মা

মায়ের মিথ্যা সবচেয়ে পবিত্র মিথ্যা

পর্ব ১ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

ফাতেমা সন্ধ্যার আজানের আগেই উঠানে বেরিয়ে আসে।

অভ্যাস। পঁচিশ বছরের অভ্যাস। বাচ্চারা যখন ছোট ছিল, সন্ধ্যায় একে একে সবাইকে ভেতরে আনতে হতো। রফিক গাছে চড়ত, মিনা পুকুরপাড়ে খেলত, আরিফ মাদ্রাসা থেকে ফিরতে দেরি করত, নাসিমা পাশের বাড়িতে গল্প করত, ছোট সালাম কোথায় যেত কেউ জানত না। পাঁচটা বাচ্চা। পাঁচ দিকে। সন্ধ্যায় সবাইকে জড়ো করা মানে রাখাল যেমন গরু ফেরায়, ঠিক সেভাবে। শুধু গরুর ঘণ্টা বাজে, বাচ্চাদের বাজে না। ডাক দিতে হয়। বারবার ডাক দিতে হয়।

এখন উঠান খালি। ডাকার কেউ নেই। তবু ফাতেমা বেরিয়ে আসে। দাঁড়ায়। তাকায়। বাঁশঝাড়ের ওপর দিয়ে আকাশ দেখে। মাঘের শেষে আকাশটা পরিষ্কার থাকে, তারাগুলো স্পষ্ট। ফাতেমা তারা চেনে না, নাম জানে না, কিন্তু দেখে। দেখাটাই যথেষ্ট।

পেছনে ঘরে ভাতের হাঁড়ি চুলায়। একজনের ভাত। এক মুঠো চাল, একটু পানি, একটুখানি আঁচ। একজনের ভাত রান্না করতে ফাতেমার লজ্জা লাগে। তিরিশ বছর ধরে সাতজনের রান্না করেছে, কখনো কখনো দশজনের, যখন আত্মীয় আসত, যখন স্বামীর বন্ধুরা হঠাৎ এসে পড়ত, যখন ঈদে পাড়ার সব বাচ্চা এসে ভিড় করত। তখন হাঁড়ি বড় ছিল। চুলার আগুন বড় ছিল। হাতের কাজ বড় ছিল।

এখন সব ছোট।

ফাতেমার শরীরটা একটা মানচিত্র।

পেটে সিজারের দাগ, রফিকের সময়। ডাক্তার বলেছিল, "স্বাভাবিক হবে না, কাটতে হবে।" ফাতেমার স্বামী মফিজ স্কুলে ক্লাস নিচ্ছিল, খবর পেয়ে দৌড়ে এসেছিল, জুতোর ফিতা বাঁধা ছিল না। ফাতেমা সেটা মনে রাখে। ডাক্তারের কথা মনে নেই, ব্যথার কথা মনে নেই, কিন্তু মফিজের খোলা জুতোর ফিতা মনে আছে। মানুষ কী মনে রাখে, সেটা মানুষ ঠিক করতে পারে না।

ডান হাঁটুতে বাত। সিঁড়ি ভাঙতে পারে না। সিঁড়ি আসলে তার বাড়িতে নেই, একতলা টিনের ঘর, কিন্তু মিনার ঢাকার ফ্ল্যাটে গেলে সমস্যা হয়। মিনা বলে, "আম্মা, লিফট আছে।" ফাতেমা লিফটে উঠতে ভয় পায়। ছোট বাক্সের ভেতর ওপরে ওঠা, এটা তার বোধগম্য নয়। মানুষ নিজের পায়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। পা যখন ওঠে না, তখন না ওঠাটাই মেনে নিতে হয়।

বাম চোখে ঝাপসা দেখে। ছানি হচ্ছে, আরিফ বলেছে অপারেশন করাতে। ফাতেমা বলেছে, "দরকার নাই। যা দেখার দেখেছি।" আরিফ রেগে গিয়েছিল। ফাতেমা হেসেছিল। ছেলেরা বোঝে না যে মায়েরা কখনো কখনো সত্যি বলে, আর সেই সত্যিটা এত ভারী যে ছেলেরা সেটাকে ঠাট্টা ভাবে।

দুটো গর্ভপাত। একটা রফিকের পরে, আরেকটা নাসিমার আগে। কেউ জানে না। মফিজ জানত। মফিজ এখন নেই। তিন বছর হলো। হার্ট অ্যাটাক। স্কুলে, ক্লাসরুমে, অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস পড়াতে পড়াতে। ছাত্ররা ভেবেছিল স্যার ঘুমিয়ে পড়েছেন। মফিজ এভাবেই গেল, যেভাবে সে সবকিছু করত, নিঃশব্দে।

