বউ
আমি শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। হয়েছি। শুধু ছাত্র একজন।
১
রাবেয়া ভোরে ওঠে আজানের সাথে।
আজানের আগে না, পরেও না, ঠিক সাথে। এটা শাশুড়ি শিখিয়েছে। "আজানের আগে উঠলে তুই পাগল, আজানের পরে উঠলে তুই অলস। আজানের সাথে উঠবি।" রাবেয়া সেই হিসেব মানে। আঠারো মাস হলো এই ঘরে এসেছে, আঠারো মাস ধরে এই হিসেব।
প্রথম কাজ: চা। শাশুড়ির জন্য, শ্বশুরের জন্য, ননদের জন্য। তিন কাপ। শাশুড়ি চায় আদা দিয়ে, কড়া, চিনি কম। শ্বশুর চায় দুধ দিয়ে, পাতলা, চিনি বেশি। ননদ চায় লিকার চা, লেবু দিয়ে। তিনজনের তিন রকম। রাবেয়া মনে রাখে। মনে রাখতে হয়। ভুল হলে চোখের ভাষায় শুনতে হয়, মুখের কথায় না, চোখের কথায়, যেটা আরও কঠিন।
তিন কাপ চায়ে তিন রকম স্বাদ। তিন রকম মেজাজ। রাবেয়া প্রতিটা মনে রাখে, কারণ ভুল করার সুযোগ নেই।
নিজের চা? রাবেয়া খায় না। সকালে চা খেলে পেটে গ্যাস হয়, এটা তার অজুহাত। আসল কারণ: রান্নাঘরে চারটা কাপ নেই। তিনটা আছে। চতুর্থটা ভাঙা গেছে এক মাস আগে। রাবেয়া বলেছিল নতুন কিনতে হবে। শাশুড়ি বলেছিল, "দরকার নাই। তুই তো খাস না।" সেদিন থেকে রাবেয়া সত্যিই খায় না।
চা দিয়ে রান্না শুরু।
সকালের রান্না। মুড়ি ভাজা, আলুভাজি, ডিমভাজি। তারপর দুপুরের রান্না শুরু। ভাত, ডাল, সবজি, মাছ। মাছের কাঁটা বাছতে হয়, শ্বশুর কাঁটা সহ্য করতে পারেন না, গলায় আটকে যায়। রাবেয়া প্রতিটা টুকরো হাত দিয়ে দেখে, কাঁটা বের করে, তারপর হাঁড়িতে দেয়।
রান্নাঘরে রাবেয়ার সকাল শুরু হয় আর শেষও হয় রান্নাঘরে। এর মাঝে কাপড় কাচা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া, ইব্রাহিমকে গোসল করানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো। চক্র। প্রতিদিন একই। সোমবারও একই, শুক্রবারও একই। ঈদের দিনও প্রায় একই, শুধু রান্নাটা বেশি। রাবেয়ার ক্যালেন্ডারে দিনের নাম নেই। শুধু কাজ আছে। কাজ দিয়ে সে দিন চেনে। আজ মুরগি কেটেছি, তাহলে শুক্রবার। আজ ডাল-ভাত, তাহলে সাধারণ দিন।
মাঝে মাঝে রাবেয়া ভাবে, এই ঘরের দেয়ালগুলো যদি কথা বলত। তাহলে কী বলত? বলত, "আমরা দেখেছি তোমাকে কাঁদতে। আমরা দেখেছি তোমাকে একা দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে। আমরা দেখেছি তোমাকে ইব্রাহিমকে জড়িয়ে ধরে চোখ মুছতে।" দেয়ালগুলো কথা বলে না। সেটাই ভালো। কিছু সাক্ষী নিরব থাকাই ভালো।
এই হাতগুলো অন্যকিছু করতে চেয়েছিল।
২
রাবেয়া শিক্ষক হতে চেয়েছিল।
এটা কাউকে বলে না। কাকে বলবে? শাশুড়িকে বললে হাসবে। ননদকে বললে গল্প করবে পাড়ায়। স্বামী শফিককে বললে... শফিক কী বলবে রাবেয়া জানে না। শফিক ভালো মানুষ। গার্মেন্টসে কাজ করে, রাতের শিফট, সকালে ফেরে, দুপুরে ঘুমায়, বিকেলে যায়। মাঝখানে রাবেয়ার সাথে যে সময়টুকু থাকে, সেটুকুতে কথা হয়, কিন্তু গভীর কথা হয় না। গভীর কথা বলার জন্য সময় লাগে, শক্তি লাগে, আর শফিকের দুটোই কম।
