বিড়ি শ্রমিক
আমরা বিড়ি বানাই। বিড়ি আমাদের ফুসফুস খায়। আমরা নিজেরাই নিজেদের বিষ বানাই।
১
আনোয়ারার আঙুল গুনলে বোঝা যায় না কয়টা। এত দ্রুত চলে।
তেনতুলিয়ার পাতা। তামাকের গুঁড়ো। সুতো। তিনটা জিনিস। পাতা হাতে নেয়, এক চিমটি তামাক রাখে, গোল করে পাকায়, সুতো দিয়ে বাঁধে। একটা বিড়ি তৈরি। চার সেকেন্ড। পরেরটা। চার সেকেন্ড। পরেরটা।
এক হাজার বিড়ি প্রতিদিন। একশো কুড়ি টাকা।
প্রতিটা বিড়ি বারো পয়সা। প্রতিটা পাকানোতে চার সেকেন্ড শ্রম, দুটো আঙুলের স্পর্শ, একটু তামাকের গুঁড়ো ফুসফুসে।
রংপুর জেলা। পীরগঞ্জ উপজেলা। এই অঞ্চলের মেয়েরা বিড়ি পাকায়। ছোটবেলা থেকে। আনোয়ারা পাকায় যখন থেকে তার বয়স নয়। এখন চল্লিশ। একত্রিশ বছর ধরে পাকাচ্ছে। প্রতিদিন এক হাজার। বছরে তিন লাখ। একত্রিশ বছরে তিরানব্বই লাখ বিড়ি। প্রায় এক কোটি।
এক কোটি বিড়ি পাকিয়েছে আনোয়ারা। তার আঙুলগুলো দেখলে বোঝা যায়। হলুদ। তামাকের রঙ। নখের নিচে বাদামি। চামড়া শুকনো, কুঁচকানো। চল্লিশ বছর বয়সে হাত দেখে ষাটের মতো লাগে।
২
সকাল ছটায় ওঠে আনোয়ারা। ফজরের নামাজ পড়ে। ভাত রান্না করে। পান্তাভাত রাখে দুপুরের জন্য। তারপর বসে। ঘরের মেঝেতে। একটা পাটির ওপর। সামনে তামাকের গুঁড়ো একটা পিতলের থালায়। পাশে তেনতুলিয়ার পাতার বান্ডিল। সুতোর রিল।
পাকানো শুরু।
ঘর ছোট। দশ ফুট বাই দশ ফুট। টিনের চাল। মাটির মেঝে। একটা জানালা আছে, কিন্তু বন্ধ রাখে। বাতাসে পাতা উড়ে যায়, তামাক ছড়ায়। তাই বন্ধ। ঘরের ভেতরে বাতাস চলে না। তামাকের ধুলো ঘরময়। আনোয়ারার চুলে, কাপড়ে, চোখে। শ্বাস নিলে তামাকের গুঁড়ো ঢোকে। শ্বাস ছাড়লেও তামাকের গন্ধ বের হয়।
আটটার মধ্যে তিনশো বিড়ি হয়। দুপুর বারোটায় ছশো। বিকাল চারটায় নয়শো। সন্ধ্যা ছটার মধ্যে হাজার পূর্ণ।
হাজার হলে গোনে। পঞ্চাশটা করে বান্ডিল। কুড়িটা বান্ডিল। গুনে গুনে ব্যাগে রাখে। আগামীকাল সকালে মহাজন আসবে। নিয়ে যাবে। একশো কুড়ি টাকা দেবে।
৩
আনোয়ারার ছেলে সোহাগ। বয়স ১১। ক্লাস ফাইভে পড়ে। স্কুল থেকে ফেরে দুপুর দেড়টায়। তিনটা থেকে বসে বিড়ি পাকাতে।
সোহাগ ধীরে পাকায়। তার আঙুল মায়ের মতো দ্রুত না। দিনে দুইশো পারে। চব্বিশ টাকা।
আনোয়ারা বলে, "তাড়াতাড়ি করো। হাত চালাও।"
সোহাগ হাত চালায়। পাতা নেয়, তামাক রাখে, পাকায়, বাঁধে। তার আঙুলেও হলুদ রঙ ধরতে শুরু করেছে। তার ফুসফুসেও তামাকের গুঁড়ো ঢুকছে। সে জানে না। আনোয়ারা জানে, কিন্তু কী করবে।
