দাদি
হাত কাঁপে, কিন্তু হাতের মাপ কাঁপে না
১
সুফিয়া সকালে নামাজ পড়ে জায়নামাজেই বসে থাকে।
তাসবিহ গোনে। একটা, দুটো, তিনটা। তাসবিহর দানাগুলো পুরোনো, ক্ষয়ে গেছে, মসৃণ হয়ে গেছে বছরের পর বছর আঙুলের ঘর্ষণে। এই তাসবিহ সুফিয়ার মায়ের। মা মারা যাওয়ার সময় সুফিয়ার হাতে দিয়ে গিয়েছিল। সেটা ১৯৮০ সাল। ছেচল্লিশ বছর আগে। তাসবিহর দানাগুলো তখন খসখসে ছিল, এখন মাখনের মতো মসৃণ। সময় সবকিছু ঘষে মসৃণ করে। ব্যথাও।
সুফিয়ার বয়স পঁচাত্তর। সে নিজে হিসেব করে না। বছর গোনা তার কাজ না। তার কাজ দিন গোনা। আজকের দিনটা কাটাও, কালকেরটা আল্লাহ দেবেন। এই ছিল তার মায়ের কথা, এটাই তার কথা।
জানালা দিয়ে আলো আসে। শীতের সকালের আলো, হলুদ, তির্যক, ধুলোর কণায় ভরা। সুফিয়ার ঘরে আসবাব কম। একটা চৌকি, একটা আলমারি, দেয়ালে মক্কার ছবি, আর একটা পুরোনো ট্রাঙ্ক। ট্রাঙ্কটা লোহার, জং ধরেছে কিনারায়, তালা ভাঙা। কিন্তু সুফিয়া খোলে না। ট্রাঙ্কের ভেতর যা আছে, সেগুলো দেখার দরকার নেই। সেগুলো মনে আছে। মনে না থাকলেও শরীরে আছে।
সুফিয়ার শরীরটা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা দলিল। প্রতিটা কুঁচকানো চামড়ায় একটা গল্প আছে। প্রতিটা সাদা চুলে একটা বছর আছে। প্রতিটা গিঁটের ব্যথায় একটা ঋতু আছে। কেউ পড়তে পারে না এই দলিল। শুধু সুফিয়া পারে।
২
১৯৭১। সুফিয়ার বয়স তখন বিশ।
মার্চ মাস। গ্রামে খবর এসেছিল রেডিওতে। সুফিয়ার শ্বশুর রেডিও শুনতেন, রাতে, মশারির ভেতরে, ভলিউম কম করে, যেন পাকিস্তানি আর্মি শুনতে না পায়। একদিন রাতে শ্বশুর বললেন, "যুদ্ধ শুরু হয়েছে।" সুফিয়া তখন বুঝত না যুদ্ধ কী। যুদ্ধ মানে সিনেমায় দেখা গুলির শব্দ, ট্যাংকের ছবি। আসল যুদ্ধ অন্যরকম। আসল যুদ্ধে গুলির আগে নীরবতা আসে। সেই নীরবতা সুফিয়া শুনেছিল।
এপ্রিলের এক রাতে আর্মি এসেছিল গ্রামে। গ্রামের পুরুষেরা আগেই পালিয়েছিল, যারা মুক্তিযোদ্ধা তারা, আর যারা মুক্তিযোদ্ধা না তারাও, কারণ আর্মি তফাত করত না। সুফিয়ার স্বামী আকবর চলে গিয়েছিল সীমান্তের দিকে। বলে গিয়েছিল, "বাঁশঝাড়ে লুকাবে। বাচ্চাকে নিয়ে।" বাচ্চা তখন একটাই। তিন মাসের মেয়ে। নাম তখনো রাখা হয়নি।
