কবর খোদক
কবরে কোনো ফার্স্ট ক্লাস নেই।
১
ইব্রাহিমের কোদাল মাটিতে পড়লে একটা শব্দ হয়। ঠক।
শুকনো মাটিতে ঠক। ভেজা মাটিতে থপ। পাথুরে মাটিতে ঠন। কাদামাটিতে চপ। ইব্রাহিম শব্দ শুনেই বলতে পারে কতটা গভীর খুঁড়তে হবে, কতক্ষণ লাগবে, কোদালের ধার কতদিন টিকবে।
তিরিশ বছর ধরে খুঁড়ছে। তিন হাজারের বেশি কবর। মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার কেন্দ্রীয় কবরস্থান। পদ্মার ধারে। মাটি এখানে পলিমাটি, নরম, কোদাল সহজে ঢোকে। কিন্তু বর্ষায় পানি ওঠে। তখন কবর খুঁড়লে পানি জমে। পানি সেচতে হয়। কবরে লাশ নামানোর আগে পানি সরাতে হয়। মৃত মানুষও শুকনো মাটিতে শুতে চায়।
পাঁচশো টাকা। একটা কবরের দাম। ছয় ফুট লম্বা। তিন ফুট চওড়া। সাড়ে চার ফুট গভীর। এই মাপ সবার জন্য একই। ধনীর কবর ছয় ফুট, গরিবেরও ছয় ফুট। যে লোক জীবনে পাঁচতলা বাড়ি বানিয়েছে তার কবরও সাড়ে চার ফুট। যে লোক রাস্তায় ঘুমাত তারও সাড়ে চার ফুট।
কবরে কোনো ফার্স্ট ক্লাস নেই।
২
ইব্রাহিমের বয়স ৫৫। চুল পাকা। শরীর শুকনো, কিন্তু হাত মোটা, পেশিবহুল। কোদাল চালানোর হাত। পিঠ একটু বাঁকা হয়ে গেছে, ত্রিশ বছর ঝুঁকে খোঁড়ার ফলে।
সে কবরস্থানের পাশেই থাকে। মাটির ঘর। বউ মারা গেছে দশ বছর আগে। তার কবরও ইব্রাহিম নিজে খুঁড়েছিল। সেদিন সে কাঁদেনি। কোদাল চালিয়েছে। মাটি তুলেছে। বউকে নামিয়েছে। মাটি দিয়েছে। তারপর বাড়ি গেছে। ভাত খেয়েছে। শুয়েছে। পরদিন আরেকটা কবর খুঁড়তে হয়েছে, অন্য কারো জন্য। মৃত্যু অপেক্ষা করে না। মৃত্যু সিরিয়ালে আসে, বিরতি নেয় না।
ইব্রাহিমের একটা ছেলে আছে। মাহমুদ। বয়স ২৮। সেও কবর খোদক। বাবার সাথে কাজ করে। বাবা-ছেলে মিলে খোঁড়ে। বাবা খোঁড়ে গভীর অংশ, ছেলে মাটি তুলে ওপরে ফেলে। দুজনে মিলে দুই ঘণ্টায় একটা কবর শেষ।
ইব্রাহিমের বাবাও কবর খোদক ছিল। তার বাবাও। তিন প্রজন্ম। ইব্রাহিম বলে, "এটা পেশা না। এটা উত্তরাধিকার।"
৩
ইব্রাহিম মাটি চেনে।
নদীর ধারের মাটি এঁটেল, চটচটে, কোদালে লেগে থাকে। সেচতে হয়। কিন্তু কবরের দেওয়াল মজবুত হয়, ভাঙে না। মাদ্রাসার পাশের মাটি বালুমিশ্রিত, হালকা, খুঁড়তে সহজ, কিন্তু দেওয়াল ঝরে পড়ে, ঠেকনা দিতে হয়। পাহাড়ের কাছের মাটি পাথুরে, কোদালের ধার ভোঁতা হয়ে যায়, হাতে ঝাঁকুনি লাগে, কাজ শেষে কবজি ব্যথা করে।
প্রতিটা কবরের মাটি আলাদা। প্রতিটা কবর আলাদা। কিন্তু ভেতরে যা যায় তা এক।
