নাটক/যাত্রা কর্মী

মঞ্চে আমি রানী। মঞ্চের বাইরে আমি কেউ না।

পর্ব ৮৭ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সালেহার মুখে রং লাগানো আছে। সস্তা ফাউন্ডেশন, গাঢ় কাজল, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক। আয়নাটা ভাঙা, অর্ধেক আয়না, তাতেই সে তৈরি হয়। পেছনে কেউ সাজিয়ে দেয় না। নিজে সাজে। বিশ বছর ধরে নিজে সাজছে।

আজ রাতে সে রানী ময়নামতী।

যাত্রাদলের নাম "চাঁদনী অপেরা।" মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার একটা গ্রাম। খোলা মাঠে মঞ্চ। বাঁশের খুঁটি, টিনের চালা, রঙিন কাগজের পর্দা। সামনে প্লাস্টিকের চেয়ার দুশোটা। পেছনে মাটিতে বসবে যারা টিকিট কেনেনি। টিকিট ত্রিশ টাকা।

দলে বিশজন। অভিনেতা বারোজন। বাদক চারজন। ম্যানেজার একজন। হেল্পার তিনজন। সালেহা একমাত্র মেয়ে।

একমাত্র মেয়ে হওয়া সহজ না।

বিশটা পুরুষের সাথে সে ভ্যানগাড়িতে চড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে যায়। রাতে মঞ্চের ওপর ঘুমায়। মঞ্চের তক্তায় একটা পাতলা তোশক বিছায়। মশারি নেই। মশা কামড়ায়। পাশে ড্রাম বাজানো মতিন শোয়, ওপাশে হারমোনিয়াম বাজানো রহিম। সালেহা মাঝখানে। এটাই ব্যবস্থা।

কেউ কিছু করে না। করার সাহস নেই। সালেহার হাত ভারী। একবার নতুন একজন ঢুকেছিল দলে, রাতে হাত বাড়িয়েছিল। সালেহা তার মুখে কষে এক ঘুষি মেরেছিল। নাক ফেটে রক্ত বেরিয়েছিল। পরদিন ছেলেটা দল ছেড়ে গেছে।

ম্যানেজার আকবর মিয়া বলেছিল, "সালেহা, এত মারামারি করলে দলে লোক থাকবে না।"

সালেহা বলেছিল, "লোক না থাকলে থাকবে না। আমার গায়ে হাত দিলে আমি মারব।"

আকবর মিয়া আর কিছু বলেননি। সালেহা ছাড়া দল চলবে না। সে একাই রানী, দেবী, ডাইনি, পরী, সতী নারী, অসতী নারী সব সামলায়। অন্য মেয়ে পাওয়া যায় না। কে আসবে? তিনশো টাকা রাতে, ঘুম নেই, সম্মান নেই, ভবিষ্যৎ নেই।

সালেহার বয়স আটত্রিশ। দুই ছেলে। বড়টার বয়স বারো, ছোটটার আট। মানিকগঞ্জ শহরে তার মায়ের কাছে থাকে। সালেহা মাসে দুইবার বাড়ি যায়। বাকি সময় দলের সাথে।

স্বামী ছিল। রাজমিস্ত্রি। শাদির পর তিন বছর ছিল। তারপর চলে গেল। অন্য মেয়ে। সালেহাকে বলল, "তুই যাত্রা করিস, রাতে পুরুষদের সাথে ঘুরিস, আমি তোকে নিয়ে সংসার করব কেন?"

সালেহা বলেনি যে যাত্রা না করলে ছেলেদুটো খাবে কী। সে শুধু বলেছিল, "যাও।"

সে গেছে।

মা বলে, "আবার বিয়ে কর।" সালেহা বলে, "কে করবে? যাত্রাওয়ালি মেয়েকে কে বিয়ে করে?" মা চুপ করে যান। জানেন এটা সত্য।

আজ রাতের পালা: ময়নামতীর গান। সালেহা ময়নামতী সাজছে। রানীর পোশাক, রানীর মুকুট। মুকুটটা প্লাস্টিকের, সোনালি রঙ করা। আগে কাগজের ছিল। প্লাস্টিকেরটা টেকে বেশি।

রাত নটায় পালা শুরু। বাঁশি বাজে। ঢোল বাজে। হারমোনিয়াম বাজে। ন্যারেটর বলে, "হাজার বছর আগে এই বাংলায় এক রানী ছিলেন..."

