শাশুড়ি

শাশুড়ি মানে এমন একজন নারী যে নিজের কষ্ট ভুলতে পারেনি

পর্ব ৪ · ১৫ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

হালিমা সকালে চা খায় একা।

এটা তার সময়। শুধু তার। সারাদিনের ভেতরে এটাই একমাত্র সময় যখন কেউ তার কাছে কিছু চায় না। কেউ "আম্মা" বলে ডাকে না। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না। চা, সকাল, নীরবতা। তিনটে মিলে একটা ছোট্ট স্বাধীনতা।

রান্নাঘরের দরজায় বসে, পা দুটো উঠানের দিকে ঝুলিয়ে। চায়ে আদা আছে, দুধ নেই। কড়া, তেতো, যেমন তার পছন্দ। এই পছন্দ তার নিজের তৈরি। বিয়ের পর প্রথম পনেরো বছর সে যে চা খেত, সেটা তার শাশুড়ির পছন্দমতো ছিল। তার শাশুড়ি চাইত দুধ চা, পাতলা, চিনি বেশি। হালিমা সেটা বানাত, সেটা খেত, সেটা পছন্দ করত। শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর হালিমা বুঝল, সে দুধ চা পছন্দ করে না। কখনো করেনি। সে পছন্দ করে আদা চা, কড়া, তেতো।

পনেরো বছর লেগেছিল নিজের পছন্দ আবিষ্কার করতে। এটা কি ট্র্যাজেডি? হালিমা ভাবে না। হালিমা এটাকে বলে "সংসার।" সংসারে নিজের পছন্দ থাকে না। সংসারে সবার পছন্দ থাকে, আর সবার পছন্দ মেটানোর পরে যেটুকু সময় বাকি থাকে, সেটুকুতে নিজের পছন্দ খুঁজতে হয়। অনেকে খুঁজে পায় না। হালিমা পেয়েছে। দেরিতে, কিন্তু পেয়েছে।

হালিমার আরও কিছু পছন্দ আছে যেগুলো সে সম্প্রতি আবিষ্কার করেছে। সে পছন্দ করে সকালে একা বসে পাখি দেখতে। বুলবুল, শালিক, দোয়েল। দোয়েলটা প্রতিদিন আসে, ঠিক এই সময়ে, বেড়ার ওপর বসে। হালিমা ভাবে, দোয়েলটাও একা। দোয়েলেরও কেউ নেই এই সকালে। দুজনে একসাথে একা। এটা একটা অদ্ভুত সঙ্গ, যেখানে কেউ কারো কাছে কিছু চায় না, শুধু থাকে।

উঠান পরিষ্কার। হালিমা প্রতিদিন ঝাড়ু দেয়। ঝাড়ু দেওয়া তার ধ্যান। ঝাড়ু দেওয়ার সময় সে কিছু ভাবে না। শুধু ঝাড়ু চলে, ধুলো সরে, মাটি পরিষ্কার হয়। এটুকুই। মানুষের জীবনে এরকম কিছু কাজ থাকা দরকার যেখানে চিন্তা থামে। হালিমার জন্য সেটা ঝাড়ু।

ভেতরে রাবেয়া রান্না করছে। হালিমা শুনতে পায়। হাঁড়ির আওয়াজ, চুলার ফুঁ, কাটাকুটির শব্দ। রাবেয়া ভালো রাঁধে। এটা হালিমা স্বীকার করে, তবে রাবেয়ার সামনে বলে না। বললে রাবেয়া আলগা হয়ে যাবে। ছেড়ে দিলে রান্নার মান কমবে। এটা হালিমার যুক্তি। এই যুক্তি কি ঠিক? হালিমা জানে না। কিন্তু তার শাশুড়ি এই যুক্তি ব্যবহার করত। তার শাশুড়ির শাশুড়িও সম্ভবত করত। এটা একটা শৃঙ্খল। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চলে আসা শৃঙ্খল।

ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণ একসাথে গাঁথা, যেমন মালায় ফুল আর সুতো। ফুল ছাড়া মালা সুন্দর না। সুতো ছাড়া মালা টেকে না। হালিমা সুতো। রাবেয়া ফুল। দুজনে মিলে মালা। কিন্তু মালাটা কার গলায়? এই প্রশ্নের উত্তর জটিল।

হালিমা যখন বউ ছিল, তার শাশুড়ির নাম ছিল জোবেদা।

জোবেদা। এই নাম উচ্চারণ করলে হালিমার ভেতরে কিছু একটা শক্ত হয়ে যায়। পেশি শক্ত হয়, চোয়াল শক্ত হয়, যেন শরীর আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। কুড়ি বছর পরেও।

জোবেদা বেঁটে মানুষ ছিল, কিন্তু তার উপস্থিতি ঘর ভরে থাকত। জোবেদার চোখ ছিল ধারালো, যেন দা-এর ফলা। সেই চোখ দিয়ে সে হালিমাকে মাপত। প্রতিটা কাজ, প্রতিটা পদক্ষেপ, প্রতিটা শব্দ। হালিমার ভাত যদি একটু বেশি সেদ্ধ হতো, জোবেদা কিছু বলত না, শুধু ভাতের দিকে তাকাত। সেই তাকানো যথেষ্ট ছিল।

জোবেদা হালিমাকে মেরেছে। তিনবার। প্রথমবার রান্নাঘরে, হালিমা দুধ উথলে ফেলে দিয়েছিল। জোবেদা হাতা দিয়ে পিঠে মেরেছিল। দ্বিতীয়বার উঠানে, হালিমা পাশের বাড়ির বউয়ের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, জোবেদা চুল ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে গিয়েছিল। তৃতীয়বার... তৃতীয়বারের কথা হালিমা ভাবতে চায় না।

স্বামী ইদ্রিস জানত। কিন্তু ইদ্রিস কিছু বলত না। ইদ্রিস ভালো মানুষ ছিল, কিন্তু ভালো মানুষ আর সাহসী মানুষ এক নয়। ইদ্রিস মায়ের সাথে কথা বলতে পারত না। অনেক ছেলেই পারে না। তারা বাইরে সিংহ, ঘরে মায়ের সামনে বিড়াল।

হালিমা সইয়েছে। কুড়ি বছর। জোবেদা মারা যাওয়ার দিন হালিমা কেঁদেছিল। কেন কেঁদেছিল, সে নিজেও জানে না। দুঃখে? স্বস্তিতে? নাকি সেই কান্না ছিল কুড়ি বছরের জমানো কান্না যেটা আর ধরে রাখা গেল না? হালিমা জানে না। কান্নার কারণ সবসময় জানা যায় না। কান্না মাঝে মাঝে তার নিজের পথে আসে। কান্না জিজ্ঞেস করে না, "এখন আসব?" কান্না আসে, হয়ে যায়, চলে যায়।

হালিমা কাঁদতে পারে। এটা তার শক্তি। অনেকে পারে না।

জোবেদা মারা গেল, আর হালিমা রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। সেই দরজা যেটা এতদিন জোবেদার ছিল। এখন হালিমার। ক্ষমতার হস্তান্তর। নিঃশব্দে, কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া, কোনো ঘোষণা ছাড়া। শুধু একজন বৃদ্ধা চোখ বন্ধ করল, আর আরেকজন নারী সেই চোখের জায়গায় নিজের চোখ বসাল।

জোবেদার একটা জিনিস হালিমা রেখে দিয়েছে। একটা রুপোর বাটি। ছোট, হাতের তালুতে ধরে যায়। জোবেদা এই বাটিতে পান সাজাত। চুন, খয়ের, সুপারি, জর্দা। বাটিটা এখন হালিমার আলমারিতে। হালিমা পান খায় না। কিন্তু বাটিটা রাখে। কেন? জোবেদাকে মনে রাখার জন্য? নাকি মনে রাখার জন্য যে কী ছিল, যেন ভুলে না যায়, যেন আবার না হয়? হালিমা জানে না। কিছু জিনিস রাখার কারণ মানুষ নিজেও জানে না।

