জাহাজ ভাঙা শ্রমিক

ইউরোপের জাহাজ ইউরোপে ভাঙতে দেয় না। দামি পড়ে। আমরা সস্তায় ভাঙি। আমরাও সস্তা।

পর্ব ৯৭ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সীতাকুন্ড। চট্টগ্রামের উত্তরে। বঙ্গোপসাগরের ধার ঘেঁষে দশ কিলোমিটার জুড়ে লোহার সমুদ্র। মরা জাহাজের সমুদ্র।

ইউরোপ থেকে আসে। জাপান থেকে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে। তেলের ট্যাংকার, কার্গো শিপ, ক্রুজ লাইনার। যখন আর চলে না, যখন মেরামতের খরচ জাহাজের দামের চেয়ে বেশি হয়, তখন এখানে আসে। মরতে আসে। নাসির এদের মারে।

নাসিরের বয়স ৩২। দেখতে ৪৫-এর মতো। শরীরে একটা পোড়ার দাগ আছে বাঁ কাঁধ থেকে কনুই পর্যন্ত। গত বছর ব্লোটর্চের স্পার্ক থেকে কাপড়ে আগুন লেগেছিল। হাসপাতালে তিন সপ্তাহ ছিল। কারখানা কিছু দেয়নি। চিকিৎসার খরচ নিজে বহন করেছে। সাড়ে চার হাজার টাকা। দেড় মাসের জমানো টাকা।

তিন সপ্তাহ পর সে আবার ইয়ার্ডে ফিরে এসেছে। পোড়া ঘা তখনো শুকায়নি। কিন্তু তিন সপ্তাহে আয় শূন্য। বউ-বাচ্চার খরচ? ধার। মুদি দোকানে ধার। বাড়িওয়ালার কাছে ধার। ধারের ওপর ধার।

নাসির ভোলা থেকে এসেছিল। ঘূর্ণিঝড় সিডর। ২০০৭। ঘর গেছে, গরু গেছে, জমি নদীতে গেছে। তখন তার বয়স তেরো। বাবার সাথে সীতাকুন্ডে এসেছিল। বাবা ইয়ার্ডে ঢুকেছিল। নাসিরও। তেরো বছরের ছেলে। ব্লোটর্চ চালাতে শিখেছিল পনেরোতে। উনিশ বছর ধরে কাটছে।

সকাল সাড়ে পাঁচটায় ইয়ার্ডে ঢোকে। নাসিরের দল পাঁচজন। একজন কাটার, দুজন হেল্পার, একজন তোলার, একজন বহনকারী। নাসির কাটার। ব্লোটর্চ তার হাতিয়ার। অক্সি-অ্যাসিটিলিন। নীল আগুনে স্টিলের প্লেট কাটে।

জাহাজের ভেতরে ঢোকে। অন্ধকার। টর্চের আলোতে পথ চেনে। ইঞ্জিনরুম, কার্গো হোল্ড, ক্রু কোয়ার্টার। সবকিছু ভাঙতে হবে। সবকিছু টুকরো করতে হবে। লোহার টুকরো, তারের টুকরো, পাইপের টুকরো। সব আলাদা করে ওজন করে বিক্রি হবে।

কিন্তু জাহাজের ভেতরে শুধু লোহা না।

অ্যাসবেস্টস আছে। ইনসুলেশনে। পুরোনো জাহাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত। সাদা তুলোর মতো দেখায়। হাত দিলে গুঁড়ো হয়ে বাতাসে ওড়ে। নাসিরের ফুসফুসে ঢোকে। পিসিবি আছে। পেইন্টে সিসা আছে। ভারী ধাতু আছে। ফুয়েল ট্যাংকে অবশিষ্ট তেল আছে, কাটতে গেলে মাঝেমধ্যে বিস্ফোরণ হয়।

নাসির জানে এসব আছে। কিন্তু মাস্ক? কাগজের মাস্ক দেয় কারখানা। কাগজের মাস্ক অ্যাসবেস্টস আটকায় না। ফাইবার এত সূক্ষ্ম যে কাগজের ফাঁক দিয়ে ঢুকে যায়। আসল রেসপিরেটর দরকার। দাম দুই হাজার টাকা। কারখানা দেয় না। নাসিরের কেনার সামর্থ্য নেই।