সুফিয়া বাঁশঝাড়ে লুকিয়েছিল। তিন মাসের মেয়ে বুকে। মেয়ে কাঁদলে সব শেষ। আর্মি শুনতে পাবে। সুফিয়া মেয়ের মুখে স্তন দিয়ে রেখেছিল। মেয়ে চুষছিল, চুপ ছিল। কতক্ষণ? সুফিয়া জানে না। এক ঘণ্টা? দুই ঘণ্টা? সময়ের কোনো অর্থ ছিল না সেই রাতে। শুধু অন্ধকার ছিল, বাঁশপাতার খসখস শব্দ ছিল, আর দূরে গুলির আওয়াজ ছিল।
আর্মি চলে গিয়েছিল। গ্রামের তিনটা ঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল। একজন বৃদ্ধকে মেরেছিল। সুফিয়ার শ্বশুরকে। রেডিও শুনতেন যে মানুষটা, তাঁকে।
সুফিয়া বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে এসেছিল সকালে। মেয়ে তখনো বুকে। মেয়ে ঘুমাচ্ছিল। সুফিয়া পোড়া ঘর দেখেছিল। পোড়া গন্ধ শুঁকেছিল। শ্বশুরের শরীরটা দেখেছিল। কাঁদেনি। কান্না আসেনি। কান্না পরে এসেছিল, অনেক পরে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে, যখন আকবর ফিরেছিল, যখন নতুন ঘর উঠেছিল, যখন মেয়ের নাম রাখা হয়েছিল। তখন কান্না এসেছিল, আর থামেনি বহুদিন।
মেয়ের নাম রেখেছিল "মুক্তি।"
আকবর বলেছিল, "কেন এই নাম?" সুফিয়া বলেছিল, "কারণ এই মেয়ে যুদ্ধে জন্মেছে। এই মেয়ে বাঁশঝাড়ে বেঁচেছে। এই মেয়ের প্রথম ঘুম ছিল গুলির শব্দে।" আকবর আর কিছু বলেনি। মুক্তি নাম হয়ে গেল।
মুক্তি এখন বায়ান্ন। ঢাকায় থাকে। স্কুলে পড়ায়। বাংলা। সুফিয়া ভাবে, মুক্তি শিক্ষক হয়েছে কারণ সুফিয়া তাকে গল্প বলত। যে মানুষ গল্প শুনে বড় হয়, সে গল্প বলতে চায়। মুক্তি ছাত্রদের গল্প বলে। বাংলা সাহিত্যের গল্প। কিন্তু সুফিয়ার গল্প বলে না। সুফিয়ার গল্প পাঠ্যবইয়ে নেই। সুফিয়ার গল্প ইতিহাসের বই নয়, সুফিয়ার গল্প শরীরের ইতিহাস, যেটা কেউ লেখে না।
৩
১৯৭৪। দুর্ভিক্ষ।
সুফিয়ার বয়স তেইশ। দুটো বাচ্চা। মুক্তি তিন বছর, ছেলে আরিফ এক বছর। আকবর দিনমজুর, দিনে কাজ পায়, কিন্তু কাজ পেলেও চালের দাম এত বেশি যে কিনতে পারে না। সুফিয়া একদিন বাজারে গিয়েছিল, চালের দাম শুনে ফিরে এসেছিল খালি হাতে।
সেদিন সুফিয়া পুকুরে গিয়েছিল। পুকুরের পানি ঘোলা, কিন্তু পাড়ে শাপলা ফুটে আছে। সুফিয়া শাপলা তুলেছিল, ডাঁটাসহ। শাপলার ডাঁটা সেদ্ধ করলে খাওয়া যায়। কলাগাছের ভেতরের অংশ কেটেছিল, সেদ্ধ করেছিল। মোচা। থোড়। যা পেয়েছিল। পানিফলও। কচুর লতিও। এগুলো খাদ্য না, এগুলো বেঁচে থাকার চেষ্টা। শরীরকে বলা, "আরেকটু সময় দাও, আরেকটু।"
মুক্তি জিজ্ঞেস করেছিল, "আম্মা, ভাত?"