ফাতেমা মফিজের কথা ভাবে না। ভাবলে ভেতরে কিছু একটা নড়ে ওঠে যেটাকে সে চেনে, কিন্তু ছুঁতে চায় না। সেটা দুঃখ না। দুঃখের চেয়ে গভীর কিছু। দুঃখ কাঁদে, কিন্তু এটা কাঁদে না। এটা চুপ করে বসে থাকে বুকের ভেতর, ভারী, স্থির, পাথরের মতো।

ফাতেমা জানে কোন পাতা জ্বর সারায়।

নিমপাতা ফুটিয়ে খেলে ম্যালেরিয়ার জ্বর নামে। বাসকপাতার রস মধু দিয়ে মেশালে কাশি কমে। তুলসীপাতা আর আদা একসাথে জ্বালালে গলা বসা সারে। হলুদ আর দুধ ঘুমের আগে খেলে শরীরের ব্যথা কমে। থানকুনি পাতা বেটে খেলে পেটের অসুখ ভালো হয়।

এগুলো তার মা শিখিয়েছিল। তার মা শিখেছিল তার মায়ের কাছ থেকে। শেকড় কতদূর যায় ফাতেমা জানে না। কিন্তু জানে যে এই জ্ঞান লেখা নেই কোথাও। কোনো বইয়ে নেই। কোনো ডাক্তারের কাছে নেই। এটা মুখে মুখে এসেছে, হাতে হাতে এসেছে, মা থেকে মেয়ে, মেয়ে থেকে মেয়ে। পুরুষেরা এই শৃঙ্খলের বাইরে। তারা জানে না নিমপাতা কতক্ষণ ফুটাতে হয়। তারা জানে ডাক্তারের নম্বর।

ফাতেমা জানে কোন দোয়া পড়লে ঝড়ের রাতে ভয় কমে। কোন সুরা পড়লে সন্তানের মঙ্গল হয়। কোন দোয়া ঘুমের আগে পড়লে দুঃস্বপ্ন আসে না। এগুলোও তার মা শিখিয়েছিল। ফাতেমা নিজেও শিখিয়েছে, কিন্তু কে শুনেছে, কে রাখবে, সে জানে না। মিনা বলে, "আম্মা, ওসব কুসংস্কার।" ফাতেমা কিছু বলে না। মিনা ঢাকায় থাকে, ঢাকায় কুসংস্কার বলা সহজ। গ্রামে, রাতের অন্ধকারে, যখন বিদ্যুৎ নেই আর বাইরে ঝড় হচ্ছে, তখন দোয়া ছাড়া আর কী আছে?

ফাতেমা জানে কোন নীরবতা কী বোঝায়।

ছেলে যখন ফোনে চুপ করে যায়, মানে টাকা দরকার কিন্তু বলতে লজ্জা পাচ্ছে। মেয়ে যখন হাসতে হাসতে হঠাৎ থামে, মানে শ্বশুরবাড়িতে কিছু হয়েছে। নাতি যখন দৌড়ে এসে কোলে মুখ গুঁজে রাখে, মানে কেউ বকেছে। ফাতেমা শব্দ ছাড়া শোনে। এটা মায়েদের কান। এটা কেউ শেখায় না। এটা আসে। প্রথম সন্তানের কান্নার সাথে আসে, তারপর আর যায় না।

ফাতেমা জানে প্রতিটা সন্তানের পছন্দের খাবার। রফিক: খিচুড়ি, ডিম ভাজি দিয়ে। মিনা: মুরগির রোস্ট, যেটা ফাতেমা ঈদে বানায়। আরিফ: শুটকি ভর্তা, যেটা অন্য কেউ খেতে পারে না, এত ঝাল। নাসিমা: পায়েস, খেজুরের গুড়ের। সালাম: পুরি আর হালুয়া, ছোটবেলা থেকে। এই পাঁচটা তালিকা ফাতেমার মাথায় খোদাই করা। কোনো কাগজে লেখা নেই। কোনো ফোনে সেভ করা নেই। মায়ের মাথাই সবচেয়ে পুরোনো ডাটাবেজ।