হেলমেট দেয়। ফাটা। নাসির হেলমেটের ফাটলে টেপ লাগিয়ে পরে। টেপ কি মাথা বাঁচাবে তিন টনের স্টিল প্লেট পড়লে? না। কিন্তু কিছু না পরার চেয়ে ভালো। অন্তত মনে হয় কিছু একটা আছে মাথার ওপর।

সেফটি হার্নেস নেই। উঁচুতে কাজ করে দড়ি ছাড়া। জাহাজের ডেক থেকে মাটি পর্যন্ত চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট। পড়লে মৃত্যু। পড়ে না বেশিরভাগ সময়। কিন্তু কেউ কেউ পড়ে। প্রতি বছর কেউ না কেউ। পড়া মানে শেষ। কারখানা লাশটা পরিবারের কাছে পাঠায়। একটা কফিন। কিছু টাকা। একটা "দুঃখিত।" এটুকুই।

নাসির উঁচুতে কাজ করে। প্রতিদিন। দড়ি ছাড়া। হার্নেস ছাড়া। শুধু নিজের ভারসাম্যে। পা পিছলালে, হাত ফসকালে, বাতাস জোরে দিলে... সে ভাবে না এসব। ভাবলে পা কাঁপবে। পা কাঁপলে পড়বে।

ইউরোপের জাহাজ ইউরোপে ভাঙতে দেয় না।

ইউরোপের আইনে জাহাজ ভাঙা বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পরিবেশ সুরক্ষার নিয়ম আছে। শ্রমিকের নিরাপত্তার নিয়ম আছে। অ্যাসবেস্টস অপসারণে বিশেষ প্রক্রিয়া আছে। সব মেনে চললে একটা জাহাজ ভাঙতে কোটি কোটি টাকা খরচ। লাভ থাকে না।

তাই জাহাজ আসে বাংলাদেশে। ভারতে। পাকিস্তানে। তুরস্কে। যেখানে নিয়ম কম, শ্রমিক সস্তা, জীবনের দাম কম।

নাসির দিনে ৬০০ টাকা পায়। মাসে আঠারো হাজার। এই টাকায় সে বউ, দুই ছেলে, মা, আর পঙ্গু বাবাকে চালায়। বাবাও শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে কাজ করত। স্টিল প্লেট পড়ে পা ভেঙেছে। এখন হুইলচেয়ারে। কারখানা ক্ষতিপূরণ দিয়েছে দশ হাজার টাকা। হাসপাতালে ত্রিশ হাজার খরচ হয়েছে।

ইউরোপের জাহাজ ইউরোপে ভাঙতে দেয় না। দামি পড়ে। আমরা সস্তায় ভাঙি। আমরাও সস্তা।

গত মাসে দুটো মৃত্যু হয়েছে ইয়ার্ডে।

একটা: স্টিল প্লেট কাটার সময় পড়ে গেছে শ্রমিকের ওপর। তিন টনের প্লেট। শ্রমিকের নাম ছিল ইকবাল। বয়স ২৫। বিয়ে হয়নি। বাড়ি নোয়াখালী। মাকে টাকা পাঠাত। কারখানা পরিবারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছে। আর একটা কফিন।

আরেকটা: ফুয়েল ট্যাংক কাটতে গিয়ে বিস্ফোরণ। দুজন আহত, একজন মৃত। মৃতের নাম মনির। শরীর এত পুড়েছে যে চেনা যায়নি। আঙুলের ছাপ দিয়ে শনাক্ত করেছে পুলিশ।

প্রতি মাসে দুই-তিনটা মৃত্যু। ইয়ার্ডগুলো মিলিয়ে। বছরে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ। সরকারি হিসাবে কম। কারণ সব মৃত্যু রিপোর্ট হয় না। কারখানা এবং পরিবার মিলে সেটেলমেন্ট করে। পঞ্চাশ হাজার, এক লাখ। মামলা হয় না। পুলিশ আসে, চা খায়, যায়।

নাসির ইকবালের পাশে কাজ করত। সেদিন সে দশ ফুট দূরে ছিল। প্লেট পড়ার শব্দটা সে শুনেছে। মাংস থেঁতলানোর শব্দটা সে শুনেছে। রাতে ঘুমাতে পারেনি।