এখন হালিমা শাশুড়ি। ষাট বছরের শাশুড়ি।

তার শরীরেও ইতিহাস আছে। তিনটা সন্তান জন্ম দিয়েছে। দুটো ছেলে, একটা গর্ভপাত। গর্ভপাতটা কেউ জানে না। সেটা ছিল তৃতীয় সন্তানের চেষ্টায়। মেয়ে হতো হয়তো। হালিমা বিশ্বাস করে মেয়ে হতো। কারণ পেটে যখন ছিল, তখন মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করত। "মেয়ে হলে মিষ্টি খেতে মন চায়" বলত তার মা। এটা কুসংস্কার? হতে পারে। কিন্তু হালিমার জন্য এটা সত্য। সেই না-জন্মানো মেয়ের জন্য হালিমা মাঝে মাঝে চোখের পানি ফেলে। কাউকে দেখায় না। দেখানোর কেউ নেই।

সে জানে পাড়ায় তাকে কী বলে। "কড়া শাশুড়ি।" "বউকে একটু বিশ্রাম দেয় না।" "জোবেদার মতোই হয়ে গেছে।"

জোবেদার মতো? হালিমা ভাবে। সত্যি কি? সে কি জোবেদা হয়ে গেছে?

না। হালিমা রাবেয়াকে মারেনি। কখনো মারবেও না। হালিমা জানে মারের ব্যথা কেমন। সেই ব্যথা সে অন্য কাউকে দেবে না। এটা তার শপথ। নিজের কাছে করা, নিঃশব্দ শপথ।

কিন্তু হালিমা নিয়ন্ত্রণ করে। রান্নাঘরের সময়সূচি তার। বাজারের তালিকা তার। কোন দিন কী রান্না হবে, কার প্লেটে কতটুকু থাকবে, কখন ঘরে আলো জ্বলবে আর কখন নিভবে, সব তার। এই নিয়ন্ত্রণ কি নিষ্ঠুরতা? হালিমা বলবে, না। হালিমা বলবে, এটা ব্যবস্থাপনা। সংসার চালাতে হলে কাউকে ধরতে হয়। সেটা সে ধরেছে।

কিন্তু রাতে, একা বিছানায়, ইদ্রিস পাশে ঘুমাচ্ছে, তখন হালিমা জানে সত্যিটা অন্যরকম। সত্যিটা হলো: কুড়ি বছর যে মানুষটার কোনো ক্ষমতা ছিল না, সে ক্ষমতা পেলে ছাড়তে চায় না। যে মানুষটা কুড়ি বছর ধরে চুপ ছিল, সে কথা বলার সুযোগ পেলে থামতে চায় না। যে মানুষটার পছন্দ-অপছন্দ কেউ জিজ্ঞেস করত না, সে এখন সবার পছন্দ-অপছন্দ নির্ধারণ করতে চায়।

এটা কি প্রতিশোধ? না। প্রতিশোধ সচেতন। হালিমার নিয়ন্ত্রণ অচেতন। সে জানেই না যে সে নিয়ন্ত্রণ করছে। সে ভাবে সে সংসার চালাচ্ছে। সংসার চালানো আর নিয়ন্ত্রণ করা, এই দুটোর মাঝের সীমারেখা এত সূক্ষ্ম যে খালি চোখে দেখা যায় না।