ফাতেমা জানে প্রতিটা সন্তানের ভয়। রফিক ভয় পায় ব্যর্থতায়, ব্যবসায় লোকসান হলে রাতে ঘুমাতে পারে না। মিনা ভয় পায় একাকীত্বে, স্বামী বাইরে গেলে ফোনে ফোনে জিজ্ঞেস করে কখন আসবে। আরিফ ভয় পায় অসুখে, ছোটবেলায় একবার নিউমোনিয়া হয়েছিল, সেই থেকে। নাসিমা ভয় পায় অন্ধকারে, এখনো। সালাম ভয় পায় দায়িত্বে, তাই পালায়, তাই ফোন করে না।

এই ভয়গুলো সন্তানেরা কাউকে বলে না। কিন্তু মা জানে। মা সবসময় জানত। জানবে।

ফাতেমা জানে প্রতিটা সন্তানের মিথ্যা। রফিক বলে "ব্যবসা ভালো চলছে," ভালো চলছে না। মিনা বলে "শ্বশুরবাড়ি ভালো," ভালো না সবসময়। আরিফ বলে "আমি ঠিক আছি," ঠিক নেই, একা থাকে ঢাকায়, বিয়ে হয়নি এখনো, চল্লিশ পার হচ্ছে। নাসিমা বলে "ছেলে ভালো পড়ছে," ভালো পড়ছে না, ক্লাসে ফেল করেছে গত সেমিস্টারে। সালাম বলে... সালাম কিছু বলে না, সেটাই তার সবচেয়ে বড় মিথ্যা।

ফাতেমা এই মিথ্যাগুলো শোনে। চুপ করে শোনে। ভেঙে দেয় না। কারণ প্রতিটা সন্তানের মিথ্যা তাকে রক্ষা করার জন্য। ফাতেমা যেমন তাদের রক্ষা করতে মিথ্যা বলে, তারাও তাকে রক্ষা করতে মিথ্যা বলে। মিথ্যার এই আদান-প্রদান, এটাই পরিবার। এটাই ভালোবাসা। কুৎসিত? হয়তো। কিন্তু সত্য।

সন্ধ্যায় ফাতেমা উঠানে বসে মরিচ শুকায়। শুকনো মরিচ, লাল, রোদে তেতে ওঠে, গন্ধে চোখ জ্বালা করে। ফাতেমার চোখ জ্বালা করে না। অভ্যাস। তিরিশ বছর ধরে মরিচ শুকিয়েছে, মরিচ বেটেছে, মরিচ ভেজেছে। চোখ শিখে গেছে সহ্য করতে।

পাশের বাড়ির সাকেরার মা এসেছে। বসেছে। গল্প করছে। সাকেরার বিয়ে হচ্ছে, পাত্র ঢাকায় চাকরি করে, ভালো ছেলে। সাকেরার মা খুশি। ফাতেমাও খুশি হওয়ার ভান করে। ভেতরে ভাবে, বিয়ের পর সাকেরাও ঢাকায় চলে যাবে। সাকেরার মাও একা হবে এই গ্রামে। আরেকটা মা, আরেকটা খালি ঘর, আরেকটা রাত আটটার ফোন।

"ফাতেমা আপা, তোমার মিনাকে বলো আমার সাকেরাকে একটু দেখে রাখতে। ঢাকায় তো চেনাজানা কেউ নাই।"

"বলব।"

ফাতেমা বলবে। মিনাকে বলবে। মিনা বলবে "ঠিক আছে" এবং সত্যিই দেখবে। কারণ মেয়েরা দেখে। মেয়েরা অন্য মেয়েদের দেখে। এটা পুরুষেরা করে না। পুরুষেরা নিজের দেখাশোনা নিজে করে, অথবা করে না। মেয়েরা জাল বোনে, একে অন্যকে ধরে, একে অন্যকে জানায়, "আমি আছি।"

সাকেরার মা চলে গেলে ফাতেমা মরিচ গুটিয়ে ভেতরে নেয়। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। প্রদীপ জ্বালাতে হবে। বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু ফাতেমা তবু একটা প্রদীপ জ্বালায়। মফিজ জীবিত থাকতে জ্বালাত। সন্ধ্যার প্রদীপ। অভ্যাস। কিছু অভ্যাস মানুষ চলে গেলেও থেকে যায়। প্রদীপ জ্বলে, মফিজ নেই, কিন্তু প্রদীপ জ্বলে।

রাত আটটায় ফোন বাজে।

ফোনটা নোকিয়ার পুরোনো ফোন, বোতামওয়ালা। মিনা একটা স্মার্টফোন কিনে দিতে চেয়েছিল, ফাতেমা নেয়নি। "এই ফোনেই কথা বলা যায়, আর কী দরকার?" মিনা বলেছিল, "ভিডিও কলে মুখ দেখা যায়।" ফাতেমা বলেছিল, "তোর মুখ আমি চোখ বন্ধ করলেও দেখি।"

আরিফের ফোন। ঢাকা থেকে। প্রতিদিন রাত আটটায়। আরিফ সবচেয়ে নিয়মানুবর্তী। স্কুলমাস্টারের ছেলে, সময়ের হিসেব রাখে।

"মা, খেয়েছো?"

