পানের বরজ চাষি

আমি ৫০ পাই। ঢাকা ১৫০ পায়। মাঝখানে কে খায়?

পর্ব ৯৩ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

হামিদার দিন শুরু হয় ভোর চারটায়।

বরজে যেতে হয়। পানগাছ অপেক্ষা করে না। পানগাছের ধৈর্য নেই। একদিন পানি না দিলে পাতা নেতিয়ে পড়ে। দুদিন না দিলে হলদে হয়। তিনদিন না দিলে মরে। পানগাছ শিশুর মতো। প্রতিটা দিন দেখভাল চাই।

হামিদা বরিশালের বানারীপাড়ায় থাকে। তার বরজ পঞ্চাশ শতক। এটুকু জায়গায় পানগাছ আছে প্রায় চার হাজার। সারি সারি। বাঁশের মাচায় গাছ উঠেছে। ওপরে ছাউনি, তালপাতা আর খড় দিয়ে। রোদ সরাসরি পড়লে পানগাছ মরে। ছায়া চাই। আর্দ্রতা চাই। বাতাস চাই, কিন্তু বেশি না।

পানের বরজ বানানো সহজ না। প্রথমে মাটি তৈরি। তারপর বাঁশের খুঁটি। তারপর মাচা। তারপর ছাউনি। তারপর চারা রোপণ। তারপর প্রতিদিন পানি, সার, পরিচর্যা। ছয় মাসে প্রথম পাতা পাওয়া যায়। পুরো ফলন পেতে এক বছর।

হামিদা বলে, "পানের বরজ বানানো সন্তান মানুষ করার মতো। প্রতিদিন দেখভাল। একদিন না দেখলে মরে যায়।"

হামিদার স্বামী জালাল মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। হার্ট অ্যাটাক। বরজে কাজ করতে করতে। বুকে হাত দিয়ে বসে পড়েছিল। হামিদা ছুটে গিয়েছিল। জালাল কিছু বলতে পারেনি। চোখ খোলা ছিল। হামিদার দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর তাকানো থেমে গেল।

হাসপাতাল দূরে। বানারীপাড়া থেকে বরিশাল শহর ঘণ্টাখানেক। অ্যাম্বুলেন্স নেই। ভ্যানে করে নিয়ে গিয়েছিল। পৌঁছতেই ডাক্তার বলল, "নিয়ে আসেন কেন? এখানে কিছু হবে না।"

জালালের মৃত্যুর পর সবাই বলেছিল, "বরজ বিক্রি করে দাও। মেয়েমানুষের কর্ম না।"

হামিদা বিক্রি করেনি। সে জানে বরজ ছাড়া তার কিছু নেই। দুই মেয়ে আছে। বড় মেয়ে সুমি, বিয়ে হয়ে গেছে, স্বামী অটোচালক। ছোট মেয়ে তানিয়া, ক্লাস নাইন। তানিয়ার পড়ার খরচ, বরজ থেকে আসে।

হামিদা একা বরজ সামলায়। ভোর থেকে সন্ধ্যা। তিনশো পঁয়ষট্টি দিন। কোনো ছুটি নেই। পানগাছ ছুটি দেয় না।

সকালে পানি দেয়।

কুয়ো থেকে পানি তোলে বালতিতে। প্রতিটা গাছের গোড়ায় দেয়। চার হাজার গাছ। এক বালতিতে দশ গাছ। চারশো বালতি। হামিদার হাতে দড়ির দাগ আছে, কুয়ো থেকে বালতি টানতে টানতে। আঙুলে, তালুতে, কবজিতে।

পানি দেওয়ার পর সার। সরিষার খৈল। গাছের গোড়ায়, অল্প অল্প। বেশি দিলে গাছ পুড়ে যায়।

তারপর পাতা তোলা। যে পাতা পেকেছে, সেটা তুলতে হয়। পাকা পাতা বেশিক্ষণ রাখলে শক্ত হয়ে যায়, দাম কমে। হামিদা গাছে গাছে যায়। প্রতিটা পাতা হাতে ধরে দেখে, ঠিক রং হয়েছে কিনা। গাঢ় সবুজ, চকচকে, একটু পুরু। এটাই আদর্শ পান।

পাতা তোলে আস্তে। ছিঁড়ে গেলে দাম নেই। একটা একটা করে তোলে। পাটের দড়ি দিয়ে বিড়া বাঁধে। এক বিড়ায় আশিটা পাতা।

দিনে দশ-বারো বিড়া হয়।

ফড়িয়া আসে বিকালে।

মোটরসাইকেলে। বরিশাল শহর থেকে। বরজে বরজে যায়। পান কেনে।

"বিড়া কত?"