আমার ছেলে স্কুল থেকে ফিরে বিড়ি পাকায়। স্কুলে যা শেখে, বিড়ি পাকাতে লাগে না।
ছেলে পড়বে কতদূর? আনোয়ারার স্বামী মজিবর রিকশা চালায়। দিনে তিনশো-চারশো টাকা। আনোয়ারার একশো কুড়ি। সোহাগের চব্বিশ। মেয়ে রিনা, বয়স ১৪, সেও পাকায়, তিনশো বিড়ি, ছত্রিশ টাকা। পুরো পরিবারের দৈনিক আয়: সাড়ে পাঁচশো থেকে ছশো টাকা। মাসে পনেরো-আঠারো হাজার। চারজনের খাওয়া, ঘরভাড়া, সোহাগের স্কুল, রিনার ওষুধ।
রিনার কাশি আছে। তিন বছর ধরে।
৪
আনোয়ারার হাতে একটা ক্ষত আছে। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলে। পাতার ধার দিয়ে কেটেছে, বছর দুয়েক আগে। সেরেছে, কিন্তু দাগ আছে। সেই দাগের ওপর দিয়ে তামাকের রঙ লেগেছে। দাগটা এখন বাদামি-হলুদ। আনোয়ারার শরীরে তামাকের স্বাক্ষর।
সোহাগ একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "মা, আমরা সারাজীবন বিড়ি পাকাব?"
আনোয়ারা বলেছিল, "তুই পড়। পড়লে অন্য কাজ পাবি।"
সোহাগ বলেছিল, "আমাদের স্কুলের স্যার বলেন, পড়লে মানুষ হবি।"
আনোয়ারা চুপ করে ছিল। সে ভেবেছিল: মানুষ তো আমিও। বিড়ি পাকালে মানুষ হয় না? মানুষ কি শুধু যারা অফিসে বসে কাজ করে, পরিষ্কার কাপড় পরে, হাতে তামাকের দাগ নেই? আনোয়ারা কি মানুষ না?
সে কিছু বলেনি। সে পাকিয়েছে। পরেরটা। পরেরটা।
৫
বিড়ির কারখানা রংপুরে অনেকগুলো। কিন্তু কারখানা বলা ঠিক হবে না। কারখানা বলা ঠিক হবে না। মহাজনের ব্যবসা। মহাজন তামাক কেনে। পাতা কেনে। শ্রমিকদের বাড়িতে বিতরণ করে। শ্রমিকরা বাড়িতে বসে পাকায়। মহাজন সংগ্রহ করে। প্যাকেটে ভরে। বিক্রি করে।
এটাকে বলে পুটিং-আউট সিস্টেম। শিল্প বিপ্লবের আগে ইংল্যান্ডে এই ব্যবস্থা ছিল। তিনশো বছর আগে। ইংল্যান্ড সেটা ছেড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের রংপুরে এখনো চলে।
মহাজনের নাম আশরাফ আলী। তাঁর বাড়ি পীরগঞ্জ শহরে। পাকা বাড়ি, দুতলা। ড্রয়িংরুমে এসি আছে। গাড়ি আছে, টয়োটা অ্যালিওন। ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট আছে, মিরপুরে। ছেলে ঢাকায় পড়ে, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি।
আশরাফ আলীর হাত পরিষ্কার। নখ কাটা। আঙুলে আংটি।
আনোয়ারার হাত হলুদ। নখের নিচে তামাক। আঙুলে ফাটা চামড়া।