ইব্রাহিম বলে, "আমি তিন হাজার মানুষকে কবর দিয়েছি। ধনী, গরিব, শিক্ষিত, মূর্খ। মাটির নিচে সবাই একই জিনিস হয়ে যায়। মাটি। ছয় মাসে মাংস গলে। দুই বছরে হাড় খসে। দশ বছরে কিছু থাকে না। শুধু মাটি। আমি জানি কারণ পুরোনো কবর খুঁড়েছি, নতুন কবরের জায়গা করতে। পুরোনো কবরে কিছু নেই। মাটি।"
৪
ইব্রাহিম মানুষের গল্প জানে। কারণ মানুষ তার কাছে শেষবার আসে।
কৃষকের কবর খুঁড়েছে। জানাজায় শুনেছে: তিন বিঘা জমি ছিল, মহাজনের কাছে গেছে, শেষ বয়সে বর্গাচাষি ছিল। কবরে নামানোর সময় দেখেছে মাটিমাখা হাত। মৃত মানুষের হাতেও মাটি লেগে ছিল। সেই মাটি কবরের মাটিতে মিশে গেছে।
জেলের কবর খুঁড়েছে। নদীতে ডুবে মারা গিয়েছিল। শরীর ফুলে গিয়েছিল। কবরে নামাতে কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু নামিয়েছে। জেলের শরীরে নদীর গন্ধ ছিল, কবরের মাটিতে মিশে গেছে।
নাপিতের কবর। গার্মেন্টস শ্রমিকের কবর। রিকশাচালকের কবর। দিনমজুরের কবর। স্কুলশিক্ষকের কবর। ডাক্তারের কবর (একজন, তিরিশ বছরে)। চেয়ারম্যানের কবর (দুজন)। ভিখারির কবর (অনেকগুলো, কে জানে কত)।
বাচ্চাদের কবর।
বাচ্চাদের কবর ছোট হয়। তিন ফুট, আড়াই ফুট। কোদাল কম চালাতে হয়। কিন্তু সেটাই সবচেয়ে কঠিন কবর। ইব্রাহিম বলে, "বুড়ো মানুষের কবর খুঁড়তে কষ্ট হয় না। তারা বেঁচেছে। কিন্তু বাচ্চাদের... তিন ফুটের কবর খুঁড়তে গিয়ে কোদাল ভারী লাগে।"
৫
একদিন ইব্রাহিমের কাছে একটা লাশ এসেছিল রাতে। জরুরি। কেউ দাবি করেনি। পুলিশ পাঠিয়েছে। হিজড়া। শরীর হলুদ। চোখে কাজলের দাগ ছিল এখনো। হাতে চুড়ি। ইব্রাহিম কবর খুঁড়েছে। একই মাপ। ছয় ফুট। তিন ফুট। সাড়ে চার ফুট। কেউ জানাজা পড়াতে আসেনি। ইব্রাহিম নিজে দোয়া পড়েছে। মাটি দিয়েছে।
পরে শুনেছে একদল মানুষ এসেছিল, তাদের মতো পোশাকে। কবরের পাশে বসে কেঁদেছে। একটা ইটের টুকরো গেঁথে দিয়ে গেছে মাথার কাছে।
ইব্রাহিম বলে, "কবরস্থান সবচেয়ে সৎ জায়গা। এখানে কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না তুমি কে, কোন ধর্ম, কোন জাত, ছেলে না মেয়ে। মাটি জিজ্ঞেস করে না। মাটি শুধু নেয়।"
৬
ইব্রাহিম নিজে মৃত্যুকে ভয় পায় কি না?
সে বলে, "আমি মৃত্যু দেখি প্রতিদিন। মৃত্যু আমার কাছে অচেনা কিছু না। মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় কারণ তারা মৃত্যু দেখে না। আমি দেখি। প্রতিটা মুখ। শান্ত মুখ, ভয়ার্ত মুখ, কষ্টের মুখ। মরার পর সব মুখ একরকম হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা পর পেশি শিথিল হয়। মুখ খোলে। চোখ বন্ধ থাকে, কিন্তু মুখ একটু খোলে, যেন শেষবার কিছু বলতে চাইছে।"
"ভয়? না। আমি ভয় পাই না। আমি শুধু ভাবি, আমার কবর কে খুঁড়বে?"
