ভাটিয়ালি মাঝি
নদী আমার ঘর খেয়েছে। নদী আমাকে গান দিয়েছে। কোনটা বেশি দামি?
১
আব্বাসের গলায় পদ্মা নদী বাস করে।
সে নিজে বলে না এটা। অন্যেরা বলে। চরভদ্রাসনের লোকে বলে, "আব্বাসের গান শুনলে মনে হয় পদ্মা নিজে গাইছে।" আব্বাস কাঁধ ঝাঁকায়। সে জানে গলা তার একটাই সম্পদ। নৌকা ভাড়া করা। বৈঠা তার নিজের। গলাও তার নিজের। বাকি সব নদী নিয়ে গেছে।
সকালে আব্বাস ঘাটে যায়। রাজবাড়ী থেকে পদ্মা পার হতে চায় মানুষ। ইঞ্জিনের নৌকা আছে, লঞ্চ আছে, কিন্তু কিছু লোক এখনো ডিঙিতে পার হয়। সস্তা। আব্বাসের ডিঙিতে পার হলে জনপ্রতি বিশ টাকা। ইঞ্জিনের নৌকায় পঞ্চাশ।
আব্বাস বৈঠা টানে। পদ্মার স্রোত জোরে। শুকনো মৌসুমে কম, বর্ষায় প্রচণ্ড। বৈঠা টানতে টানতে আব্বাসের হাতের পেশি দড়ির মতো। পিঠে ঘাম চকচক করে। রোদ পড়ে পানিতে, পানি থেকে আলো ফিরে এসে আব্বাসের মুখে পড়ে। চোখ কুঁচকে তাকায় সে।
বৈঠা টানতে টানতে গান ধরে।
"সর্বনাশা পদ্মা নদী, তুই আমারে করলি কী?"
গলাটা ভাঙা। সুরে একটা ফাটল আছে, যেটা সুরকে আরো সত্য করে তোলে। পালিশ করা গলা না। নদীর ধারে বড় হওয়া গলা। বাতাসে, ঝড়ে, রোদে পোড়া গলা।
যাত্রীরা চুপ করে যায়। বৈঠার ছপছপ শব্দ আর আব্বাসের গান। পদ্মার ওপর এই দুটো শব্দ ছাড়া আর কিছু থাকে না।
২
ট্যুরিস্টরা আসে শীতকালে।
ঢাকা থেকে। বিদেশ থেকেও কখনো। তারা পদ্মার ওপর নৌকা ভ্রমণ চায়। আব্বাস নিয়ে যায়। এক ঘণ্টা। দুই ঘণ্টা। সূর্যাস্তের সময় সবচেয়ে চাহিদা। পদ্মার ওপর সূর্য ডোবে, আকাশ লাল হয়, পানি লাল হয়, আব্বাস গান ধরে।
পাঁচশো টাকা নেয় এক ঘণ্টার জন্য। ট্যুরিস্টরা মোবাইলে ভিডিও করে। ফেসবুকে দেয়। ক্যাপশন লেখে, "Authentic Bhatiali folk song on the Padma." আব্বাসের মুখ দেখা যায় ভিডিওতে। তার নাম দেখা যায় না।
একজন ট্যুরিস্ট জিজ্ঞেস করেছিল, "আপনি কি কোনো অ্যালবাম করেছেন?"
আব্বাস হেসেছিল। "অ্যালবাম? আমার অ্যালবাম পদ্মা নদী। প্রতিদিন বাজে।"
ট্যুরিস্ট বুঝল না। ভাবল রসিকতা। কিন্তু আব্বাস রসিকতা করেনি। সে সত্যি বলেছে। তার গান কোনো স্টুডিওতে রেকর্ড হয়নি। তার গান পদ্মার বাতাসে মেশে, পানিতে ভাসে, চরে ঠেকে ফিরে আসে। তারপর হারিয়ে যায়।
প্রতিটা গান একবারই গাওয়া হয়। একই গান, কিন্তু প্রতিবার একটু অন্যরকম। নদীর মেজাজ বদলায়, আব্বাসের গলাও বদলায়।
৩
নদী আব্বাসের ঘর খেয়েছে তিনবার।
প্রথমবার ২০০৪ সালে। চরভদ্রাসনে ছিল তার বাবার টিনের ঘর। পদ্মা ভাঙল। রাতে ভাঙল। ঘুমের মধ্যে শব্দ হলো, মাটি ভাঙার শব্দ, যেটা গর্জনের মতো। বাবা সবাইকে টেনে বের করল। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল ঘরটা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এক মিনিটে। মাটিসুদ্ধ। যেন মাটি কখনো ছিলই না।
দ্বিতীয়বার ২০১২ সালে। আব্বাস তখন বিয়ে করেছে। নিজে ঘর তুলেছে চরে। বাঁশের ঘর। আটকপালে ছিল। ঘর তোলার সাত মাসের মাথায় নদী ভাঙল। এবার ধীরে। প্রতিদিন একটু একটু করে। আব্বাস দেখতে পেল মাটি সরছে। পনেরো দিনে ঘর থেকে নদীর দূরত্ব একশো গজ থেকে দশ গজ হলো। আব্বাস ঘর খুলে সরিয়ে নিল। টিন, বাঁশ, কাঠ। কিন্তু মাটি সরাতে পারল না।
তৃতীয়বার ২০১৯ সালে। এবার পাকা ভিটায় ঘর করেছিল। সবাই বলেছিল এই জায়গা ভাঙবে না। ভাঙল।
আব্বাস বলে, "নদী আমার ঘর খেয়েছে। নদী আমাকে গান দিয়েছে। কোনটা বেশি দামি?"