দুজনেই বিড়ির ব্যবসায়। একজন বানায়। একজন বিক্রি করে। একজনের ফুসফুস তামাকে ভরে। অন্যজনের পকেট টাকায় ভরে।
৬
আনোয়ারার কাশি কবে শুরু হয়েছে সে মনে করতে পারে না।
পাঁচ বছর আগে? সাত বছর আগে? প্রথমে মাঝেমধ্যে হতো। তারপর প্রতিদিন। তারপর সারাদিন। এখন রাতেও। শুয়ে থাকলে বাড়ে। বুকে একটা ঘড়ঘড় শব্দ হয়। শ্বাস নিলে যেন ভেতরে কিছু আটকে আছে।
স্থানীয় ডাক্তার দেখেছে। কাশির সিরাপ দিয়েছে। কাজ হয়নি। জেলা হাসপাতালে গেছে। এক্স-রে হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, "ফুসফুসে সমস্যা। তামাকের ধুলো ছাড়তে হবে।"
তামাকের ধুলো ছাড়া মানে বিড়ি পাকানো ছাড়া। বিড়ি পাকানো ছাড়া মানে দিনে একশো কুড়ি টাকা কম। একশো কুড়ি টাকা কম মানে সোহাগের স্কুল বন্ধ, অথবা দুবেলা ভাতের বদলে একবেলা।
আনোয়ারা কাশির সিরাপ খায়। বিড়ি পাকায়। দুটো একসাথে চলে।
আমরা বিড়ি বানাই। বিড়ি আমাদের ফুসফুস খায়। আমরা নিজেরাই নিজেদের বিষ বানাই।
এই বাক্যটা আনোয়ারা একদিন একটা এনজিও কর্মীকে বলেছিল। কর্মী লিখে নিয়েছিল। হয়তো কোনো রিপোর্টে ব্যবহার করেছে। রিপোর্ট হয়তো কোনো ওয়েবসাইটে আছে। ইংরেজিতে অনুবাদ হয়ে। কিন্তু আনোয়ারার জীবনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সে এখনো পাকায়। এক হাজার। প্রতিদিন।
৭
বিড়ি প্যাকেটে একটা সতর্কবার্তা আছে। "ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।" আনোয়ারা ধূমপান করে না। সে বিড়ি খায় না। সে বিড়ি বানায়। কিন্তু তামাকের ধুলো তার ফুসফুসে ঢোকে প্রতিদিন। সে ধূমপায়ী না, তবু ধূমপানের শিকার। বিড়ির সতর্কবার্তায় তার কথা লেখা নেই। কোনো প্যাকেটে লেখা নেই: "এই বিড়ি বানাতে গিয়ে একজন নারীর ফুসফুস নষ্ট হয়েছে।"
যে বিড়ি খায় তার ক্ষতি হয়। যে বিড়ি বানায় তারও ক্ষতি হয়। পার্থক্য: যে খায় সে জেনে খায়। যে বানায় সে বাধ্য হয়ে বানায়।
আনোয়ারার বাড়ির পাশে তামাকের ক্ষেত আছে। সবুজ। সুন্দর দেখায়। কিন্তু যে জমিতে তামাক হয় সেই জমিতে ধান হয় না। মাটি নষ্ট হয়ে যায়। রংপুরে আগে ধানের ক্ষেত ছিল। এখন তামাকের। কারণ তামাকে দাম বেশি। কৃষক তামাক লাগায়। সেই তামাক আনোয়ারার সামনে আসে গুঁড়ো হয়ে। সে পাকায়। কৃষকের জমি নষ্ট হয়। আনোয়ারার ফুসফুস নষ্ট হয়। ধূমপায়ীর শরীর নষ্ট হয়। তিনজনই হারে। শুধু মহাজন জেতে।
৮
রংপুরে বিড়ি শ্রমিক কত?
