মাটি কাটা শ্রমিক

মাটি খুঁড়ে মাটিতেই যাবো। আমি আর মাটি একই জিনিস।

পর্ব ৯৪ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সোনা মিয়া মাটি কাটে।

এটাই তার কাজ। এটাই তার পরিচয়। লোকে জিজ্ঞেস করে, "কী করেন?" সোনা মিয়া বলে, "মাটি কাটি।" এর বেশি কিছু বলার নেই। মাটি কাটে, মাটি সরায়, মাটি ফেলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা। কোদাল আর শরীর। এই দুটোই তার হাতিয়ার।

কিশোরগঞ্জ থেকে এসেছে। গ্রামে জমি নেই। বাবারও ছিল না। দাদারও। তিন পুরুষ ধরে ভূমিহীন। ভূমিহীনদের কাজ কী? যাদের জমি আছে তাদের জমিতে খাটা। অথবা মাটি কাটা। সোনা মিয়া মাটি কাটা বেছে নিল। কারণ মাটি কাটায় কারো জমিতে বাঁধা থাকতে হয় না। যেখানে কাজ, সেখানে যাও। কাজ শেষ, অন্য জায়গায়।

আজ সে সিরাজগঞ্জে আছে। একটা পুকুর খনন হচ্ছে। সরকারি প্রকল্প। কাবিখা। পুকুর কেটে দেবে, গ্রামের মানুষ মাছ চাষ করবে। সোনা মিয়া কাটছে। তার সাথে আরো পনেরো জন। সবাই মাটি কাটা শ্রমিক। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা।

কোদাল মাটিতে ঢোকে। সোনা মিয়া হ্যান্ডেলে চাপ দেয়। মাটি ওঠে। ভারী, ভেজা মাটি। কোদালের ওপর ভারসাম্য রেখে তোলে। ঝুড়িতে ফেলে। ঝুড়ি ভরলে মাথায় নিয়ে হাঁটে। পুকুরের পাড়ে ফেলে।

প্রতিটা ঝুড়ি প্রায় ত্রিশ কেজি। দিনে দুইশো ঝুড়ি। ছয় হাজার কেজি মাটি। ছয় টন।

একজন মানুষ দিনে ছয় টন মাটি সরায়। বিনিময়ে পায় আড়াইশো টাকা।

সোনা মিয়ার শরীর তার জীবনবৃত্তান্ত।

পিঠে পেশি আছে যেগুলো সাধারণ মানুষের থাকে না। কোদাল চালাতে চালাতে পিঠের পেশি দড়ির মতো শক্ত হয়ে গেছে। হাতের তালু চামড়ার মতো মোটা, কোদালের বাঁটে ঘষে ঘষে। হাঁটু ফোলা, ক্রমাগত উঠবস করতে করতে। কোমর সোজা করতে কষ্ট হয়, সামনে ঝুঁকে কাজ করে বলে।

বয়স পঁয়তাল্লিশ। দেখতে ষাটের মতো। রোদে পোড়া মুখ, কুঁচকানো চামড়া, চোখের কোণে গভীর দাগ। দাঁত কয়েকটা নেই। চুলে পাক ধরেছে, কিন্তু মাটির ধুলোয় সব এক রং হয়ে যায়।

সোনা মিয়া ত্রিশ বছর ধরে মাটি কাটছে। পনেরো বছর বয়সে শুরু। বাবার সাথে। বাবা মারা গেছে দশ বছর আগে। মাটি কাটতে কাটতেই মারা গেছে। হার্ট অ্যাটাক না, শরীর ক্ষয়ে গেছে। একদিন সকালে কোদাল তুলতে পারেনি। শুয়ে পড়ল। আর ওঠেনি।

সোনা মিয়া জানে সে একদিন তার বাবার মতো শুয়ে পড়বে। কোদাল তুলতে পারবে না। সেদিন পর্যন্ত কাটবে।

সোনা মিয়া শুধু পুকুর কাটেনি জীবনে।

রাস্তা কেটেছে। বাঁধ কেটেছে। ভবনের ভিত কেটেছে। নালা কেটেছে। কবরও কেটেছে।

কবর কাটা সবচেয়ে কম পরিশ্রমের কাজ। ছয় ফুট লম্বা, তিন ফুট চওড়া, পাঁচ ফুট গভীর। এক ঘণ্টার কাজ। পাঁচশো টাকা পায়। কিন্তু সোনা মিয়া কবর কাটতে পছন্দ করে না। মাটির গন্ধ অন্যরকম কবরে। ভেজা, ঠান্ডা, যেন মাটি জানে কী আসছে।

"মাটি খুঁড়ে মাটিতেই যাবো। আমি আর মাটি একই জিনিস।"

সোনা মিয়া এটা দার্শনিক কথা হিসেবে বলে না। সে আক্ষরিক অর্থে বলে। তার শরীরে মাটি আছে। নখের নিচে, চুলের গোড়ায়, কানের ভাঁজে, নাকের ভেতরে। সন্ধ্যায় গোসল করলেও সকালে আবার মাটি। মাটি তার শরীর ছাড়ে না।

