজের গানও কিছু আছে, কিন্তু সেগুলো কেউ চায় না। মানুষ পুরনো গান চায়। পরিচিত সুর চায়। করিম দেয়।

কোথায় দেয়? ট্রেনে।

ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া ট্রেন। ইন্টারসিটি না, লোকাল। ইন্টারসিটিতে পুলিশ তোলে। লোকালে কেউ কিছু বলে না। লোকালে যারা চড়ে তারা নিজেরাও কোনোমতে টিকিট কাটে।

করিম ঢাকার কমলাপুর থেকে ওঠে। একতারা কাঁধে। গামছা কোমরে। একটা কাপড়ের থলে, তাতে চিড়া আর গুড়। এটাই তার সম্বল।

বগিতে ঢুকে সে কোনো সিটের কাছে দাঁড়ায় না। দরজার কাছে দাঁড়ায়। একতারায় সুর বাঁধে। টুংটাং। টুংটাং। তারটা একটাই, কিন্তু সুর ওঠে। করিমের আঙুলে জাদু নেই। অভ্যাস আছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের অভ্যাস।

"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়..."

গলাটা ভাঙা। আগে ভাঙা ছিল না। আগে গলায় তান ছিল, পাল্টা ছিল, দম ছিল। এখন ধরে না। সুর ওঠে, তারপর নামে। করিম জানে গলা যাচ্ছে। বিড়ি খায় দিনে দশটা। ঠান্ডা লাগে প্রতি শীতে। ওষুধ খায় না। ওষুধের টাকা নেই।

তবু সে গায়। কারণ গান তার কাজ। গান তার পেশা। গান তার একমাত্র সম্পদ। গুরু যা দিয়েছিলেন সেটাই সে বহন করে চলেছে। একতারার কাঠের মতো, তারটা বদলায়, কাঠটা থাকে।

গান শেষ হলে সে থলে এগিয়ে দেয়।

কেউ পাঁচ টাকা দেয়। কেউ দশ। বেশিরভাগ দেয় না। মুখ ফিরিয়ে রাখে। কেউ কেউ বিরক্ত হয়। "যাও বাবা, ঘুমাতে দাও।" করিম যায়। পরের বগিতে যায়। আবার একই গান।

একটা ট্রিপে সে কত কামায়? আশি থেকে একশো বিশ টাকা। দিনে দুটো ট্রিপ করে। কখনো তিনটা। মোট দুশো থেকে তিনশো টাকা। এই দিয়ে চলে।

কী চলে? খাওয়া চলে। বিড়ি চলে। একতারার তার ছিঁড়লে নতুন তার কেনা চলে। আর কিছু চলে না।

কখনো বৃষ্টির দিনে ট্রেনে মানুষ কম থাকে। বিক্রি হয় না। করিম তখন দরজায় বসে বৃষ্টি দেখে। বৃষ্টি দেখতে তার ভালো লাগে। কুষ্টিয়ার বৃষ্টি মনে পড়ে। উঠোনে বৃষ্টি পড়ত। বউ ভেজা কাপড় তুলে আনত। ছেলে দুটো বৃষ্টিতে ভিজত।

সেসব দিন নেই। থাকার জায়গা নেই। কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঘুমায়। একটা প্লাস্টিকের চাদর আছে, সেটা বিছায়। বালিশ নেই। থলেটা মাথায় দেয়। একতারা বুকে জড়িয়ে ঘুমায়। চুরি হয়ে যাবে।

স্টেশনে আরো অনেকে ঘুমায়। ভিখারি। কুলি। হকার। ভবঘুরে। করিম এদের কাউকে চেনে না, কিন্তু এদের পাশেই ঘুমায়। রাত তিনটায় মশা কামড়ায়। ভোর পাঁচটায় ট্রেনের হর্ন বাজে। করিম উঠে যায়।

করিমের শিক্ষা নেই। স্কুলে যায়নি। তার বাবাও যাননি। বাবা ছিলেন ফকির। মাজারে থাকতেন। গান গাইতেন। দরগায় লোকে যা দিত তাই খেতেন। করিমকে বলতেন, "দুনিয়ায় দুই জিনিস শেখ, গান আর আল্লাহর নাম।"

করিম দুটোই শিখেছে। কিন্তু দুটোর কোনোটাই তার পেট ভরায় না।

গুরুর কাছে গিয়েছিল কুষ্টিয়ায়। গুরু ছিলেন লালনের আখড়ার শিষ্য পরম্পরার একজন। লালন থেকে তাঁর গুরু, তাঁর গুরু থেকে তিনি, তিনি থেকে করিম। এই চারটা প্রজন্ম। দুশো বছরের ধারা।