কেউ সঠিক সংখ্যা জানে না। কারণ এরা কারখানায় কাজ করে না। বাড়িতে বসে করে। কোনো রেজিস্টার নেই, কোনো আইডি কার্ড নেই। অনানুষ্ঠানিক খাত। অনুমান: পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ। বেশিরভাগ নারী। বেশিরভাগ গরিব। বেশিরভাগ ভূমিহীন পরিবারের।
এদের কোনো শ্রম আইনের আওতায় আনা হয়নি। ন্যূনতম মজুরি প্রযোজ্য না। ছুটি নেই। অসুস্থতায় বেতন নেই। মাতৃত্বকালীন ছুটি? আনোয়ারা হেসেছিল এই শব্দ শুনে। সোহাগ হওয়ার দিন সকালে পাঁচশো বিড়ি পাকিয়েছিল। দুপুরে ব্যথা শুরু হয়। বিকালে বাচ্চা হয়েছে। তিনদিন পর আবার পাকানো শুরু।
তিনদিন মানে তিনশো ষাট টাকা মাইনাস।
৯
আনোয়ারার মা বিড়ি পাকাত। তার নানিও পাকাত। তিন প্রজন্ম। একই কাজ। একই তামাক। একই কাশি।
মা মারা গেছে ৫২ বছর বয়সে। শ্বাসকষ্টে। শেষের দিকে হাঁটতে পারত না। দুই পা ফেললে দম ফুরিয়ে যেত। বসে বসে বিড়ি পাকাত। মরার একদিন আগেও পাকিয়েছিল। তিনশো। ছত্রিশ টাকা। সেই ছত্রিশ টাকা দিয়ে কাফনের কাপড়ের কিছু অংশ জুটেছিল।
আনোয়ারা ভাবে: আমিও কি ৫২-তে মরব? হয়তো। হয়তো তার আগে। কাশি বাড়ছে। শ্বাস কমছে। কিন্তু হাত থামছে না। হাত থামলে পেট থামবে। পেট থামলে সব থামবে।
মৃত্যু ধীরে আসে। ক্ষুধা দ্রুত আসে। ক্ষুধা আর মৃত্যুর মধ্যে মানুষ ক্ষুধা সামলায় আগে। মৃত্যু পরে দেখা যাবে।
১০
সন্ধ্যায় আনোয়ারা বাইরে বসে।
সামনে উঠোন। মাটির উঠোনে একটা তুলসীগাছ আছে। আনোয়ারা তুলসী পাতা চিবোয়। গলার জ্বালা কমে একটু। কাশি কমে কি না বোঝা যায় না।
সোহাগ পড়ছে। কেরোসিনের বাতিতে। বাংলা বই। গণিত বই। আনোয়ারা নিজে পড়তে পারে না। তিনদিন স্কুলে গিয়েছিল, তারপর বাবা বলেছিল, "মেয়েদের পড়ে কী হবে।" সোহাগকে সে পড়াচ্ছে। যতদিন পারে।
রিনা বিড়ি পাকাচ্ছে রাতেও। কাল সকালে মহাজন আসবে। আজকের পাকানো শেষ না হলে হিসাবে গোলমাল হবে। রিনার হাত চলছে। কাশি হচ্ছে। মাঝেমধ্যে থামছে, কাশছে, আবার পাকাচ্ছে।
আনোয়ারা দেখছে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে সে নিজের চৌদ্দ বছর বয়সটা দেখছে। একই হাত। একই তামাক। একই কাশি। ত্রিশ বছর আগের আনোয়ারা এখন রিনার চেহারায় বসে বিড়ি পাকাচ্ছে। ইতিহাস পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ফুসফুসে, আঙুলে, রক্তে।
মজিবর বাড়ি ফেরে রাত নটায়। রিকশা রেখে আসে। ক্লান্ত। খায়। শোয়। কাশির শব্দে জেগে ওঠে না। অভ্যস্ত।
আনোয়ারা শোয়। কাশে। ঘুমায়। কাশে। ঘুমায়।
সকালে আবার ওঠে। ফজরের নামাজ। ভাত। তারপর বসে। পাতা, তামাক, সুতো। এক, দুই, তিন, চার সেকেন্ড। আবার এক। এক হাজার পর্যন্ত।
প্রতিদিন। প্রতিদিন। প্রতিদিন।
একদিন আনোয়ারার হাত থামবে। সেদিন হয় সে মরবে, নয় তার আঙুল আর চলবে না। সেদিন পর্যন্ত সে পাকাবে। এক হাজার। প্রতিদিন। একশো কুড়ি টাকা। প্রতিদিন। তামাকের গুঁড়ো ফুসফুসে। প্রতিদিন।
আনোয়ারার আঙুলে হিসাব আছে। এক কোটি বিড়ি। বারো লাখ টাকা। একত্রিশ বছরে বারো লাখ। মাসে গড়ে তিন হাজার দুইশো। এই টাকায় একটা পরিবার বেঁচেছে। বেঁচে আছে। কোনোমতে।
বিড়ির ধোঁয়া আকাশে ওড়ে। আনোয়ারার কাশি বাতাসে মেশে। কেউ শোনে না। রংপুরের আকাশ নীল। তামাকের ক্ষেত সবুজ। আনোয়ারার ফুসফুস ধূসর। রঙের বৈপরীত্য। জীবনের বৈপরীত্য।