হালিমা মাঝে মাঝে ভাবে, রাবেয়া কি তাকে ভয় পায়? সম্ভবত পায়। হালিমা জানে রাবেয়ার হাত কাঁপে যখন সে চা নিয়ে আসে। হালিমা জানে রাবেয়া ভাতের হাঁড়ির দিকে তাকায় আগে হালিমার দিকে, তারপর বেড়ে দেয়, যেন হালিমার অনুমোদন দরকার। এই ভয়টা হালিমার ভালো লাগে না। কিন্তু এই ভয়টা হালিমাকে একটা নিশ্চয়তা দেয়। সংসারে কেউ ধরবে, নয়তো সব এলোমেলো হয়ে যাবে। হালিমা ধরে আছে। এই ধরাটা ভালোবাসা না, ক্ষমতা না, অভ্যাস। শুধু অভ্যাস।

হালিমার নিজের একটা মেয়ে হলে ভালো হতো। মেয়ে থাকলে পিঠার রেসিপি দিত মেয়েকে, গল্প বলত মেয়েকে, মেয়ের সাথে বসে চা খেত। কিন্তু আল্লাহ মেয়ে দেননি। ছেলে দিয়েছেন। ছেলে ভালো, কিন্তু ছেলের সাথে মায়ের যে সম্পর্ক, সেটা মেয়ের সাথে হওয়া সম্পর্কের মতো না। মেয়ে মায়ের সখী হতে পারে। ছেলে হতে পারে না। ছেলে মায়ের গর্ব, কিন্তু সখী? কখনো না।

তাই রাবেয়া। রাবেয়া ছেলের বউ, কিন্তু হালিমা মাঝে মাঝে ভাবে, রাবেয়া যদি তার মেয়ে হতো। তাহলে সবকিছু অন্যরকম হতো। তাহলে হালিমা নিয়ন্ত্রণ করত না, শেখাত। তাহলে হালিমা কড়া হতো না, নরম হতো। কিন্তু রাবেয়া মেয়ে না। রাবেয়া বউ। আর "বউ" শব্দটার সাথে এত শতাব্দীর বোঝা জড়িয়ে আছে যে হালিমা চাইলেও নামাতে পারে না।

হালিমার একটা সন্ধ্যার অভ্যাস আছে। সন্ধ্যায় সে নামাজ পড়ে, তারপর জায়নামাজে বসে থাকে কিছুক্ষণ। চোখ বন্ধ করে। কিছু ভাবে না। শুধু বসে থাকে। এটা তার বিশ্রাম। সারাদিন যে নিয়ন্ত্রণ করে, সেই মানুষটারও বিশ্রাম দরকার। কিন্তু এই বিশ্রামের কথা কেউ জানে না। সবাই ভাবে হালিমা নামাজ পড়ছে। আসলে হালিমা শুধু বসে আছে। শুধু থেমে আছে। যেন একটা ঘড়ি, যেটা সারাদিন টিকটিক করেছে, সন্ধ্যায় একটু থামল।

বিকেলে হালিমা পিঠা বানায়।

ভাপা পিঠা। চালের গুঁড়ো, নারকেল, গুড়। এই তিনটা জিনিস মেশানোর অনুপাত হালিমার হাতে। কোনো মাপ নেই, কোনো রেসিপি নেই। হাতই জানে কতটুকু লাগবে। এই জ্ঞান তার মায়ের কাছ থেকে এসেছে। মা বলত, "হাত দিয়ে বুঝবি, চোখ দিয়ে না।" হালিমা হাত দিয়ে বুঝেছে।

রাবেয়া পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে।

হালিমা জানে রাবেয়া দেখছে। দেখুক। শেখা দরকার। এই পিঠা বানানোর পদ্ধতি কোনো বইয়ে নেই, কোনো ইউটিউবে নেই। এটা হাত থেকে হাতে যায়। মা থেকে মেয়ে। শাশুড়ি থেকে বউ। একটা অদৃশ্য সুতোর মতো, যেটা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টানা আছে, যেটা ছিঁড়ে গেলে আর জোড়া লাগে না।

"আসো, হাত লাগাও।"