উত্তরটা সে জানে: মাহমুদ। তার ছেলে। সেও কবর খোদক। সেও একদিন এই কোদাল ধরবে, এই মাটি খুঁড়বে, এই কবরস্থানে। তারপর মাহমুদের ছেলে, যদি থাকে।
আমার কবর কে খুঁড়বে? আমার ছেলে। সেও কবর খোদক। এটা পেশা না, এটা উত্তরাধিকার।
৭
বিকালে ইব্রাহিম কবরস্থানে বসে।
সামনে তিন হাজার কবর। সারি সারি। কিছু কবরে পাকা ছাদ আছে, টাইলস লাগানো, নাম লেখা, তারিখ লেখা। এগুলো ধনীদের। কিছু কবরে শুধু মাটির ঢিবি, ঘাস গজিয়েছে, কোনো নাম নেই। এগুলো গরিবের। কিছু কবর সমতল হয়ে গেছে, মাটি বসে গেছে, বোঝার উপায় নেই এখানে কেউ শুয়ে আছে। এগুলো পুরোনো।
ইব্রাহিম প্রতিটা কবর চেনে। কোনটায় কে আছে, কবে মারা গেছে, কবরের মাটি কেমন ছিল। সে মনে রাখে। এটা তার ডায়েরি। মাটির ডায়েরি।
আমি একশো জন মানুষের গল্প বলতে পারি। কৃষক, নাপিত, গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালক, জেলে, তাঁতি, ইটভাটার শ্রমিক, চা-শ্রমিক, গৃহকর্মী... সবাই এখানে আসে। আমি শেষ মানুষ যে তাদের সেবা করে।
ডাক্তার প্রথম সেবা করে। জন্মের সময়। ইব্রাহিম শেষ সেবা করে। মৃত্যুর সময়। দুটোর মাঝখানে জীবন। সেই জীবনে কত কিছু হয়। জমি যায়। ঋণ হয়। ঘাম ঝরে। পিঠে রোদ পড়ে। বউ কাঁদে। ছেলে জিজ্ঞেস করে, "আমরা গরিব কেন?" কেউ উত্তর দিতে পারে না।
তারপর সব শেষ হয়। ইব্রাহিমের কোদাল পড়ে। ঠক। মাটি ওঠে। গর্ত হয়। লাশ নামে। মাটি পড়ে। শেষ।
৮
রাতে ইব্রাহিম ঘরে বসে।
একা। কেরোসিনের বাতি জ্বলে। দেওয়ালে একটা ছবি আছে, বউয়ের। সাদাকালো। বিয়ের সময়ের। বউয়ের মুখ ঝাপসা হয়ে গেছে, ছবি পুরোনো। কিন্তু ইব্রাহিম চেনে। সে সেই মুখ শেষবার দেখেছিল কবরে নামানোর আগে। সাদা কাপড়ে মোড়া। চোখ বন্ধ। মুখ শান্ত।
ইব্রাহিম ভাত খায়। নিজে রান্না করে। ডাল, ভর্তা। কখনো মাছ। কখনো শুধু নুন-ভাত। পেট ভরলেই হলো।
সে ভাবে না ভবিষ্যতের কথা। কবর খোদকের ভবিষ্যৎ কী? মৃত্যু থামবে না। মানুষ মরতেই থাকবে। তাই কাজ থাকবে। পাঁচশো টাকা প্রতি কবর। মাসে দশ-বারোটা কবর। পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। এটুকুতে চলে। বেশি লাগে না।
সে ভাবে অতীতের কথা। তিন হাজার মুখ। তিন হাজার কবর। তিন হাজার পরিবার যারা কেঁদেছে, মাটি ছুড়েছে, দোয়া পড়েছে, তারপর চলে গেছে। চলে গেছে জীবনে ফিরে। কারণ জীবন থামে না। মৃত্যু থামে না। কোনোটাই থামে না।
৯
একটা কবর খোঁড়ার প্রক্রিয়া।
প্রথমে জায়গা ঠিক করে। কবরস্থানের কমিটি বলে কোথায়। ইব্রাহিম মাটি দেখে। শুকনো না ভেজা। নরম না শক্ত। তারপর দাগ কাটে। ছয় ফুট বাই তিন ফুট। দড়ি টেনে সোজা করে। কোদাল তোলে।
প্রথম কোদাল সবসময় একটু ভারী লাগে। তারপর ছন্দ ধরে। কোদাল ওঠে, পড়ে, মাটি ওঠে, পাশে পড়ে। একটা ছন্দ। সংগীতের মতো। ঠক, ঠক, ঠক। মাটি তোলা, মাটি ফেলা। ইব্রাহিমের শরীর এই ছন্দ জানে। মস্তিষ্ক ভাবে না, হাত চালায়।
দুই ফুট খুঁড়লে মাটির রঙ বদলায়। ওপরের মাটি কালচে, জৈব পদার্থ মেশানো। নিচের মাটি লালচে, কাঁকর মেশানো। আরো গভীরে গেলে ধূসর, ভেজা, ঠান্ডা। চার ফুটের পর মাটিতে একটা শীতলতা আছে যেটা ওপরে পাওয়া যায় না। ইব্রাহিম ভাবে, মৃতরা ঠান্ডায় থাকে। রোদ পায় না। বৃষ্টি পায় না। শীত-গরম নেই। শুধু মাটির ঠান্ডা। চিরকালের।
