মেয়ে

মেয়েরা পরীক্ষা দেয় দুবার

পর্ব ২ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

তানিয়া ভোর চারটায় ওঠে।

অ্যালার্ম নেই। শরীরই অ্যালার্ম। শরীর জানে পরীক্ষা আসছে, শরীর জানে সময় কম, শরীর জানে ঘুমের বিলাসিতা এখন চলে না। তানিয়ার শরীর সতেরো বছরের, কিন্তু তার ভেতরে একটা ঘড়ি আছে যেটা অনেক পুরোনো। সেই ঘড়ি তার মা তানুর কাছ থেকে পাওয়া, যে নিজে পড়তে পারেনি কিন্তু মেয়েকে পড়ানোর জন্য ভোরে উঠে রুটি বেলে।

ঘরে অন্ধকার। বাবা আর ছোট ভাই ঘুমাচ্ছে। মা উঠেছে, রান্নাঘরে কিছু একটা নাড়ছে, চুলার আলো দরজার ফাঁক দিয়ে আসছে। তানিয়া ফোনটা তুলে নেয়। ব্যাটারি একুশ পার্সেন্ট। চার্জার বাবার ফোনে লাগানো। তানিয়া ফোনের আলো কমিয়ে দেয়, সবচেয়ে কম ব্রাইটনেস, যেন ব্যাটারি টেকে। এই আলোতে পড়ে।

জীববিজ্ঞান। কোষ বিভাজন। মাইটোসিস, মিয়োসিস। প্রোফেজ, মেটাফেজ, অ্যানাফেজ, টেলোফেজ। শব্দগুলো ইংরেজিতে, বইটা বাংলায়, তানিয়ার মাথায় দুটো ভাষা একসাথে ঘোরে। সে আঙুল দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে ডায়াগ্রাম বড় করে দেখে। ক্রোমোজোম। সেন্ট্রোমিয়ার। স্পিন্ডল ফাইবার। ছোট ছোট সুতোর মতো জিনিস যেগুলো কোষের ভেতরে টানাটানি করে, আলাদা করে, নতুন কিছু বানায়।

তানিয়া ভাবে, তার জীবনটাও একটা কোষ বিভাজন। সে এখন মেটাফেজে, মাঝখানে দাঁড়িয়ে, দুই দিকে দুটো টান। একদিকে বাড়ি, বিয়ে, সংসার, মায়ের ইচ্ছা। আরেকদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি, নিজের পায়ে দাঁড়ানো, বাবার স্বপ্ন। স্পিন্ডল ফাইবার দুদিক থেকে টানছে।

কিন্তু তানিয়া নিজেও একটা দিক বেছে নিয়েছে। নিজের দিক। সেটা কেউ জানে না। তানিয়া ডাক্তার হতে চায়। মেডিক্যালে ভর্তি হতে চায়। এটা সে কাউকে বলেনি, কারণ বললে সবাই হাসবে। রাজমিস্ত্রির মেয়ে, গ্রামের স্কুলে পড়ে, ফোনের আলোতে পড়ে, সে ডাক্তার হবে? কিন্তু তানিয়া জানে, ডাক্তার হওয়ার জন্য যা লাগে সেটা টাকা না, সেটা পড়া। পড়া সে পারে। বাকিটা সময়ের ব্যাপার।

তানিয়ার খাতায় একটা তালিকা আছে। পিছনের পাতায়, যেখানে কেউ দেখবে না। "মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা: জীববিজ্ঞান ৬০, রসায়ন ২৫, পদার্থ ১৫।" নম্বর বণ্টন। তানিয়া হিসেব করেছে। সবচেয়ে বেশি নম্বর জীববিজ্ঞানে। তাই জীববিজ্ঞান সবচেয়ে বেশি পড়ে। কৌশল। গরিব মেয়ের কৌশল, যেখানে কোচিং নেই, প্রাইভেট টিউটর নেই, শুধু নিজের মাথা আছে আর একটা পুরোনো ফোন।

