হিজড়া

আমি না ছেলে, না মেয়ে। আমি মানুষ। কিন্তু 'মানুষ' শব্দটার মধ্যেও আমার জায়গা নেই।

পর্ব ৯৯ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

রূপার জন্মের নাম রুবেল।

ছেলে হিসেবে জন্মেছিল। কুষ্টিয়ায়। বাবা দিনমজুর। মা গৃহকর্মী। চারভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয়। ছোটবেলা থেকে কিছু একটা আলাদা ছিল। কী আলাদা সেটা সে নিজেও বুঝত না, অন্যরাও বুঝত না, কিন্তু সবাই টের পেত।

সে মেয়েদের সাথে খেলত। মেয়েদের মতো হাঁটত। গলার স্বর মেয়েদের মতো ছিল না, কিন্তু সে মেয়েদের মতো করে কথা বলার চেষ্টা করত। মায়ের শাড়ি পরত লুকিয়ে। আয়নায় নিজেকে দেখত। সেই আয়নায় সে রুবেলকে দেখত না। অন্য কাউকে দেখত। সেই অন্য কেউ তখনো নাম পায়নি।

চৌদ্দ বছর বয়সে বাবা জানতে পারল। পাড়ার লোকে বলল। "তোমার ছেলে হিজড়া।"

বাবা মারল। লাঠি দিয়ে। পিঠে, পায়ে, হাতে। "তুই ছেলে হয়ে মেয়েদের মতো চলবি?" রুবেল কাঁদল। মার খেল। কিন্তু পরিবর্তন হলো না। পরিবর্তন হওয়ার কিছু ছিল না। এটা পোশাক না যে খুলে ফেলবে। এটা সে নিজে।

দুই মাস পর বাবা ঘর থেকে বের করে দিল। "যা। তোর জন্য এই ঘরে জায়গা নেই।"

মা কাঁদল। কিন্তু মায়ের কথা বাবার কাছে ধোপে টেকে না। রুবেল গেল। একটা পলিথিনের ব্যাগে দুটো লুঙ্গি, একটা গামছা, একটা জামা। চৌদ্দ বছরের একটা বাচ্চা। রাস্তায়।

ঢাকায় এল ট্রেনে। টিকিট ছাড়া। গাবতলী ব্রিজের নিচে দুই রাত ঘুমাল। ভিক্ষা করল। ভিক্ষায় পেল পঁচিশ টাকা। চারটা রুটি কিনল।

তৃতীয় দিনে একটা হিজড়া দল তাকে দেখল। দলের নাম গুরুমায়ের দল। গুরুমা: নাম যশোদা। বয়স পঞ্চাশের ওপরে। মুখে পাউডার, চোখে কাজল, হাতে চুড়ি। গলার স্বর গভীর, কিন্তু কথা বলে মেয়েদের ভঙ্গিতে।

যশোদা রুবেলকে দেখল। বুঝল। বলল, "আমার সাথে আয়।"

রুবেল গেল। পুরান ঢাকায় একটা বাড়িতে। চারতলা। একতলায় দোকান। দুই, তিন, চারতলায় হিজড়ারা থাকে। বারোজন। একটা সংসার। গুরুমা প্রধান। গুরুমায়ের কথাই আইন।

এখানে রুবেল রূপা হলো।

যশোদা বলল, "তোর পুরুষের নামে কী হবে? তুই রূপা।" শাড়ি দিল। চুড়ি দিল। কাজল দিল। রূপা আয়নায় দেখল নিজেকে। এবার সে চিনতে পারল। এই সেই মানুষ যাকে সে সারাজীবন আয়নায় খুঁজেছে।

হিজড়াদের আয়ের উৎস তিনটা।

এক: আশীর্বাদ। বাচ্চা হলে, বিয়ে হলে হিজড়ারা যায়। নাচে, গায়, তালি বাজায়। আশীর্বাদ দেয়। বিনিময়ে টাকা নেয়। পাঁচশো, হাজার, দুই হাজার। পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী। এটা পুরোনো প্রথা। শত শত বছরের। হিজড়ার আশীর্বাদে বাচ্চা ভালো থাকে, বিয়ে টেকে, এই বিশ্বাস আছে মানুষের। বিশ্বাসটা কুসংস্কার, নাকি সম্মান, সেটা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার।

