হকার/ট্রেনে বিক্রেতা

আমার ঠিকানা ট্রেনের বগি

পর্ব ৯০ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

"চানাচুর! চানাচুর! দশ টাকা!"

বেলালের গলা শুনলে চেনা যায়। ভাঙা গলা। ফাটা। যেন কাঁচা পাটের আঁশ দিয়ে বানানো। সকাল ছয়টায় যখন প্রথম ডাক দেয় তখন গলাটা মোটামুটি থাকে। রাত দশটায় যখন শেষ বগি থেকে নামে তখন গলা থাকে না।

ঢাকা-চট্টগ্রাম রুট। লোকাল ট্রেন। সপ্তাহে বারোটা ট্রিপ। ছয়দিন, দিনে দুইবার। শুক্রবার বিশ্রাম। বিশ্রাম মানে কমলাপুর স্টেশনে শুয়ে থাকা।

বেলালের বয়স আঠাশ। কিন্তু চেহারায় চল্লিশ লাগে। রোদে পোড়া মুখ। শুকনো ঠোঁট। চোখের নিচে কালো দাগ। চুল ধুলোয় মলিন। সে শেষ কবে আয়নায় নিজেকে দেখেছে মনে করতে পারে না। আয়না নেই। আয়না রাখার ঘর নেই।

বেলালের ব্যবসা সহজ। কমলাপুরের কাছে একটা পাইকারি দোকান থেকে চানাচুরের প্যাকেট কেনে। এক প্যাকেট সাত টাকা। বিক্রি করে দশ টাকায়। লাভ তিন টাকা। দিনে একশো থেকে একশো ত্রিশটা প্যাকেট বিক্রি করে। মোট লাভ তিনশো থেকে চারশো টাকা।

সাথে চিপস বিক্রি করে। কোল্ডড্রিংক বিক্রি করে। পানির বোতল বিক্রি করে। এগুলো মিলিয়ে দিনে চারশো থেকে পাঁচশো টাকা কামায়।

খরচ? খাওয়া একশো টাকা। স্টেশনের ধারে রুটি-ডাল। সকালে চা-বিস্কুট। তাহলে হাতে থাকে তিনশো থেকে চারশো।

এই টাকা দিয়ে কী হয়? বেঁচে থাকা হয়। আর কিছু হয় না।

টিকিট নেই বেলালের। কখনো ছিল না। হকাররা টিকিট কাটে না। টিটি জানে। পুলিশ জানে। সবাই জানে। মাঝে মাঝে টিটি তাড়ায়। "নাম, নাম।" বেলাল এক দরজা দিয়ে নামে, পরের দরজা দিয়ে ওঠে। টিটি পরের বগিতে চলে যায়। বেলাল আবার চানাচুর ডাকে।

কখনো পুলিশ ধরে। থানায় নিয়ে যায়। দুইশো টাকা জরিমানা। বেলাল দেয়। অর্ধেক দিনের কামাই। তারপর আবার ট্রেন।

একবার পুলিশ মেরেছিল। লাথি। পিঠে। বেলাল পড়ে গিয়েছিল প্ল্যাটফর্মে। চানাচুরের প্যাকেট ছড়িয়ে গিয়েছিল। পুলিশ বলেছিল, "আবার দেখলে ধরব।" বেলাল উঠেছিল। প্যাকেট কুড়িয়েছিল। ধুলো ঝেড়েছিল। পরের ট্রেনে উঠেছিল।

"ট্রেনে আমি ব্যবসায়ী। ট্রেনের বাইরে আমি ভবঘুরে।"

বেলাল ভোলার চর ফ্যাশন থেকে। মেঘনার বুকে একটা চর। চরে বাড়ি ছিল। মাটির বাড়ি। ২০০৯ সালে আইলা নিয়ে গেল। পানি এলো, বাড়ি গেল, গরু গেল, সব গেল। বাবা-মা নিয়ে ভোলা শহরে আশ্রয় নিল। তারপর বাবা মারা গেলেন। হার্ট অ্যাটাক। কোনো চিকিৎসা হয়নি। মা ভোলায় আছেন। একটা ভাড়া ঘরে। প্রতিবেশীদের বাড়িতে কাজ করেন। বেলাল মাসে দুই হাজার টাকা পাঠায়। বিকাশে।