গুরু বলতেন, "বাউল গান হলো সাধনা। পেটের জন্য না।"

করিম এখন জানে, পেটের জন্য না হলে বাউল গান আর কার জন্য? যার পেট ভরা সে সাধনা করতে পারে। যার পেট খালি সে শুধু বাঁচার জন্য গায়।

একদিন ট্রেনে এক যুবক ফোন বের করে বলল, "চাচা, এই গানটা গাও তো।"

ফোনে ইউটিউব চালু। একটা বাউল গান বাজছে। করিম চিনল। গানটা তার গুরুর। কোনো এক সময় কেউ রেকর্ড করেছিল। ভিডিওতে গুরু বসে আছেন, একতারা হাতে, আখড়ায়। পেছনে শিষ্যরা। ভিডিওর ভিউ বারো লাখ।

বারো লাখ মানুষ এই গান শুনেছে। গুরু তখন জীবিত ছিলেন না। আর বেঁচে থাকলেও বারো লাখ ভিউ থেকে তাঁর হাতে একটা টাকাও আসত না।

করিম গানটা গাইল। যুবক রেকর্ড করল নিজের ফোনে। "চাচা, দারুণ!" দশ টাকা দিল।

বারো লাখ ভিউ। দশ টাকা।

করিম ভাবল, "আমার গান ফোনে শোনে সবাই। কিন্তু ফোনে টাকা দেয় না কেউ।"

কুষ্টিয়ায় করিমের একটা ঘর ছিল। টিনের চালা। একটা ঘর, একটা উঠোন। বউ ছিল। দুই ছেলে। বড় ছেলে ঢাকায় গার্মেন্টসে গেছে। ফোন করে মাঝে মাঝে। টাকা পাঠায় না। ছোট ছেলে কোথায় গেছে কেউ জানে না। তিন বছর আগে বেরিয়ে গেছে। খবর নেই।

বউ মরেছে পাঁচ বছর আগে। জন্ডিস। হাসপাতালে নিতে পারেনি। টাকা ছিল না। ডাক্তার বাড়িতে এসে দেখে বলল, "আগে আনলে বাঁচত।" আগে আনলে। এই কথাটা করিম রোজ শোনে মাথার ভেতরে।

ঘরটা এখন পড়ে আছে। তালা দিয়ে রেখেছে। বছরে একবার যায়। গুরুর মাজারে যায়। ঘরে একরাত থাকে। তারপর আবার ঢাকা।

বাউল গান মন্দিরের গান ছিল। আখড়ার গান ছিল। মেলার গান ছিল। পৌষ মেলায়, চৈত্র সংক্রান্তিতে, দোল পূর্ণিমায় বাউলরা গাইতেন। মানুষ শুনতেন। মুগ্ধ হতেন। কিছু দিতেন।

এখন মেলা হয়। বাউলও আসে। কিন্তু মঞ্চে মাইক, সাউন্ড সিস্টেম, ব্যানার। কমিটি ঠিক করে কে গাইবে। করিমকে কেউ ডাকে না। সে নাম করা বাউল না। সে কোনো অ্যালবাম করেনি। তার ইউটিউব চ্যানেল নেই। সে শুধু গান জানে।

মন্দিরের পুরোহিত এখন ব্লুটুথ স্পিকারে ভজন বাজান। আখড়ায় এখন টিভি আছে। শিষ্যরা ফোনে গান শোনে। লাইভ বাউলের দরকার নেই।

করিম একদিন আখড়ায় গেল। নতুন মহন্ত তাকে চেনে না। "আপনি কে?" করিম বলল, "আমি ফকির করিম। আমার গুরু এই আখড়ায় থাকতেন।" মহন্ত বলল, "অনেকেই থাকতেন। এখন আখড়ায় জায়গা নেই।"

জায়গা নেই। বাউলের জন্য আখড়ায় জায়গা নেই।

ট্রেনে একদিন এক মধ্যবয়সী লোক করিমের গান শুনে কাঁদল। চোখ মুছল রুমালে। করিমকে একশো টাকা দিল।

"চাচা, আমার মা এই গান গাইতেন।"

