ম্যানহোল পরিষ্কারক

যেখানে কেউ যেতে চায় না, সেখানে আমি যাই।

পর্ব ৯৫ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

রঞ্জিত নামে সকালে।

ম্যানহোলের ঢাকনা খোলে। লোহার ঢাকনা, ভারী। দুজনে মিলে সরায়। ভেতর থেকে একটা গন্ধ ওঠে। পচা। মিথেন। হাইড্রোজেন সালফাইড। রঞ্জিত রসায়নের নাম জানে না। সে জানে এই গন্ধ। এই গন্ধ মৃত্যুর গন্ধ।

একটা গামছা নাকে-মুখে বাঁধে। এটাই তার মাস্ক। এটাই তার সুরক্ষা। অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই। গ্যাস ডিটেক্টর নেই। হার্নেস নেই। দড়ি আছে, সেটাও নিজের কেনা। কোমরে বাঁধে। ওপরে একজন দাঁড়িয়ে থাকে দড়ি ধরে। টান দিলে বুঝবে টেনে তুলতে হবে।

রঞ্জিত নামে। সিঁড়ি আছে, লোহার, মরচে ধরা। কখনো ধাপ ভাঙা। পা ফসকায়। কিন্তু রঞ্জিত ফসকায় না। পনেরো বছরের অভিজ্ঞতা। শরীর জানে কোথায় পা দিতে হবে।

নিচে অন্ধকার। চোখ অভ্যস্ত হতে কয়েক মিনিট লাগে। তারপর দেখে। পাইপ। নোংরা পানি। মানুষের মল। প্লাস্টিক। কাপড়ের টুকরো। মরা ইঁদুর। সব মিলে একটা স্তর তৈরি হয়েছে পাইপের মুখে। এটা পরিষ্কার করতে হবে।

রঞ্জিত হাত ঢোকায়। খালি হাতে। গ্লাভস নেই। আঙুল দিয়ে জমাট বাঁধা ময়লা ভাঙে। টানে। বালতিতে ভরে। বালতি ওপরে পাঠায় দড়িতে বেঁধে।

রঞ্জিত দলিত।

এই শব্দটা সে নিজে ব্যবহার করে না। অন্যরা করে। তার বাবা ম্যানহোল পরিষ্কার করত। তার দাদাও। পরিবারের পেশা। বংশ পরম্পরায়।

কেউ জিজ্ঞেস করেনি রঞ্জিত ম্যানহোল পরিষ্কার করতে চায় কিনা। পেশা বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। যখন বাবা মারা গেল, রঞ্জিতের বয়স ষোলো। পরিবারে আয় নেই। মা বলল, "তোর বাপ যা করত, সেটা কর।" রঞ্জিত করতে শুরু করল।

প্রথমদিন সে বমি করেছিল। তিনবার। ম্যানহোলে নামার পর গন্ধে, দৃশ্যে, সব মিলিয়ে পেট উলটে গিয়েছিল। বাবা বেঁচে থাকতে বলত, "অভ্যাস হয়ে যাবে।" বাবা ঠিক বলেছিল। অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন রঞ্জিত ম্যানহোলে নামে যেভাবে মানুষ অফিসে ঢোকে।

ঢাকা ওয়াসার ঠিকাদার। রঞ্জিত ওয়াসার কর্মচারী না। ঠিকাদারের শ্রমিক। কোনো আইডি কার্ড নেই। কোনো বীমা নেই। কোনো পেনশন নেই। ম্যানহোল প্রতি পাঁচশো টাকা। দিনে তিনটা পরিষ্কার করে। পনেরোশো টাকা। এর থেকে ঠিকাদার তিনশো কেটে রাখে। হাতে পায় বারোশো।

গত পাঁচ বছরে তিনজন সহকর্মী মারা গেছে।

প্রথমজন করিম। ২০২১ সালে। মিরপুরে একটা গভীর ম্যানহোলে নেমেছিল। মিথেন গ্যাস। নামার সাথে সাথে অজ্ঞান। ওপরে যারা ছিল তারা টানতে পারেনি, দড়ি ছিল না সেদিন। দ্বিতীয়জন শ্যামল নামল বাঁচাতে। সেও অজ্ঞান। দুজনেই মারা গেল।

