ভাগচাষি
এই মাটি আমার না। কিন্তু এই মাটি আমাকে চেনে।
১
হবিবরের হাতের রেখা দেখা যায় না। মাটি ঢুকে গেছে রেখায়। কালো মাটি। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি, যেটা শুকনো মৌসুমে ইটের মতো শক্ত, ভেজা মৌসুমে আঠার মতো লেগে থাকে। এই মাটিতে হবিবর ধান ফলায়, গম ফলায়, পেঁয়াজ ফলায়।
পাঁচ বিঘা জমি। একটুও তার না।
জমি মালিকের। মালিকের নাম আনোয়ার সাহেব। ঢাকায় থাকেন। গুলশানে ফ্ল্যাট। ব্যবসা করেন, কীসের ব্যবসা হবিবর জানে না। জমির কাগজে আনোয়ার সাহেবের নাম। হবিবরের নাম কোথাও নেই।
ভাগচাষ। ফসলের অর্ধেক মালিকের। অর্ধেক হবিবরের। বীজ হবিবরের, সার হবিবরের, সেচ হবিবরের, শ্রম হবিবরের। জমি শুধু আনোয়ার সাহেবের। পঞ্চাশ ভাগ পান শুধু জমি দিয়ে।
হবিবর হিসাব জানে না। কিন্তু বউ জোহরা জানে। জোহরা বলে, "খরচ বাদ দিলে আমরা পাই ত্রিশ ভাগ। বাকি সত্তর ভাগ যায় সারে, ডিজেলে, কীটনাশকে, আর মালিকের পকেটে।"
২
হবিবরের বাবার নাম ছিল মোতালেব। মোতালেবও এই পাঁচ বিঘা চাষ করতেন। একই মালিকের বাবার জমি। আনোয়ার সাহেবের বাবা কাদের সাহেব। তিনি থাকতেন রাজশাহী শহরে। মাসে একবার আসতেন। গরুর গাড়িতে।
মোতালেবের আগে ছিলেন হবিবরের দাদা আবদুর রশিদ। তিনিও চাষ করতেন এই জমি। কাদের সাহেবের বাবার জমি। তখন ভাগ ছিল ষাট-চল্লিশ। ষাট মালিকের, চল্লিশ চাষির। পরে পঞ্চাশ-পঞ্চাশ হয়েছে। মালিক দয়া করেননি। আইন হয়েছে।
তিন প্রজন্ম। একই মাটি। একই ফসল। একই ভাগ। তিন প্রজন্মে শুধু বদলেছে সারের দাম, বীজের দাম, ডিজেলের দাম। চাষির ভাগ সবসময় সেই অর্ধেক।
"এই মাটি আমার না। কিন্তু এই মাটি আমাকে চেনে।"
হবিবর এই কথা বলে যখন ভোরে মাঠে দাঁড়ায়। একা দাঁড়ায়। চারদিকে ক্ষেত। দূরে তালগাছের সারি। আকাশে পাখি। সবকিছু চেনা। প্রতিটা গাছ, প্রতিটা আল, প্রতিটা খাল। এই ল্যান্ডস্কেপ তার শরীরের অংশ। মাটি চেনে তাকে। তার পায়ের ছাপ চেনে। তার লাঙলের দাগ চেনে। কিন্তু চেনা আর নিজের হওয়া এক না।
৩
বোরো মৌসুম। জানুয়ারি। চারা লাগানো হয়ে গেছে। এখন সেচ দিতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টি কম। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে প্রতি বছর। শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি তুলতে হয়। ডিজেল লাগে।
ডিজেলের দাম একশো আট টাকা লিটার। পাঁচ বিঘায় সেচ দিতে মৌসুমে বারো হাজার টাকা ডিজেল লাগে। শুধু ডিজেল। মেশিন ভাড়া আলাদা।
হবিবরের কাছে টাকা নেই। গত মৌসুমের ধান বিক্রি করে যা পেয়েছিল তা দিয়ে ঋণ শোধ হয়েছে, সংসার চলেছে। কিছু জমা নেই।
সে মহাজনের কাছে যায়। বাজারে আলম ব্যাপারীর দোকান। আলম ব্যাপারী সুদে টাকা দেন। সুদ মাসে পাঁচ শতাংশ। বারো হাজার টাকা নিলে ফসল তোলার সময়, চার মাস পর, শোধ দিতে হবে চৌদ্দ হাজার চারশো টাকা। দুই হাজার চারশো টাকা সুদ।
হবিবর নেয়। নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
৪