রাবেয়া একটু অবাক হয়। হালিমা সাধারণত সাহায্য চায় না। হালিমা সবকিছু নিজে করে। রান্নাঘর তার রাজত্ব, সেখানে অন্য কেউ ঢুকলে সে অস্বস্তি বোধ করে। কিন্তু আজ ডেকেছে। হালিমা সাধারণত সাহায্য চায় না। হালিমা নিজে করে।

কিন্তু আজ হালিমা ডেকেছে। কেন? হালিমা নিজেও জানে না পুরোটা। কিন্তু কিছু একটা আছে। একটা টান। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া জিনিস কাউকে দিতে হয়। না দিলে সেটা হারিয়ে যায়। হালিমার মেয়ে নেই, ছেলে আছে। ছেলেরা পিঠা বানায় না। তাহলে কাকে দেবে? বউকে।

রাবেয়া পাশে এসে বসল। হালিমা তার হাত ধরে চালের গুঁড়োতে রাখল।

"এইটুকু নারকেল, বুঝলি? বেশি দিলে ভেজা হয়ে যাবে। কম দিলে স্বাদ হবে না।"

রাবেয়া মাথা নাড়ল।

হালিমার হাত রাবেয়ার হাতের ওপর। দুজনের হাত একসাথে চালের গুঁড়ো মাখছে। এই মুহূর্তটা অদ্ভুত। শাশুড়ি আর বউ, নিয়ন্ত্রণকারী আর নিয়ন্ত্রিত, দুজন একসাথে পিঠা বানাচ্ছে। এই মুহূর্তে কোনো ক্ষমতার লড়াই নেই। শুধু চালের গুঁড়ো, নারকেল, গুড়। আর দুই প্রজন্মের দুটো হাত। একটা হাত জোবেদার মার সহ্য করেছে। আরেকটা হাত হালিমার চোখ সহ্য করে। কিন্তু এই মুহূর্তে দুটো হাতই শুধু পিঠা বানাচ্ছে। শুধু চালের গুঁড়ো মাখছে। এটুকুই।

"গুড়টা একটু ভেঙে দে, ছোট ছোট টুকরো।"

রাবেয়া গুড় ভাঙে। হালিমা দেখে। রাবেয়ার হাত পাতলা, তরুণ, শক্ত। হালিমার হাত মোটা, বুড়ো, গেঁটে বাত শুরু হয়েছে। কিন্তু দুটো হাতই জানে কী করতে হবে। একটা হাত শিখেছে, আরেকটা শিখছে।

হালিমা দেখে রাবেয়া যত্ন করে কাজ করছে। তাড়াহুড়ো করছে না। এটা ভালো লক্ষণ। পিঠায় তাড়াহুড়ো করলে হয় না। পিঠা ধৈর্যের খাবার। চালের গুঁড়ো সময় নিয়ে মাখতে হয়। গুড় আস্তে আস্তে গলাতে হয়। ভাপ দিতে সময় দিতে হয়। তাড়াহুড়ো করলে পিঠা কাঁচা থাকে, অথবা পুড়ে যায়। জীবনের মতো।

হালিমা ভাবে, তার জীবনটাও একটা পিঠা। কাঁচাও ছিল, পোড়াও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিঠা হয়েছে। খেতে খারাপ না।

"আম্মা, গুড় কতটুকু?"