তৃতীয়জন বিকাশ। ২০২৩ সালে। মহাখালীতে। সে ম্যানহোল থেকে উঠে আসার সময় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই মারা গেল। ডাক্তার বলল, "গ্যাস পয়জনিং।"

রঞ্জিত তিনজনকেই চিনত। করিম তার মামাতো ভাই। শ্যামল তার বন্ধু। বিকাশ নতুন ছিল, ছয় মাস হয়েছিল কাজে ঢুকেছে।

তিনজনের পরিবার কিছু পায়নি। ক্ষতিপূরণ নেই। ঠিকাদার বলেছে, "তারা সাবধান ছিল না।" ওয়াসা বলেছে, "তারা আমাদের কর্মচারী না।"

রঞ্জিত জানে পরের নাম তার হতে পারে। প্রতিবার নামার সময় জানে। কিন্তু না নামলে পরিবার খাবে কী?

ওয়াসা কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম দেয় না।

রঞ্জিত একবার জিজ্ঞেস করেছিল ঠিকাদারকে। "মাস্ক দেবেন?"

ঠিকাদার বলেছিল, "মাস্ক? কোনো দিন তো ছাড়াই কাজ করেছ। এখন মাস্ক লাগে?"

রঞ্জিত বলেছিল, "করিম মারা গেল..."

ঠিকাদার বলেছিল, "সাবধানে নামবেন। আগে একটু অপেক্ষা করবেন, গ্যাস বের হোক।"

সাবধান হওয়ার উপায় নেই। ম্যানহোল খুললে গ্যাস কতটুকু বের হয়েছে বোঝার কোনো যন্ত্র নেই। গন্ধ পেলে গ্যাস আছে বোঝা যায়। কিন্তু মিথেন গন্ধহীন। হাইড্রোজেন সালফাইডের গন্ধ পচা ডিমের মতো, সেটা পাওয়া যায়। কিন্তু বেশি ঘনত্বে নাক অসাড় হয়ে যায়, গন্ধ আর পাওয়া যায় না।

"তারা বলে, সাবধানে নামবেন। সাবধান হওয়ার উপায় নেই। নামলেই বিষ।"

রঞ্জিত তবু নামে। প্রতিদিন। গামছা বেঁধে। দড়ি কোমরে বেঁধে। ভগবানের নাম নিয়ে।

রঞ্জিতের শরীরে দাগ আছে।

চামড়ায় র‍্যাশ। হাতে, পায়ে, বুকে। নোংরা পানিতে প্রতিদিন নামে, চামড়া প্রতিক্রিয়া করে। চুলকানি। ফুসকুড়ি। কখনো পুঁজ হয়। ডাক্তার বলেছে, "এই পানিতে নামবেন না।" রঞ্জিত হেসেছে। না নামলে খাবে কী?

চোখে সমস্যা আছে। ম্যানহোলের ভেতরে অন্ধকারে কাজ করে, তারপর ওপরে উঠলে তীব্র আলো। এই পরিবর্তনে চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রঞ্জিতের চোখ সবসময় লাল থাকে। পানি পড়ে। দূরের জিনিস ঝাপসা দেখে।

শ্বাসকষ্ট আছে। গ্যাস ফুসফুসে ঢোকে প্রতিদিন। অল্প অল্প করে। একবারে মারে না। ধীরে ধীরে মারে। রঞ্জিত রাতে কাশে। শুকনো কাশি। বুকে একটা ভার অনুভব করে, যেন কেউ বসে আছে বুকের ওপর।

রঞ্জিতের বয়স বত্রিশ। শরীর বলে পঞ্চাশ।

রঞ্জিতের দুই ছেলে।

বড় ছেলে সুমন, বয়স দশ। ক্লাস ফোর। ছোট ছেলে রতন, বয়স সাত। ক্লাস ওয়ান।

সুমন স্কুলে যায়। স্কুলে তাকে বলে "গু-পরিষ্কারের ছেলে।"

প্রথমবার শুনে সুমন কেঁদেছিল। বাড়ি এসে মাকে বলেছিল। মা লাবণী চোখ মুছেছিল। রঞ্জিতকে বলেনি। রঞ্জিত জানতে পেরেছিল অন্যভাবে। সুমন একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "বাবা, তুমি অন্য কাজ করতে পারো না?"

