ডাক্তার

সবার জীবন বাঁচাই। নিজের জীবন সাজানোর সময় নেই।

পর্ব ৭ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সুমাইয়ার হাত ধুয়ে যাচ্ছে। সাবান, পানি, সাবান, পানি। বিশ সেকেন্ড। এটা নিয়ম। WHO-র গাইডলাইন। কিন্তু সুমাইয়া ত্রিশ সেকেন্ড ধরে ধোয়। দশ সেকেন্ড বেশি। এই দশ সেকেন্ড তার নিজের জন্য। এই দশ সেকেন্ডে সে চোখ বন্ধ করে। পানির শব্দ শোনে। নিজেকে মনে করিয়ে দেয় যে সে একজন মানুষ। শুধু একটা প্রেসক্রিপশন লেখার যন্ত্র না।

সকাল আটটা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কুষ্টিয়া জেলার একটা উপজেলা। বিল্ডিংটা পুরনো। দেয়ালের রঙ উঠে গেছে। সিলিংয়ে পাখা ঘুরছে, কিন্তু বাতাস দিচ্ছে না, শুধু গরম বাতাসকে এদিক-ওদিক ঘোরাচ্ছে। করিডোরে মানুষের ভিড়। মহিলারা বাচ্চা কোলে বসে আছে। বৃদ্ধরা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার হাতে একটা করে কাগজ, সিরিয়াল নম্বর লেখা।

সুমাইয়া চেম্বারে ঢুকল। টেবিলে বসল। স্টেথোস্কোপ গলায় ঝুলিয়ে নিল। প্রেসক্রিপশন প্যাড টানল। কলম তুলল।

"পরের রোগী।"

দরজা খুলল। একটা মহিলা ঢুকল। কোলে একটা বাচ্চা। বাচ্চাটার জ্বর। তিনদিন ধরে। মহিলার চোখে ঘুম নেই। মুখে ক্লান্তি। শাড়ির আঁচল দিয়ে বাচ্চার কপালের ঘাম মুছছে।

"কবে থেকে জ্বর?"

"তিনদিন, আপা। নামতেই চায় না।"

সুমাইয়া বাচ্চাকে দেখল। কান দেখল। গলা দেখল। বুকে স্টেথোস্কোপ লাগাল। পেট চাপল। তাপমাত্রা মাপল। ১০২।

"প্যারাসিটামল দিচ্ছেন?"

"হ্যাঁ, আপা। কিন্তু নামে না।"

"কতটুকু দিচ্ছেন?"

মহিলা বলল পরিমাণ। ভুল পরিমাণ। কম দিচ্ছে। বাচ্চার ওজন অনুযায়ী কম।

সুমাইয়া ঠিক মাত্রা লিখে দিল। সাথে একটা অ্যান্টিবায়োটিক। খাবার স্যালাইন। বাচ্চাকে বেশি পানি খাওয়াতে বলল। স্পঞ্জিং করতে বলল।

"ওষুধের দাম কত হবে, আপা?"

"বেশি না। ফার্মেসিতে জিজ্ঞেস করবেন।"

মহিলা বেরিয়ে গেল। পরের রোগী ঢুকল। আরেকটা মহিলা। পেটে ব্যথা। তিন মাসের গর্ভবতী। রক্তপাত হচ্ছে। সুমাইয়ার হাত দ্রুত হলো। আল্ট্রাসাউন্ডের জন্য রেফার করল। বিশ্রামে থাকতে বলল। ভারী কাজ করতে নিষেধ করল।

"ভারী কাজ করি না তো, আপা। শুধু রান্না করি, কাপড় ধুই, উঠান ঝাড়ু দেই, গরু-ছাগলের খাবার দেই, বাচ্চাদের স্কুলে পাঠাই..."