বিদ্যুৎ নেই। গ্রামে রাতে থাকে না। সন্ধ্যা ছয়টায় যায়, সকাল আটটায় আসে। কখনো আসে, কখনো আসে না। তানিয়া এই অন্ধকারে পড়তে শিখেছে। ফোনের আলো তার সূর্য।

তানিয়ার ঘর ছোট। দুটো ঘর। একটায় পরিবার ঘুমায়, আরেকটায় রান্না হয়। তানিয়ার পড়ার টেবিল নেই। মেঝে তার টেবিল। দেয়াল তার বুকশেলফ, পেরেকে ঝোলানো একটা ব্যাগ, তাতে বই। এটুকুই তানিয়ার পৃথিবী। কিন্তু এটুকু পৃথিবীতে সে পুরো পর্যায় সারণি মুখস্থ করেছে। পুরো মানবদেহের অঙ্গ-প্রতঙ্গ শিখেছে। পুরো রাসায়নিক বিক্রিয়ার তালিকা মনে রেখেছে। ছোট জায়গায় বড় স্বপ্ন, এটা বাংলাদেশের প্রতিটা গরিব মেয়ের গল্প।

সকাল সাতটায় তানিয়া স্কুলে যায়।

পায়ে হেঁটে। বিশ মিনিটের রাস্তা। মাটির রাস্তা, পাশে ধানক্ষেত, সামনে বাঁশের সাঁকো। সাঁকোর নিচে খাল। বর্ষায় খাল ভরে যায়, তখন সাঁকো ডুবে যায়, তখন স্কুল বন্ধ। কিন্তু এখন শীতের শেষ, খাল শুকনো, সাঁকো পার হওয়া সহজ।

তানিয়ার ব্যাগে তিনটা বই, দুটো খাতা, একটা কলম, একটা পেন্সিল। আর একটা কাপড়ের থলি, ভেতরে পুরোনো কাপড়ের টুকরো। পরিষ্কার, ভাঁজ করা, রোদে শুকানো। এই থলি তানিয়ার গোপন। ক্লাসের ছেলেরা জানে না এটা কী। ক্লাসের বেশিরভাগ মেয়েও জানে না, কারণ যাদের সামর্থ্য আছে তারা প্যাড কেনে। তানিয়ার সামর্থ্য নেই। একটা প্যাডের দাম দশ থেকে পনেরো টাকা। মাসে চার-পাঁচদিন লাগে। মাসে পঞ্চাশ থেকে পঁচাত্তর টাকা। বছরে ছয়শো থেকে নয়শো টাকা।

ছয়শো টাকায় একটা গাইড বই কেনা যায়।

তানিয়া গাইড বই কেনে।

মা বলে, "কাপড় ভালো। আমরা সবাই কাপড়ে চলেছি। তুইও চলবি।" মা ঠিকই বলে। কাপড় ভালো। কিন্তু কাপড়ে চলতে গেলে কিছু জিনিস মানতে হয়। ঘন ঘন বাথরুম যেতে হয়। বাথরুম বলতে স্কুলের পেছনে টিনের ঘর, তালা ভাঙা, দরজায় ফাঁক। তানিয়া দুপুরের আগে যায় না। দুপুরে সবাই খেতে যায়, তখন বাথরুম খালি থাকে।

কাপড়ে চলতে গেলে ভয়ে থাকতে হয়। সালোয়ারে দাগ লাগল কিনা। উঠে দাঁড়ালে চেয়ারে কিছু আছে কিনা। পেছনে কেউ দেখল কিনা। এই ভয়টা মাসের সেই কদিন তানিয়ার ছায়া হয়ে থাকে। পড়ার সাথে সাথে আরেকটা হিসেব চলে। শরীরের হিসেব।