রঞ্জিত চুপ ছিল অনেকক্ষণ। তারপর বলেছিল, "পারি না।"

সুমন আর জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু সে স্কুলে তার বাবার পেশা বলে না এখন। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে, "ওয়াসায় কাজ করে।" এটা পুরো মিথ্যা না। ওয়াসার কাজই করে। কিন্তু সত্যটা আলাদা।

রতন এখনো ছোট। সে জানে না বাবা কী করে। সে জানে বাবা সকালে যায়, সন্ধ্যায় ফেরে। বাবার গায়ে একটা গন্ধ থাকে। রতন সেই গন্ধে অভ্যস্ত। বাবার গন্ধ।

রঞ্জিত আজ মোহাম্মদপুরে কাজ করছে।

একটা ম্যানহোল ব্লক হয়েছে। রাস্তায় নোংরা পানি উঠছে। এলাকার মানুষ অভিযোগ করেছে। ওয়াসা ঠিকাদারকে বলেছে। ঠিকাদার রঞ্জিতকে পাঠিয়েছে।

ম্যানহোল খুলল। গন্ধ উঠল। রাস্তায় যারা হাঁটছিল তারা নাক চেপে ধরল। কেউ কেউ দূরে সরে গেল। একজন বলল, "ছি, কী গন্ধ!"

রঞ্জিত গামছা বাঁধল। নামল।

ভেতরে অন্ধকার। হাঁটুজল। নোংরা পানি। পাইপের মুখে প্লাস্টিক জমে আছে, পলিথিন, স্যানিটারি ন্যাপকিন, কাপড়ের টুকরো। রঞ্জিত হাত দিয়ে সাফ করতে লাগল। একটা একটা করে।

ওপর থেকে কেউ দেখছে না। ম্যানহোলের ছিদ্র দিয়ে আকাশ দেখা যায়। গোল, ছোট আকাশ। রঞ্জিতের আকাশ এটুকুই।

আধঘণ্টা পর উঠে এল। শরীরে নোংরা পানি লেগে আছে। জামা ভেজা। হাত কালো। মুখে ছিটা। সে রাস্তার পাশের নলকূপে গিয়ে হাত-মুখ ধুলল। জামা বদলাল না, কারণ আরো দুটো ম্যানহোল বাকি।

"আমি শহরের নিচে যাই।"

রঞ্জিত এটা বলে কখনো কখনো। কাউকে বলে না আসলে। নিজেকে বলে। মনে মনে।

"শহরের সবচেয়ে নোংরা জায়গায়। যেখানে কেউ যেতে চায় না, সেখানে আমি যাই।"

ঢাকা শহর। দুই কোটি মানুষ। প্রতিদিন তারা টয়লেট ব্যবহার করে, গোসল করে, থালাবাসন ধোয়, কাপড় ধোয়। সেই সব পানি, সেই সব বর্জ্য, পাইপ দিয়ে নামে মাটির নিচে। সেখানে রঞ্জিত।

শহরের ওপরে ঝকঝকে রাস্তা। শপিং মল। অফিস। গাড়ি। মানুষ। তাদের পায়ের নিচে, দশ ফুট গভীরে, রঞ্জিত হামাগুড়ি দিয়ে পাইপ পরিষ্কার করে। তাদের ময়লা সাফ করে। তারা জানে না রঞ্জিত কে। জানতে চায়ও না।

রঞ্জিত ওপরে উঠলে কেউ তার দিকে তাকায় না। তাকালেও সরে যায়। গন্ধ। রঞ্জিতের গায়ে গন্ধ। সাবান দিয়ে ধুলেও যায় না পুরোপুরি। চামড়ায় ঢুকে গেছে। কাপড়ে ঢুকে গেছে। রঞ্জিতের বাসায় এই গন্ধ। রঞ্জিতের বিছানায়। রঞ্জিতের জীবনে।