বেলাল ঢাকায় এসেছিল চৌদ্দ বছর বয়সে। একা। কাউকে চেনে না। কমলাপুর স্টেশনে নেমে দাঁড়িয়ে ছিল। কী করবে জানে না। একটা ছেলে এসেছিল, বেলালের চেয়ে একটু বড়, নাম রশিদ। বলেছিল, "নতুন? কোত্থেকে?" বেলাল বলেছিল, "ভোলা।" রশিদ বলেছিল, "চল, কাজ দেব।"

সেই রাতে রশিদ তাকে স্টেশনের এক কোণে নিয়ে গিয়েছিল। রুটি খাইয়েছিল। বেলাল খেয়েছিল ক্ষুধার্ত মানুষের মতো, কারণ সে ক্ষুধার্ত ছিল। দুইদিন কিছু খায়নি।

কাজটা ছিল ট্রেনে চানাচুর বিক্রি। রশিদ শিখিয়ে দিল। কোন ট্রেনে উঠতে হয়, কোন বগিতে যেতে হয়, টিটি এলে কী করতে হয়, পুলিশ এলে কী করতে হয়। বেলাল শিখল। চৌদ্দ বছর আগে।

বেলালের ঘর নেই। ঠিকানা নেই। কমলাপুর স্টেশনই তার ঘর।

প্ল্যাটফর্ম নম্বর তিনের শেষ মাথায় একটা জায়গা আছে। দেয়ালের কোণে। ওখানে সে ঘুমায়। একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে তার সব জিনিস। দুটো লুঙ্গি, একটা গেঞ্জি, একটা গামছা, একটা সাবান। ব্যাগটা বালিশ হয়। মাটিতে একটা পুরনো চাদর বিছায়। শোয়।

পাশে আরো চারজন ঘুমায়। রশিদ এখন নেই, সে চট্টগ্রামে চলে গেছে। অন্যরা আছে। সোহেল, চানাচুর বিক্রি করে বেলালের মতো। কালাম, পানির বোতল বিক্রি করে। জসিম, ভিক্ষা করে। রাজু, কুলি।

পাঁচজন। পাঁচটা জীবন। একটা প্ল্যাটফর্ম।

রাতে মশা। শীতে ঠান্ডা। বর্ষায় পানি ঢোকে। গরমে গরম। কোনো ঋতুই আরামের না।

একবার স্টেশন কর্তৃপক্ষ তাড়িয়ে দিয়েছিল। "স্টেশনে ঘুমানো নিষেধ।" পাঁচজন বেরিয়ে গিয়েছিল। তিনদিন ফুটপাতে ঘুমিয়েছিল। তারপর আবার ফিরে এসেছিল। কর্তৃপক্ষ আর কিছু বলেনি। কিছু মানুষকে তাড়ানো যায় না। তারা ফিরে আসে। কারণ যাওয়ার জায়গা নেই।

ট্রেনে বেলালের একটা রুটিন আছে। সকাল ছয়টায় প্রথম লোকাল। কমলাপুর থেকে ওঠে। ডাক শুরু করে দ্বিতীয় বগি থেকে। "চানাচুর! চানাচুর! দশ টাকা!" প্রতিটা বগিতে হাঁটে। দুই মিনিট করে। একটা বগিতে দুই-তিনটা বিক্রি হয়। কখনো একটাও হয় না।

যাত্রীদের মুখ সে পড়তে পারে। কে কিনবে, কে কিনবে না। ছেলেপিলে নিয়ে যারা যায় তারা কেনে। ছেলেটা চায়, মা কেনে। একা যারা যায় তারা কেনে না। ঘুমায়। বই পড়ে। ফোন দেখে।

ফোন দেখে বেশিরভাগ। আগে মানুষ ট্রেনে বসে বাইরে তাকাত। জানালা দিয়ে ধানক্ষেত দেখত, নদী দেখত। এখন ফোন দেখে। বেলাল এসে ডাকলে বিরক্ত হয়। "যাও, দরকার নেই।"

"দরকার নেই" শব্দটা বেলাল দিনে পঞ্চাশবার শোনে। প্রতিবার কিছু মরে ভেতরে। কিন্তু সে হাসে। হাসিটা তার অস্ত্র। রাগ করলে কেউ কিনবে না। কাঁদলে তাড়াবে। হাসলে কেউ কেউ দয়া করে কেনে।

বেলাল যায়। পরের বগিতে যায়। একই ডাক। একই বিরক্তি। একই তিন টাকা লাভ।

চট্টগ্রাম স্টেশনে পৌঁছলে বেলাল নামে। স্টেশনের বাইরে একটা কল আছে, সেখানে মুখ ধোয়। তারপর স্টেশনে ফিরে আসে। পরের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা। দুই ঘণ্টা। এই দুই ঘণ্টায় সে প্ল্যাটফর্মে বসে থাকে। কিছু করে না। কখনো ঘুমায়। কখনো আকাশ দেখে।