ছেলেদের এই হিসেব নেই। তারা শুধু পড়ে। তানিয়া পড়ে, আর গোনে।

তানিয়ার ক্লাসে আরেকটা মেয়ে ছিল, শিউলি। শিউলি ভালো পড়ত। তানিয়ার চেয়ে ভালো। কিন্তু শিউলি গত বছর স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। বিয়ে হয়ে গেছে। ষোলো বছরে। শিউলির বাবা রাজি ছিল, মা রাজি ছিল, শিউলি রাজি ছিল কিনা কেউ জিজ্ঞেস করেনি।

তানিয়া মাঝে মাঝে শিউলির কথা ভাবে। শিউলি এখন কোথায়? কী করছে? রান্না? বাচ্চা? শিউলি কি এখনো জীববিজ্ঞানের কোষ বিভাজন মনে রাখে? নাকি ভুলে গেছে? ভুলে যাওয়াটাও একটা ব্যথা। জানা জিনিস ভুলে যাওয়া, শেখা জিনিস হারিয়ে ফেলা, এটা একটা মৃত্যু। ছোট মৃত্যু। প্রতিদিনের মৃত্যু।

তানিয়া শিউলি হতে চায় না। হবেও না। বাবা আছে। বাবা দাঁড়িয়ে আছে।

আজ পরীক্ষা। জীববিজ্ঞান।

তানিয়া সকালে উঠে বুঝল, আজই এসেছে। দিনটা আজই বেছে নিয়েছে। শরীরের নিজের ক্যালেন্ডার আছে, সেই ক্যালেন্ডার পরীক্ষার সময়সূচি মানে না।

পেটের নিচে ব্যথা। চাপা, ভারী, যেন কেউ ভেতর থেকে মুচড়ে ধরেছে। তানিয়া জানে এটা আরও বাড়বে। প্রথম দিন সবচেয়ে খারাপ। ওষুধ নেই। প্যারাসিটামল আছে বাড়িতে, কিন্তু সেটা জ্বরের জন্য রাখা। বাবার জ্বর হলে লাগবে। তানিয়া নেয় না।

মা একটা পুরোনো গামছা ছিঁড়ে ভাঁজ করে দিল। "যত্ন কইরে যাস।" এটা মায়ের ভাষায় যত্নের কথা। মায়ের ভাষায় শরীরের এই ব্যাপারগুলো সরাসরি বলা হয় না। ঘুরিয়ে বলা হয়। "অসুবিধা," "সমস্যা," "ওই ব্যাপার।" যেন নাম ধরে ডাকলে লজ্জা।

তানিয়া নাম জানে। মেনস্ট্রুয়েশন। ঋতুস্রাব। জীববিজ্ঞান বইয়ে পড়েছে। এন্ডোমেট্রিয়াম ক্ষরণ। ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন। হরমোনের ওঠানামা। কিন্তু বই আর শরীর এক জিনিস নয়। বইয়ে ডায়াগ্রাম পরিষ্কার, লেবেল করা, রঙিন। শরীরে কোনো লেবেল নেই। শরীরে শুধু ব্যথা আছে, আর সেই ব্যথা নিয়ে হেঁটে যাওয়ার জেদ।

তানিয়া স্কুলে পৌঁছায়। পরীক্ষার হলে ঢোকে। নিজের সিটে বসে। চেয়ারটা শক্ত, কাঠের। বসতে ব্যথা লাগে। কিন্তু সে বসে। মুখ সমান রাখে। পাশের ছেলেটা, রাকিব, খাতা গুছাচ্ছে, পেন চেক করছে, নিশ্চিন্ত। রাকিবের শরীরে আজ কোনো যুদ্ধ নেই। রাকিব শুধু পরীক্ষা দেবে। তানিয়া পরীক্ষা দেবে, আর একই সাথে শরীরের সাথে লড়বে।