লাবণী বলে, "ছেলেদের এই কাজ করতে দেব না।"

রঞ্জিত বলে, "দেব না।"

দুজনেই জানে এটা প্রতিজ্ঞা না, ইচ্ছা। প্রতিজ্ঞা পূরণ করতে ক্ষমতা লাগে। ইচ্ছা শুধু মনে থাকে।

সুমন পড়ছে। কিন্তু সরকারি স্কুলে। বই ফ্রি, কিন্তু খাতা-কলম-ড্রেস কিনতে হয়। প্রাইভেট টিউটর নেই। সুমন গণিতে দুর্বল। বাংলায় ভালো। ইংরেজিতে কোনোরকম। রঞ্জিত সাহায্য করতে পারে না, সে নিজে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছে।

লাবণী চায় সুমন এসএসসি পাস করুক। তাহলে পুলিশে, আর্মিতে, কোথাও চাকরি হতে পারে। কিন্তু এসএসসি পর্যন্ত আরো ছয় বছর। ছয় বছর পড়ার খরচ চালাতে হবে।

রঞ্জিত হিসাব করে। দিনে বারোশো টাকা। মাসে ছত্রিশ হাজার। ভাড়া আট হাজার। খাওয়া বারো হাজার। ছেলেদের পড়া তিন হাজার। বাকি তেরো হাজার। ওষুধ, কাপড়, যাতায়াত বাদ দিলে সঞ্চয় শূন্য।

ছয় বছর। রঞ্জিতের শরীর ছয় বছর চলবে কিনা সেটাও প্রশ্ন।

১০

সন্ধ্যায় রঞ্জিত বাড়ি ফেরে।

মিরপুরে একটা বস্তিতে থাকে। একটা ঘর। টিন আর ইটের। দশ বাই আট ফুট। চারজন থাকে। রঞ্জিত, লাবণী, সুমন, রতন।

রঞ্জিত ফিরলে প্রথম কাজ গোসল। সাবান দিয়ে। দুইবার। তিনবার। গন্ধ পুরো যায় না, কিন্তু কমে। লাবণী তার কাপড় আলাদা বালতিতে ভেজায়। অন্যদের কাপড়ের সাথে মেশায় না।

রতন দৌড়ে আসে। "বাবা!" রঞ্জিতকে জড়িয়ে ধরে। রঞ্জিত রতনকে কোলে তোলে। রতন তার গায়ে মুখ গোঁজে। গন্ধ পায়। পাত্তা দেয় না। বাবার গন্ধ।

সুমন দূর থেকে দেখে। সে আর বাবাকে জড়িয়ে ধরে না। সে বড় হয়ে গেছে। সে জানে বাবার কাজ কী। সে লজ্জা পায়। এই লজ্জা সে নিজেও জানে অন্যায়। কিন্তু দশ বছরের ছেলে কোথা থেকে বুঝবে লজ্জা আর শ্রদ্ধার তফাত?

রঞ্জিত সুমনের দিকে তাকায়। সুমন অন্যদিকে তাকায়।

রঞ্জিত কিছু বলে না। সে জানে সুমনের লজ্জা সুমনের দোষ না। সমাজের দোষ। কিন্তু সমাজ বদলানোর ক্ষমতা রঞ্জিতের নেই। সে শুধু ম্যানহোল পরিষ্কার করতে পারে।

রাতে ভাত খায়। লাবণী রান্না করেছে। মাছের ঝোল। ভাত গরম। রঞ্জিত খায়। ভাত ভালো লাগে। পেট ভরে। শরীরের ব্যথা একটু কমে।

রঞ্জিত শোয়। রতন পাশে শোয়। লাবণী অন্যপাশে। সুমন দেয়ালের ধারে।

কাল সকালে আবার ম্যানহোল। আবার গামছা বাঁধা। আবার নামা। আবার অন্ধকার। আবার গন্ধ। আবার বিষ।

রঞ্জিত চোখ বোজে। ঘুমানোর আগে ভগবানের কাছে একটাই চায়। আজকের মতো কাল যেন ফিরে আসতে পারে। ওপরে। মাটির ওপরে। আলোতে।

এটুকুই।