প্রাক্তন ডাকাত/গার্ড

একই নদী, দুটো জীবন

পর্ব ৮৮ · ৭ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

মনসুরের বাম কাঁধে একটা গুলির দাগ আছে। গোল, মসৃণ, চামড়া একটু ভেতরে ঢুকে আছে। ডান উরুতে আরেকটা। সেটা ছুরির, গুলির না। দুটো দাগই সে লুকিয়ে রাখে। ফুলহাতা শার্ট পরে। লুঙ্গি গোড়ালি পর্যন্ত নামায়।

সে এখন সিকিউরিটি গার্ড। মোংলা বন্দরের কাছে একটা কার্গো ঘাটে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়। রাত আটটা থেকে ভোর ছয়টা। দশ ঘণ্টা। হাতে একটা লাঠি। গায়ে একটা নীল ইউনিফর্ম। বুকে একটা প্লাস্টিকের ব্যাজ: "মনসুর হোসেন, গার্ড, আইডি নং ৪৭।"

মাসে আট হাজার টাকা।

পনেরো বছর আগে এই একই নদীতে সে ডাকাত ছিল।

সুন্দরবনের ডাকাত। বাইরের লোকে শুনলে সিনেমার কথা মনে করে। সুন্দরবনে বাঘ আছে, ডাকাতও আছে। কিন্তু বাস্তবটা সিনেমা না।

মনসুর পটুয়াখালীর কলাপাড়া থেকে। বাবা জেলে। মা জেলের বউ। ছয় ভাইবোন। ঘরে খাবার জুটত না। বারো বছর বয়সে বাবার নৌকায় উঠল। মাছ ধরা শিখল। জাল ফেলা, টানা, মাছ বাছা, বরফ দেওয়া। কিন্তু মাছ কমে যাচ্ছিল। ট্রলার আসছিল। বড় বড় ট্রলার, বিশাল জাল, সব মাছ তুলে নিচ্ছিল। ছোট নৌকার জেলেদের কিছু থাকত না।

সতেরো বছর বয়সে একদিন কলাপাড়ার ঘাটে একটা লোক এলো। নাম সোলায়মান। মনসুরকে বলল, "মাছ ধরে কত কামাস?" মনসুর বলল, "দিনে একশো, দেড়শো। কখনো কিছুই না।" সোলায়মান বলল, "আমার সাথে আয়। রাতে একটা কাজ। হাজার টাকা।"

মনসুর জানত কী কাজ। জানত এবং গেল।

প্রথম রাত। তিনজন। একটা ছোট নৌকা। সুন্দরবনের খালে একটা মাছ ধরা ট্রলার দাঁড়িয়ে আছে। মাঝরাত। ট্রলারে দুজন ঘুমাচ্ছে।

সোলায়মান উঠল প্রথমে। মনসুর পেছনে। তৃতীয় জন নৌকায়। সোলায়মানের হাতে রামদা। মনসুরের হাতে বটি। ঘুমন্ত দুজনকে জাগিয়ে বেঁধে ফেলল। মুখে কাপড় গুঁজে দিল। মাছ নিল। বরফ নিল। ট্রলারের ইঞ্জিনের ডিজেলও নিল। টাকা পেল তিনশো টাকা। ট্রলারের মালিকের পকেটে এইটুকুই ছিল।

সোলায়মান বলল, "এটা ছোট কাজ। বড় কাজ আসবে।"

বড় কাজ এলো। কার্গো নৌকা। পণ্যবাহী ট্রলার। কখনো যাত্রীবাহী লঞ্চ। অস্ত্র এলো। রামদা থেকে পিস্তল। পিস্তল থেকে রাইফেল। দল বড় হলো। তিনজন থেকে বারোজন।

মনসুর পনেরো বছর এই কাজ করেছে। সতেরো থেকে বত্রিশ।

গুলি লেগেছিল কুঙ্গা নদীতে। একটা কার্গো নৌকায় হামলা করেছিল। কিন্তু নৌকায় অস্ত্রধারী গার্ড ছিল। গার্ড গুলি করেছিল। মনসুরের কাঁধে লেগেছিল।

পানিতে পড়ে গিয়েছিল। জ্ঞান হারায়নি। সাঁতরে নৌকায় উঠেছিল। দলের একজন মারা গিয়েছিল সেদিন। নাম ইদ্রিস। বাইশ বছর বয়স।