আনোয়ার সাহেব আসেন বছরে একবার। ফসল তোলার সময়। একটা মাইক্রোবাস আসে ঢাকা থেকে। সাথে ড্রাইভার। আনোয়ার সাহেব নামেন, খেত দেখেন, মাথা নাড়েন।
তারপর ধান মাপা হয়। বস্তায় বস্তায়। একজন একজন করে গোনেন আনোয়ার সাহেব। হবিবর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। চুপচাপ।
এই দৃশ্যটা হবিবর ছোটবেলা থেকে দেখছে। তার বাবাও এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মালিকের বাবাও এভাবে গুনতেন।
"তিনি গোনেন, আমি ফলাই। তিনি খান, আমি দেখি।"
আনোয়ার সাহেব তাঁর ভাগের বস্তাগুলো ট্রাকে তোলেন। ট্রাক রাজশাহী শহরে যায়। সেখান থেকে আড়তে বিক্রি হয়। আনোয়ার সাহেবের হিসাব ফোনে আসে। টাকা ব্যাংকে যায়। গুলশানের ফ্ল্যাটে বসে তিনি হিসাব দেখেন।
হবিবর তার ভাগের বস্তা ঘরে নেয়। মাথায় করে। রিকশাভ্যানে করে। কিছু রাখে খাওয়ার জন্য। বাকিটা বিক্রি করে বাজারে। বিক্রির টাকা থেকে প্রথমে মহাজনের ঋণ শোধ। তারপর বাকি যা থাকে তা দিয়ে চলা।
৫
জোহরা বলে, "জমি কেনার কথা ভাবো।"
হবিবর হাসে। হাসিটা তিক্ত। জমির দাম কত? এক বিঘা বরেন্দ্র অঞ্চলে তিন লাখ টাকা। পাঁচ বিঘা পনেরো লাখ। হবিবর বছরে কামায় পঞ্চাশ-ষাট হাজার। সঞ্চয় শূন্য। পনেরো লাখ টাকা জমানোর জন্য কত বছর লাগবে?
হবিবর হিসাব করতে পারে না। কিন্তু বোঝে, তার জীবদ্দশায় সম্ভব না।
তার বাবাও ভেবেছিলেন। তার দাদাও ভেবেছিলেন। তিন প্রজন্মে কেউ পারেনি। চতুর্থ প্রজন্ম, হবিবরের ছেলে রাসেল, সে কি পারবে?
রাসেলের বয়স ষোলো। নবম শ্রেণিতে পড়ে। মাঠে আসে বাবাকে সাহায্য করতে। ছুটির দিনে লাঙল ধরে। পরীক্ষার আগে বই পড়ে আলোকবর্তিকায়, কারণ ঘরে ভালো বাতি নেই।
রাসেল বলে, "আব্বা, আমি পড়াশোনা করে চাকরি করব। তোমাকে জমি কিনে দেব।"
হবিবর কিছু বলে না। সে জানে চাকরি পাওয়া জমি কেনার চেয়েও কঠিন। কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সে বলে না।
রাসেলের পড়ার খরচ জোগাতে হবিবর আরেকটা জমি ভাগে নিয়েছে। আরো দুই বিঘা। আরেক মালিকের। এখন সাত বিঘা চাষ করে। শরীরে কুলায় না। ভোর চারটায় ওঠে। রাত নটায় ঘুমায়। মাঝখানে শুধু মাটি।
৬
পেঁয়াজ লাগিয়েছিল এক বিঘায়। এবার দাম ভালো পাবে ভেবেছিল। গত বছর পেঁয়াজ কেজি ষাট টাকা ছিল বাজারে। এ বছর সবাই পেঁয়াজ লাগিয়েছে। সাপ্লাই বেশি। দাম কেজি পনেরো।
পনেরো টাকা কেজি। উৎপাদন খরচ কুড়ি। মানে প্রতি কেজিতে পাঁচ টাকা লোকসান।
হবিবর পেঁয়াজ তুলে ঘরের উঠোনে রাখল। বিক্রি করল না। ভাবল, দাম বাড়বে। এক সপ্তাহ রাখল। পেঁয়াজ পচতে শুরু করল। দাম বাড়ল না।
সে পচা পেঁয়াজ ফেলে দিল। যেগুলো ভালো ছিল সেগুলো পনেরো টাকায় বিক্রি করল। মোট পেল আট হাজার টাকা। খরচ হয়েছিল বারো হাজার। চার হাজার টাকা লোকসান।
আনোয়ার সাহেবের লোকসান নেই। তিনি পেঁয়াজে বিনিয়োগ করেননি। জমি দিয়েছেন। জমির কিছু হয়নি। জমি আছে, জমি থাকবে। লোকসান চাষির।
৭
একদিন রাতে হবিবর উঠোনে বসে আকাশ দেখছিল। তারা ভরা আকাশ। বরেন্দ্রের আকাশ পরিষ্কার, শহরের মতো ধোঁয়া নেই। জোহরা এসে পাশে বসল।
"কী ভাবো?"
