ময়লা কুড়ানি শিশু
ধনীরা ফেলে দেয়। আমি কুড়িয়ে নিই। পৃথিবীটা এভাবেই চলে।
১
রুমার সকাল শুরু হয় অন্ধকারে।
ভোর পাঁচটা। মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের পাশে টিনের চালার ঘর। ঘরে মা আর দুই ভাই ঘুমায়। রুমা ওঠে। মুখ ধোয় না। চুল আঁচড়ায় না। পায়ে স্যান্ডেল নেই। খালি পায়ে বের হয়। কাঁধে একটা বস্তা। হাতে একটা লোহার হুক।
দশ বছর বয়স।
ল্যান্ডফিলে তখন প্রথম ট্রাক আসেনি। কিন্তু গতকালের ময়লা পড়ে আছে। রুমা জানে কোথায় কী পাওয়া যায়। পূর্ব দিকটায় হাসপাতালের বর্জ্য থাকে। পশ্চিমে গার্মেন্টসের ঝুট কাপড়। মাঝখানে গৃহস্থালি ময়লা, সেখানে প্লাস্টিকের বোতল বেশি পাওয়া যায়।
রুমা প্লাস্টিক কুড়ায়। পেট ড্রিংকসের বোতল, তেলের বোতল, শ্যাম্পুর বোতল। সব এক বস্তায়। প্লাস্টিকের দাম কেজি দুই টাকা। কম। কিন্তু প্লাস্টিক সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়।
অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান পেলে ভালো। কেজি ত্রিশ টাকা। কিন্তু ক্যান কম পাওয়া যায়। ঢাকার মানুষ ক্যানে কম খায়। বোতলে বেশি খায়।
তামার তার সবচেয়ে দামি। পুরনো মোটর, পুরনো ট্রান্সফরমার, ছেঁড়া ইলেকট্রিক তার। তামা পেলে দিনটা ভালো যায়। কিন্তু তামা প্রায় পাওয়া যায় না। বড়রা আগেই নিয়ে নেয়।
কার্ডবোর্ডও কুড়ায় রুমা। কেজি পাঁচ টাকা। ভেজা হলে কম দেয়।
২
সকাল সাতটায় প্রথম ট্রাক আসে।
ট্রাক ময়লা ফেলার সাথে সাথে কুড়ানিরা ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিশ-পঁচিশ জন। বেশিরভাগ শিশু। কেউ রুমার বয়সী, কেউ আরো ছোট। সাত-আট বছরের বাচ্চারাও আছে। ট্রাকের তাজা ময়লায় ভালো জিনিস বেশি থাকে। তাই দৌড়।
রুমা দৌড়ায়। বস্তা কাঁধে ঝুলিয়ে, হুক হাতে। ময়লার স্তূপে উঠে পড়ে। গন্ধ। পচা খাবারের গন্ধ, ভেজা কাগজের গন্ধ, মরা প্রাণীর গন্ধ। রুমার নাক এই গন্ধ আর চেনে না। প্রথম দিকে বমি আসত। এখন আসে না।
হুক দিয়ে ময়লা উলটায়। প্লাস্টিকের ব্যাগ ছিঁড়ে দেখে ভেতরে কী আছে। কখনো শুধু ভাতের ফেলে দেওয়া অংশ। কখনো ভাঙা খেলনা। কখনো পুরনো জুতা। কখনো সিরিঞ্জ।
সিরিঞ্জ দেখলে রুমা সরে যায়। কিন্তু সবসময় দেখা যায় না। ময়লার ভেতরে লুকানো থাকে। হাত ঢোকালে বিঁধে।
গত বছর একবার সুই বিঁধেছিল। ডান হাতের তালুতে। রক্ত বের হয়েছিল। রুমা ময়লা থেকে একটা কাপড়ের টুকরো তুলে বেঁধে নিয়েছিল। চিকিৎসা? কোথায়? কে নিয়ে যাবে? কার টাকায়?