"হাতেই বুঝবি। হাত বলে দেবে।"

পিঠা তৈরি হলো। গরম গরম। ভাপ বেরোচ্ছে। হালিমা প্রথম পিঠাটা রাবেয়ার হাতে দিল।

রাবেয়া তাকাল। অবাক। হালিমা কখনো প্রথম পিঠা কাউকে দেয় না। প্রথম পিঠা সবসময় হালিমার। নিজে চেখে দেখে, ঠিক হয়েছে কিনা, তারপর বাকিদের দেয়।

"খা। বলো কেমন হইছে।"

রাবেয়া খেল। চোখ বন্ধ করে চিবাল। গুড়ের মিষ্টি। নারকেলের ঘ্রাণ। চালের নরম গুঁড়ো। একসাথে মিশে মুখে গলে যাচ্ছে।

"খুব ভালো হইছে, আম্মা।"

হালিমা কিছু বলল না। কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটু কিছু নড়ল। হাসি? হতে পারে। হালিমার হাসি ছোট হয়, দ্রুত চলে যায়, কেউ ধরতে পারে না।

রাতে হালিমা একটা পিঠা আলাদা করে রাখে।

রাবেয়ার জন্য। রাবেয়া জানে না। হালিমা বলে না। কাল সকালে চায়ের সাথে রাবেয়া পাবে। ভাববে বাকি ছিল। বাকি ছিল না। হালিমা রেখেছে।

এটাও ভালোবাসা। হালিমার ভালোবাসা সরাসরি আসে না। হালিমার ভালোবাসা ঘুরপথে আসে। একটা পিঠা আলাদা রাখার মধ্য দিয়ে। একটু বেশি মাছ রাবেয়ার প্লেটে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। ননদকে বলা, "বউমার সাথে ঝগড়া করবি না," এটার মধ্য দিয়ে।

হালিমা নিজের বিছানায় শোয়। ইদ্রিস ঘুমাচ্ছে। ইদ্রিসের নাক ডাকে। চল্লিশ বছর ধরে এই নাক ডাকার শব্দ শুনছে হালিমা। এখন এটা তার ঘুমের ওষুধ। এটা না শুনলে ঘুম আসে না।

হালিমা ভাবে ইদ্রিসের কথা। ইদ্রিস কি ভালো স্বামী? হালিমা জানে না "ভালো স্বামী" কী। ইদ্রিস মারেনি কোনোদিন। এটা কি যথেষ্ট? যে যুগে "না মারা"-ই ভালো স্বামীর সংজ্ঞা, সেই যুগে ইদ্রিস ভালো। কিন্তু ইদ্রিস মায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি। জোবেদা যখন হালিমাকে মারত, ইদ্রিস পাশের ঘরে ছিল। শুনত। কিছু বলত না। এই নীরবতা কি সহিংসতা? হালিমা জানে না। নীরবতা আর সহিংসতার মাঝে একটা ধূসর জায়গা আছে, যেখানে অনেক স্বামী বাস করে।

কিন্তু ইদ্রিস একটা কাজ করত। রাতে, জোবেদা ঘুমিয়ে গেলে, ইদ্রিস হালিমার মাথায় হাত বুলাত। কিছু বলত না। শুধু হাত বুলাত। সেটাই তার ভাষা ছিল। যে মানুষ মায়ের সামনে কথা বলতে পারে না, সে রাতের অন্ধকারে হাত দিয়ে কথা বলে। হালিমা সেটা বুঝত। সেটুকুই ছিল।

হালিমা চোখ বন্ধ করে। জোবেদার মুখ ভাসে। জোবেদার ধারালো চোখ। জোবেদার হাতার আঘাত। জোবেদার চুল ধরে টানা। এই স্মৃতিগুলো হালিমার শরীরে আছে, হাড়ে আছে, মাংসে আছে। এগুলো যায়নি। যাবেও না। কিন্তু হালিমা এগুলোর সাথে বসবাস করেছে। যেমন মানুষ বাতের ব্যথার সাথে বসবাস করে। ব্যথা থাকে, কিন্তু মানুষ চলে।