সালেহা মঞ্চে ওঠে।

সে যখন মঞ্চে ওঠে তখন সে সালেহা থাকে না। সত্যিই থাকে না। কণ্ঠস্বর বদলায়। হাঁটা বদলায়। চোখের তাকানো বদলায়। সে রানী হয়ে যায়। মাঠের লোকেরা দেখে, মুগ্ধ হয়। সামনের সারির বুড়োরা হাত তুলে দোয়া করে। পেছনের সারির ছেলেরা বাঁশি বাজায়।

সালেহা জানে এই মুহূর্তটুকুই তার। মঞ্চে দাঁড়িয়ে, আলোয়, তিনশো মানুষের সামনে, সে কেউ একজন। মঞ্চের বাইরে সে কেউ না।

"মঞ্চে আমি রানী। মঞ্চের বাইরে আমি কেউ না।"

যাত্রা মরে যাচ্ছে। সালেহা জানে। আকবর মিয়া জানেন। সবাই জানে।

বিশ বছর আগে এই জেলায় দুশোটা যাত্রাদল ছিল। এখন বিশটা। বাকিরা কোথায় গেল? ভেঙে গেল। দর্শক নেই। দর্শক কোথায়? বাড়িতে। টিভি দেখে। ইউটিউব দেখে। টিকটক দেখে।

গ্রামের মানুষের হাতে এখন ফোন। সস্তা ফোন, পাঁচ হাজার টাকার ফোন, কিন্তু তাতে পৃথিবীর সব বিনোদন। নাটক আছে, সিনেমা আছে, গান আছে। রাত জেগে মাঠে বসে ত্রিশ টাকা দিয়ে যাত্রা দেখার দরকার কী?

আকবর মিয়া বলেন, "আগে একটা পালায় পাঁচশো লোক আসত। এখন দুশো আসে কি আসে না।" টিকিট বিক্রি কমছে। দলের খরচ কমছে না। ভ্যান ভাড়া, মাইক ভাড়া, পোশাক, রং, খাওয়া। প্রতি রাতে খরচ পাঁচ হাজার। আয় হয় ছয় থেকে আট। লাভ হাজার দুয়েক। বিশজনের মধ্যে ভাগ।

তিনশো টাকা। সালেহার রাতের মজুরি।

ছোট ছেলে রাকিব ফোন করে। "আম্মা, তুমি কবে আসবে?"

সালেহা বলে, "শুক্রবারে।"

"আম্মা, স্কুলে স্যার বলেছে বই কিনতে হবে।"

"কত?"

"দুইশো টাকা।"

দুইশো টাকা। সালেহার এক রাতের মজুরির তিন ভাগের দুই ভাগ। সে বলে, "আম্মা আসলে দেব।"

ফোন রাখে। মাথা নিচু করে বসে থাকে। তারপর উঠে দাঁড়ায়। সাজতে হবে। আজ রাতে সে সীতা। সীতার বনবাস। সালেহা হাসে না। সীতার বনবাস তাকে হাসায় না। সে নিজে বনবাসে আছে।

মঞ্চে একটা দৃশ্যে সালেহাকে কাঁদতে হয়। সীতা কাঁদছেন। রামকে ছেড়ে যাচ্ছেন। সালেহা কাঁদে। আসল কান্না। অভিনয় না।

দর্শকরা ভাবে অভিনয় দারুণ। মুগ্ধ হয়। হাততালি দেয়।

সালেহা জানে সে কাঁদছে কেন। সে কাঁদছে কারণ তার ছেলের বইয়ের টাকা নেই। সে কাঁদছে কারণ স্বামী চলে গেছে। সে কাঁদছে কারণ আটত্রিশ বছর বয়সে তার শরীর ক্লান্ত, কিন্তু বিশ্রামের উপায় নেই। সে কাঁদছে কারণ যাত্রা মরে যাচ্ছে এবং যাত্রার সাথে সে মরছে।

কিন্তু মঞ্চে তার কান্না সুন্দর দেখায়। করুণ দেখায়। শিল্প হয়ে যায়।

দারিদ্র্যকে মঞ্চে তুললে সেটা শিল্প হয়। বাস্তবে সেটা শুধু দারিদ্র্য।

দল যখন ঘিওর থেকে সিংগাইর যায়, ভ্যানগাড়িতে সবাই বসে আছে। রাত দুইটা। পালা শেষ। সবাই ক্লান্ত। সালেহার মুখে এখনো রঙের দাগ। সে মোছেনি। মোছার ক্রিম ফুরিয়ে গেছে। সাবান দিয়ে মুছবে পরে।

পাশে বসা তবলচি আসলাম বলে, "সালেহা আপা, আমার ছেলেটা বড় হচ্ছে। আমি দল ছাড়ব মনে হয়।"

"কী করবে?"