সুমাইয়া চুপ করে শুনল। এই তালিকাটা শেষ হবে না। এই তালিকায় যা আছে তার সবকিছুই ভারী কাজ। কিন্তু কেউ এগুলোকে কাজ বলে না। এগুলো "মেয়েদের কাজ।" মেয়েদের কাজ মানে কাজ না। মেয়েদের কাজ মানে জীবন।

দুপুর বারোটা। সুমাইয়া একশো দশ জন রোগী দেখেছে। চার ঘণ্টায়। প্রতি রোগীতে গড়ে দুই মিনিট বিশ সেকেন্ড।

দুই মিনিট বিশ সেকেন্ড। একটা মানুষের অসুখ বুঝতে, পরীক্ষা করতে, ডায়াগনোসিস করতে, প্রেসক্রিপশন লিখতে, বুঝিয়ে বলতে। দুই মিনিট বিশ সেকেন্ড। এটা যথেষ্ট না। সুমাইয়া জানে। কিন্তু বাইরে আরো নব্বই জন বসে আছে। তারা সকাল থেকে অপেক্ষা করছে। অনেকে দূর থেকে এসেছে। বাসে। ভ্যানে। হেঁটে। তাদের ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।

পাশের চেম্বারে ডাক্তার আরিফ। পুরুষ ডাক্তার। আরিফ আজ আশি জন দেখবে। বেশি না। কারণ পুরুষ ডাক্তারের কাছে মহিলা রোগীরা আসে না। মহিলা রোগীরা মেয়ে ডাক্তার চায়। শরীরের কথা মেয়ে ডাক্তারকে বলা যায়। পুরুষ ডাক্তারকে বলা যায় না।

তাই সুমাইয়ার লাইন দুইশো। আরিফের লাইন আশি। একই যোগ্যতা। একই ডিগ্রি। একই পোস্টিং। একই বেতন। কিন্তু সুমাইয়া আড়াইগুণ বেশি কাজ করে।

আরিফ ভালো মানুষ। সুমাইয়ার সাথে তর্ক করে না। চা এনে দেয় মাঝে মাঝে। কিন্তু আরিফ দুপুরে লাঞ্চ ব্রেক নেয়। এক ঘণ্টা। সুমাইয়া নেয় না। লাঞ্চ ব্রেক নিলে বাইরের মানুষগুলো আরো এক ঘণ্টা বসে থাকবে। অনেকে দূর থেকে এসেছে। বাচ্চা কোলে। বৃদ্ধ বাবা-মা নিয়ে। এক ঘণ্টা বেশি বসে থাকা মানে বাসের শেষ ট্রিপ মিস করা। বাসের শেষ ট্রিপ মিস করা মানে রাতে আটকে যাওয়া। আটকে যাওয়া মানে আরো খরচ। যে টাকায় ওষুধ কেনা যেত সে টাকায় রাত কাটানো।

তাই সুমাইয়া লাঞ্চ স্কিপ করে। একটা বিস্কুট খায়। চা খায়। আবার বসে।

"পরের রোগী।"

বিকেল তিনটায় একটা কেস এলো যেটা সুমাইয়াকে থামিয়ে দিল।

মেয়েটার বয়স ষোলো। নাম জুলি। মা নিয়ে এসেছে। জুলি কথা বলছে না। মাথা নিচু করে বসে আছে। মা বলছে, "পেটে ব্যথা, আপা। খেতে পারে না।"

সুমাইয়া জুলির দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখের নিচে কালো। ঠোঁট শুকনো। শরীর শুকিয়ে গেছে। কিন্তু পেটটা একটু ভারী।

"কবে থেকে?"

"দুই মাস।"

সুমাইয়া মাকে বাইরে পাঠাল। দরজা বন্ধ করল। জুলির সামনে বসল। মেঝেতে। চেয়ারে না। মেঝেতে বসলে চোখ সমান হয়। ক্ষমতার দূরত্ব কমে।

"জুলি, আমি ডাক্তার। আমি তোমাকে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু সাহায্য করতে হলে আমাকে সত্যি বলতে হবে।"

জুলি চুপ। হাতের আঙুলগুলো মুচড়াচ্ছে। নখ কামড়াচ্ছে।

"তোমার পিরিয়ড কবে হয়েছিল শেষ?"

জুলি কাঁপল। পুরো শরীর। পাতার মতো।

সুমাইয়া আস্তে আস্তে জুলির হাত ধরল। "ভয় পেয়ো না। আমি তোমার পাশে আছি।"

জুলি বলল। ফিসফিস করে। তিন মাস আগে। চাচাতো ভাই। বাড়িতে কেউ ছিল না। মা বাজারে গিয়েছিল।

সুমাইয়ার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গেল। এই ভাঙাটা নতুন না। প্রতিবার ভাঙে। প্রতিবার জোড়া লাগায়। আবার ভাঙে। ডাক্তারের শরীরে একটা অদৃশ্য হাড় আছে যেটা বারবার ভাঙে আর বারবার জোড়া লাগে। এটাকে কোনো এনাটমির বইতে লেখা নেই। কিন্তু প্রতিটা মেয়ে ডাক্তার জানে এটা কোথায় আছে।

সুমাইয়া পরীক্ষা করল। কনফার্ম করল। মাকে ডাকল। মাকে বলল।

মা প্রথমে চুপ ছিল। তারপর কাঁদল। তারপর বলল, "কেউ জানবে না তো, আপা?"