ইদ্রিসের মা পরে এসেছিল সোলায়মানের কাছে। কেঁদেছিল। সোলায়মান পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিল। "এটা তোমার ছেলের ভাগ।"

পাঁচ হাজার টাকা। একটা প্রাণের দাম।

মনসুর সেদিন ভেবেছিল ছেড়ে দেবে। ভেবেছিল, কিন্তু ছাড়েনি। ছাড়ার জায়গা কোথায়? ফিরে গিয়ে কী করবে? মাছ ধরবে? মাছ নেই। ক্ষেত করবে? জমি নেই। চাকরি করবে? শিক্ষা নেই।

ডাকাতি ছাড়া সে কিছু জানত না।

গ্রেপ্তার হয়েছিল একবার। র্যাবের অভিযানে। ভোর চারটায় একটা চরে ঘুমাচ্ছিল। চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল। পালানোর পথ ছিল না। হাত তুলে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

জেলে ছিল এগারো মাস। খুলনা কেন্দ্রীয় কারাগার। সেখানে অন্য ডাকাতদের সাথে থাকত। খুনি, ধর্ষক, চোরাচালানি, সব একসাথে। জেলে খাবার ছিল। ঘুমানোর জায়গা ছিল। মনসুর ভেবেছিল, জেলে বাইরের চেয়ে ভালো।

তারপর পালিয়েছিল। কীভাবে সেটা সে কাউকে বলে না। "টাকা দিলে জেল থেকে বের হওয়া যায়। সবাই জানে।"

আবার সুন্দরবন। আবার সোলায়মান। আবার রাতের নদী, অন্ধকার, অস্ত্র, চিৎকার, লুট।

সরকার অ্যামনেস্টি দিল। ডাকাত পুনর্বাসন কর্মসূচি। আত্মসমর্পণ করলে মামলা তুলে নেওয়া হবে। পুনর্বাসন ভাতা দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

সোলায়মান বলল, "ফাঁদ। যেতে যেতেই ধরবে।"

মনসুর ভাবল। বত্রিশ বছর বয়স। শরীরে দুটো দাগ। একটা ছেলে হয়েছে এক বছর আগে। ছেলেটার মা একটা মেয়ে, নাম রুবি, পটুয়াখালী শহরে থাকে। মনসুর মাঝে মাঝে যায়। টাকা দেয়। রুবি জানে মনসুর কী করে। কিছু বলে না। টাকা নেয়।

কিন্তু ছেলেটার মুখ দেখে মনসুর ভাবল, এই ছেলে বড় হয়ে জানবে তার বাবা ডাকাত ছিল। কি জানবে তার বাবা গার্ড ছিল।

সে আত্মসমর্পণ করল। একা। সোলায়মানকে বলেনি। রাতে নৌকা নিয়ে মোংলা থানায় গেল। হাত তুলে ঢুকল। "আমি ডাকাত মনসুর। আত্মসমর্পণ করতে এসেছি।"

পুনর্বাসন। শব্দটা বড়। বাস্তবটা ছোট।

তিন মাস ট্রেনিং। সিকিউরিটি গার্ড ট্রেনিং। লাঠি চালানো, টর্চ জ্বালানো, রিপোর্ট লেখা। মনসুর হাসত মনে মনে। লাঠি চালানো শেখাচ্ছে তাকে, যে রাইফেল চালিয়েছে।

তারপর চাকরি দিল। মোংলা বন্দরের কার্গো ঘাট। রাতের শিফট। আট হাজার টাকা।

মনসুর প্রথম রাতে ঘাটে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। এই নদী সে চেনে। এই নদীর প্রতিটা বাঁক সে জানে। কোথায় স্রোত তীব্র, কোথায় চর আছে, কোথায় নৌকা লুকানো যায়। সে এই নদীতে লুট করেছে। এখন এই নদীতে পাহারা দিচ্ছে।

"আমি আগে লুট করতাম। এখন পাহারা দিই। একই নদী, দুটো জীবন।"

অন্য গার্ডরা জানে না। মনসুর বলেনি। তার কাগজপত্রে লেখা আছে "প্রাক্তন জেলে।" এটুকুই। ডাকাত শব্দটা নেই কোথাও।