"রিকশা চালাব। রিকশায় অন্তত রোজ ঘরে ফেরা যায়।"

সালেহা কিছু বলে না। সে জানে আসলাম ঠিকই বলছে। রিকশাচালক হলে রোজ ঘরে ফেরা যায়। ছেলেমেয়েকে দেখা যায়। তিনশো টাকা যাত্রায় না হয় রিকশায়, পার্থক্য কী?

পার্থক্য এটুকু যে সালেহা রিকশা চালাতে পারে না। সে অভিনয় করতে পারে। আর অভিনয়ের বাজার মরে যাচ্ছে।

একটা এনজিও এসেছিল গত বছর। "লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ" প্রকল্প। সালেহার দলের ছবি তুলল। ভিডিও করল। সালেহার ইন্টারভিউ নিল। সে বলল তার কথা। ক্যামেরার সামনে সে কাঁদল না। শুকনো চোখে বলল, "যাত্রা মরে যাচ্ছে। আমরা যাত্রার সাথে মরছি।"

এনজিওর লোকেরা মাথা নাড়ল। "খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা রিপোর্ট করব।"

রিপোর্ট হয়েছে হয়তো। কোনো অফিসের কোনো ফাইলে আছে হয়তো। সালেহার হাতে কিছু আসেনি। দলের কিছু বদলায়নি। তিনশো টাকা তিনশোই আছে।

সংরক্ষণ। শব্দটা সালেহা বোঝে না। যা মরে যাচ্ছে তাকে সংরক্ষণ করা যায় কীভাবে? মিউজিয়ামে রাখবে? মঞ্চটাকে কাচের বাক্সে ঢুকিয়ে লেবেল লাগাবে, "এটা যাত্রা। একসময় বাংলাদেশে এটা ছিল"?

১০

রাকিব একদিন ফোনে বলেছিল, "আম্মা, তুমি কী করো সেটা বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে। আমি কী বলব?"

সালেহা চুপ করে ছিল একটু। তারপর বলেছিল, "বলবে তোমার আম্মা অভিনয় করে।"

"অভিনয় মানে কী বলে?"

"বলবে নাটক করে।"

রাকিব পরদিন বন্ধুদের বলেছিল তার আম্মা নাটক করে। বন্ধুরা হেসেছিল। একজন বলেছিল, "তোর আম্মা যাত্রাওয়ালি?" রাকিব মেরেছিল সেই ছেলেকে। স্কুল থেকে অভিযোগ গিয়েছিল সালেহার মায়ের কাছে।

সালেহা যখন শুনল, কিছু বলল না। সে জানে সমাজ কী ভাবে। যাত্রাওয়ালি মানে নিচু। যাত্রাওয়ালি মানে বেশ্যা। যাত্রাওয়ালি মানে যাকে ইচ্ছা অপমান করা যায়। সালেহা এই অপমান বিশ বছর ধরে সয়ে আসছে।

১১

রাত শেষ হয়। ভোর হয়। সিংগাইরের মাঠে মঞ্চ তৈরি হচ্ছে আজ রাতের জন্য। সালেহা বসে আছে মঞ্চের কোণে। পা ঝুলিয়ে। চা খাচ্ছে। চায়ের কাপ প্লাস্টিকের।

আজ রাতে সে দুর্গা।

সে দুর্গা হবে। অসুরকে মারবে। অন্যায়কে ধ্বংস করবে। দর্শক হাততালি দেবে।

তারপর মঞ্চ থেকে নামবে। রং মুছবে। মুকুট খুলবে। ত্রিশূল রাখবে। আবার সালেহা হবে। একজন একা মা। তিনশো টাকার মজুর। যাত্রাদলের শেষ মেয়ে।

দর্শক বাড়িতে যাবে। টিভি চালাবে। সালেহাকে ভুলে যাবে।

যাত্রা মরে যাচ্ছে। আর সালেহা মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে, শেষ অঙ্কের জন্য অপেক্ষা করছে।

শেষ অঙ্কটা কার, সেটা সে জানে না।