সুফিয়া বলেছিল, "আজ পিঠা খাব। মজার পিঠা।"
কলাগাছের সেদ্ধ টুকরোকে "পিঠা" বলেছিল। মিথ্যা। কিন্তু তিন বছরের মেয়ে মিথ্যা বোঝে না। মেয়ে খেয়েছিল। মুখ কুঁচকেছিল, কিন্তু খেয়েছিল। সুফিয়া নিজে খায়নি। মায়েরা দুর্ভিক্ষে শেষে খায়। অথবা খায় না।
সেই দুর্ভিক্ষে গ্রামের সাতজন মারা গিয়েছিল। সুফিয়ার পরিবার বেঁচেছিল। কীভাবে? সুফিয়া বলে, "আল্লাহর রহমত।" কিন্তু আসলে সুফিয়ার শরীরের জেদ। সেই শরীর যেটা বাঁশঝাড়ে লুকিয়ে আর্মি পার করেছিল, সেই শরীর কলাগাছ খেয়ে দুর্ভিক্ষ পার করেছিল। মায়ের শরীর এক অদ্ভুত যন্ত্র, নিজে জ্বলে সন্তানকে আলো দেয়।
দুর্ভিক্ষের পর সুফিয়ার চুল পড়তে শুরু করেছিল। পুষ্টির অভাবে। সুফিয়া চুলের কথা ভাবেনি, বাচ্চাদের পেটের কথা ভেবেছিল। কিন্তু চুল পড়ছিল। আকবর লক্ষ্য করেছিল। একদিন বাজার থেকে নারকেল তেল এনেছিল। সুফিয়ার মাথায় দিয়েছিল। কিছু বলেনি। সুফিয়াও কিছু বলেনি। কিন্তু সেই তেলের ঘ্রাণ সুফিয়া আজও মনে রাখে। পঁচাত্তর বছরের স্মৃতিতে সেই নারকেল তেলের ঘ্রাণ সতেজ, তরুণ, অক্ষত।
আকবর নিজে খাচ্ছিল না। সুফিয়া জানত। কিন্তু দুজনেই চুপ ছিল। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দুর্ভিক্ষকালীন একটা চুক্তি ছিল, অলিখিত: কে কম খাচ্ছে সেটা নিয়ে কেউ কথা বলবে না। দুজনেই কম খাচ্ছিল। দুজনেই বাচ্চাদের আগে দিচ্ছিল। এটা প্রতিযোগিতা ছিল না। এটা ছিল দুটো শরীরের একটাই সিদ্ধান্ত: বাচ্চারা আগে।
৪
১৯৮৮। বন্যা।
সুফিয়ার বয়স সাতত্রিশ। পাঁচটা সন্তান তখন। পানি এসেছিল রাতে। ঘুমের মধ্যে। সুফিয়ার পা ভিজে ঘুম ভাঙে। বিছানায় পানি। মেঝেতে হাঁটু পানি। আর বাড়ছে।
আকবর ছিল না। ঢাকায় গেছিল কাজে। সুফিয়া একা। পাঁচটা বাচ্চা। সবচেয়ে ছোটটার বয়স দুই বছর।
সুফিয়া ছোটটাকে মাথায় তুলে নিয়েছিল। বাকিদের বলেছিল, "আমার শাড়ি ধরে হাঁটো। ছেড়ো না।" পানির ভেতর দিয়ে হেঁটেছিল। বুক পানি। স্রোত আছে। পায়ের নিচে মাটি পিচ্ছিল। একবার পড়ে গেলে সব শেষ। সুফিয়া পড়েনি। কীভাবে পড়েনি, সে জানে না। শরীর জানত। পায়ের পাতা মাটি আঁকড়ে ছিল। পাঁচটা সন্তানের ওজন তাকে স্থির রেখেছিল।
স্কুলঘরে আশ্রয় নিয়েছিল। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ছিল। পানি বাড়ছিল। সুফিয়া স্কুলের বেঞ্চের ওপর বাচ্চাদের শুইয়ে দিয়েছিল। নিজে বসে ছিল মেঝেতে, পানিতে, সারারাত।