করিম একশো টাকা পেয়ে খুশি হলো। একশো টাকা মানে একদিন ভাতে মাছ। তারপর ভাবল, এই লোকটা গান শুনে কাঁদল। কিন্তু কাল আবার ট্রেনে উঠবে এবং ফোনে গান শুনবে। করিমকে মনে রাখবে না।

কেউ মনে রাখে না।

করিমের গুরু বলতেন, "বাউল মানে উদাসী। সংসারে থেকেও সংসারের না।" করিম সংসার হারিয়েছে। সে এখন উদাসী হতে বাধ্য। সাধনা নয়, দারিদ্র্য তাকে উদাসী বানিয়েছে।

স্টেশনে রাতে একটা কুকুর আসে। করিমের পাশে শোয়। করিম তাকে চিড়া দেয়। কুকুরটা খায়। দুজনে পাশাপাশি থাকে। কুকুরটার কোনো নাম নেই। করিম তাকে ডাকে "ভাই।"

"ভাই, তুইও আমার মতো। কোনো ঠিকানা নেই।"

কুকুরটা লেজ নাড়ায়।

একদিন একটা এনজিওর লোক এসেছিল স্টেশনে। "ফোকলোর ডকুমেন্টেশন" প্রকল্প। করিমকে দেখে বলল, "আপনি বাউল? গান গান?" করিম বলল, "হ্যাঁ।" লোকটা ক্যামেরা বের করল। ভিডিও করল। করিম গাইল। পাঁচটা গান। লোকটা খুশি হলো। ধন্যবাদ বলল। চলে গেল।

টাকা দিল না। "ডকুমেন্টেশন" হলো, কিন্তু ডকুমেন্টেশন দিয়ে পেট ভরে না।

করিম ভাবল, তার গুরুর গান ইউটিউবে বারো লাখ ভিউ, এনজিও ডকুমেন্টেশন করে, সরকার লোকসংস্কৃতি বোর্ড চালায়। সবাই বাউল সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলে। কিন্তু একজন জীবিত বাউলের দিকে কেউ তাকায় না।

বাউল সংস্কৃতি রক্ষা করতে চায় সবাই। বাউলকে রক্ষা করতে চায় না কেউ।

ভোরে মুয়াজ্জিনের আজান ভেসে আসে। করিম উঠে বসে। গোসল করে স্টেশনের বাথরুমে। নামাজ পড়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে। তারপর একতারা তুলে নেয়।

আরেকটা দিন শুরু হয়।

১০

লালন বলেছিলেন, "সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে।" করিমকেও কেউ জিজ্ঞেস করে না সে কী জাত। কেউ জিজ্ঞেস করে না সে কে। ট্রেনের যাত্রীরা তাকে দেখে একটাই জিনিস বোঝে: একজন বুড়ো লোক, হাতে একতারা, গান গায়, টাকা চায়। ভিখারি না তো? প্রায় তাই।

করিম জানে তফাৎটা। ভিখারি চায়, শিল্পী দেয়। সে দেয়। গান দেয়। সুর দেয়। কিন্তু নেওয়ার মানুষ কমে যাচ্ছে। যে দেশে দুশো বছরের বাউল ঐতিহ্য আছে, সেই দেশে একজন বাউল ট্রেনে ভিক্ষা করে বেঁচে থাকে। এটা পরিহাস না। এটা বাস্তব।

১১

একতারায় সুর বাঁধি, মনে সুর নেই। করিম এই কথাটা নিজে বানিয়েছে। কাউকে বলেনি। কোনো গানে ব্যবহার করেনি। এটা তার নিজের কাছে রাখা একটা লাইন। সত্য কথা।

সে সুর বাঁধে কারণ সুর বাঁধা ছাড়া সে আর কিছু জানে না। মাটি চাষ জানে না। রিকশা চালাতে পারে না। গার্মেন্টসে যাওয়ার বয়স পেরিয়ে গেছে। সে শুধু গান জানে।

গান দিয়ে কি বাঁচা যায়? বাউলের গান দিয়ে? এই দেশে?

করিম জানে না। সে শুধু জানে আজ সকালে কমলাপুর থেকে একটা লোকাল ট্রেন ছাড়বে। সে উঠবে। একতারায় তার বাঁধবে। গলা খুলবে।

"খাঁচার ভিতর অচিন পাখি..."

কেউ শুনবে। কেউ শুনবে না। পাঁচ টাকা পড়বে থলেতে। কি পড়বে না।

করিম গাইবে। কারণ গান ছাড়া তার আর কিছু নেই।

কিছুই নেই।