রাবেয়া এইচএসসি পাস করেছিল। বিজ্ঞান বিভাগ। জিপিএ ভালো ছিল না, কিন্তু মন্দও ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে চেয়েছিল। বাবা বলেছিল, "দিস।" মা বলেছিল, "আগে বিয়েটা হোক, পরে দেখা যাবে।" পরে আর দেখা হয়নি। বিয়ের পরে "পরে" বলে কিছু থাকে না। বিয়ের পরে সবকিছু "এখন।" এখন রান্না করো। এখন শ্বশুরবাড়ি সামলাও। এখন সন্তান দাও।
সন্তান। এই শব্দটা রাবেয়ার কানে প্রথম বিয়ের ছয় মাস পর এসেছিল। শাশুড়ি বলেনি সরাসরি। শাশুড়ি পাড়ার অন্য বউদের গল্প করেছিল, জোরে জোরে, যেন রাবেয়া শুনতে পায়। "রুমার বিয়ের চার মাসেই পেটে বাচ্চা। আমিনার ছয় মাসে। সাবিনার..." প্রতিটা নাম একটা গুলি। রাবেয়ার দিকে ছোড়া।
রাবেয়ার পেটে বাচ্চা আসতে এক বছর লেগেছিল। সেই এক বছর ছিল একটা দীর্ঘ বিচার। প্রতিটা মাসে যখন ঋতুস্রাব হতো, রাবেয়া জানত, এই মাসেও ব্যর্থ। এই "ব্যর্থ" শব্দটা কে দিয়েছে? কে ঠিক করেছে যে একটা বাইশ বছরের মেয়ের শরীর যদি প্রতি মাসে সন্তান না ধারণ করে তাহলে সে "ব্যর্থ"?
কিন্তু এই প্রশ্নগুলো রাবেয়া জিজ্ঞেস করে না। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মাছের কাঁটা বাছে।
রাবেয়ার একটা বান্ধবী ছিল, ফারজানা। একসাথে পড়ত। ফারজানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ফারজানার বিয়ে হয়নি। ফারজানার ফেসবুকে ছবি আসে, ক্যাম্পাসে, বান্ধবীদের সাথে, হাসিমুখ। রাবেয়া দেখে। দেখে আর ভাবে, ও জায়গায় আমি থাকতে পারতাম। ঐ হাসিটা আমার হতে পারত। ঐ ক্যাম্পাসের গাছটার নিচে আমি বসতে পারতাম।
কিন্তু পারতাম আর পারিনি, এই দুটো শব্দের মাঝে একটা পুরো জীবন পার হয়ে গেছে। রাবেয়া ফেসবুক বন্ধ করে। ইব্রাহিমকে দুধ দেয়।
ইব্রাহিমের মুখে দুধের ফেনা। রাবেয়া মুছে দেয়। এই মুখ, এই ছোট্ট গোল মুখ, এটাই রাবেয়ার সব। ফারজানার ক্যাম্পাস নেই, কিন্তু এই মুখ আছে। এটুকু থাকলে চলে।
৩
ছেলে হয়েছে। নাম রাখা হয়েছে ইব্রাহিম। শাশুড়ি নাম রেখেছে।
রাবেয়া রাখতে চেয়েছিল "অয়ন।" সে একটা বইয়ে পড়েছিল এই নাম। অর্থ: সূর্যের গতিপথ। সুন্দর নাম। কিন্তু শাশুড়ি বলেছিল, "ও নাম কীসের? ইব্রাহিম, নবীর নাম।" রাবেয়া কিছু বলেনি। নামে কী আসে যায়? ছেলেটা তো তার। নামটা শাশুড়ির হোক।
কিন্তু মাঝে মাঝে, যখন কেউ শোনে না, রাবেয়া ছেলেকে "অয়ন" বলে ডাকে। ফিসফিস করে। ছেলে বোঝে না, ছেলের বয়স চৌদ্দ মাস, সে কিছুই বোঝে না। কিন্তু রাবেয়া ডাকে। এটা তার বিদ্রোহ। ছোট্ট, গোপন, নিঃশব্দ বিদ্রোহ। কেউ জানে না। এটাই এর শক্তি।