হাতটা ফুলেছিল তিনদিন। তারপর নিজে থেকে কমে গেছে। রুমা আল্লাহকে ধন্যবাদ দিয়েছিল।
৩
দুপুরে রুমা হিসাব করে।
বস্তায় প্লাস্টিক আছে প্রায় দশ কেজি। কার্ডবোর্ড পাঁচ কেজি। অ্যালুমিনিয়াম দুটো ক্যান, ওজনে কিছুই না। একটা পিতলের কব্জা পেয়েছে, সেটা দিয়ে দশ-পনেরো টাকা আসতে পারে।
রুমা বস্তা কাঁধে নিয়ে হাঁটে ভাঙারির দোকানে। দোকানদার রহমত আলি। মোটা লোক। প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে থাকেন। ওজন করেন নিজের দাঁড়িতে। দাঁড়ি সবসময় রুমাদের দিকে কম দেখায়, রুমা জানে। কিন্তু কিছু বলে না। অন্য ভাঙারি আরো দূরে। এত ভারী বস্তা নিয়ে আর হাঁটতে পারবে না।
"প্লাস্টিক নয় কেজি। কার্ডবোর্ড সাড়ে চার কেজি।"
রুমা জানে প্লাস্টিক দশ কেজির বেশি, কার্ডবোর্ড পাঁচ কেজি। কিন্তু তর্ক করে না।
"মোট ৪০ টাকা। কব্জা ১০। মোট ৫০।"
পঞ্চাশ টাকা। সকাল পাঁচটা থেকে দুপুর একটা। আট ঘণ্টা কাজ। পঞ্চাশ টাকা।
রুমা টাকাটা গোঁজে কাপড়ের কোমরে। বাড়ি ফেরে। পথে একটা ছোলার ঠোঙা কেনে। দশ টাকা। খায় হাঁটতে হাঁটতে। এটাই তার প্রথম খাবার আজকের।
৪
বিকালে আবার যায়।
বিকালের শিফটে কম কুড়ানি থাকে। গরমে অনেকে আসে না। রুমা আসে। গরমে তার কিছু হয় না। রোদে পুড়ে চামড়া কালো হয়ে গেছে। পিঠে ঘামে ভেজা ফ্রক শরীরে আটকে থাকে।
বিকালে সে ব্যাটারি পেল।
গাড়ির ব্যাটারি। পুরনো। ভাঙা। ভেতরে অ্যাসিড আছে। রুমা জানে না এটা অ্যাসিড। সে জানে ভেতরে পানি মতো কিছু থাকে যেটা গায়ে লাগলে জ্বালা করে। সে সাবধানে ধরল। কিন্তু ব্যাটারি ফাটা। অ্যাসিড গড়িয়ে তার বাম হাতের আঙুলে লাগল।
জ্বালা।
রুমা হাত ঝাঁকাল। ময়লা পানিতে ধুলল। জ্বালা কমল না। আঙুলের চামড়া সাদা হয়ে গেল। তারপর লাল।
এটাও সারবে। আগেরবারও সেরেছিল। রুমার শরীরে এরকম দাগ অনেক আছে। বাম হাতে, ডান পায়ে, পিঠে। কোনোটা অ্যাসিডের, কোনোটা ভাঙা কাচের, কোনোটা মরচে পড়া লোহার।
রুমার হাত দেখলে মনে হয় চল্লিশ বছরের মানুষের হাত। আঙুলগুলো মোটা, রুক্ষ। নখ ভাঙা। নখের নিচে স্থায়ী কালো দাগ, যেটা কোনো সাবানে যায় না। তালুতে ক্যালাস। দশ বছরের বাচ্চার হাতে ক্যালাস।
৫
রুমা স্কুলে যায়নি কোনোদিন।
মা বলে, "পড়ালেখা খাওয়ায় না।"
মা ঠিকই বলে। রুমার বাবা নেই। মারা গেছে তিন বছর আগে। ল্যান্ডফিলেই কাজ করত। একদিন ময়লার স্তূপ ধসে পড়ল। নিচে চাপা পড়ল। বের করতে পারেনি কেউ। পরদিন বুলডোজার দিয়ে সরিয়ে লাশ বের করল। তখন আর লাশ চেনা যায় না।