প্রশ্নপত্র এলো। তানিয়া পড়ল।

"কোষ বিভাজনের বিভিন্ন পর্যায় বর্ণনা কর।"

তানিয়া হাসল। ভেতরে ভেতরে। এটা সে জানে। ভোর চারটায় পড়েছে। ফোনের আলোতে।

লিখতে শুরু করল। হাত চলে। পেটে ব্যথা চলে। দুটো একসাথে। তানিয়ার কলম থামে না। ব্যথা তীব্র হলে সে একটু থামে, চোখ বন্ধ করে, দাঁত চেপে ধরে, তারপর আবার লেখে। কেউ দেখে না। কেউ জানে না। তানিয়ার মুখে কোনো ভাব নেই। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে একটা মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে, স্বাভাবিক, শান্ত।

ভেতরে তানিয়া কামড়াচ্ছে। নিজের ঠোঁট কামড়াচ্ছে।

দুপুরে পরীক্ষা শেষ। তানিয়া বাথরুমে যায়। কাপড় বদলায়। হাত ধোয়। মুখ ধোয়। আয়না নেই, কিন্তু দরকার নেই। আয়না ছাড়াও তানিয়া জানে তার মুখটা কেমন দেখাচ্ছে। ক্লান্ত। ফ্যাকাসে। ঠোঁট শুকনো।

বাড়ি ফিরে খাবে। মা ভাত রেখেছে। ডাল আর আলুভর্তা। মাংস নেই। মাছ নেই। তানিয়ার পেটে ক্ষুধা আছে, কিন্তু ব্যথাও আছে। দুটো একসাথে থাকলে ক্ষুধা হারে।

বাথরুমের বাইরে এসে দেখল, সুমি দাঁড়িয়ে। সুমি তার ক্লাসমেট। সুমির চোখ লাল।

"কী হইছে?"

সুমি কিছু বলল না। তারপর ফিসফিস করে বলল, "আমারও হইছে। প্যাড নাই। তোর কাছে আছে?"

তানিয়া থলিটা বের করল। একটা পরিষ্কার কাপড় দিল।

সুমি নিল। কিছু বলল না। কিন্তু চোখে যেটা ছিল সেটা কৃতজ্ঞতার চেয়ে বেশি কিছু। সেটা স্বীকৃতি। আমরা দুজন একই যুদ্ধ লড়ছি। একই গোপন, একই লজ্জা, একই ব্যথা ভাগ করছি। আর কেউ জানে না। জানবেও না।

তানিয়া ভাবল, ক্লাসে ত্রিশজন মেয়ে। তার মধ্যে কতজন আজ এই যুদ্ধে? পাঁচজন? দশজন? কেউ কাউকে বলে না। কেউ কারো মুখ দেখে বোঝে না। মেয়েরা লুকাতে শিখে গেছে। এত ভালো লুকায় যে পৃথিবী ভাবে কিছুই হয় না।

রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে তানিয়া ভাবে।

বাবা চায় সে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাক। বাবা নিজে এসএসসি পাস, রাজমিস্ত্রির কাজ করে, দিনে পাঁচশো থেকে সাতশো টাকা পায়। বাবা বলে, "আমার মেয়ে পড়বে। আমি ইট বহন করি যেন সে বই বহন করে।" বাবার কথায় কোনো কাব্য নেই, কিন্তু সত্য আছে। ইট আর বই, একটার ওজন আরেকটাকে বহন করে।

মা চায় তানিয়া পড়ুক, কিন্তু মা ভয়ও পায়। "বেশি পড়লে বিয়ে হবে না। ছেলেরা পড়ালেখা জানা মেয়ে চায় না।" মা ভুল বলে না। মা যেটা দেখেছে সেটা বলে। মায়ের চারপাশে যে ছেলেরা আছে, তারা সত্যিই পড়ালেখা জানা মেয়ে চায় না। তারা চায় মেয়ে রান্না জানুক, চুপ থাকুক, কম কথা বলুক।