"পঞ্চাশ।"

ফড়িয়া মুখ বাঁকায়। "চল্লিশ দেব।"

হামিদা জানে ঢাকায় এই পান বিড়া একশো পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি হয়। সে পায় পঞ্চাশ, কখনো চল্লিশ। মাঝখানে ফড়িয়া, আড়তদার, পাইকার। তিন স্তর। প্রতিটা স্তরে দাম বাড়ে। চাষি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দাম তিনগুণ হয়।

"আমি ৫০ পাই। ঢাকা ১৫০ পায়। মাঝখানে কে খায়?"

হামিদা জানে কে খায়। কিন্তু কিছু করতে পারে না। সে নিজে ঢাকায় পান পাঠাতে পারে না। পরিবহন লাগে, পরিচিতি লাগে, ঢাকার বাজারে ঢোকার ক্ষমতা লাগে। হামিদার এসব নেই। তার আছে বরজ, হাত, আর ধৈর্য।

ফড়িয়া চল্লিশে নেয়। দশ বিড়া। চারশো টাকা। এটাই আজকের আয়।

সারের খরচ, বাঁশের খরচ, ছাউনির খরচ, শ্রমিক লাগালে মজুরি। সব বাদ দিলে হামিদার দিনে হাতে থাকে দুইশো-আড়াইশো টাকা। যখন সবকিছু ঠিক থাকে।

সবকিছু ঠিক থাকে না।

ঘূর্ণিঝড় মোখা। ২০২৩।

হামিদা আকাশের দিকে তাকিয়েছিল সেদিন সকালে। মেঘ ছিল অন্যরকম। ভারী, নিচু, ধূসর-কালো। বাতাসে একটা গন্ধ ছিল, ভেজা মাটির গন্ধ, কিন্তু তার মধ্যে লবণ। সমুদ্রের দিক থেকে বাতাস আসছিল।

হামিদা জানত ঝড় আসবে। রেডিওতে বলেছে। কিন্তু বরজকে কোথায় নিয়ে যাবে? বরজ তো ঘরের মতো ভাঁজ করে রাখা যায় না। চার হাজার গাছ মাটিতে গাঁথা। ছাউনি বাঁশে বাঁধা। সবকিছু খোলা। সবকিছু ঝড়ের মুখে।

হামিদা ছাউনি শক্ত করল দড়ি দিয়ে। অতিরিক্ত বাঁশ লাগাল। জানত কাজ হবে না। তবু করল। কারণ কিছু না করে বসে থাকা আরো কঠিন।

রাতে ঝড় এল।

বাতাস। বৃষ্টি না, বাতাস। বাতাস এমন জোরে এল যে টিনের চাল কেঁপে উঠল। হামিদা ঘরে বসে শুনতে পেল বরজের বাঁশ ভাঙার শব্দ। কড়কড় করে। একটা একটা করে। সে চোখ বুজে বসে রইল। অন্ধকারে। বৃষ্টির শব্দে। বাঁশ ভাঙার শব্দে।

সকালে বের হলো।

বরজ নেই। ছাউনি উড়ে গেছে। বাঁশ ভেঙে পড়েছে। পানগাছ মাটিতে শুয়ে আছে, শিকড় ওপরে। যেন কেউ চার হাজার গাছ একসাথে উপড়ে ফেলেছে।

হামিদা দাঁড়িয়ে রইল। কাঁদেনি। কান্নার শক্তি ছিল না। শুধু দাঁড়িয়ে দেখল। এক বছরের পরিশ্রম, দশ মিনিটের বাতাসে।

পুনর্নির্মাণ।

হামিদা ধার করল ত্রিশ হাজার টাকা। মহিলা সমিতি থেকে। সুদ দশ শতাংশ। বছরে।

বাঁশ কিনল। ছাউনি বানাল। নতুন চারা লাগাল। প্রতিদিন সকালে বরজে গেল। পানি দিল। সার দিল। দেখভাল করল। একটা একটা করে গাছ বড় হলো। ছয় মাসে প্রথম পাতা।

হামিদা বলে, "বরজ ভাঙলে আবার বানাই। নদী ভাঙলে মানুষ আবার ঘর তোলে। আমরা এভাবেই বাঁচি। ভেঙে যাই, আবার বানাই।"

কিন্তু হামিদা জানে প্রতিবার ভাঙলে কিছু একটা কমে। টাকা কমে। শক্তি কমে। আশা কমে। প্রথমবার বরজ বানিয়েছিল জালালের সাথে। দ্বিতীয়বার একা। তৃতীয়বার ধারের টাকায়। চতুর্থবার?