সুফিয়ার স্মৃতিতে সেই রাত চিরকালের জন্য খোদাই আছে। পানির শব্দ। বাচ্চাদের কান্না। টিনের চালে বৃষ্টির গর্জন। আর সুফিয়ার হৃদপিণ্ডের ধুকধুক, এত জোরে যে সে নিজেই শুনতে পেত।
সেই রাতে সুফিয়া একটা গান গেয়েছিল। মা শিখিয়েছিল সেই গান। "আমার ভাঙা ঘরে ভাঙা চালে, বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর।" রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু সুফিয়া জানত না কার গান। জানত শুধু মা গাইত। বাচ্চারা গানে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সুফিয়া জেগে ছিল। গান শেষ হওয়ার পরেও জেগে ছিল। পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। পানি বাড়ছিল। তারপর থামল। ভোরের আগে থামল। সুফিয়া বুঝল, এবারও বেঁচে গেছে।
সুফিয়া মাঝে মাঝে ভাবে, তার শরীর কতটুকু সহ্য করেছে। পাঁচটা সন্তান জন্ম দিয়েছে, কোনো হাসপাতালে না, বাড়িতে, ধাত্রীর হাতে। প্রতিবার ব্যথা ছিল, প্রতিবার ভয় ছিল, প্রতিবার বেঁচে যাওয়ার স্বস্তি ছিল। তার প্রজন্মের মেয়েরা এভাবেই সন্তান জন্ম দিত। হাসপাতাল ছিল দূরে, টাকা ছিল কম, আর "এটাই তো স্বাভাবিক" ছিল সবার কথা। স্বাভাবিক। মেয়েদের ব্যথা সবসময় "স্বাভাবিক।"
পরে মানুষ জিজ্ঞেস করত, "ভয় লাগেনি?"
সুফিয়া বলত, "ভয় পাওয়ার সময় ছিল না।"
এটা সত্য। ভয় বিলাসিতা। যখন পাঁচটা বাচ্চার জীবন হাতে, তখন ভয়ের জায়গা নেই। তখন শুধু কাজ আছে। হাঁটা আছে। ধরা আছে। টিকে থাকা আছে।
সুফিয়া ভাবে আকবরের কথা। আকবর ভালো মানুষ ছিল। আকবর সুফিয়াকে কোনোদিন মারেনি। কোনোদিন বকেনি। কোনোদিন তার কাজের সমালোচনা করেনি। আকবর শুধু কাজ করত, ঘরে ফিরত, খেত, ঘুমাত। আকবরের ভালোবাসা ছিল নিঃশব্দ, প্রতিদিনের নিঃশব্দতায় মেশানো, যেমন চায়ে চিনি মেশে, আলাদা করা যায় না।
আকবর মারা গেছে দশ বছর আগে। ডায়াবেটিস। পায়ে গ্যাংগ্রিন হয়েছিল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু দেরি হয়ে গিয়েছিল। সুফিয়া আকবরের পাশে বসে ছিল শেষ রাতে। আকবর বলেছিল, "সুফি, বাচ্চাদের দেখো।" সুফিয়া বলেছিল, "দেখব।" আকবর চোখ বন্ধ করেছিল। সুফিয়া তার হাত ধরে ছিল। হাত ঠান্ডা হয়ে গেছিল। সুফিয়া ছাড়েনি। অনেকক্ষণ ধরে রেখেছিল। কারণ হাত ছেড়ে দিলে সত্যিই শেষ। ধরে রাখলে একটু সময় বেশি পাওয়া যায়। একটু।