কিন্তু তানিয়ার বাবা অন্যরকম। বাবা মায়ের সাথে তর্ক করে তানিয়ার হয়ে। "ও পড়বে। বিয়ে পরে হবে। আগে পায়ের নিচে মাটি হোক।" বাবার গলা শক্ত হয়ে যায়। মা চুপ করে যায়। তানিয়া পাশের ঘরে শোনে। বাবার জন্য গর্ব হয়। মায়ের জন্য কষ্ট হয়। দুটো একসাথে থাকে, যেমন ক্ষুধা আর ব্যথা একসাথে থাকে।

সাঁকো পার হতে গিয়ে তানিয়া একটু থামে। খালের পানি দেখে। পানি স্বচ্ছ, তলায় নুড়ি দেখা যায়। একটা মাছ চলে গেল। তানিয়া ভাবে, মাছের জীবন সহজ। মাছকে পরীক্ষা দিতে হয় না। মাছকে কাপড় বদলাতে হয় না। মাছকে প্রমাণ করতে হয় না যে সে যোগ্য।

তারপর ভাবে, না, মাছের জীবনও সহজ না। মাছকে জাল এড়াতে হয়। প্রতিটা প্রাণীর নিজের পরীক্ষা আছে।

তানিয়া সাঁকো পার হয়। একটা একটা করে। একটা পা, তারপর আরেকটা পা। এভাবেই চলে।

রাতে বিদ্যুৎ আসে। অপ্রত্যাশিতভাবে। সাধারণত আসে না, আজ এসেছে। পাখা ঘোরে। আলো জ্বলে। তানিয়ার ছোট ভাই সোহেল চেঁচিয়ে ওঠে, "কারেন্ট আইছে!" যেন উৎসব।

তানিয়া তাড়াতাড়ি ফোন চার্জে দেয়। তারপর বই খোলে। টেবিল নেই, মেঝেতে বসে। কোলের ওপর খাতা। সামনে বই। পাশে ফোন, চার্জ হচ্ছে। আলো আছে, তাই ফোনের আলো লাগবে না। এটা বিলাসিতা। আলোর বিলাসিতা।

রসায়ন। পর্যায় সারণি। হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, লিথিয়াম, বেরিলিয়াম। তানিয়া মুখস্থ করে। মুখস্থ করা তার পছন্দ নয়, বোঝা পছন্দ, কিন্তু পরীক্ষায় মুখস্থ লাগে। বাংলাদেশের পরীক্ষা পদ্ধতি মুখস্থনির্ভর। তানিয়া জানে এটা ভুল। কিন্তু ভুল পদ্ধতিতেও জিততে হয়। আগে জিতবে, তারপর পদ্ধতি বদলাবে। এটা তানিয়ার পরিকল্পনা। দীর্ঘমেয়াদি। সতেরো বছরের মেয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

পেটের ব্যথা এখন কম। সন্ধ্যায় মা গরম পানিতে আদা দিয়ে খাইয়েছে। কাজ করেছে। মায়ের ওষুধ কাজ করে। সবসময় করে।

তানিয়া পড়ে। ঘরের এক কোণায় বাবা শুয়ে আছে, ক্লান্ত, সারাদিন ইট বহন করেছে। আরেক কোণায় সোহেল ঘুমিয়ে গেছে। মা রান্নাঘরে কাল সকালের জন্য চাল ভিজিয়ে রাখছে।

তানিয়া পড়ে।

সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, সিলিকন, ফসফরাস, সালফার, ক্লোরিন, আর্গন।

মৌলগুলো সারিবদ্ধ। একটার পর একটা। ক্রমানুসারে। প্রতিটার নিজের জায়গা আছে, নিজের পারমাণবিক সংখ্যা আছে, নিজের ভর আছে। কেউ কাউকে সরাতে পারে না। কেউ কাউকে বাদ দিতে পারে না।