দুই: ভিক্ষা। ট্রাফিক সিগনালে। বাসে। ট্রেনে। হাত পাতা। তালি বাজানো। "দাও মা, দাও বাবা।" কেউ দেয়। কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়। কেউ গালি দেয়। "দূর হ, হিজড়া।"

তিন: যৌনকর্ম। এটা কেউ বলে না। কিন্তু সবাই জানে। রাতে। নির্দিষ্ট জায়গায়। পুরুষ আসে। টাকা দেয়। তিনশো, পাঁচশো। কখনো কম। কখনো কিছু দেয় না, জোর করে। কখনো মারে। পুলিশে অভিযোগ করলে পুলিশ হাসে। "হিজড়ার সাথে কী হয়েছে, সেটা তো অভিযোগের বিষয় না।"

রূপা তিনটাই করে। আশীর্বাদ দেয় দিনে। সিগনালে দাঁড়ায় বিকালে। রাতে... রাতের কথা সে বলে না। জিজ্ঞেস করলে চুপ হয়ে যায়। চোখ নামিয়ে নেয়। হাতের চুড়ি নাড়ে।

সমাজ আমাকে মানুষ মানে না। কিন্তু বাচ্চা হলে আশীর্বাদ নিতে আসে।

রূপা এটা বোঝে। এটা বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো বৈপরীত্যগুলোর একটা।

মানুষ তাকে ডাকে যখন দরকার। নাচো, গাও, আশীর্বাদ দাও, টাকা নাও, যাও। দরকার শেষ হলে সে অস্তিত্বহীন। রাস্তায় হাঁটলে মানুষ তাকিয়ে দেখে। বাচ্চারা আঙুল দেখায়। কিশোররা হাসে। বুড়োরা মুখ ঘোরায়।

বাসে উঠলে কেউ পাশে বসতে চায় না। দোকানে গেলে দোকানদার দ্রুত বিদায় করতে চায়। "কী লাগবে? নেন, যান।"

রূপা একবার হাসপাতালে গিয়েছিল। জ্বর, প্রচণ্ড। জরুরি বিভাগে। নার্স জিজ্ঞেস করল, "নাম?" "রূপা।" "বাবার নাম?" বলল। "লিঙ্গ?" রূপা চুপ। নার্স তাকাল। বুঝল। ফর্মে "পুরুষ" লিখল। রূপার বুকে কিছু একটা ভেঙে গেল। সেটা জ্বরের চেয়ে বেশি কষ্ট দিল।

সরকার তৃতীয় লিঙ্গ স্বীকৃতি দিয়েছে। কাগজে। জাতীয় পরিচয়পত্রে "তৃতীয় লিঙ্গ" অপশন আছে। কিন্তু সমাজে? সমাজ কাগজ পড়ে না। সমাজ চোখ দিয়ে দেখে, আর চোখ যা দেখে তা হলো: "এটা না ছেলে, না মেয়ে। এটা অন্য কিছু। এটা আমাদের না।"

আমি না ছেলে, না মেয়ে। আমি মানুষ। কিন্তু "মানুষ" শব্দটার মধ্যেও আমার জায়গা নেই।

রূপার একটা প্রেম ছিল।

ছেলেটার নাম ফারুক। রিকশাচালক। পুরান ঢাকায়। রূপাকে দেখত প্রতিদিন, রাস্তায়। একদিন থামাল। "চা খাবে?" রূপা অবাক হলো। কেউ তাকে এভাবে ডাকে না। চা খেতে বসে না। মানুষের মতো।

ফারুকের সাথে ছয় মাস ছিল। ফারুক আসত সন্ধ্যায়। কথা বলত। হাত ধরত। রূপার জীবনে এই প্রথম কেউ তাকে মানুষ হিসেবে ছুঁয়েছে। দরকারে না। টাকা দিয়ে না। শুধু ছুঁয়েছে।

তারপর ফারুকের বিয়ে হলো। পরিবারের চাপে। মেয়ে দেখা হলো, বিয়ে হলো। ফারুক আর এল না। একবারও না।