৫
এখন সুফিয়ার বয়স পঁচাত্তর।
ঈদে নাতি-নাতনিরা আসে। গ্রামে। মুক্তির দুই ছেলে, আরিফের তিন মেয়ে, বাকিদেরও সন্তানাদি। ঘর ভরে যায়। সেই ঘর যেটা ১৯৭১-এ পুড়েছিল, ১৯৮৮-তে ডুবেছিল, সেই ঘর এখন হাসিতে ভরে যায়।
নাতি-নাতনিরা সুফিয়ার কোলে বসে। ছোটরা কোলে, বড়রা পাশে। সুফিয়ার গায়ে একটা গন্ধ আছে, নারকেল তেল আর ধূপের মিশ্রণ, যেটা নাতি-নাতনিরা "দাদির গন্ধ" বলে। এই গন্ধ তারা সারাজীবন মনে রাখবে। বড় হয়ে কোথাও নারকেল তেলের ঘ্রাণ পেলে চোখ বন্ধ করবে, আর দাদির কোল মনে পড়বে।
সুফিয়া গল্প বলে। ১৯৭১-এর গল্প। বাঁশঝাড়ের গল্প। দুর্ভিক্ষের গল্প। বন্যার গল্প। নাতিরা অর্ধেক শোনে, বাকি অর্ধেক ফোনে খেলে। সুফিয়া দেখে, কিছু বলে না। সে জানে, গল্প এখনই বসবে না। গল্প পরে বসে। অনেক পরে। যখন এই নাতিরা বড় হবে, যখন তাদের নিজেদের ঝড় আসবে, তখন তারা মনে করবে দাদির কথা। তখন বুঝবে কেন দাদি সেই গল্পগুলো বলত। গল্পের বীজ এখন পড়ল, ফল ধরবে দশ বছর পরে, কুড়ি বছর পরে। সুফিয়া তত দিন থাকবে না। কিন্তু গল্প থাকবে।
"আমার গল্প শুনলে ওরা জানবে কোথা থেকে এসেছে। না শুনলে হারিয়ে যাবে।"
একটা নাতনি, তাহিয়া, শোনে। বাকিরা শোনে না, কিন্তু তাহিয়া শোনে। তাহিয়ার চোখ বড় হয়ে যায় যখন সুফিয়া বাঁশঝাড়ের গল্প বলে। তাহিয়া জিজ্ঞেস করে, "দাদি, ভয় লাগেনি?" সুফিয়া বলে, "ভয় লাগছিল। কিন্তু তোর ফুফুকে বুকে ধরে রেখেছিলাম, তাই ভয়ের চেয়ে ধরে রাখাটা বড় ছিল।"
তাহিয়া মনে রাখবে। সুফিয়া জানে। গল্প সবার কাছে যায় না। গল্প তাকে খুঁজে নেয় যে শুনতে চায়। তাহিয়া শুনতে চায়। তাহিয়া শৃঙ্খলের পরের কড়া।
সুফিয়া তাহিয়াকে আরও কিছু শেখায়। কোন মাটিতে কোন ফসল হয়। কোন মেঘ বৃষ্টি আনে আর কোন মেঘ শুধু ভয় দেখায়। কোন পাখির ডাক শুভ আর কোনটা অশুভ, সুফিয়া বিশ্বাস করে এসব, তাহিয়া হাসে, কিন্তু শোনে। শোনে কারণ দাদির গলায় এমন কিছু আছে যেটা ইউটিউবে নেই। অভিজ্ঞতার ওজন। সত্তর বছরের অভিজ্ঞতা, যেটা কোনো সার্চ ইঞ্জিন দিতে পারে না।
সুফিয়া তাহিয়ার চুল বাঁধে। ঠিক যেভাবে মুক্তির চুল বাঁধত। ঠিক যেভাবে তার মা তার চুল বাঁধত। একই ভাঁজ, একই গিঁট, একই টান। এটাও হাতের মাপ। চুল বাঁধার মাপ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা মাপ।