পরদিন সকালে সে আবার ইয়ার্ডে গেছে।

নাসিরের শরীরের একটা মানচিত্র আছে।

বাঁ কাঁধে পোড়ার দাগ: ব্লোটর্চের স্পার্ক, ২০২৫। ডান হাতের তর্জনী বাঁকা: স্টিল শিটে চাপা পড়ে ভেঙেছিল, ঠিকমতো জোড়া লাগেনি, ২০২২। বুকে একটা কাটা দাগ: ইঞ্জিনরুমে ধারালো ধাতুতে কেটেছে, ২০২০। বাঁ হাঁটু ব্যথা করে: উঁচু থেকে পড়ে মচকেছে, ২০১৯। ডান কানে কম শোনে: ব্লোটর্চের শব্দে, কবে থেকে জানে না।

এগুলো বাইরের আঘাত। ভেতরের আঘাত দেখা যায় না।

ফুসফুসে অ্যাসবেস্টস ফাইবার জমেছে। এটা বের হয় না। শরীর ফাইবারের চারদিকে টিস্যু জমায়। ধীরে ধীরে। বছরের পর বছর। যখন লক্ষণ দেখা দেয়, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। অ্যাসবেস্টসিস, মেসোথেলিওমা। নাম শুনলে ভয় লাগে না নাসিরের। সে এই নামগুলো জানে না। সে জানে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। একটু হাঁটলেই হাঁপায়। রাতে কাশি হয়।

সে ডাক্তারের কাছে গেছে। স্থানীয় ডাক্তার। সিনিয়র মেডিকেল অফিসার, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স। ডাক্তার বুকে স্টেথোস্কোপ ধরেছেন। শুনেছেন। এক্স-রে দিয়েছেন।

রিপোর্ট দেখে বলেছেন, "এটা ঠিক হবে না।"

নাসির বলেছে, "জানি।"

ডাক্তার অপেক্ষা করেছেন। আর কিছু বলবে কি না।

নাসির বলেছে, "কিন্তু কাল আবার যেতে হবে।"

ডাক্তার কিছু বলেননি। কী বলবেন? "যেও না"? নাসির না গেলে সুমি কী খাবে? সাব্বির কী খাবে? ডাক্তারের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর নেই। তিনি ফুসফুস দেখেন। পেট দেখার দায়িত্ব তাঁর না।

ইয়ার্ডের মালিক ঢাকায় থাকেন। নাম শুনলে চেনা যায়। ব্যবসায়ী পরিবার। রাজনীতিতে যোগাযোগ আছে। ইয়ার্ডটা কিনেছেন পনেরো বছর আগে, দুইশো কোটি টাকায়। এখন সাতশো কোটির ব্যবসা। লোহা বিক্রি হয় রড কারখানায়। তামা বিক্রি হয় আলাদা। অ্যালুমিনিয়াম আলাদা। জাহাজের ফার্নিচার, বাথরুমের ফিটিংস, কিচেনের বাসনপত্র, সব বিক্রি হয়। একটা জাহাজ কিনতে দশ কোটি, ভাঙা শেষে বিক্রি হয় পনেরো-আঠারো কোটিতে। লাভ পাঁচ-আট কোটি। প্রতি জাহাজে।

এই লাভের একটা শর্ত: শ্রমিক সস্তা থাকতে হবে। নিরাপত্তা সস্তা থাকতে হবে। রেসপিরেটর দিলে, গামবুট দিলে, হার্নেস দিলে, ট্রেনিং দিলে খরচ বাড়বে। খরচ বাড়লে লাভ কমবে। লাভ কমলে ইয়ার্ড কেনার মানে হয় না।

তাই নাসির কাগজের মাস্ক পরে। ফাটা হেলমেট পরে। প্লাস্টিকের স্যান্ডেলে কাজ করে। আর মালিক ঢাকায় বসে হিসাব করেন। জাহাজ কেনেন। জাহাজ ভাঙেন। টাকা গোনেন।

নাসির এই হিসাব জানে না। সে শুধু জানে দিনে ৬০০ টাকা। সেটুকু পেলেই হলো। মালিক জানে পুরো হিসাব। কিন্তু মালিক আর নাসির কোনোদিন একই ঘরে বসেনি। মালিক ঢাকায়। নাসির কাদায়। দুজনের মাঝখানে সমুদ্র না, শ্রেণি।

