গার্মেন্টস শ্রমিক

সুই ফোটাতে জানি। চুপ থাকতেও জানি। দুটোই বেঁচে থাকার জন্য।

পর্ব ৬ · ১৩ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সুই ঢোকে। সুতা টানে। সুই বেরোয়।

নাজমার জীবন এই তিনটে ক্রিয়ার ভেতরে। ঢোকা। টানা। বেরোনো। আবার ঢোকা। আবার টানা। আবার বেরোনো। বারো ঘণ্টা। ছয়দিন। প্রতিমাস। প্রতিবছর।

সাভারের এই ফ্যাক্টরিতে নাজমা তিন বছর ধরে কাজ করছে। বিশ বছর বয়সে এসেছিল। গ্রাম থেকে। ভোলা থেকে। বাবা জেলে ছিলেন, নদী খেয়ে নিয়েছে তাঁর জাল, তাঁর নৌকা, তাঁর সুস্থতা। মা বলেছিলেন, "যা। ঢাকায় যা। এখানে থাকলে তুইও ডুববি।" নাজমা ডুবেনি। ভেসে আছে। ভাসাটাকে কেউ কেউ বেঁচে থাকা বলে।

সকাল সাতটায় লাইনে ঢোকে। সন্ধ্যা সাতটায় বেরোয়। কখনো রাত নটা। কখনো দশটা। ওভারটাইম। ওভারটাইম না করলে মাস শেষে টান পড়ে। আটহাজার পাঁচশো টাকা বেসিক। ওভারটাইম মিলিয়ে দশ-এগারো হাজার হয়। পাঁচ হাজার পাঠায় গ্রামে। বাকি ছয় হাজারে সাভারে টিকে থাকা। একটা ঘর ভাগাভাগি করে তিনজন মেয়ে। ভাড়া দুই হাজার। বাকি চার হাজারে খাওয়া, বাস, ফোন, সাবান, তেল, ওষুধ।

হিসেবটা প্রতিমাসে মেলে। কোনোরকমে। টাকার হিসেব জীবনের হিসেবের মতো, শূন্যের কাছাকাছি ভাসতে থাকে, কখনো একটু ওপরে, কখনো একটু নিচে, কিন্তু কখনো সত্যিকারের ওপরে না।

নাজমা H&M-এর লেবেল চেনে। ZARA চেনে। Primark চেনে। লেবেলের অক্ষরগুলো পড়তে পারে, ইংরেজি একটু একটু শিখেছে। "মেইড ইন বাংলাদেশ" লেখাটা প্রতিটা লেবেলে থাকে। নাজমা একদিন ভেবেছিল, এই লেখাটার বদলে যদি লেখা থাকতো "মেইড বাই নাজমা," তাহলে কি কেউ তার নাম পড়তো? লন্ডনের কোনো মেয়ে কি ভাবতো, এই জামাটা কে বানিয়েছে?

না। ভাবতো না। জামা কেনার সময় কেউ ভাবে না কে বানিয়েছে। জামা কেনার সময় মানুষ ভাবে দামটা কম কিনা। নাজমার শ্রম সেই কম দামের ভেতরে লুকিয়ে আছে।

ফ্লোর সুপারভাইজারের নাম রশিদ।

রশিদ মোটা মানুষ। চওড়া কাঁধ। গলার স্বর উঁচু। রশিদ যখন হাঁটে, লাইনের মেয়েরা মাথা নিচু করে। এটা ভয় না। এটা অভ্যাস। ভয় আর অভ্যাস দুটো আলাদা জিনিস, কিন্তু যথেষ্ট দিন একসাথে থাকলে আলাদা করা যায় না।

রশিদ প্রথম দিন থেকেই নাজমাকে "বোন" বলে ডাকে। "বোন, এদিকে আয়। বোন, এই অর্ডারটা দেখ। বোন, একটু দ্রুত কর।" বোন ডাকটা প্রথমে ভালো লাগতো। গ্রামের মতো। পরে বুঝেছে, বোন ডাকটা একটা ঢাল। ঢালের পেছনে কী আছে সেটা রশিদ ছাড়া কেউ জানে না।

ছয় মাস আগে রশিদ নাজমাকে অফিসে ডেকেছিল। সন্ধ্যা ছয়টা। লাইনের বেশিরভাগ মেয়ে চলে গেছে। অফিসের দরজা বন্ধ।

"নাজমা, তোর কাজ ভালো। ফাস্ট। ক্লিন।"

"ধন্যবাদ, ভাই।"