রূপা তিনদিন কাঁদল। তারপর উঠল। শাড়ি পরল। কাজল দিল। তালি বাজাল। সিগনালে গেল।

কান্নার পর কাজ। এটাই নিয়ম। হিজড়ার কান্না দেখার সময় কারো নেই।

গুরুমা যশোদা মারা গেল গত বছর। বয়স হয়েছিল। কত বয়স কেউ জানে না। হিজড়াদের জন্ম তারিখ থাকে না। মৃত্যু তারিখও কেউ লেখে না। যশোদা ছিল, তারপর নেই। এটুকুই।

যশোদার শেষকৃত্য হলো রাতে। মসজিদে জানাজা পড়াতে চায়নি ইমাম। "এটা পুরুষ না মহিলা? জানাজা কীভাবে হবে?" দলের মানুষরা অনুরোধ করল। অনেকক্ষণ ধরে। শেষে ইমাম রাজি হলেন। শর্ত: পুরুষদের জানাজায় পড়াবেন। পুরুষের কাতারে। কারণ জন্মসূত্রে পুরুষ।

যশোদা, যে সারাজীবন নারী হিসেবে বেঁচেছিল, তাকে মৃত্যুতে পুরুষ বানানো হলো।

রূপা কাঁদল। কিন্তু প্রতিবাদ করল না। প্রতিবাদ করার শক্তি নেই। প্রতিবাদ করে কী হবে? মৃত মানুষের লিঙ্গ নিয়ে কে তর্ক করবে?

দলের নেতৃত্ব এখন রূপার ওপর। সে এখন গুরুমা। বারোজনের দেখাশোনা। কে কোথায় যাবে, কে কত আয় করবে, কে অসুস্থ, কার ওষুধ লাগবে। একটা পরিবার। রক্তের বন্ধন নেই, কিন্তু রক্তের চেয়ে গভীর বন্ধন আছে। প্রত্যাখ্যানের বন্ধন। সবাই কোথাও না কোথাও থেকে তাড়া খেয়ে এসেছে। সেই তাড়া খাওয়ার স্মৃতি তাদের জুড়ে রাখে।

রূপার বয়স এখন ৩৮। শরীর ক্লান্ত। হরমোনের ওষুধ খায়, অনিয়মিত, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া। দামি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। লিভারে চাপ পড়ে। কিন্তু ওষুধ ছাড়লে শরীর পুরুষের দিকে ফেরে। সেটা রূপা সহ্য করতে পারে না।

এইচআইভি টেস্ট করিয়েছে। নেগেটিভ। কিন্তু কতদিন? সে জানে না। রাতের কাজে কনডম ব্যবহার করতে চায়, কিন্তু কাস্টমার চায় না। কাস্টমার টাকা দেয়। টাকা যে দেয় তার কথা শুনতে হয়।

পুলিশ। এটা আরেক অধ্যায়। পুলিশ আসে রাতে। ধরে নিয়ে যায়। থানায়। একটু বসিয়ে রাখে। হাসে। "নাচ দেখা।" কখনো মারে। কখনো টাকা নেয়। পাঁচশো, হাজার। "ছেড়ে দিচ্ছি, আর দেখব না।" পরের সপ্তাহে আবার ধরে।

অভিযোগ কোথায় করবে? পুলিশের বিরুদ্ধে পুলিশে? আদালতে যাওয়ার টাকা নেই, উকিল নেই, সাক্ষী নেই। হিজড়ার পক্ষে কে সাক্ষী দেবে?

রূপা সহ্য করে। এটা জীবনের অংশ। বৃষ্টি যেমন আকাশ থেকে পড়ে, অপমান তেমন সমাজ থেকে পড়ে। দুটোই স্বাভাবিক। দুটোই এড়ানো যায় না।

একদিন রূপা তার মাকে দেখতে গিয়েছিল। কুষ্টিয়ায়। চব্বিশ বছর পর।

মা বুড়ো হয়ে গেছে। চুল সাদা। পিঠ বাঁকা। বাবা মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। ভাইয়েরা আলাদা। মা একা থাকে। একটা ঘরে।

রূপা দরজায় দাঁড়াল। শাড়ি পরা। চুড়ি হাতে। কাজল চোখে। মা তাকাল। চিনল। কাঁদল।

"রুবেল?"