একটা জাহাজের ভেতরে যে পরিমাণ অ্যাসবেস্টস থাকে, সেটা সরাতে ইউরোপে খরচ হয় পাঁচ কোটি টাকা। বাংলাদেশে? শূন্য। কারণ সরানো হয় না। নাসিরের ফুসফুসে জমা হয়। সেটার খরচ? সেটা নাসির বহন করে। নিজের জীবন দিয়ে।

ইয়ার্ডে একটা জাহাজ এসেছে গত সপ্তাহে। গ্রিসের পতাকা। কিন্তু তৈরি জাপানে, ১৯৮৮ সালে। কার্গো শিপ। নাম: Aegean Star। ৩৫ হাজার টন।

এই জাহাজ ভাঙতে ছয় মাস লাগবে। তিনশো শ্রমিক। নাসিরের দল ইঞ্জিনরুমে কাজ পেয়েছে। সবচেয়ে কঠিন অংশ। ইঞ্জিন, জেনারেটর, পাইপলাইন, ওয়্যারিং। সব কাটতে হবে। সব আলাদা করতে হবে। লোহা এক দিকে, তামা আরেক দিকে, অ্যালুমিনিয়াম আরেক দিকে।

নাসির ব্লোটর্চ জ্বালায়। নীল আগুন। চোখে ঝালাইয়ের কালো চশমা। কিন্তু চশমাটা পুরোনো, আলো ফিল্টার ঠিকমতো হয় না। চোখ জ্বালা করে। সন্ধ্যায় চোখে পানি পড়ে।

জাহাজের পেটের ভেতরে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি। বাতাস চলে না। ব্লোটর্চের আগুনে আরো বাড়ে। ঘাম ঝরে। কাপড় ভেজে। লোহার গুঁড়ো ঘামে মিশে ত্বকে লাগে। চুলকায়। ফুসকুড়ি হয়।

ছটায় বের হয়। সমুদ্রের হাওয়ায় একটু ঠান্ডা লাগে। শরীর থেকে ধোঁয়া ওঠে। রোদে ভেজা কাপড় থেকে বাষ্প উড়ে যায়, শহীদুলের মতো গন্ধ নেই, কিন্তু ধাতুর স্বাদ আছে মুখে, নাকে, গলায়।

নাসিরের বড় ছেলে সাব্বির। বয়স ১০। সে বাবাকে বলে, "বাবা, আমি বড় হয়ে নাবিক হব। জাহাজে চড়ব।"

নাসির জাহাজ চেনে। জাহাজের ভেতরটা চেনে। প্রতিটা ঘর, প্রতিটা করিডোর, প্রতিটা সিঁড়ি। কিন্তু সে জাহাজে চড়েনি কখনো। সে জাহাজ ভাঙে। জাহাজ যখন আসে এখানে, তখন সেটা আর জাহাজ না। সেটা লাশ। নাসির লাশ কাটে।

সাব্বিরকে সে বলে, "পড়াশোনা করো।"

সে জানে সাব্বির পড়বে ক্লাস এইট পর্যন্ত, হয়তো নাইন। তারপর আসবে ইয়ার্ডে। কারণ পড়াশোনা করে চাকরি পাওয়ার জন্য যে পরিমাণ টাকা লাগে, সেই টাকা নাসিরের নেই। কলেজ, কোচিং, বই, পরীক্ষার ফি। সব মিলিয়ে যা লাগে তা নাসিরের দুই বছরের আয়।

সাব্বির ইয়ার্ডে আসবে। ব্লোটর্চ ধরবে। নাসিরের মতো কাটবে, নাসিরের মতো পুড়বে, নাসিরের মতো ফুসফুস ভরবে ফাইবারে। তারপর একদিন সেও ডাক্তারের কাছে যাবে, ডাক্তার বলবে, "এটা ঠিক হবে না।"