কেউ উত্তর দেয় না। কারণ উত্তরটা কঠিন। ঘর ছাড়া মানুষ বাঁচে। গান ছাড়াও বাঁচে। কিন্তু আব্বাস কীভাবে বাঁচে সেটা অন্য প্রশ্ন।
৪
আব্বাসের বউ রেহানা বলে, "গান দিয়ে ছাদ হয় না।"
রেহানা ঠিক বলে। গান দিয়ে ছাদ হয় না, দেয়াল হয় না, রান্নাঘর হয় না। গান দিয়ে বাচ্চার স্কুলের বেতন দেওয়া যায় না। গান দিয়ে ওষুধ কেনা যায় না।
কিন্তু আব্বাস গান ছাড়া পারে না। সে বৈঠা টানলে গান আসে। গান না এলে বৈঠা ঠিকমতো চলে না। শরীরের ছন্দ আর গানের ছন্দ একসাথে কাজ করে। বৈঠা ওঠে, সুর ওঠে। বৈঠা পড়ে, সুর পড়ে।
রেহানা তিন সন্তানের মা। বড় ছেলে ঢাকায় গেছে গার্মেন্টসে কাজ করতে। মেয়ে বিয়ে হয়ে গেছে শরিয়তপুরে। ছোট ছেলে এখনো আব্বাসের সাথে থাকে। সেও নৌকা চালায়। কিন্তু সে গান গায় না।
আব্বাস ছোট ছেলেকে বলে, "গান শেখ।"
ছেলে বলে, "গান শিখে কী হবে? মোবাইলে সবাই গান শোনে এখন। নৌকায় কে শোনে?"
আব্বাস চুপ করে যায়। ছেলে ঠিক বলেছে। মোবাইল এসেছে। ব্লুটুথ স্পিকার এসেছে। ট্যুরিস্টরাও নৌকায় নিজেদের গান বাজায় কখনো। আব্বাসের গান তখন চুপ করে থাকে।
৫
বর্ষাকালে পদ্মা রাগী হয়।
পানি ওঠে। স্রোত তীব্র। ঘোলা পানি, যেটা তাকালে কিছু দেখা যায় না। পানির নিচে কী আছে কেউ জানে না। গাছের গুঁড়ি, ডুবে যাওয়া ঘরের টিন, মরা গরু। সবকিছু ভেসে যায়।
বর্ষায় আব্বাস নৌকা চালায় না। বিপজ্জনক। একবার চালিয়েছিল, নৌকা উলটেছিল। সাঁতরে উঠেছিল কোনোমতে। তারপর থেকে বর্ষায় নৌকা বাঁধা থাকে।
কিন্তু আব্বাস নদীর ধারে যায়।
সে বসে ঘাটে। পা ঝুলিয়ে। পদ্মা তার পায়ের কাছ দিয়ে ছুটে যায়। আব্বাস গান ধরে। কাউকে শোনানোর জন্য না। নদীকে শোনানোর জন্য।
"ও পদ্মা, তুই কোথায় যাস? সাগরে গিয়ে কী পাবি? আমিও তো কোথাও যেতে পারি না।"
এই গান কেউ শোনে না। ঘাটে কেউ নেই বর্ষায়। মাছ ধরার লোকও নেই। শুধু আব্বাস আর পদ্মা। দুজনে মুখোমুখি।
কেউ পয়সা দেয় না এই গানের জন্য। আব্বাস পয়সা চায়ও না। কিছু গান বিক্রির জন্য না। কিছু গান নদীর পাওনা।
৬
শুকনো মৌসুমে পদ্মা শুকায়।
চর জেগে ওঠে। বালি। ধূসর বালি। যেখানে তিন মাস আগে পানি ছিল, সেখানে এখন বাচ্চারা ক্রিকেট খেলে। আব্বাস শুকনো নদীর দিকে তাকায়। তার চোখে একটা ব্যথা থাকে, যেটা সে কাউকে দেখায় না।
"পদ্মা শুকালে আমার গলাও শুকায়।"
এটা সত্য। শুকনো মৌসুমে আব্বাসের গলা অন্যরকম। শুষ্ক। ভারী। যেন গলার ভেতরেও বালি।
এই মৌসুমে আয় কম। নৌকা চলে, কিন্তু যাত্রী কম। মানুষ হেঁটে পার হয় চর দিয়ে। নৌকার দরকার হয় না। ট্যুরিস্টও আসে কম। শুকনো পদ্মায় ছবি তুলে কী হবে?