ইব্রাহিমের জন্মের সময় রাবেয়ার শরীর ফেটে পড়েছিল। প্রসবে এপিসিওটমি হয়েছিল। সেলাই পড়েছিল। সেই সেলাই সারতে তিন সপ্তাহ লেগেছিল। তিন সপ্তাহ রাবেয়া হাঁটতে পারেনি ঠিকমতো। কিন্তু রান্না করেছে। কারণ রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থাকা যায়, হাঁটতে হয় না। রাবেয়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রান্না করেছে, ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে, আর ইব্রাহিম পাশের ঘরে কেঁদেছে।
শফিক বলেছিল, "তুমি রেস্ট নাও, আম্মা রান্না করবে।" শাশুড়ি বলেছিল, "আমার হাঁটুতে ব্যথা।" দুটো ব্যথার ভেতর শাশুড়ির ব্যথা জিতেছিল। কারণ শাশুড়ির ব্যথা পুরোনো। পুরোনো ব্যথার মর্যাদা বেশি। নতুন ব্যথাকে অপেক্ষা করতে হয়।
রাবেয়া ভাবে, তার শরীরটা আর আগের মতো নেই। আঠারো বছরের শরীর ছিল যখন বিয়ে হলো। শক্ত, তরুণ, ক্লান্তি জানত না। এখন বাইশ, কিন্তু শরীর যেন তিরিশের। গর্ভধারণ শরীরকে বদলে দেয়। পেটে দাগ, স্তনে পরিবর্তন, পিঠে ব্যথা। এগুলো কেউ বলে না আগে থেকে। কেউ সতর্ক করে না। বিয়ের আগে কেউ বলেনি, "তোমার শরীর বদলে যাবে।" শুধু বলেছিল, "সংসার করবে, সুখে থাকবে।" সুখ? সুখ কোনটা? ইব্রাহিমের হাসি সুখ। শফিকের "তুমি কেমন আছো?" সুখ। কিন্তু সেলাইয়ের ব্যথা? একা রান্নাঘরে দাঁড়ানো? নিজের স্বপ্ন ভুলে যাওয়া? এগুলো কী?
এগুলোর কোনো নাম নেই। বাংলায় এমন কোনো শব্দ নেই যেটা দিয়ে একজন বউয়ের সেই অবস্থাটা বোঝানো যায় যেখানে সে সুখীও না, অসুখীও না, শুধু আছে। শুধু টিকে আছে। শুধু চলছে। দিনের পর দিন, রুটিনের পর রুটিন।
৪
বিকেলে, ইব্রাহিম ঘুমালে, রাবেয়ার কিছুটা সময় থাকে।
এই সময়টুকু তার। শুধু তার। পনেরো থেকে বিশ মিনিট। কখনো আধঘণ্টা, যদি ভাগ্য ভালো থাকে।
রাবেয়া তখন ফোনে পড়ে। ইউটিউবে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের ভিডিও দেখে। তারা কীভাবে অ, আ, ই, ঈ শেখায়। কীভাবে ছোট বাচ্চাদের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বর্ণমালা বলে। কীভাবে চক দিয়ে বোর্ডে লেখে। রাবেয়া দেখে আর ভাবে, এটা সে হতে পারত।
তারপর ভিডিও বন্ধ করে। ইব্রাহিমকে কোলে নেয়। আর শেখায়।
"এটা কী? এটা আম। আ-ম। বলো, আম।"
ইব্রাহিম বলে, "আআআ।"
রাবেয়া হাসে। "হ্যাঁ, আ। ভালো।"
এটাই তার শিক্ষকতা। আটশো বর্গফুটের ক্লাসরুম। একজন ছাত্র। কোনো বেতন নেই। কোনো সার্টিফিকেট নেই। কোনো স্বীকৃতি নেই। কিন্তু ইব্রাহিম যখন "আ" বলে, রাবেয়ার বুকে যে অনুভূতি হয়, সেটা কোনো বেতনে কেনা যায় না। সেটা একজন শিক্ষকেরই অনুভূতি। পাঠ গ্রহণ করা হয়েছে। বীজ রোপণ করা হয়েছে। ফল ধরবে। কবে, কে জানে। কিন্তু ধরবে।
রাবেয়া ভাবে, ইব্রাহিম বড় হলে কী হবে? বাবার মতো গার্মেন্টসে যাবে? নাকি পড়বে? রাবেয়া চায় ছেলে পড়ুক। অনেক পড়ুক। রাবেয়া যেটুকু পড়তে পারেনি, ইব্রাহিম সেটা পড়বে। রাবেয়ার অসমাপ্ত পথটা ইব্রাহিম হেঁটে শেষ করবে। এটা কি ঠিক? সন্তানের ওপর নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়া? রাবেয়া জানে না। কিন্তু জানে যে এটা মায়েরা করে। সব মায়েরা করে। ফাতেমা করেছিল, ফাতেমার মাও করেছিল। এটা শৃঙ্খল না, এটা সেতু। এক প্রজন্ম যেটা পারেনি, পরের প্রজন্ম সেটা পারবে। মা সেতুর পাটাতন, সন্তান পথিক।