"ভাই না। রশিদ ভাই বল।"

"ধন্যবাদ, রশিদ ভাই।"

রশিদ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিল। টেবিলের ওপর একটা খাতা, একটা ক্যালকুলেটর। পাখা ঘুরছে। দেয়ালে প্রোডাকশন চার্ট।

"তোকে সিনিয়র অপারেটর করতে পারি। বেতন বাড়বে। দুই হাজার বেশি।"

দুই হাজার। নাজমার বুকে কিছু লাফ দিল। দুই হাজার মানে গ্রামে আরো এক হাজার পাঠানো যায়। মায়ের ওষুধ। ছোট ভাইয়ের বই।

"কিন্তু একটা শর্ত আছে।"

রশিদ উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গেল। তালা লাগাল। নাজমার শরীর শক্ত হয়ে গেল। সুইয়ের ডগার মতো সরু, ধারালো একটা বোধ শিরদাঁড়া বেয়ে উঠে এলো।

"রাতের শিফটে থাকলে প্রমোশন দেবো।"

রশিদ ফিরে এলো। টেবিলের ওপর ঝুঁকে দাঁড়াল। তার মুখ নাজমার মুখ থেকে দুই ফুট দূরে। তামাকের গন্ধ। ঘামের গন্ধ। ক্ষমতার গন্ধ।

নাজমা উঠে দাঁড়াল। চেয়ারটা পেছনে সরে গেল।

"আমি রাতের শিফটে থাকব না।"

রশিদের মুখ বদলাল না। চোখ বদলাল। চোখের ভেতরটা শক্ত হয়ে গেল, যেমন সিমেন্ট জমে যায়।

"ঠিক আছে। তোর ইচ্ছা।"

নাজমা বেরিয়ে এলো। করিডোরে একটা টিউবলাইট পিটপিট করছিল। নাজমার হাত কাঁপছিল। সে মুঠো করে হাত চেপে ধরল। সুই ধরার মতো। শক্ত। স্থির।

প্রমোশন পেল না নাজমা।

রশিদ কিছু বলেনি। কোনো চিঠি আসেনি। কোনো ঘোষণা হয়নি। শুধু প্রমোশনের লিস্টে নাজমার নাম নেই। এটাই শাস্তি। নীরব শাস্তি। এমন শাস্তি যেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায় না, কারণ কিছু ঘটেনি। কিছুই ঘটেনি।

রিনা পেয়েছে প্রমোশন। রিনা নাজমার পাশের মেশিনে বসে। রিনা ময়মনসিংহের মেয়ে। তেইশ বছর। পাতলা শরীর। চোখে সবসময় একটু ভয়, যেন কেউ তাকে তাড়া করছে। রিনা দুই মাস ধরে রাতের শিফটে থাকছে।

নাজমা কিছু বলেনি। কী বলবে? "রিনা, তুই জানিস কেন তোকে প্রমোশন দিয়েছে?" বলা যায় না। বলার ভাষা নেই। বলার জায়গা নেই। বলার পরিণতি আছে, সেটা ভালো না।

তিন মাস পরে রিনার শরীর ভারী হতে লাগল।

নাজমা প্রথমে লক্ষ্য করল রিনার হাতের গতি কমে গেছে। তারপর লক্ষ্য করল রিনা সকালে বমি করে। তারপর আর লক্ষ্য করার দরকার হলো না। সবাই দেখতে পেল।

রশিদ রিনাকে অফিসে ডাকল। দরজা বন্ধ ছিল পনেরো মিনিট। রিনা বেরিয়ে এলো। চোখ লাল। হাতে একটা সাদা খাম। ভেতরে টার্মিনেশন লেটার।

"প্রোডাকশনে সমস্যা হচ্ছে। হেলথ রিস্ক।" কারণ লেখা।

রিনা তার জিনিসপত্র গুছিয়ে নিল। একটা ব্যাগে। একটা টিফিন বক্স, একটা চিরুনি, একটা ছোট আয়না, একটা ফোনের চার্জার। তিন বছরের চাকরির সবকিছু একটা ব্যাগে ঢুকে গেল।

নাজমা রিনার দিকে তাকাল। রিনা তাকাল না। তাকানোর শক্তি ছিল না। রিনা হেঁটে বেরিয়ে গেল। গেটের কাছে একবার থামল। পেছনে ফিরে তাকাল। ফ্যাক্টরির দিকে না, আকাশের দিকে। তারপর চলে গেল।