"রূপা, মা। আমার নাম রূপা।"

মা জড়িয়ে ধরল। কাঁদল অনেকক্ষণ। তারপর ঘরে নিল। ভাত রান্না করল। মাছ ভাজল। রূপা খেল। মায়ের হাতের ভাত। চব্বিশ বছর পর।

পাড়ার লোক দেখল। ফিসফিস করল। "করিম মিয়ার ছেলে হিজড়া হয়ে এসেছে।" ভাইয়েরা খবর পেল। বড় ভাই ফোন করল। "মায়ের বদনাম করবি না। চলে যা।"

রূপা একরাত থাকল। সকালে চলে গেল। মাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে গেল। মা নিল। কাঁদল।

ট্রেনে ফিরতে ফিরতে রূপা ভাবল: যে ঘরে সে জন্মেছিল সেখানে তার একরাতের বেশি থাকার অধিকার নেই। যে মায়ের পেটে সে ছিল, সেই মায়ের পাশে থাকতে পারে না। কারণ সে না ছেলে, না মেয়ে। সে এমন কিছু যেটার জন্য পরিবারে, সমাজে, ভাষায় কোনো জায়গা তৈরি হয়নি।

রূপা মারা যায় ৪০ বছর বয়সে।

লিভার ফেইলিওর। হরমোনের ওষুধ, অনিয়মিত খাওয়া, চিকিৎসা না পাওয়া। শেষ দিকে হলুদ হয়ে গিয়েছিল পুরো শরীর। চোখ হলুদ। ত্বক হলুদ। পেট ফুলেছিল পানিতে।

হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দলের মানুষরা নিয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার দেখেছিলেন। ওয়ার্ডে রাখতে চাননি। "পুরুষ ওয়ার্ডে রাখব? মহিলা ওয়ার্ডে?" শেষে করিডোরে একটা স্ট্রেচারে রাখা হয়েছিল। সেখানেই মারা গেছে রূপা। করিডোরে। না পুরুষ ওয়ার্ডে, না মহিলা ওয়ার্ডে। মৃত্যুতেও তার জায়গা হয়নি কোথাও।

লাশ দাবি করতে আসেনি কেউ। পরিবার জানে না, জানলেও আসত কি না বলা যায় না। দলের মানুষরা নিয়ে গেছে। গোসল দিয়েছে। কাফন পরিয়েছে। মসজিদে জানাজা হয়নি। দলের ভেতরে নিজেরা দোয়া পড়েছে। কবরস্থানে কবর খুঁড়েছে। মাটি দিয়েছে।

কবরে কোনো নাম লেখা নেই। শুধু একটা ইটের টুকরো গাঁথা আছে মাথার কাছে।

জন্মে কেউ ছিল না। মৃত্যুতেও কেউ নেই। মাঝখানের সময়টুকু আমি নিজে নিজে বেঁচেছি।

রূপা এ কথা বলেছিল জীবদ্দশায়। একটা সন্ধ্যায়। ছাদে বসে। ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু সে তাকিয়ে ছিল। যেন তারা আছে। যেন কেউ দেখছে।

কেউ দেখেনি। কেউ দেখে না।

রূপার দলে এখন একটা মেয়ে আছে। নাম সোনিয়া। বয়স ষোলো। বরিশাল থেকে এসেছে। একই গল্প। বাবার মার। পরিবারের তাড়া। রাস্তা। তারপর দল।

সোনিয়াকে দেখলে রূপা নিজের ষোলো বছর দেখতে পায়। একই ভয়। একই একাকিত্ব। একই প্রশ্ন: আমি কে?

রূপা সোনিয়ার মাথায় হাত রাখে। বলে, "ভয় পাস না। আমরা আছি।"

এই "আমরা" ছাড়া সোনিয়ার কেউ নেই। এই "আমরা" ছাড়া রূপারও কেউ ছিল না। "আমরা" শব্দটাই এদের পরিবার। রক্তের না। কষ্টের।