সুফিয়া এটা বলে শান্ত গলায়। কোনো অভিযোগ নেই। কোনো দুঃখ নেই। সুফিয়া অভিযোগ করার বয়স পার করেছে। এখন সে শুধু বলে। শুনুক বা না শুনুক।
সুফিয়া জানে সে বেশিদিন নেই। শরীর বলে দেয়। হাঁটুতে ব্যথা, চোখে ঝাপসা, কানে কম শোনে। শরীর ধীরে ধীরে বন্ধ হচ্ছে, যেমন সন্ধ্যায় দোকানপাট বন্ধ হয়, একটা একটা করে। প্রথমে চোখের দোকান বন্ধ হবে, তারপর কানের, তারপর পায়ের। শেষে হৃদপিণ্ডের। সুফিয়া ভয় পায় না। মৃত্যু ভয়ের জিনিস না, যখন পঁচাত্তর বছর বেঁচেছে। মৃত্যু তখন শুধু পরবর্তী ধাপ। ঘুমের আগের শেষ তাসবিহ।
কিন্তু সুফিয়া চায় যাওয়ার আগে কিছু রেখে যেতে। টাকা নেই, জমি নেই, গয়না নেই। কিন্তু গল্প আছে। পিঠার রেসিপি আছে। হাতের মাপ আছে। এগুলোই তার উত্তরাধিকার। এগুলোই সে তাহিয়াকে দেবে।
বিকেলে সুফিয়া পিঠা বানায়। নাতি-নাতনিদের জন্য। চিতই পিঠা, ভাপা পিঠা, পাটিসাপটা। হাত কাঁপে। আঙুলগুলো আর আগের মতো শক্ত নেই। গিঁটে ব্যথা। তবু বানায়। কারণ পিঠা মানে শুধু খাবার না। পিঠা মানে স্মৃতি। পিঠা মানে মা, মায়ের হাত, মায়ের রান্নাঘর, শীতের সকাল, ধানক্ষেতের ধোঁয়া, খেজুরের রস, নবান্নের গন্ধ। এই সব কিছু একটা পিঠায় ভরা। সুফিয়া সেটা বানায়, নাতিদের দেয়, নাতিরা খায়, আর সেই সব কিছু তাদের ভেতরে চলে যায়, নিঃশব্দে।
নাতনি তাহিয়া জিজ্ঞেস করে, "দাদি, তোমার পিঠা এত ভালো হয় কেন?"
সুফিয়া হাসে। "হাতের মাপ।"
"হাতের মাপ কী?"
"হাত জানে কতটুকু লাগবে। মাথা জানে না। হাত জানে।"
তাহিয়া বোঝে না। বুঝবে না এখন। পরে বুঝবে। যখন নিজে বানাবে। যখন দেখবে যে কোনো রেসিপি কাজ করে না কিন্তু হাত কাজ করে। তখন বুঝবে।
সুফিয়ার হাত কাঁপে। কিন্তু হাতের মাপ কাঁপে না।
এটা সুফিয়ার শেষ উপহার। হাতের মাপ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে যাওয়া মাপ। কোনো স্কেলে মাপা যায় না। কোনো বইয়ে লেখা যায় না। শুধু হাতে থাকে। মায়ের হাত থেকে মেয়ের হাতে। মেয়ের হাত থেকে নাতনির হাতে। এভাবে চলে। এভাবে চলবে। সুফিয়া থাকুক বা না থাকুক।
রাতে নাতি-নাতনিরা ঘুমায়। সুফিয়ার ঘর আবার ভরা। যেমন আগে ভরা ছিল। আকবর নেই, আকবর দশ বছর আগে গেছে। কিন্তু ঘর ভরা। সুফিয়া মশারি টাঙায়, বাচ্চাদের গায়ে কাঁথা দেয়, পায়ের কাছে বসে।