ইব্রাহিম আবার বলে, "আআআম!"
রাবেয়া হাসে। "আম! ভালো! এবার বলো, ই-তে ইলিশ।"
ইব্রাহিম বলে, "ইইই!"
রাবেয়া জড়িয়ে ধরে। এই মুহূর্তটা তার। শুধু তার।
রাবেয়া ইব্রাহিমকে শেখায় "অ" থেকে "ঔ" পর্যন্ত। ইব্রাহিম কিছুই বলতে পারে না ঠিকমতো। কিন্তু রাবেয়া শেখায়। এটা ইব্রাহিমের জন্য না। এটা রাবেয়ার নিজের জন্য। এটা তার সেই স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখা। ছোট্ট একটা আগুন, ফুঁ দিলে নিভে যাবে, কিন্তু রাবেয়া ফুঁ দেয় না। আলতো করে রাখে। আলতো করে জ্বালিয়ে রাখে।
রাবেয়া ভাবে তার মায়ের কথা। মা বলেছিল, "বিয়ে মানে নতুন জীবন।" নতুন জীবন ঠিকই। কিন্তু মা বলেনি যে নতুন জীবনে পুরোনো জীবনটা মরে যাবে। পুরোনো রাবেয়া, যে ক্লাসে প্রথম সারিতে বসত, যে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে হাত তুলত, যে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় গিয়েছিল, যে স্বপ্ন দেখত, সেই রাবেয়া এখন রান্নাঘরের ধোঁয়ায় মিশে গেছে। নতুন রাবেয়া মাছের কাঁটা বাছে।
দুটো রাবেয়া একই শরীরে থাকে। একটা বাইরের, যেটা শাশুড়ির কথা শোনে, ননদের সাথে মানিয়ে চলে, স্বামীর জন্য খাবার গরম রাখে। আরেকটা ভেতরের, যেটা এখনো স্বপ্ন দেখে, যেটা এখনো বই পড়তে চায়, যেটা এখনো শিক্ষক হতে চায়। বাইরের রাবেয়া সবাই চেনে। ভেতরের রাবেয়াকে কেউ চেনে না। এমনকি শফিকও না।
৫
সন্ধ্যায় রাবেয়া ছাদে যায়। ছাদ বলতে টিনের চালের ওপর একটুখানি সমতল জায়গা, যেখানে কাপড় শুকানো হয়। রাবেয়া কাপড় তুলতে যায়, কিন্তু কাপড় তুলে নেওয়ার পরও দাঁড়িয়ে থাকে।
এখান থেকে একটু দূরে দেখা যায়। পাশের বাড়ির চাল, তার পাশে গাছ, তার পাশে রাস্তা, রাস্তার ওপারে আরও বাড়ি। আটশো বর্গফুটের বাইরের পৃথিবী। রাবেয়া সেদিকে তাকায়। বাতাস আসে, চুল উড়ে যায়। সন্ধ্যার আজান হচ্ছে দূরে।
রাবেয়া ভাবে, বিয়ের আগে সে ছাদে গিয়ে আকাশ দেখত। বাবার বাড়ির ছাদ বড় ছিল, পাকা ছাদ, সেখানে বসে পড়া যেত, গল্প করা যেত, তারা দেখা যেত। এখানকার ছাদ ছোট, টিনের, গরম, দাঁড়ানো ছাড়া কিছু করা যায় না। কিন্তু আকাশটা একই। আকাশ বদলায় না। ভূগোল বদলায়, ঠিকানা বদলায়, ঘরের মাপ বদলায়, কিন্তু ওপরে তাকালে একই আকাশ। সেটুকু রাবেয়ার।
একটা বিমান যায়। দূরে, উঁচুতে, সাদা রেখা রেখে। রাবেয়া ভাবে, বিমানে যারা বসে আছে তারা কোথায় যাচ্ছে? দুবাই? সিঙ্গাপুর? লন্ডন? রাবেয়া কোথাও যায়নি। বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি, এটাই তার দূরতম ভ্রমণ। চব্বিশ কিলোমিটার। একটা বাসে।
"বউমা! নিচে আয়!"