বর্ষাকালে কাজ নেই।

মাটি ভেজা। কোদাল দিলে মাটি লেগে থাকে কোদালে। ঝুড়িতে রাখলে গড়িয়ে পড়ে। পুকুর কাটা যায় না, রাস্তা কাটা যায় না। বাঁধ মেরামতের কাজ থাকে কখনো, কিন্তু সেটা জরুরি কাজ, ঠিকাদাররা মেশিন আনে তখন।

চার মাস বর্ষা। চার মাস সোনা মিয়া বেকার।

গ্রামে ফিরে যায়। বউ জরিনা আর তিন ছেলেমেয়ের কাছে। জরিনা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। ধান ভানে, গরু চরায়, ঘর ঝাড়ু দেয়। মাসে দুই হাজার টাকা। বর্ষায় এটাই সংসারের একমাত্র আয়।

সোনা মিয়া বর্ষায় ঘরে বসে থাকে। বসে থাকতে তার কষ্ট হয়। শরীর অভ্যস্ত কাজে। হাত কোদাল খোঁজে। কিন্তু কোদাল কোণে রাখা থাকে, মরচে ধরে।

কখনো বাড়ির পেছনে মাটি কাটে। কোনো কারণ ছাড়া। শুধু হাত চালু রাখতে।

জরিনা বলে, "কী করো? কেন খুঁড়ো?"

সোনা মিয়া বলে, "অভ্যাস।"

শুকনো মৌসুমে শরীর ভাঙে।

অক্টোবর থেকে মে। আট মাস কাজ। প্রতিদিন। রবিবার নেই, শুক্রবার নেই। কাজ থাকলে কাজ। না থাকলে হাঁটা, অন্য জেলায়, অন্য প্রকল্পে।

সোনা মিয়া এই আট মাসে বাড়ি থেকে দূরে থাকে। ঠিকাদার যেখানে নিয়ে যায়, সেখানে। থাকে প্রকল্পের পাশে। ত্রিপলের নিচে। খায় সস্তা ভাত-ডাল। ঘুমায় মাটিতে, চাটাই পেতে।

সকালে সূর্য ওঠার আগে কাজ শুরু। দুপুরে এক ঘণ্টা বিশ্রাম। তারপর আবার। সন্ধ্যা পর্যন্ত। দশ-বারো ঘণ্টা। কোদাল চালায়, মাটি তোলে, ঝুড়ি বহন করে।

রোদে মাথা ঘোরে। পানি খায় পুকুরের, নলকূপের, যা পায়। কখনো ডায়রিয়া হয়। কখনো চোখ লাল হয়ে ফুলে ওঠে, ধুলোয়। কখনো কোদাল পায়ে পড়ে, কেটে যায়।

চিকিৎসা? ফার্মেসি। গ্রামের ফার্মেসি। "ব্যথার ওষুধ দেন।" দশ টাকার ট্যাবলেট খায়। কাজে ফেরে।

শরীর যন্ত্র। যন্ত্র চললে কাজ হয়। যন্ত্র বন্ধ হলে কাজ বন্ধ। কাজ বন্ধ হলে ভাত বন্ধ। তাই যন্ত্র চালাতে হয়।

একদিন জেসিবি এল।

হলুদ রঙের। বিশাল। লোহার হাত। লোহার দাঁত। মাটিতে দাঁত বসাল। এক কামড়ে যে পরিমাণ মাটি তুলল, সোনা মিয়া সেটা তুলতে এক ঘণ্টা লাগত।

সোনা মিয়া আর তার সাথীরা দাঁড়িয়ে দেখল। কেউ কথা বলল না। জেসিবি এক ঘণ্টায় যা করল, বিশ জন মানুষের একদিন লাগত। ঠিকাদার জেসিবির জন্য দিনে পাঁচ হাজার টাকা দেয়। বিশ জন শ্রমিকের মজুরি পাঁচ হাজার। একই দাম। কিন্তু জেসিবি বিশ গুণ বেশি কাজ করে।

হিসাব সহজ। ঠিকাদার জেসিবি আনবে।

সোনা মিয়া বলল, "মেশিন এসেছে। আমাদের দরকার ফুরিয়েছে।"

তার সাথীরা চুপ। কেউ কেউ কোদাল কাঁধে নিয়ে চলে গেল। কেউ বসে রইল। কোথায় যাবে?

সোনা মিয়া চলে গেল না। সে দাঁড়িয়ে দেখল জেসিবি কাজ করছে। লোহার হাত উঠছে, নামছে। মাটি উঠছে, পড়ছে। ইঞ্জিনের গর্জন। ডিজেলের গন্ধ। ধুলো।

সোনা মিয়া ভাবল, ত্রিশ বছর ধরে সে যা করেছে, একটা মেশিন সেটা এক ঘণ্টায় করে। তার ত্রিশ বছরের মূল্য কত?