নাজমা মেশিনে ফিরে বসল। সুই তুলে নিল। কাপড়ে ফোটাল। সুতা টানল। আবার ফোটাল। আবার টানল।

রিনার খালি চেয়ারটা পাশে পড়ে রইল। পরদিন নতুন একটা মেয়ে এসে বসল। রাজশাহী থেকে। নাম শাকিলা। চোখে ভয়। সালমার মতো ভয়। রিনার মতো ভয়। সব নতুন মেয়ের চোখে একই ভয়।

রাতে নাজমা তার ঘরে ফেরে। সাভারের একটা গলি। গলির ভেতরে একটা তিনতলা বাড়ি। দোতলায় একটা ঘর। দশ বাই আট। তিনটা মেয়ে থাকে। নাজমা, লিপি, আর তাসমিয়া। তিনটা মেয়ে তিনটা ফ্যাক্টরি থেকে আসে। তিনটা মেয়ে একটা চুলায় রান্না করে, একটা বাথরুম ভাগ করে, একটা আয়না ভাগ করে।

লিপি আগে শুয়ে পড়েছে। তাসমিয়া রাতের শিফটে গেছে। নাজমা একা বসে আছে।

মেঝেতে একটা পাটি বিছানো। দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার, মসজিদের ছবি। কোণায় তিনটা ব্যাগ। জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তার আলো ঢুকছে। কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। দূরে ট্রাকের হর্ন।

নাজমা মোবাইল বের করল। মাকে ফোন করল।

তিনবার রিং হলো। মা ধরলেন।

"নাজমা?"

"হ্যাঁ, মা।"

"কেমন আছিস?"

"ভালো।"

"খাইছিস?"

"হ্যাঁ।"

দুটোই মিথ্যা। ভালো নেই। খায়নি। কিন্তু এই মিথ্যাগুলো রোজ বলতে হয়। মায়ের কাছে সত্যি বলার অর্থ মায়ের ঘুম কেড়ে নেওয়া। নাজমা নিজের ঘুম দিতে পারে, মায়ের ঘুম নিতে পারে না।

"টাকা পাইছ?"

"হ্যাঁ, মা। বিকাশে পাঠাইছি।"

"তোর ভাই পরীক্ষা দিবে। আরেকটু লাগব।"

"কত?"

"দুই হাজার।"

নাজমা চুপ করে রইল। দুই হাজার। এই মাসে ওভারটাইম কম হয়েছে। অর্ডার কম। কিন্তু ভাইয়ের পরীক্ষা।

"পাঠাব, মা।"

"আল্লাহ তোরে ভালো রাখুক।"

"হ্যাঁ, মা।"

ফোন রাখল। হিসেব করল। পাঁচ হাজার আর দুই হাজার, সাত হাজার গ্রামে যাবে। বাকি থাকবে তিন-চার হাজার। ভাড়া দুই হাজার। বাকি দুই হাজারে পুরো মাস। দিনে সত্তর টাকা। তিনবেলা খাওয়া যাবে না। দুইবেলা। সকালে রুটি আর ডাল। রাতে ভাত আর সবজি। দুপুরে না খাওয়া। পেটের খিদেটাকে অভ্যাস বানিয়ে ফেলতে হবে।

নাজমা এটা পারে। আগেও করেছে। শরীর অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রথম দুইদিন মাথা ঘোরে। তৃতীয় দিন থেকে পেট চুপ হয়ে যায়। পেটও বোঝে, এই শরীরে দাবি করার জায়গা নেই।

সুই ফোটাতে ফোটাতে নাজমার আঙুলে ক্যালাস পড়ে গেছে।

ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী। চামড়া পুরু হয়ে গেছে। শক্ত হয়ে গেছে। সুই ফুটলেও ব্যথা লাগে না। আগে লাগতো। প্রথম বছরে আঙুল দিয়ে রক্ত পড়তো। কাপড়ে লাগতো। জাহানারা আপা, যে নাজমাকে ট্রেনিং দিয়েছিল, বলতো, "ব্যান্ডএইড লাগা। তারপর সেলাই কর। কাপড়ে রক্ত লাগলে রিজেক্ট।" নাজমা ব্যান্ডএইড কিনতো না। দাম বেশি। কাপড়ের টুকরো পেঁচিয়ে নিত। এখন আর কিছু লাগে না। আঙুল নিজেই বর্ম হয়ে গেছে।