ফাতেমা চুলার দিকে তাকাল। ভাতের হাঁড়ি আছে। ভাত হয়েছে। কিন্তু সে বসেনি এখনো। বসার ইচ্ছে নেই। একা খেতে ভালো লাগে না। তিরিশ বছর ধরে সবাইকে বেড়ে দিয়ে, সবাই খাওয়া শেষ করলে, হাঁড়ির তলায় যেটুকু থাকত সেটা খেয়েছে। সেটাই তার খাওয়া। সেটাই তার অভ্যাস। সেই "বাকিটুকু" তার জন্য রাখা ছিল। কখনো কম ছিল, কখনো একটু বেশি। কিন্তু সবসময় সবার পরে। সবসময় শেষে।

এখন সে প্রথমে খেতে পারে। পুরো হাঁড়ি তার। কিন্তু পুরো হাঁড়ি এক ব্যক্তির জন্য রান্না করা যায় না। পুরো হাঁড়ি একা খাওয়া যায় না। পূর্ণতার জন্য অভাব দরকার, অন্যদের খাওয়ানোর পরে যে অভাব থাকে, সেই অভাবটুকুই ফাতেমার পরিচয়। সেই অভাব এখন নেই। তাই খাওয়াটাও নেই।

"হ্যাঁ, খেয়েছি।"

মিথ্যা। পবিত্র মিথ্যা। মায়ের মিথ্যা।

ফাতেমা সারাজীবন এই মিথ্যা বলেছে। বাচ্চারা যখন ছোট ছিল, ভাত কম থাকলে বলত, "আমি খেয়েছি, তোরা খা।" খায়নি। মফিজ অসুস্থ থাকলে বলত, "আমার কিছু হয়নি, তুমি বিশ্রাম নাও।" হয়েছে। রাতে একা কাঁদত, সকালে মুখ ধুয়ে বলত, "সব ঠিক আছে।" ঠিক ছিল না।

মায়ের মিথ্যা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো মিথ্যা। সবচেয়ে জরুরি মিথ্যা। এই মিথ্যা না থাকলে সংসার চলে না। এই মিথ্যা না থাকলে সন্তানরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না। এই মিথ্যা মায়ের শরীরে জমা হয়, স্তরে স্তরে, পলিমাটির মতো, এবং একদিন সেই ভার এত বেশি হয় যে মা নুয়ে পড়ে। কিন্তু নুয়ে পড়েও বলে, "আমি ঠিক আছি।"

"আরিফ, তুই খেয়েছিস?"

"হ্যাঁ মা।"

"কী খেলি?"

"ভাত, মাছ।"

"মাছ কী?"

"ইলিশ।"

"ইলিশের দাম কত এখন?"

"অনেক, মা। আপনি চিন্তা করবেন না।"

ফাতেমা চিন্তা করে। সবসময় চিন্তা করে। পাঁচ সন্তানের জন্য পাঁচটা আলাদা চিন্তা। রফিকের ব্যবসা কেমন চলছে। মিনার শ্বশুরবাড়ি ঠিক আছে তো। আরিফের চাকরি স্থায়ী হয়েছে কিনা। নাসিমার ছেলেটা স্কুলে ভালো করছে কিনা। সালাম কি এখনো সিগারেট খায়।

চিন্তাগুলো সুতোর মতো। ফাতেমা সেই সুতো ধরে বসে থাকে, টানতে পারে না, ছাড়তেও পারে না।

রাত গভীর হয়। ফাতেমা বিছানায় শোয়।

বিছানার ডান পাশটা খালি। তিন বছর ধরে খালি। ফাতেমা এখনো বাঁ পাশে শোয়। ডান পাশে শোয় না। সেটা মফিজের পাশ। মফিজ নেই, কিন্তু পাশটা তার। কিছু জায়গা মানুষ চলে গেলেও ফেরত দেওয়া যায় না। কিছু জায়গা চিরকালের জন্য কারো নামে লেখা থাকে।

মশারির ভেতর দিয়ে টিনের চালের ফাঁক দেখা যায়। একটা তারা। ফাতেমা সেটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