পাশের গার্ড সুমন। তরুণ ছেলে। বলে, "মনসুর ভাই, রাতে ভয় করে না?" মনসুর বলে, "না।" সুমন বলে, "শুনেছি এদিকে ডাকাত আছে। নদীতে।" মনসুর বলে, "আছে।"

সুমন বলে, "ডাকাত এলে কী করব?" মনসুর বলে, "লাঠি আছে তো। মারবে।" সুমন হাসে। সুমনের হাসি নার্ভাস।

মনসুর হাসে না। সে জানে ডাকাত এলে লাঠি দিয়ে কিছু হবে না। ডাকাতের কাছে অস্ত্র থাকে। ডাকাত প্রথমে গার্ডকে সরায়। মেরে বা বেঁধে। তারপর কাজ করে। মনসুর জানে কারণ সে নিজে এটা করেছে।

"আমি জানি চোর কোথায় লুকায়। কারণ আমি সেখানে লুকাতাম।"

রুবি এখন মনসুরের সাথে থাকে। মোংলায় একটা ভাড়া ঘর। টিনের চালা। একটা ঘর, একটা রান্নাঘর। ছেলে ফারুকের বয়স এখন ছয়। স্কুলে যায়।

ফারুক একদিন জিজ্ঞেস করল, "আব্বা, তুমি রাতে কী করো?"

মনসুর বলল, "পাহারা দিই।"

"কার পাহারা?"

"নদীর।"

"নদী কি পালায়?"

মনসুর হাসল। "না। কিন্তু নদীতে চোর আসে। আমি দেখি যেন না আসে।"

ফারুক সন্তুষ্ট হলো। ছয় বছরের ছেলে। তার কাছে বাবা হিরো। বাবা রাতে নদী পাহারা দেয়। চোর তাড়ায়।

মনসুর ফারুকের মাথায় হাত রাখল। ভাবল, এই ছেলে কোনোদিন জানবে না। জানলে কী হবে সেটা মনসুর ভাবতে চায় না।

১০

সোলায়মান ধরা পড়ল দুই বছর আগে। র্যাবের ক্রসফায়ারে মরেনি, জীবিত ধরা পড়েছে। জেলে আছে। মনসুর শুনেছে।

কখনো কখনো মনসুর ভাবে, সোলায়মান তাকে ঘৃণা করে কি না। সে দল ছেড়ে এসেছে, আত্মসমর্পণ করেছে, এখন গার্ডের চাকরি করে। সোলায়মানের চোখে সে বিশ্বাসঘাতক।

কিন্তু মনসুর জানে, সোলায়মানের রাস্তায় থাকলে সেও জেলে থাকত। অথবা মাটির নিচে। পনেরো বছরের সাথীদের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছে। তিনজন জেলে। বাকিরা কোথায় কেউ জানে না।

মনসুর বেঁচে আছে। ফারুক স্কুলে যায়। রুবি ঘর সামলায়। আট হাজার টাকায় চলে। কোনোমতে চলে।

১১

রাত দুইটা। ঘাটে নিস্তব্ধ। নদীতে জোয়ার। পানি কালো। কার্গো নৌকাগুলো বাঁধা আছে। দুলছে আস্তে আস্তে।

মনসুর দাঁড়িয়ে আছে। লাঠি হাতে। টর্চ পকেটে। চোখ নদীতে।

নদীর ওপারে অন্ধকার। সুন্দরবনের অন্ধকার। সেই অন্ধকারে সে পনেরো বছর কাটিয়েছে। সেই অন্ধকার থেকে সে বেরিয়ে এসেছে।

বেরিয়ে এসেছে কি? মনসুর নিশ্চিত না। শরীর বেরিয়ে এসেছে। মাথা? মাথায় এখনো সেই অন্ধকার আছে। রাতে ঘুমালে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে নদী, স্বপ্নে নৌকা, স্বপ্নে চিৎকার। কখনো ইদ্রিসকে দেখে, বাইশ বছরের ইদ্রিস, বুকে গুলি, পানিতে পড়ে যাচ্ছে।

মনসুর জেগে ওঠে। ঘামে ভেজা।

আট হাজার টাকায় অতীত মোছে না। অতীত শরীরে থাকে, দাগের মতো। ঢেকে রাখা যায়, মুছে ফেলা যায় না।

নদী বইছে। একই নদী। দুটো জীবন।

মনসুর পাহারা দিচ্ছে।