শরীরের অন্য জায়গাগুলোও বদলে গেছে। ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে, সবসময় নিচু থাকে বলে। কোমরে ব্যথা, বারো ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকলে হয়। চোখ জ্বালা করে, টিউবলাইটের সাদা আলোয়। কানে একটা হালকা গুনগুন আছে সবসময়, সেলাই মেশিনের শব্দ যেন মাথার ভেতরে বাসা বেঁধেছে।

তেইশ বছরের শরীরে তেতাল্লিশ বছরের ক্লান্তি। কিন্তু শরীর অভিযোগ করে না। শরীরও শিখে গেছে। শরীরও জানে, এই জীবনে অভিযোগের জায়গা নেই।

মাঝে মাঝে নাজমা নিজের হাতের দিকে তাকায়। এই হাত দিয়ে সে প্রতিদিন তিনশো পিস সেলাই করে। প্রতি পিসে আটটা সিম। তিনশো গুণ আট, চব্বিশশো সিম। প্রতিদিন। প্রতি মাসে বাহাত্তর হাজার সিম। প্রতি বছরে সাড়ে আট লাখ সিম। তিন বছরে পঁচিশ লাখ সিম। পঁচিশ লাখ বার সুই ঢুকেছে, সুতা টেনেছে, সুই বেরিয়েছে।

এই পঁচিশ লাখ সিমের বিনিময়ে নাজমা কী পেয়েছে? একটা ঘরের এক-তৃতীয়াংশ। দুইবেলা খাবার। মায়ের ওষুধ। ভাইয়ের পরীক্ষার ফি। আর আঙুলে ক্যালাস।

আজ শুক্রবার। ছুটির দিন। নাজমা ঘর থেকে বের হয়নি।

লিপি বাজারে গেছে। তাসমিয়া ঘুমাচ্ছে। নাজমা মেঝেতে বসে একটা কাজ করছে যেটা সে কাউকে দেখায় না। সে লিখছে।

একটা সস্তা খাতা। দশ টাকার কলম। নাজমা লিখছে। কী লিখছে? গল্প না। কবিতা না। ডায়েরি না। সে হিসেব লিখছে।

প্রতিদিন কত পিস করেছে। কত ওভারটাইম হয়েছে। কত ঘণ্টা কাজ করেছে। কত টাকা পাওয়ার কথা। কত টাকা পেয়েছে। প্রতিটা মাসের। গত তিন বছরের।

নাজমা একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে। ওভারটাইমের হিসেব মেলে না। শ্রম আইনে ওভারটাইমের রেট দ্বিগুণ। কিন্তু ফ্যাক্টরি দেয় দেড়গুণ। প্রতিমাসে তিন-চারশো টাকা কম দেয়। বছরে চার-পাঁচ হাজার। তিন বছরে বারো-পনেরো হাজার। পুরো ফ্লোরে দুইশো মেয়ে। দুইশো গুণ পনেরো হাজার। ত্রিশ লাখ টাকা। তিন বছরে। একটা ফ্লোর থেকে।

নাজমা এটা জানে। খাতায় লেখা আছে। কিন্তু কাউকে বলেনি। বলে কী হবে? ইউনিয়ন নেই। থাকলেও ইউনিয়ন করলে চাকরি যায়। চাকরি গেলে গ্রামে ফিরতে হয়। গ্রামে ফিরলে বাবার মতো নদীর দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে হয়।

নাজমা খাতা বন্ধ করল। বালিশের নিচে রাখল। এই খাতাটা তার অস্ত্র। এখনো ব্যবহার করেনি। হয়তো কোনোদিন করবে। হয়তো করবে না। কিন্তু খাতাটা আছে। সংখ্যাগুলো আছে। সত্যটা লেখা আছে।

সত্য লেখা থাকলে সত্য থাকে। না লিখলে সত্য হারিয়ে যায়। মুখে বলা সত্যকে অস্বীকার করা যায়। লেখা সত্যকে যায় না।

সোমবার সকাল। ফ্যাক্টরিতে ঢুকতেই রশিদের সাথে দেখা।

রশিদ নাজমার দিকে তাকাল। নাজমা তাকাল না। সোজা নিজের মেশিনে গিয়ে বসল। সুই তুলল। কাপড় সেট করল। মেশিন চালু করল।

শাকিলা পাশে বসে আছে। নতুন মেয়ে। ময়মনসিংহের।

"আপা, রশিদ ভাই খুব রাগী না?"

নাজমা বলল, "রাগ না। ওটা রাগ না।"

"তাহলে কী?"