উত্তরাধিকার।

বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙা শিল্পে কত শ্রমিক কাজ করে? অনুমান: ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার। সরাসরি। পরোক্ষভাবে আরো দুই লাখ। লোহা বহনকারী, পরিবহন, রিরোলিং মিল। বিশ্বের অবসরপ্রাপ্ত জাহাজের প্রায় অর্ধেক বাংলাদেশে ভাঙা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিপ ব্রেকিং দেশ। গর্বের বিষয় হওয়ার কথা। কিন্তু গর্ব করতে হলে শ্রমিকদের দিকে তাকানো যায় না।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলে: "বাংলাদেশে শিপ ব্রেকিং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।" তারা রিপোর্ট লেখে। কনফারেন্সে বলে। প্রেস রিলিজ দেয়। কিন্তু জাহাজ আসতেই থাকে। কারণ জাহাজ ভাঙতেই হবে। আর ইউরোপে ভাঙলে দামি পড়ে। এটাই সত্য। বাকি সব কথা।

নাসির রিপোর্ট পড়ে না। কনফারেন্সে যায় না। সে ব্লোটর্চ জ্বালায়। কাটে। পুড়ে। ভাঙে। এটাই তার কনফারেন্স। প্রতিদিনের।

১০

রাতে নাসির বাড়ি ফেরে। ইয়ার্ডের পাশেই একটা বস্তি। টিনের ঘর। শ্রমিকরা থাকে এখানে। যারা দূর থেকে এসেছে। নোয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী। মূলত উপকূলের মানুষ। ঘূর্ণিঝড়ে ঘর হারিয়েছে, নদীভাঙনে জমি হারিয়েছে। সব হারিয়ে এখানে। লোহা কাটে। নিজেদের বাকি জীবন কাটে।

নাসিরের ঘর দশ ফুট বাই আট ফুট। টিনের চাল, বাঁশের বেড়া। বউ সুমি ভাত রান্না করেছে। মাছ ভাজা আছে। ছোট মাছ, বাজার থেকে একশো টাকার। চারজনে ভাগ করে খায়।

খাওয়ার পর নাসির বাইরে বসে। সিগারেট ধরায়। বিড়ি না, সিগারেট। দিনে দুটো। ফুসফুসে যা ঢুকেছে তার পাশে সিগারেটের ধোঁয়া কিছুই না। সে জানে। তবু খায়। এটুকু আরাম।

সমুদ্রের ধারে বসে। অন্ধকারে জাহাজের কঙ্কাল দেখা যায়। বিশাল। কালো। আকাশের তারার সামনে ছায়ার মতো। একটা জাহাজ একসময় সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। ঝড়ের মধ্যে, ঢেউয়ের মধ্যে। ক্যাপ্টেন ছিল, নাবিক ছিল, যাত্রী ছিল। এখন সেই জাহাজ মরে পড়ে আছে কাদায়। কাল নাসির ওর পেটে ঢুকবে। ব্লোটর্চ জ্বালাবে। কাটবে।

জাহাজের জীবন শেষ। নাসিরের জীবনেরও বেশি বাকি নেই। দুজনেই সীতাকুন্ডের কাদায় শেষ হবে। পার্থক্য শুধু, জাহাজের লোহা গলিয়ে নতুন কিছু হবে। নাসিরের হাড় গলবে না। মাটিতে মিশবে। চুপচাপ।

সুমি ঘরে শুয়ে শুনতে পায় নাসিরের কাশি। রাত গভীর হলে কাশি বাড়ে। সুমি জেগে থাকে। সে জানে এই কাশি কোথায় যাবে। সে দেখেছে পাশের ঘরের সেলিমের বউকে। সেলিম মারা গেছে গত বছর। ফুসফুসের ক্যান্সার। ত্রিশ বছর ইয়ার্ডে কাজ করেছে। মরার সময় ওজন ছিল পঁয়ত্রিশ কেজি। হাড্ডিসার। শ্বাস নিতে পারত না। কাশিতে রক্ত আসত।

সুমি ভাবে: নাসিরও কি এভাবে যাবে? সে প্রশ্নটা করে না। নাসিরকে জিজ্ঞেস করে না। কিছু প্রশ্ন আছে যেগুলোর উত্তর জানা থাকে, তবু জিজ্ঞেস করা যায় না। জিজ্ঞেস করলে উত্তরটা শব্দ হয়ে বাতাসে ছড়ায়। তখন আর অস্বীকার করা যায় না।

তাই দুজনেই চুপ। নাসির কাশে। সুমি শোনে। সমুদ্রের ঢেউ আছড়ায়। জাহাজের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে থাকে। রাত কাটে।