হালিমা ভাবে রাবেয়ার কথা। রাবেয়াকে সে মারেনি। এটা তার অর্জন। ছোট অর্জন, কিন্তু অর্জন। কারণ হালিমা জানে, ক্ষমতা হাতে পেলে মানুষ যা শিখেছে তাই করে। হালিমা শিখেছে মার। কিন্তু সে মারেনি। এটা শেখার বিরুদ্ধে যাওয়া। এটা শৃঙ্খল ভাঙা। সম্পূর্ণ ভাঙেনি, নিয়ন্ত্রণ করে, কড়া কথা বলে, চোখে চোখে রাখে। কিন্তু মারেনি। জোবেদা থেকে হালিমা, এটুকু পথ এগিয়েছে।

হালিমা রাবেয়ার দিকে তাকায়। ঘুমাচ্ছে রাবেয়া? নাকি জেগে আছে? হালিমা জানে না। জানতেও চায় না। কিছু জিনিস না জানাই ভালো। রাবেয়া যদি জেগে থাকে, হয়তো ভাবছে হালিমার কথা। ভালো ভাবছে না মন্দ ভাবছে, সেটাও হালিমার জানা নেই।

হালিমা থেকে রাবেয়া আরেকটু এগোবে। রাবেয়া যদি কখনো শাশুড়ি হয়, সে হয়তো নিয়ন্ত্রণও করবে না। হয়তো সেই বউকে স্বাধীনতা দেবে। হয়তো বলবে, "তোমার পছন্দমতো রাঁধো।"

হয়তো। হালিমা জানে না। ভবিষ্যৎ কেউ জানে না। কিন্তু হালিমা জানে, শৃঙ্খল একদিনে ভাঙে না। প্রতিটা প্রজন্ম একটা গিঁট আলগা করে। একটাই। পুরোটা না। পুরোটা একবারে হয় না। জোবেদা মেরেছে। হালিমা মারেনি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করেছে। রাবেয়া হয়তো নিয়ন্ত্রণও করবে না। এভাবে, ধীরে ধীরে, একটা গিঁট, একটা গিঁট করে, শৃঙ্খল আলগা হয়।

শাশুড়ি মানে শত্রু না। শাশুড়ি মানে এমন একজন নারী যে নিজের কষ্ট ভুলতে পারেনি। আর সেই না-ভোলা কষ্ট তার প্রতিটা কাজে, প্রতিটা কথায়, প্রতিটা সিদ্ধান্তে ছায়া ফেলে। যারা বোঝে, তারা ক্ষমা করে। যারা বোঝে না, তারা ঘৃণা করে।

হালিমা ঘুমায়। কাল সকালে উঠে চা খাবে। আদা দিয়ে, কড়া, তেতো। নিজের পছন্দ। পনেরো বছর পরে খুঁজে পাওয়া পছন্দ।

আর রাবেয়া সকালে পাবে একটা ভাপা পিঠা। চায়ের পাশে। জানবে না কে রেখেছে। জানার দরকার নেই।

রাবেয়া পিঠাটা খাবে। ভালো লাগবে। ভাববে, বাকি ছিল বোধহয়। কিন্তু মুখের ভেতরে গুড়ের যে মিষ্টি ছড়িয়ে যাবে, সেটা শুধু গুড়ের মিষ্টি না। সেটা অন্য কিছু। সেটা এমন একটা মিষ্টি যেটা শুধু তখনই আসে যখন কেউ তোমার কথা ভেবে কিছু করে, তুমি না জেনেই।

হালিমা কখনো বলবে না "আমি তোকে ভালোবাসি।" হালিমার প্রজন্মের মানুষ এই শব্দ ব্যবহার করে না। তাদের ভালোবাসা ক্রিয়াপদে থাকে, বিশেষ্যে না। পিঠা রেখে দেওয়ায় থাকে। মাছের বড় টুকরোটা বউয়ের প্লেটে দেওয়ায় থাকে। ননদকে বলা "বউমার সাথে ভালো করে কথা বল" এটায় থাকে। শব্দে না, কাজে। দৃশ্যমান না, কিন্তু বাস্তব।

ভালোবাসা সবসময় নিজের পরিচয় দেয় না।

কখনো কখনো ভালোবাসা একটা পিঠা।