নাজমা কিছু বলল না। কিছু বলার নেই। কিছু বলতে গেলে অনেক কিছু বলতে হয়। অনেক কিছু বলতে গেলে কান্না আসে। কান্না এলে সেলাই নষ্ট হয়। সেলাই নষ্ট হলে পিস রিজেক্ট হয়। পিস রিজেক্ট হলে বেতন কাটে।

তাই নাজমা চুপ। চুপ থাকাটা দক্ষতা। চুপ থাকাটা বর্ম। চুপ থাকাটা বেঁচে থাকার কৌশল।

দুপুরে লাঞ্চ ব্রেক। ত্রিশ মিনিট। নাজমা টিফিন বক্স খুলল। ভাত আর আলু ভর্তা। পাশে লিপির বক্স থেকে একটু ডাল নিল। লিপি একটু সবজি নিল নাজমার বক্স থেকে। কোনো কথা হলো না। এই আদান-প্রদান চুক্তি ছাড়াই চলে। গরিবের সাথে গরিবের চুক্তি কখনো কাগজে লেখা হয় না।

খাওয়ার পরে নাজমা একটু বাইরে গেল। ফ্যাক্টরির গেটের কাছে দাঁড়াল। আকাশটা ধূসর। সাভারের আকাশ সবসময় ধূসর। কারখানার ধোঁয়া, গাড়ির ধোঁয়া, ইটভাটার ধোঁয়া। ভোলার আকাশ নীল ছিল। নদীর ওপরে আকাশটা এতটাই নীল ছিল যে মনে হতো পানি আর আকাশ একটাই জিনিস।

নাজমা আকাশের দিকে তাকাল। তারপর ফিরে এলো। মেশিনে বসল। সুই তুলল।

রাতে নাজমা একটা স্বপ্ন দেখল।

স্বপ্নে সে ভোলায়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। পানি স্থির। বাতাস নেই। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের আলোয় নদীর পানি রুপোলি।

নাজমার হাতে একটা সুই। সুইটা বিশাল। একটা বৈঠার সমান। সে সুইটা নদীতে ফেলল। নদী ফেটে গেল। দুইভাগ হয়ে গেল। মাঝখানে শুকনো মাটি। মাটিতে একটা রাস্তা। রাস্তা দিয়ে সে হাঁটতে শুরু করল। দুইপাশে পানির দেয়াল। মাথার ওপরে চাঁদ।

রাস্তার শেষে একটা ঘর। ঘরে আলো। ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে একটা সেলাই মেশিন। কিন্তু সেটা নাজমার মেশিন না। সেটা নাজমার নিজের মেশিন। নিজের ঘরে। নিজের কারখানায়। দেয়ালে একটা সাইনবোর্ড: "নাজমা গার্মেন্টস।"

তারপর ঘুম ভাঙল। ভোর পাঁচটা। অ্যালার্ম বাজছে। লিপি উঠে গেছে। বাথরুমে লাইন। আজ আরেকটা দিন। বারো ঘণ্টা। তিনশো পিস। চব্বিশশো সিম।

নাজমা উঠল। মুখ ধুয়ে রুটি আর চা খেলো। জামা পাল্টাল। ব্যাগ কাঁধে নিল। গলিতে বেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

হাঁটতে হাঁটতে ভাবল। স্বপ্নটা সুন্দর ছিল। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে যে দূরত্ব, সেটা সাভার থেকে ভোলার চেয়ে বেশি। সেটা পৃথিবীর এক মাথা থেকে আরেক মাথার মতো। হয়তো তার চেয়েও বেশি।

কিন্তু নাজমা হাঁটে। হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। দাঁড়ালে ডুবে যাবে। বাবার মতো। নদীর মতো। নাজমা ডুববে না। নাজমা ভেসে থাকবে। সুই ধরে, সুতা টেনে, চুপচাপ ভেসে থাকবে।

বাসে উঠল নাজমা। জানালার ধারে দাঁড়াল। বাইরে সাভারের রাস্তা। হাজার হাজার মেয়ে হাঁটছে ফ্যাক্টরির দিকে। একই জামা। একই ব্যাগ। একই পা। একই মুখ। না, মুখ আলাদা। প্রতিটা মুখ আলাদা। প্রতিটা মুখের পেছনে একটা গল্প। কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না। কেউ শোনে না।

নাজমা জানালা দিয়ে দেখল। চুপচাপ।

সুই ফোটাতে জানি। চুপ থাকতেও জানি। দুটোই বেঁচে থাকার জন্য।

ফ্যাক্টরির গেটে নেমে নাজমা ঢুকে গেল। সুই তুলে নিল। আরেকটা দিন শুরু হলো।