শাশুড়ির ডাক। রাবেয়া নামে। আকাশটা রেখে যায়। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবে, আকাশটা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। ঘর, রান্নাঘর, সময়সূচি, নাম, সব নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিন্তু আকাশ? আকাশ সবার। আকাশে কারো শাশুড়ি নেই।
রাবেয়া নিচে নেমে দেখে শাশুড়ি নাতিকে কোলে নিয়ে বসে আছে। ইব্রাহিম দাদির কোলে হাসছে। শাশুড়ি ইব্রাহিমের সাথে কথা বলছে, নরম গলায়, যে গলা রাবেয়া কখনো শোনেনি। "আমার সোনা, আমার মণি, আমার চাঁদ।" এই শব্দগুলো শাশুড়ির মুখ থেকে বেরোচ্ছে, আর রাবেয়া অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মানুষটাই সকালে চোখ দিয়ে চাবুক মারে। এই মানুষটাই এখন নাতির গালে চুমু খাচ্ছে।
রাবেয়া বোঝে, শাশুড়ি খারাপ মানুষ না। শাশুড়ি জটিল মানুষ। ভালোবাসা আছে, কিন্তু প্রকাশের ভাষা বদলে গেছে কোথাও, কোনো এক সময়ে, জোবেদার হাতায়, কুড়ি বছরের চাপা যন্ত্রণায়। সেই ভাষা এখন আর সরলরেখায় আসে না। ঘুরপথে আসে। নাতির মধ্য দিয়ে আসে। পিঠার মধ্য দিয়ে আসে। কিন্তু আসে।
৬
রাতে শফিক ফেরে।
ক্লান্ত। রাতের শিফট মানে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোর দুইটা। আটঘণ্টা সেলাই মেশিনের সামনে। শফিকের চোখ লাল, পিঠ ব্যথা, আঙুলে সুতোর দাগ। রাবেয়া খাবার গরম করে দেয়। শফিক খায়, বেশি কথা বলে না। ক্লান্ত মানুষ কম কথা বলে।
কিন্তু মাঝে মাঝে শফিক কথা বলে। মাঝে মাঝে, যখন একটু কম ক্লান্ত থাকে, যখন ফ্যাক্টরিতে দিনটা মোটামুটি ছিল, তখন বলে।
"তুমি কেমন আছো?"