চতুর্থবার আর পারবে কিনা হামিদা জানে না।

বরজে একটা জীবন আছে।

সকালে কুয়াশা থাকলে পানপাতায় জল জমে। ছোট ছোট বিন্দু। সূর্যের আলো পড়লে ঝকঝক করে। হামিদা এটা দেখে। প্রতিদিন দেখে। সুন্দর লাগে, কিন্তু সে "সুন্দর" বলে না। সে বলে, "পানি পড়েছে, আজ কম দিতে হবে।"

বরজে পোকা আসে। মাকড়সা আসে। ব্যাঙ আসে। হামিদা মাকড়সা মারে না। মাকড়সা পোকা খায়। পোকা পানপাতা খায়। তাই মাকড়সা হামিদার বন্ধু।

পানপাতায় একটা সুগন্ধ আছে। তীব্র। বরজে ঢুকলে নাকে লাগে। হামিদা এই গন্ধে এত অভ্যস্ত যে সে আর চেনে না। অন্যরা বলে, "বরজে গেলে মাথা ঘোরে গন্ধে।" হামিদা অবাক হয়। তার তো ঘোরে না।

বরজ হামিদার সংসার। জালাল নেই, কিন্তু বরজ আছে। চার হাজার গাছ তার সন্তানের মতো। প্রতিটার চেহারা সে চেনে। কোনটা সুস্থ, কোনটা অসুস্থ, কোনটায় ফলন ভালো, কোনটায় কম। চোখ দিয়েই বুঝতে পারে।

তানিয়া বলে, "আম্মা, আমি পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করব। তোমাকে আর বরজে খাটতে হবে না।"

হামিদা হাসে। হাসিটা বিশ্বাসের না। হাসিটা ভালোবাসার। মেয়ে ভালো কথা বলেছে। কিন্তু হামিদা জানে বাস্তব। তানিয়ার পড়ার খরচই চলে কোনোরকমে। কলেজে যেতে পারবে কিনা নিশ্চিত না। চাকরি আরো দূরের কথা।

হামিদা বলে, "পড়ো। যতদূর পারো পড়ো।"

কিন্তু মনে মনে হিসাব করে। কলেজে ভর্তি হলে মাসে দুই হাজার লাগবে। বই, খাতা, যাতায়াত। বরজ থেকে মাসে ছয়-সাত হাজার আসে। সংসার চালাতে পাঁচ হাজার যায়। বাকি দুই হাজার। ঋণের কিস্তি দিলে কিছু থাকে না।

হামিদা ঘুমানোর আগে হিসাব করে। প্রতিরাতে। সংখ্যাগুলো একই থাকে। কমে না, বাড়ে না। শুধু ঘোরে। চক্রের মতো।

আজ বিকালে হামিদা বরজে বসে আছে।

পান তুলেছে। বিড়া বেঁধেছে। ফড়িয়া আসেনি এখনো। অপেক্ষা।

বরজের ভেতরে ছায়া। বাইরে রোদ। ভেতরে আলো-আঁধারি। বাঁশের ফাঁক দিয়ে রোদের রেখা ঢোকে। পানপাতায় পড়ে। সবুজ পাতা সোনালি হয়ে যায় সেই রোদে।

হামিদা একটা পান তুলে মুখে দেয়। চুন, সুপারি ছাড়া। শুধু পান। কাঁচা পানের স্বাদ, তেতো-ঝাল, জিভে লাগে। সে চিবায় ধীরে।

এই পান সে ফড়িয়াকে বিক্রি করবে না। এটা তার নিজের। চার হাজার গাছের মধ্যে একটা পাতা তার। বাকি সব বাজারের, ফড়িয়ার, আড়তদারের, ঢাকার।

একটা পাতা হামিদার।

সে চিবায়। থুতু ফেলে মাটিতে। লাল। পানের লাল রস মাটিতে পড়ে। মাটি শুষে নেয়।

হামিদা বরজের দিকে তাকায়। চার হাজার গাছ তার দিকে তাকায়। কেউ কিছু বলে না। বলার কিছু নেই।

আগামীকাল ভোর চারটায় আবার আসবে। পানি দেবে। সার দেবে। পাতা তুলবে। ফড়িয়া আসবে। চল্লিশ কি পঞ্চাশ টাকা বিড়া দেবে।

ঝড় আসবে কি আসবে না সেটা হামিদা জানে না। সে শুধু জানে বরজ আছে। বরজ থাকলে হামিদা আছে। বরজ ভাঙলে হামিদা আবার বানাবে।

যতক্ষণ হাত চলে।