মা কাপড় সেলাই করে। দিনে একশো টাকা আয়। রুমা কুড়িয়ে আনে একশো থেকে দেড়শো। ছোট ভাই সোহেল, আট বছর, সেও কুড়ায়, পঞ্চাশ-সত্তর টাকা আনে। সবচেয়ে ছোট ভাই তিন বছর, সে এখনো কিছু করে না। আরো দুই বছর পর সেও বস্তা কাঁধে নেবে।
মোট আয় দিনে আড়াইশো থেকে তিনশো টাকা। তিন বেলা খায় না। দুই বেলা। সকালে মুড়ি, রাতে ভাত-ডাল। মাংস মাসে একবার, কখনো দুই মাসে একবার। যখন রুমা ভালো কিছু পায়, তামার তার বা পিতলের টুকরো, সেদিন মাংস হয়।
৬
একদিন রুমা ময়লার মধ্যে একটা পুতুল পেল।
প্লাস্টিকের পুতুল। চুল নেই। এক হাত ভাঙা। গায়ে ময়লা লেগে আছে। কিন্তু মুখটা ঠিক আছে। পুতুলটা হাসছে। প্লাস্টিকের আঁকা হাসি, যেটা কখনো মুছবে না।
রুমা পুতুলটা ধুলল। ময়লা পানিতে, কিন্তু তবু ধুলল। কাপড় দিয়ে মুছল। বস্তায় রাখল না। কোমরে গুঁজল।
বাড়ি ফিরে পুতুলটা আবার ধুলল। এবার সাবান দিয়ে। পুতুলের গায়ের রং বের হলো। গোলাপি। একটা হাত নেই, কিন্তু রুমা পাত্তা দিল না। সে নিজেও তো একটু ভাঙা।
রুমা পুতুলটার নাম দিল ডলি।
ডলি রুমার একমাত্র খেলনা। জীবনে প্রথম খেলনা। রুমা রাতে ডলিকে পাশে নিয়ে ঘুমায়। ডলির গায়ে এখনো ল্যান্ডফিলের একটা আবছা গন্ধ আছে। রুমার নিজের গায়েও আছে। দুজনের গন্ধ মিলে যায়।
৭
ল্যান্ডফিলে একটা নিয়ম আছে। অলিখিত।
বড়রা আগে কুড়াবে। যেটা বড়রা ফেলে দেয়, সেটা বাচ্চারা নেবে। তামা, পিতল, দামি ধাতু, বড়রা নেয়। প্লাস্টিক, কাগজ, বাচ্চাদের জন্য।
এই নিয়ম কে বানিয়েছে? কেউ জানে না। কিন্তু ভাঙলে মার খেতে হয়। রুমা একবার একটা তামার পাইপ তুলেছিল। মিলন নামে একজন বড় কুড়ানি এসে কেড়ে নিল। রুমা ধরে রাখতে চাইল। মিলন চড় মারল। রুমা পড়ে গেল ময়লার ওপর। মুখে ময়লা ঢুকল।
রুমা কাঁদল না। কাঁদলে আরো মার পড়ে। সে উঠল। অন্যদিকে গেল। প্লাস্টিক কুড়ানো শুরু করল।
ল্যান্ডফিলে কান্না চলে না। কান্না সময় নষ্ট করে। সময় মানে ময়লা। ময়লা মানে টাকা। টাকা মানে ভাত।
৮
রুমার পায়ে জুতা নেই।
খালি পায়ে হাঁটে ময়লার ওপর দিয়ে। কাচের টুকরো, ভাঙা বোতল, মরচে ধরা পেরেক। রুমার পায়ের তলা এত শক্ত যে বেশিরভাগ জিনিস ফোটে না। কিন্তু মাঝে মাঝে ফোটে। তখন রক্ত বের হয়। রুমা ময়লা থেকে একটা কাপড় তুলে বাঁধে। কাজ চালিয়ে যায়।