আব্বাস তখন অন্য কাজ খোঁজে। মাছ ধরে জাল দিয়ে। চরে কাশফুল কাটে, শহরে বিক্রি করে। কখনো দিনমজুরি করে পাশের গ্রামে।
কিন্তু সন্ধ্যায় ঘাটে ফেরে। বসে। গান ধরে। পদ্মা শুকনো হলেও শোনে। আব্বাস বিশ্বাস করে নদী শোনে।
৭
একবার একটা টেলিভিশনের লোক এসেছিল।
"ভাটিয়ালি গানের তথ্যচিত্র বানাচ্ছি। আপনি কি গাইবেন ক্যামেরার সামনে?"
আব্বাস গাইল। তিনটা গান। একটা ভাটিয়ালি, একটা সারি, একটা নিজের লেখা। ক্যামেরাম্যান বলল, "চমৎকার।" পরিচালক বলল, "অসাধারণ।"
পাঁচশো টাকা দিল। আব্বাস নিল। তথ্যচিত্রটা প্রচার হলো টেলিভিশনে। আব্বাসের নাম এসেছিল স্ক্রিনে, তিন সেকেন্ড। তারপর অন্য মাঝির কাটে গেল।
পরিচালক পুরস্কার পেলেন। "গ্রামীণ সংস্কৃতির অনন্য দলিল" বলে সংবাদপত্রে লেখা হলো। আব্বাসের কথা লেখা হলো না।
আব্বাস টেলিভিশন দেখেনি। তার টেলিভিশন নেই। পাড়ার দোকানে দেখল কেউ কেউ। বলল, "আব্বাস ভাই, তোমারে টিভিতে দেখলাম।" আব্বাস হাসল। হাসিটা বৈঠা টানার ফাঁকে এসে আবার চলে গেল।
৮
আব্বাসের বয়স পঞ্চান্ন।
শরীরে ব্যথা। কোমরে, হাঁটুতে, কাঁধে। বৈঠা টানতে টানতে শরীর ক্ষয়ে গেছে। ডান কাঁধ বাঁ কাঁধের চেয়ে নিচু, কারণ ডান হাতে বেশি টানে। হাঁটুতে পানি জমে, বিশেষ করে বর্ষায়। কোমর সোজা হয় না পুরোপুরি, সামনে ঝুঁকে থাকে সবসময়, যেন এখনো বৈঠা ধরে আছে।
আর কতদিন নৌকা চালাবে? আব্বাস জানে না। যতদিন শরীর চলে। তারপর?
তারপর কিছু নেই। পেনশন নেই। সঞ্চয় নেই। জমি নেই, নদী খেয়েছে। ঘর আছে, ধার করা জায়গায়। বড় ছেলে মাসে দুই হাজার পাঠায়, কখনো পাঠায় না।
আব্বাস ভাবে না এসব। ভাবলে গান আসে না। গান না এলে বৈঠা চলে না। বৈঠা না চললে নৌকা চলে না। তাই আব্বাস ভাবে না।
৯
আজ সন্ধ্যায় আব্বাস ঘাটে বসে আছে।
পদ্মা শান্ত। জোয়ার-ভাটার মাঝখানে। পানি স্থির, কিন্তু গভীর। আকাশে মেঘ নেই। তারা ফুটছে একটা একটা করে। পশ্চিমে সূর্যের শেষ আভা কমলা থেকে বেগুনি হচ্ছে।
আব্বাস গান ধরে। আস্তে। নিজের জন্য।
"আমি নদীর কাছে শিখেছি, ঘর বানাও কিন্তু ধরে রেখো না। নদী বলে, যা যাবে তা যাবেই। তুমি শুধু গাও।"
এই গান কোনো বইয়ে নেই। কোনো রেকর্ডে নেই। আব্বাস এইমাত্র বানাল। আগামীকাল সে এই গান ভুলে যাবে। নতুন গান আসবে। পদ্মা নতুন সুর দেবে।
নদী ঘর খায়। নদী গান দেয়। আব্বাস দুটোই নেয়। অভিযোগ করে না। অভিযোগ করলে নদী শোনে না। নদী কারো কথা শোনে না। নদী শুধু চলে। আব্বাসও চলে।
পদ্মার ওপর অন্ধকার নামে। আব্বাসের গলা অন্ধকারে মেশে। কে গাইছে আর বোঝা যায় না। নদী নাকি মানুষ।
হয়তো দুজনেই।