তানিয়া ভাবে, সে নিজেও একটা মৌল। তার নিজের জায়গা আছে। কেউ তাকে সরাতে পারবে না।

বিদ্যুৎ চলে গেল। হঠাৎ। যেমন এসেছিল। ঘর অন্ধকার।

তানিয়া ফোন তুলে নেয়। ব্যাটারি সাতচল্লিশ পার্সেন্ট। যথেষ্ট।

ফোনের আলোতে পড়ে।

পটাসিয়াম, ক্যালসিয়াম, স্ক্যান্ডিয়াম, টাইটেনিয়াম...

মা রান্নাঘর থেকে আসে। তানিয়ার পাশে বসে। কিছু বলে না। শুধু বসে। মায়ের হাতে গরম পানির গ্লাস, আদা দেওয়া। তানিয়ার জন্য। তানিয়া নেয়। এক চুমুক খায়। গরম পানি পেটে গেলে ব্যথা কমে। মা জানে।

মা বলে, "ঘুমা এখন। কাল পরীক্ষা।"

তানিয়া বলে, "আর একটু।"

মা উঠে যায়। দরজায় দাঁড়িয়ে একবার তাকায়। মেয়েকে দেখে। ফোনের আলোতে মেয়ের মুখ, যেন একটা দীপ। মা ভাবে, এই মেয়ে বড় কিছু হবে। মা জানে না কী হবে। মা ডাক্তার শব্দটাও শোনেনি তানিয়ার মুখে। কিন্তু মা বোঝে। মায়েরা বোঝে। যেমন ফাতেমা বোঝে, যেমন সব মা বোঝে, মেয়ের চোখে এমন কিছু আছে যেটা সাধারণ না।

মা ঘুমাতে যায়। তার আগে নামাজের জায়নামাজে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত পড়ে। মেয়ের জন্য। মেয়ে জানে না। জানার দরকার নেই। দোয়া গোপনেই ভালো কাজ করে।

তানিয়া পড়ে।

ভ্যানেডিয়াম, ক্রোমিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন...

আয়রন। লোহা। তানিয়ার রক্তে আয়রন কম। মা বলে, "কচুশাক খা।" কচুশাকে আয়রন আছে। তানিয়া জীববিজ্ঞান বইয়ে পড়েছে, হিমোগ্লোবিনে আয়রন থাকে, আয়রন কম থাকলে রক্তশূন্যতা হয়, ক্লান্তি আসে, মাথা ঘোরে। তানিয়ার মাঝে মাঝে মাথা ঘোরে। বিশেষ করে ঋতুস্রাবের সময়। কারণ রক্ত যায়, আয়রন যায়, হিমোগ্লোবিন কমে। এটা চক্র। শরীরের চক্র। মেয়েদের শরীরের চক্র।

ছেলেদের এই চক্র নেই। তারা পড়ে, খায়, ঘুমায়, আবার পড়ে। তাদের শরীর তাদের সাথে যুদ্ধ করে না। তাদের শরীর তাদের পক্ষে। মেয়েদের শরীর? মেয়েদের শরীর নিরপেক্ষ। কখনো সাথে, কখনো বিপক্ষে। তানিয়াকে দুটো যুদ্ধই লড়তে হয়। পরীক্ষার যুদ্ধ আর শরীরের যুদ্ধ।

কিন্তু তানিয়া লড়ে। কারণ বিকল্প নেই।

মেয়েরা পরীক্ষা দেয় দুবার। একবার খাতায়, একবার শরীরে। কিন্তু মেয়েরা দুটোতেই পাস করে। কারণ মেয়েদের কোনো বিকল্প নেই। ফেল করার বিলাসিতা মেয়েদের নেই।

তানিয়া পড়ে। ফোনের আলো তার মুখে পড়ে। অন্ধকার ঘরে একটাই আলো। সেটা তানিয়ার।