"কিছু না।"
"কিছু না মানে? সারাদিন মাঠে খাটো, রাতে আকাশ দেখো। কিছু তো ভাবো।"
হবিবর চুপ করে থাকল। তারপর বলল, "ভাবি, এই জমি যদি আমার হতো।"
জোহরা কিছু বলল না। সে জানে এই ভাবনায় কোনো ফল নেই। শুধু কষ্ট।
হবিবর বলল, "আমার দাদা এই মাটিতে হাড় পুঁতেছেন। আমার বাবা এই মাটিতে ঘাম ফেলেছেন। আমি এই মাটিতে রক্ত ফেলেছি। কিন্তু মাটি আমাদের না। মাটি তার যে ঢাকায় বসে আছে, যে এই মাটি ছুঁয়েও দেখেনি।"
৮
আনোয়ার সাহেবের ছেলে একবার এসেছিল। তরুণ। শার্ট-প্যান্ট। জুতো পরে জমিতে নেমেছিল। জুতো কাদায় ডুবে গিয়েছিল। মুখ বিকৃত করেছিল। ফোনে ছবি তুলেছিল। "ইনস্টাগ্রাম স্টোরি" দিয়েছিল। হবিবর জানে না ইনস্টাগ্রাম কী, কিন্তু রাসেল বলেছিল।
ছেলেটা হবিবরকে বলেছিল, "চাচা, ধান কীভাবে হয়?"
হবিবর দেখিয়েছিল। চারা, ক্ষেত, পানি, সার। ছেলেটা মাথা নাড়িয়েছিল। "ইন্টারেস্টিং।"
এই ছেলে একদিন এই জমির মালিক হবে। বাবার পরে। হবিবরের পরে রাসেল এই জমি চাষ করবে। মালিকের ছেলে আর চাষির ছেলে। একই জমি, দুটো ভাগ্য।
৯
বৃষ্টি হলো না। ফেব্রুয়ারি শেষ, মার্চ শুরু। খরা। বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা নতুন না, কিন্তু প্রতি বছর বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরো নিচে নামছে। শ্যালো মেশিনে পানি উঠছে না। ডিপ টিউবওয়েল লাগবে। ডিপ টিউবওয়েলের খরচ হবিবরের সাধ্যের বাইরে।
ধান শুকাচ্ছে। পাতা হলুদ হচ্ছে। হবিবর দাঁড়িয়ে দেখছে। করার কিছু নেই। আকাশের দিকে তাকায়। মেঘ নেই।
জমি যদি তার হতো, তাহলেও এই খরায় ফসল মরত। কিন্তু তাহলে লোকসানটা শুধু তার হতো। এখন লোকসান তার, কিন্তু জমি অন্যের।
আনোয়ার সাহেব ফোন করলেন। "হবিবর, ফসল কেমন?" হবিবর বলল, "খারাপ। বৃষ্টি হচ্ছে না।" আনোয়ার সাহেব বললেন, "দেখো কী করা যায়।" ফোন রাখলেন।
দেখো কী করা যায়। কী করা যায়? পানি নেই মাটিতে। টাকা নেই পকেটে। সরকারের কৃষি অফিস থেকে কেউ আসেনি। আসবেও না। ক্ষতিপূরণ? হবিবর শব্দটা শুনেছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণ পায় যার জমি আছে। ভাগচাষির ক্ষতিপূরণ নেই। ভাগচাষি কোনো কাগজে নেই। সে অদৃশ্য।
হবিবর দেখছে। আকাশ দেখছে। মাটি দেখছে। ফাটল দেখছে মাটিতে।
১০
ভোরে হবিবর মাঠে যায়। খালি পায়ে। লুঙ্গি গুটিয়ে। মাথায় গামছা। হাতে কোদাল।
এই মাটিতে সে প্রতিদিন দাঁড়ায়। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে। তার আগে তার বাবা দাঁড়াতেন। তার আগে তার দাদা। এই মাটির প্রতিটা ঢিবি, প্রতিটা গর্ত, প্রতিটা নালা সে চেনে। কোথায় পানি জমে, কোথায় মাটি উর্বর, কোথায় পোকা বেশি। সে জানে।
আনোয়ার সাহেব জানেন না। তিনি জানেন শুধু কত বস্তা ধান এলো।
হবিবর কোদাল চালায়। মাটি ভাঙে। মাটি ভেতর থেকে ভেজা। ওপরটা শুকনো, ভেতরে এখনো রস আছে। হবিবর জানে। মাটি তাকে বলে। মাটি তার হাতের ভাষা বোঝে।
কিন্তু মাটি তার না।
এই সত্যটা প্রতিদিন সকালে হবিবরকে মনে করিয়ে দেয় কেউ না। সে নিজেই জানে। জানে এবং মাঠে যায়। কোদাল চালায়। ফসল ফলায়। অর্ধেক দেয়। বাকি অর্ধেক নিয়ে বেঁচে থাকে।
তিন প্রজন্ম এভাবে বেঁচে আছে। চতুর্থ প্রজন্ম দরজায় দাঁড়িয়ে।
মাটি কারো না। মাটি সবার। কিন্তু কাগজে নাম যার, মাটি তার। আর কাগজে হবিবরের নাম নেই।
কোনোদিন ছিল না।
তিন প্রজন্মে কোনোদিন ছিল না।