জায়নামাজে বসে তাসবিহ গোনে। একটা, দুটো, তিনটা। মায়ের তাসবিহ। মসৃণ দানা। প্রতিটা দানায় একটা স্মৃতি। একটা, বাঁশঝাড়। দুটো, দুর্ভিক্ষ। তিনটা, বন্যা। চারটা, মুক্তির প্রথম কান্না। পাঁচটা, আকবরের হাসি। ছয়টা, নাতির জন্ম। সাতটা, আকবরের মৃত্যু।
আটটা, নাতনির বিয়ে। নয়টা, বন্যার পরে নতুন ঘর। দশটা, মুক্তির প্রথম চাকরি।
তাসবিহ গোনা থামে। সুফিয়া চোখ মোছে। তাসবিহটা বুকে চেপে ধরে। মায়ের তাসবিহ। মায়ের হাতের ছোঁয়া এখনো আছে এতে, সুফিয়া বিশ্বাস করে। যুক্তি বলে নেই। কিন্তু বিশ্বাস যুক্তি মানে না। বিশ্বাস মানে শুধু ধরে রাখা। সুফিয়া ধরে আছে।
পঁচাত্তর বছর। তিনটা যুদ্ধ, যুদ্ধ-দুর্ভিক্ষ-বন্যা, প্রতিটা থেকে বেঁচে ফিরেছে। স্বামী হারিয়েছে। শ্বশুর হারিয়েছে। ঘর হারিয়েছে, আবার পেয়েছে, আবার হারিয়েছে, আবার পেয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস কখনো হারায়নি: হাতের মাপ।
সুফিয়া ঘুমায়। মশারির ভেতর দিয়ে চাঁদের আলো আসে। নাতি-নাতনিদের শ্বাসের শব্দ ঘরে ভরা।
সুফিয়া হাসে, ঘুমের ভেতরে। কেউ দেখে না। দেখার দরকার নেই।
সুফিয়ার হাসি সুফিয়ার।
সবকিছু দিয়ে দেওয়ার পরেও যেটুকু থাকে, সেটা হাসি। সেটা কেউ নিতে পারে না।
সুফিয়ার পাঁচ সন্তান। পাঁচ সন্তানের বারোটা সন্তান। বারোটা নাতি-নাতনি। সুফিয়া থেকে শুরু হয়ে বাঁশঝাড়ের সেই রাতে একটা তিন মাসের মেয়ে ছিল, এখন একটা পুরো বংশ। সুফিয়া সেই বটগাছ যার শেকড় থেকে বহু ডাল বেরিয়েছে। কিন্তু শেকড়? শেকড় মাটির নিচে। কেউ দেখে না। কেউ জানে না শেকড় কতটা গভীরে গেছে। শুধু সুফিয়া জানে। শুধু মাটি জানে।
ভোরের আজান হবে কিছুক্ষণ পরে। সুফিয়া তার আগেই উঠবে। আজীবন আজানের আগে উঠেছে। কারণ সুফিয়ার ঘড়ি আজানের চেয়ে পুরোনো। সুফিয়ার ঘড়ি তার শরীরে, তার হাড়ে, তার শ্বাসে। সেই ঘড়ি কখনো থামেনি। থামবে একদিন। কিন্তু আজ না। আজ আরেকটা দিন আছে। আরেকটা পিঠা আছে। আরেকটা গল্প আছে। আরেকটা তাসবিহ আছে।
এটুকুই যথেষ্ট।
সুফিয়ার মা বলত, "মেয়ে, তুই বেশি চাইস না। যেটুকু আছে সেটুকু ধরে রাখ।" সুফিয়া ধরে রেখেছে। বাঁশঝাড়ে ধরে রেখেছে, দুর্ভিক্ষে ধরে রেখেছে, বন্যায় ধরে রেখেছে। ধরে রাখাই সুফিয়ার ক্ষমতা। ধরে রাখাই তার যুদ্ধ। ধরে রাখাই তার বিজয়।
সুফিয়ার জন্য এটুকুই সবসময় যথেষ্ট ছিল।