চট্টগ্রাম শহর দেখেনি কোনোদিন। স্টেশনের বাইরে যায় না। শহরে তার কোনো কাজ নেই। শহর তাকে চেনে না, সে শহরকে চেনে না। সে শুধু স্টেশন চেনে। ঢাকা আর চট্টগ্রাম, দুটো স্টেশন। এর মাঝের পাঁচ ঘণ্টার রেললাইন। এটাই তার পৃথিবী।

"আমার ঠিকানা ট্রেনের বগি।"

একবার একজন যাত্রী জিজ্ঞেস করেছিল, "তোমার বাড়ি কোথায়?" বেলাল বলেছিল, "ভোলা।" যাত্রী বলেছিল, "ভোলায় যাও না?" বেলাল বলেছিল, "বাড়ি নেই। পানিতে গেছে।" যাত্রী আর কিছু বলেনি। বেলালও বলেনি। পানিতে যাওয়া বাড়ির গল্প বলে কী হবে? বাড়ি ফেরত আসবে না। চর ফেরত আসবে না। বাবা ফেরত আসবে না।

ফেরার ট্রেনে আবার চানাচুর। আবার ডাক। আবার তিন টাকা। রাত দশটায় কমলাপুর। প্ল্যাটফর্ম তিন। চাদর বিছানো। ঘুম।

একবার একটা মেয়ে ট্রেনে বেলালের দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। মেয়েটা কলেজে যাচ্ছিল হয়তো। ব্যাগ কাঁধে। বই হাতে। বেলাল চানাচুর বিক্রি করছিল। মেয়েটা একটা প্যাকেট কিনেছিল। দশ টাকা দিয়ে বলেছিল, "ধন্যবাদ।"

ধন্যবাদ। কেউ কখনো বলেনি। যাত্রীরা টাকা দেয়, প্যাকেট নেয়। কিছু বলে না। এই মেয়েটা বলল "ধন্যবাদ।"

বেলাল সারাদিন এই কথাটা মনে রেখেছিল। ধন্যবাদ। একটা শব্দ। কিছু না। কিন্তু কেউ তাকে মানুষ ভেবে একটা শব্দ বলেছে, এটাই অনেক।

পরদিন থেকে বেলাল প্যাকেট দেওয়ার সময় বলে, "ধন্যবাদ।" যাত্রীরা অবাক হয়। চানাচুরওয়ালা ধন্যবাদ বলছে। কেউ হাসে। কেউ কিছু বলে না। বেলাল বলে। প্রতিবার।

বেলালের বন্ধু সোহেল বলে, "তুই ধন্যবাদ বলিস কেন? ওরা তো তোকে বলে না।" বেলাল বলে, "কেউ একদিন বলেছিল। ভালো লেগেছিল।" সোহেল বোঝে না। বেলাল বোঝাতে চায় না।

৮.১

বেলালের শরীরে ক্ষত আছে। পায়ে একটা পুরনো ঘা, শুকায় না। ট্রেনের বগিতে লোহার কোণে লেগে কেটেছিল ছয় মাস আগে। ফার্মেসি থেকে ব্যান্ডেজ কিনেছিল। নিজে পরেছিল। ডাক্তারের কাছে যায়নি। ডাক্তারের ফি তিনশো টাকা। একদিনের কামাই।

পেটে গ্যাস্ট্রিক। সারাদিন খালি পেটে থাকে, তারপর রাতে একবারে খায়। পেট জ্বলে। বুকে জ্বলে। একটা সাদা ট্যাবলেট খায়, নাম জানে না, ফার্মেসিতে বলে "পেটের ওষুধ দেন।" দুই টাকা। কাজ হয় কয়েক ঘণ্টা।

শরীর কতদিন টিকবে? বেলাল ভাবে না। ভাবলে ভয় লাগে। শরীর যেদিন থামবে, সেদিন সব থামবে। ট্রেন চলবে, বেলাল থাকবে না।

স্বপ্ন আছে বেলালের। একটাই। একটা ঠেলাগাড়ি কিনবে। কমলাপুর স্টেশনের সামনে দাঁড়াবে। চানাচুর, চিপস, বিস্কুট, কোল্ডড্রিংক সাজিয়ে রাখবে। ট্রেনে দৌড়াতে হবে না। একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে বিক্রি করবে। একটা ছাতা থাকবে মাথায়। রোদে পুড়বে না, বৃষ্টিতে ভিজবে না।