এই প্রশ্নটা রাবেয়া অন্য কারো কাছ থেকে শোনে না। শাশুড়ি জিজ্ঞেস করে না। ননদ করে না। পাড়ার মানুষ করে না। শুধু শফিক। আর সেটাও মাঝে মাঝে।
"ভালো আছি।"
শফিক হাত ধরে। আলতো করে। ক্লান্ত হাত, কিন্তু উষ্ণ। রাবেয়ার শরীর সেই উষ্ণতা চেনে। এই উষ্ণতা সারাদিনের ক্লান্তি একটু কমায়। একটুই। কিন্তু সেই একটু যথেষ্ট। মরুভূমিতে এক ফোঁটা পানি অনেক।
এটা কি মিথ্যা? রাবেয়া জানে না। ভালো থাকা কী, সেটা রাবেয়া ভুলে গেছে। বিয়ের আগে "ভালো থাকা" মানে ছিল বান্ধবীদের সাথে আড্ডা, বাবার সাথে টিভি দেখা, মায়ের পাশে শুয়ে গল্প শোনা, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া। বিয়ের পরে "ভালো থাকা" মানে কী? শাশুড়ি বকেনি? ননদ কিছু বলেনি? ইব্রাহিম অসুস্থ হয়নি? শফিক রেগে যায়নি? "ভালো থাকা" এখন "খারাপ না থাকা।" সেটাই যথেষ্ট।
রাবেয়া শফিকের পাশে শোয়। ইব্রাহিম মাঝখানে। ইব্রাহিমের ছোট্ট শ্বাসের শব্দ ঘরে ভরে থাকে। শফিক তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। রাবেয়া জেগে থাকে। রাতে জেগে থাকা তার অভ্যাস। ইব্রাহিম কাঁদলে উঠতে হবে, দুধ দিতে হবে, কোলে নিতে হবে। শফিকের ঘুম ভাঙানো যাবে না, কাল আবার শিফট।
জেগে থেকে রাবেয়া জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। আকাশ দেখা যায় না। সামনে পাশের বাড়ির দেয়াল। দেয়ালে জানালা আছে, কিন্তু বন্ধ। সবার জানালা বন্ধ। সবাই ঘুমাচ্ছে।
রাবেয়া চোখ বন্ধ করে। ভেতরে একটা ক্লাসরুম কল্পনা করে। সেখানে অনেকগুলো বাচ্চা বসে আছে। রাবেয়া সামনে দাঁড়িয়ে আছে। চক হাতে। বোর্ডে লিখছে: "অ"-তে "অজগর।" বাচ্চারা হাসছে। রাবেয়াও হাসছে।
চোখ খোলে। আটশো বর্গফুট। পাশের দেয়াল। ঘুমন্ত স্বামী। ঘুমন্ত ছেলে।
আমি শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। হয়েছি। শুধু ছাত্র একজন।
ইব্রাহিম নড়ে ওঠে ঘুমের মধ্যে। রাবেয়া হাত রাখে তার পেটে। আলতো করে। ইব্রাহিম শান্ত হয়। এই হাত, যে হাত মাছের কাঁটা বাছে, যে হাত চায়ের কাপ ধরে, যে হাত সারাদিন কাজ করে, এই হাতই ইব্রাহিমের শিক্ষকের হাত। এই হাতই ইব্রাহিমকে শেখাবে প্রতিটা বর্ণ, প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বাক্য। এই হাতের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
রাবেয়া ঘুমায়। কাল ভোরে আজান হবে। আজানের সাথে উঠতে হবে। চা বানাতে হবে। তিন কাপ।
কিন্তু আজ রাতে, এই মুহূর্তে, রাবেয়া শিক্ষক।
আর কাল? কাল আবার বউ। কাল আবার আজান, চা, রান্না, শাশুড়ি, ননদ, কাপড় কাচা, মাছের কাঁটা। কাল আবার একই চক্র। কিন্তু রাতের এই মুহূর্তটা রাবেয়ার। এই মুহূর্তটা কেউ কেড়ে নিতে পারে না। এই মুহূর্তে রাবেয়া যা চেয়েছিল তাই। এই মুহূর্তে ইব্রাহিমের ঘুমন্ত মুখটা তার ক্লাসরুমের সেরা ছাত্রের মুখ। এই মুহূর্তে আটশো বর্গফুট পুরো পৃথিবী।
জানালার বাইরে কোথাও একটা রাতের পাখি ডাকছে। রাবেয়া শোনে। মনে করে, পাখিও জেগে আছে। পাখিও একা। পাখিরও হয়তো কোনো স্বপ্ন ছিল যেটা পূরণ হয়নি। হয়তো পাখিও রাতে ডেকে সেই স্বপ্নের কথা বলে।
রাবেয়া হাসে। নিজের কাছে। চুপচাপ। এটা তার হাসি। শুধু তার।