কবর শেষ হলে সে ওপরে ওঠে। কোদাল রাখে। হাত ঝাড়ে। পানি খায়। বসে। অপেক্ষা করে। জানাজার পর লাশ আসবে। নামানো হবে। মাটি দেওয়া হবে। ইব্রাহিম দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। তার কাজ শেষ। গর্ত খুঁড়েছে। বাকিটা মাটি করবে।
মাটি সবসময় নিজের কাজ করে। ধীরে। নিশ্চিতভাবে। মানুষ তাড়াহুড়ো করে। মাটি করে না। মাটির সময় আলাদা। মাটির ধৈর্য অসীম।
১০
ইব্রাহিম বলে, "লোকে জিজ্ঞেস করে, তোমার পেশায় কষ্ট কী? আমি বলি, কষ্ট নেই। কষ্ট তো ওপরে। মাটির ওপরে। যেখানে মানুষ বেঁচে আছে। কৃষক কষ্ট পায় ধানের দাম কমলে। জেলে কষ্ট পায় মাছ না পেলে। শ্রমিক কষ্ট পায় মজুরি কম হলে। আমার কাছে যারা আসে তাদের কষ্ট শেষ। আমি কষ্টের পরের মানুষ।"
সে থামে। তারপর বলে, "কিন্তু একটা কষ্ট আছে। আমি জানি প্রতিটা কবরে একটা গল্প শেষ হচ্ছে। আর কেউ সেই গল্প বলবে না। কৃষক কীভাবে জমি হারিয়েছে, জেলে কীভাবে নদী হারিয়েছে, শ্রমিক কীভাবে স্বাস্থ্য হারিয়েছে। সব মাটিতে চাপা পড়ে। আমি শুধু মাটি চাপাই। গল্প চাপা পড়ে নিজে থেকেই।"
১১
ভোরে ইব্রাহিম ওঠে। ফজর পড়ে। চা করে। কবরস্থানে যায়। গতকালের নতুন কবরটা দেখে। মাটি একটু বসেছে। সে কোদাল দিয়ে সমান করে। ঘাস লাগাবে পরে। ঘাস লাগালে কবর সুন্দর দেখায়। মৃত মানুষ সুন্দর দেখে না, কিন্তু জীবিতরা আসে দেখতে। তাদের জন্য।
আজ নতুন কবর খুঁড়তে হবে কি না সে জানে না। মৃত্যু আগে থেকে খবর দেয় না। মৃত্যু হঠাৎ আসে। তখন কেউ ফোন করে, অথবা ছুটে আসে। "ইব্রাহিম ভাই, একটা কবর লাগবে।" ইব্রাহিম কোদাল নেয়। যায়। খোঁড়ে।
তিরিশ বছর। তিন হাজার কবর। প্রতিটা কবরে একটা জীবন। প্রতিটা জীবনে হাজার গল্প। সব মাটিতে। সব মাটির নিচে।
ইব্রাহিম দাঁড়ায় কবরস্থানের মাঝখানে। চারদিকে কবর। সারি সারি। সোজা সারি, বাঁকা সারি। পুরোনো, নতুন। পাকা, কাঁচা। নাম লেখা, নাম ছাড়া।
সে কোদাল কাঁধে রাখে। দাঁড়ায়। আকাশে রোদ ওঠে। কবরস্থানের ঘাসে শিশির জমে আছে। একটা কাক ডাকে। দূরে আজানের শব্দ। নদীর দিক থেকে বাতাস আসে। মাটির গন্ধ, ঘাসের গন্ধ, পানির গন্ধ।
ইব্রাহিম শ্বাস নেয়। গভীর শ্বাস। সে জীবিত। সে দাঁড়িয়ে আছে তিন হাজার মৃতের মাঝখানে, আর সে জীবিত। এটুকুই পার্থক্য। আজকের পার্থক্য। কালকের কথা কেউ জানে না।
মাহমুদ আসে। বলে, "বাবা, একটা কবর লাগবে। বিকালে।"
ইব্রাহিম মাথা নাড়ে। কোদাল তোলে। যায়।
আরেকটা গল্প মাটিতে যাবে আজ। আরেকটা জীবন শেষ হবে। ইব্রাহিম খুঁড়বে। মাটি তুলবে। জায়গা করবে। তারপর মাটি দেবে। চাপা দেবে। সমান করবে।
এটাই তার কাজ। এটাই তার জীবন। শেষ সেবা। নীরব সেবা। মাটির নিচে সব গল্প এক হয়ে যায়। মাটির ওপরে? মাটির ওপরে জীবন যেভাবে চলে, সেভাবেই চলছে। থামেনি। থামবেও না।
---
এই একশোটি জীবন বাংলাদেশ। ছাপাখানার কালিতে লেখা হয়নি। ঘামে, রক্তে, মাটিতে লেখা। জীবন যেভাবে চলে, সেভাবেই চলছে। থামেনি। থামবেও না।