কিন্তু জেসিবি সব জায়গায় যেতে পারে না।

সরু গলি। ঘরের পাশ। গাছের তলা। পুরনো কবরস্থানের পাশের নালা। মসজিদের ভিত। এসব জায়গায় জেসিবি ঢুকতে পারে না। চওড়া, ভারী, লোহার চাকা মাটি দাবিয়ে দেয়। সূক্ষ্ম কাজ পারে না।

সেখানে সোনা মিয়া যায়।

"যেখানে মেশিন ঢুকতে পারে না, সেখানে আমি ঢুকি। সেটাই আমার দাম।"

এটা সান্ত্বনা না। এটা বাস্তবতা। মেশিন বড় কাজ নিয়ে গেছে। ছোট কাজ বাকি আছে। ছোট কাজে দাম কম। দুইশো টাকা, দেড়শো টাকা। কিন্তু কাজ আছে।

সোনা মিয়া এখন ছোট কাজ করে। কারো বাড়ির উঠোন সমতল করে দেয়। কারো পুকুরের পাড় ঠিক করে। কারো কবর খোঁড়ে। কারো নালা পরিষ্কার করে।

বড় প্রকল্প তার জন্য নেই আর। সেগুলো মেশিনের।

সোনা মিয়া আর মেশিনের মধ্যে পার্থক্য একটাই। মেশিন ভাঙলে মেরামত করা যায়। সোনা মিয়া ভাঙলে কেউ মেরামত করে না।

রাতে সোনা মিয়া ত্রিপলের নিচে শোয়।

পাশে অন্য শ্রমিকরা। কেউ নাক ডাকে, কেউ কাশে। মশা আছে। সোনা মিয়া গামছা মুখে দিয়ে শোয়। শরীরে ব্যথা। সারা শরীরে। কিন্তু ব্যথা এত পুরনো যে সে আর আলাদা করে টের পায় না। ব্যথা শরীরের অংশ হয়ে গেছে।

সে ভাবে জরিনার কথা। ছেলেমেয়েদের কথা। বড় ছেলে ফারুক, বয়স বিশ। সেও মাটি কাটে, অন্য জেলায়। সোনা মিয়া চেয়েছিল ফারুক অন্য কিছু করুক। কিন্তু কী করবে? পড়ালেখা নেই। দক্ষতা নেই। কোদাল চালানো ছাড়া কিছু জানে না।

মেজো মেয়ে রুবি, বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ছেলে সাগর, ক্লাস সেভেন। সোনা মিয়া চায় সাগর পড়ুক। অন্তত দশম শ্রেণি পর্যন্ত। তাহলে অন্য কোনো কাজ পাবে। দোকানে বসতে পারবে। অফিসে পিয়ন হতে পারবে। মাটি কাটতে হবে না।

কিন্তু সাগরের পড়ার খরচ চলে কোনোমতে। বইয়ের টাকা নেই। প্রাইভেট টিউটরের টাকা নেই। সাগর ক্লাসে ফেল করলে সোনা মিয়া কিছু বলে না। সে জানে ফেলের কারণ বুদ্ধির অভাব না। সুযোগের অভাব।

আজ সোনা মিয়া একটা নালা কাটছে।

সিরাজগঞ্জ শহরের ভেতরে। দুটো বাড়ির মাঝখান দিয়ে নালা যাবে। বর্ষার পানি নামার জন্য। জেসিবি ঢুকতে পারে না। দুই ফুট চওড়া জায়গা। সোনা মিয়া ঢুকেছে। কোদাল চালাচ্ছে। মাটি তুলছে বালতিতে। বালতি ওপরে তুলে দিচ্ছে।

গরম। দুই বাড়ির দেয়ালের মাঝখানে বাতাস ঢোকে না। ঘাম ঝরে। চোখে ঘাম পড়ে, চোখ জ্বালা করে। গামছা দিয়ে মুখ মোছে। আবার কোদাল চালায়।

বাড়ির মালিক বারান্দা থেকে দেখছে। চা খাচ্ছে। ফোনে কথা বলছে। কখনো সোনা মিয়ার দিকে তাকায়, কখনো তাকায় না।

সোনা মিয়া তাকায় না ওপরে। সে মাটির দিকে তাকায়। মাটিই তার পৃথিবী। মাটির রং দেখে বোঝে কতটুকু গভীর হয়েছে। কালো মাটি মানে উপরিভাগ। লাল মাটি মানে গভীর। এঁটেল মাটি কঠিন, কোদালে জোর লাগে। বেলে মাটি সহজ, কিন্তু গড়িয়ে পড়ে।

সোনা মিয়া মাটি চেনে। মাটি তাকে চেনে।

সন্ধ্যায় কাজ শেষ। বাড়ির মালিক তিনশো টাকা দেয়। সোনা মিয়া টাকাটা গোঁজে কোমরে।

সে হাঁটে। কোদাল কাঁধে। পায়ে মাটি। জামায় মাটি। চুলে মাটি। সে নিজেই মাটি।

হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, মেশিন আর কতদিন পর তার এই ছোট কাজগুলোও নিয়ে নেবে? ছোট মেশিন আসবে, সরু জায়গায় ঢুকতে পারে এমন মেশিন।

সেদিন সোনা মিয়া কী করবে?

সে জানে না। মাটি জানে না। কোদাল জানে না। শুধু জানে যতক্ষণ হাত চলে, মাটি কাটবে। তারপর মাটিতে যাবে। শেষ।