পাঁচটা সন্তান জন্ম দিয়েছে। পাঁচবার সেই ব্যথা সহ্য করেছে যেটা পুরুষেরা বর্ণনায় শোনে কিন্তু বুঝতে পারে না। প্রতিটা সন্তানের জন্মের ব্যথা আলাদা। রফিকের সময় ভয় ছিল, প্রথম সন্তান, কিছুই জানত না। মিনার সময় একটু সহজ ছিল, শরীর মনে রেখেছিল কী করতে হয়। আরিফের সময় রক্তক্ষরণ হয়েছিল, ফাতেমা ভেবেছিল মারা যাবে, মারা যায়নি। নাসিমার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল, ধাত্রী আসতে দেরি হচ্ছিল, পাশের বাড়ির বৃদ্ধা এসে ধরেছিল। সালামের সময়, সবশেষে, ফাতেমা চুপচাপ সহ্য করেছিল, একটা শব্দও করেনি, যেন শরীর নিজেই জানত এটাই শেষবার।

দুটো গর্ভপাত। কেউ শোনেনি সেই গল্প। ফাতেমা নিজেও বলেনি। কাকে বলবে? মায়ের কিছু ব্যথা ভাষা পায় না। সেগুলো শরীরে থেকে যায়, হাড়ের ভেতর ঢুকে যায়, আর বছর বছর পরে বাতের ব্যথা হয়ে ফিরে আসে। ডাক্তার বলে "আর্থ্রাইটিস।" ফাতেমা জানে সেটা আসলে কী।

ফোনটা আবার বাজে। এবার নাসিমা।

"আম্মা, ঘুমাইছো?"

"না রে। শুইছি।"

"কিছু দরকার?"

"না।"

"আম্মা, ঈদে আসবো আমরা। জামিলকে নিয়ে।"

"আয়।"

ফোন রেখে দিল। একটা শব্দের উত্তর। "আয়।" কিন্তু সেই একটা শব্দের ভেতরে কত কিছু। আয়, আমি তোদের জন্য অপেক্ষা করছি। আয়, ঘর পরিষ্কার করে রাখব। আয়, তোর ছেলের পছন্দের পায়েস বানাব। আয়, আমি একা আছি কিন্তু বলব না যে একা আছি।

ফাতেমা চোখ বন্ধ করে।

পাঁচটা সন্তানের পাঁচটা মুখ। ছোটবেলার মুখ। বড়বেলার মুখ নয়। মা সবসময় সন্তানের ছোটবেলার মুখ দেখে। সেই মুখ যেটা প্রথমবার হেসেছিল, যেটা প্রথমবার "মা" বলেছিল, যেটা জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরেছিল। সেই মুখগুলো ফাতেমার চোখের পেছনে আঁকা আছে, স্থায়ী, অমোচনীয়।

বাইরে শেয়ালের ডাক। গ্রামের রাত। ঝিঁঝিঁ পোকা। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে।

ফাতেমা আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করে। সাদা, পাড়ে লাল। মফিজের কেনা। শেষ শাড়ি যেটা মফিজ কিনেছিল। ফাতেমা পরে না এটা। পরলে মফিজের কথা মনে হবে। মফিজের কথা মনে হলে সেই পাথরটা নড়বে। কিন্তু মাঝে মাঝে হাত বোলায়। কাপড়ে হাত বোলানো যায়, মানুষে যায় না, যখন মানুষ থাকে না।

শাড়িটা ভাঁজ করে আবার রাখে। আলমারি বন্ধ করে।

ফাতেমা শোয়। একা। পঞ্চান্ন বছরের একটা শরীর, যেটা পাঁচটা প্রাণ বানিয়েছে, সাতজনের রান্না করেছে, হাজার রাত জেগেছে, লক্ষ মিথ্যা বলেছে। সেই শরীর এখন বিশ্রাম নেয়।

বিশ্রাম? না। অপেক্ষা। পরের ফোনের। পরের "মা, খেয়েছো?"-র। পরের মিথ্যার।

মায়ের মিথ্যা সবচেয়ে পবিত্র মিথ্যা।

কারণ মায়ের মিথ্যা সবসময় সন্তানের জন্য। কখনো নিজের জন্য নয়।

ফাতেমা ঘুমায়। অথবা ঘুমানোর ভান করে। এটাও এক ধরনের মিথ্যা। কিন্তু এই মিথ্যা কাকে বলবে? খালি ঘরে, খালি বিছানায়, খালি উঠানে?

ফাতেমার শেষ ভাবনা: কাল সকালে উঠে সালামকে ফোন করতে হবে। সালাম তিনদিন ফোন করেনি। মানে কিছু একটা হয়েছে। মা জানে। মা সবসময় জানে।