ঠেলাগাড়ির দাম? পনেরো হাজার টাকা। বেলালের কাছে আছে তিন হাজার। প্লাস্টিকের ব্যাগে, কাপড়ে মুড়ে, ব্যাগের তলায়। সে প্রতি সপ্তাহে দুইশো টাকা জমায়। বাকি বারো হাজার জমাতে ষাট সপ্তাহ লাগবে। এক বছরের বেশি।

এক বছর পরেও পুলিশ তাড়াবে ঠেলাগাড়ি থেকে। লাইসেন্স লাগবে। ঘুষ লাগবে। কিন্তু অন্তত ট্রেনে দৌড়াতে হবে না। একটা জায়গায় দাঁড়ানো যাবে। নিজের একটা জায়গা।

এটুকুই স্বপ্ন। একটা ঠেলাগাড়ি। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট স্বপ্ন।

সোহেল বলে, "তোর স্বপ্ন একটা ঠেলাগাড়ি? আমার স্বপ্ন একটা দোকান।" কালাম বলে, "আমার স্বপ্ন বাড়ি।" রাজু বলে, "আমার স্বপ্ন মরার সময় একটা কাফনের কাপড়।" সবাই চুপ হয়ে যায়। রাজুর স্বপ্নটা সবচেয়ে বাস্তব।

বেলাল মায়ের কথা ভাবে। মা একা। ভোলায়। বেলাল পাঠায় দুই হাজার। মা খায়। কোনোরকম বেঁচে থাকে। বেলাল শেষ কবে মাকে দেখেছে? দুই বছর আগে। ঈদে গিয়েছিল। মা কেঁদেছিলেন। বলেছিলেন, "থাক না বাবা। ঢাকায় কী আছে?" বেলাল বলেছিল, "ঢাকায় কামাই আছে।" কামাই। চারশো টাকা দিনে। এটাই ঢাকা।

১০

ভোর পাঁচটা। কমলাপুর স্টেশন। বেলাল উঠেছে। চাদর গোটাচ্ছে। প্লাস্টিকের ব্যাগ কাঁধে নিচ্ছে।

স্টেশনে প্রথম ঘোষণা আসছে। "যাত্রীদের জানানো যাচ্ছে..."

বেলাল পাইকারি দোকানে যাচ্ছে। চানাচুর কিনবে। প্যাকেটগুলো একটা বড় ঝোলায় ভরবে। ঝোলা কাঁধে ট্রেনে উঠবে।

ট্রেন ছাড়বে। ঢাকা পেছনে পড়বে। জানালা দিয়ে শহর যাবে, তারপর গ্রাম আসবে, ধানক্ষেত আসবে, নদী আসবে। বেলাল দেখবে না। সে বগির ভেতরে। বগিতে যাত্রীদের মুখ দেখবে। ঘুমন্ত মুখ, ক্লান্ত মুখ, বিরক্ত মুখ।

"চানাচুর! চানাচুর! দশ টাকা!"

গলাটা এখনো আছে। সকালের গলা। পরিষ্কার। দুপুরে ভাঙবে। বিকেলে ফাটবে। সন্ধ্যায় ফিসফিস হবে।

তবু বেলাল ডাকবে। কারণ না ডাকলে বিক্রি হবে না। বিক্রি না হলে খাবে না। না খেলে মরবে।

ডাকা আর বেঁচে থাকা, বেলালের কাছে একই কথা।

ট্রেন চলছে। বেলাল হাঁটছে বগির ভেতর দিয়ে। একটা প্যাকেট এগিয়ে দিচ্ছে। তিন টাকা লাভ। আরেকটা প্যাকেট। আরো তিন টাকা।

এভাবে দিন যায়। রাত আসে। আবার দিন। আবার ট্রেন। আবার চানাচুর।

চৌদ্দ বছর ধরে এই রুটিন। চৌদ্দ বছরে বেলাল কত লাখ প্যাকেট চানাচুর বিক্রি করেছে সে জানে না। হিসাব রাখেনি। হিসাব রাখার দরকার নেই। কাল যা হয়েছে আজও তাই হবে। আজ যা হচ্ছে কাল তাই হবে।

বেলালের জীবন একটা রেললাইন। সোজা। কোনো বাঁক নেই। কোনো স্টেশনে নামার নেই।

শুধু চলা। শুধু ডাকা। শুধু বেঁচে থাকা।