একটা স্যান্ডেল কিনতে পঞ্চাশ টাকা লাগে। সেই পঞ্চাশ টাকা মানে একদিনের রোজগার। রুমা হিসাব করে, স্যান্ডেল কিনলে সেদিন ভাত হবে না। স্যান্ডেল ছাড়া পা কাটলে রক্ত বের হয়, কিন্তু ভাত হয়।
রুমা ভাত বেছে নেয়।
৯
বর্ষাকালে ল্যান্ডফিল আরো খারাপ হয়।
পানি জমে। ময়লা পচে। মশা হয়। রুমার জ্বর আসে। প্রতি বর্ষায় দুই-তিনবার জ্বর আসে। মা ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল কেনে। পাঁচ টাকা। জ্বর না কমলে আরো একটা। দশ টাকা। এর বেশি চিকিৎসা নেই।
রুমা জ্বর নিয়েও কাজ করে। কারণ জ্বরের দিন কাজ না করলে সেদিন আয় শূন্য। আয় শূন্য মানে রাতে ভাত নেই। ভাত নেই মানে সোহেলও খাবে না। ছোট ভাইটাও খাবে না। মা খাবে না।
তাই রুমা জ্বর নিয়ে যায়। মাথা ঘোরে। চোখে ঝাপসা দেখে। হাত কাঁপে। কিন্তু বস্তা কাঁধে নেয়। হুক হাতে নেয়।
ময়লার স্তূপে উঠলে গরম লাগে। পচন থেকে তাপ বের হয়। ময়লার নিচে হাত দিলে গরম। এই গরমে রুমার জ্বরের শীত একটু কমে।
ময়লা তাকে উষ্ণ রাখে। এটা কোনো রূপক না। সত্যিই রাখে।
১০
একজন এনজিওর লোক এসেছিল একদিন। ক্যামেরা নিয়ে। রুমাদের ছবি তুলল। কথা বলল।
"তুমি কি স্কুলে যেতে চাও?"
রুমা বলল, "স্কুলে গেলে কে কুড়াবে?"
লোকটা মাথা নাড়ল। নোটবুকে লিখল। আরো ছবি তুলল। চলে গেল।
তিন মাস পর একটা সাইনবোর্ড লাগল ল্যান্ডফিলের পাশে। "শিশুশ্রম মুক্ত এলাকা।" সাইনবোর্ডের পেছনে রুমা সেদিন প্লাস্টিক কুড়াচ্ছিল।
সাইনবোর্ড এখনো আছে। রুমাও এখনো আছে।
১১
রাতে রুমা ডলিকে নিয়ে বসে।
টিনের চালায় বৃষ্টি পড়ে। ঝনঝন শব্দ। মা সেলাই করছে মোমবাতির আলোয়। বিদ্যুৎ নেই। সোহেল ঘুমাচ্ছে। ছোট ভাই কাঁদছে। মা একহাতে সেলাই করে, একহাতে বাচ্চাকে দোলায়।
রুমা ডলির চুল আঁচড়ায়। ডলির চুল নেই, কিন্তু রুমা ভান করে আছে। ডলির ভাঙা হাতে একটা সুতো বেঁধে দিয়েছে, যেন ব্যান্ডেজ।
রুমা ডলিকে বলে, "তুই আগে একটা বড়লোকের বাড়িতে ছিলি। তারপর তারা তোকে ফেলে দিল। আমি তোকে কুড়িয়ে নিলাম।"
ডলি হাসে। প্লাস্টিকের স্থায়ী হাসি।
রুমা বলে, "ধনীরা ফেলে দেয়। আমি কুড়িয়ে নিই। পৃথিবীটা এভাবেই চলে।"
সে ডলিকে বুকে নিয়ে শোয়। ময়লার গন্ধ, মোমবাতির ধোঁয়া, বৃষ্টির শব্দ। রুমা ঘুমায়। কাল ভোর পাঁচটায় আবার উঠবে। বস্তা কাঁধে নেবে। হুক হাতে নেবে।
ল্যান্ডফিল অপেক্ষা করে। ময়লা কখনো ফুরায় না। যতদিন শহর আছে, ততদিন ময়লা আছে। যতদিন ময়লা আছে, ততদিন রুমা আছে।
দশ বছর বয়সে রুমার ভবিষ্যৎ তার বস্তার মতো। ভারী, ময়লা, আর কেউ চায় না।