"না।"

"লোকে জানলে মেয়ের বিয়ে হবে না।"

সুমাইয়া চুপ করে রইল। মেয়েটার শরীরে আঘাত হয়েছে। মেয়েটার মনে আঘাত হয়েছে। কিন্তু মায়ের প্রথম চিন্তা বিয়ে। এটা মায়ের দোষ না। এটা এমন একটা দেশের দোষ যেখানে মেয়ের ক্ষতির চেয়ে মেয়ের বিয়ে বড়। যেখানে অপরাধীর শাস্তির চেয়ে শিকারের লজ্জা বড়।

সুমাইয়া রেফারাল লিখল। জেলা হাসপাতালে। গাইনি কনসালট্যান্টের কাছে। কাউন্সেলিংয়ের জন্য। থানায় যেতে বলল। জানে, যাবে না। তবু বলল। বলাটা তার দায়িত্ব।

জুলি আর তার মা বেরিয়ে গেল। সুমাইয়া দরজা বন্ধ করল। দুই মিনিট চোখ বন্ধ করে বসে রইল। তারপর দরজা খুলল।

"পরের রোগী।"

সন্ধ্যা ছয়টা। দুইশো তেরো জন। আজকের হিসেব।

সুমাইয়া কোয়ার্টারে ফিরল। কোয়ার্টার মানে হাসপাতালের পেছনে একটা ফ্ল্যাট। দুই রুম। একটা রান্নাঘর। একটা বাথরুম। সুমাইয়া একা থাকে।

ফ্ল্যাটে ঢুকে জুতো খুলল। ব্যাগ রাখল। ফ্রিজ খুলল। গতকালের ভাত আছে। ডাল আছে। গরম করে খেলো। একা।

টেবিলে মোবাইল রেখে দেখল, সাতটা মিসড কল। তিনটা মায়ের। দুইটা বাবার। একটা বড় ভাইয়ের। একটা অচেনা নম্বর। অচেনা নম্বরটা সম্ভবত আত্মীয়ের। পাত্র দেখেছে কেউ হয়তো।

মাকে ফোন করল।

"সুমাইয়া? ফোন ধরিস না কেন?"

"রোগী দেখছিলাম, মা।"

"সারাদিন রোগী দেখিস? একটু নিজের দিকে দেখ।"

"কী দেখব?"

"বিয়ের কথা বলছি। তোর বয়স বত্রিশ হয়ে গেছে। আর কত?"

সুমাইয়া চুপ। এই কথোপকথন আগেও হয়েছে। শতবার হয়েছে। প্রতিটা ফোনে। প্রতিটা ঈদে। প্রতিটা বিয়েতে। প্রতিটা আত্মীয়ের সামনে।

"রোখসানার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল। রোখসানা তোর ব্যাচমেট ছিল।"

"জানি, মা।"

"ওর দুইটা বাচ্চা। তুই কী করছিস?"

সুমাইয়া এই বছরে পঞ্চাশটা বাচ্চা ডেলিভারি করিয়েছে। পঞ্চাশটা। প্রতিটা বাচ্চার প্রথম কান্না সে শুনেছে। প্রতিটা বাচ্চাকে সে প্রথম ধরেছে। প্রতিটা মায়ের মুখে সে প্রথম হাসি দেখেছে। কিন্তু এই পঞ্চাশটা বাচ্চার কোনোটাই তার না। এই পঞ্চাশটা বাচ্চা তার হাতে জন্মেছে, কিন্তু তার কোলে বড় হবে না।

"মা, আমি ক্লান্ত। পরে কথা বলি।"

"পরে পরে করলে বুড়ো হয়ে যাবি।"

"বুড়ো হলে সমস্যা কী, মা?"

"লোকে কী বলবে?"

লোকে। সেই অদৃশ্য, সর্বশক্তিমান লোকে। লোকে বলে মেয়েরা বেশি পড়লে বিয়ে হয় না। লোকে বলে মেয়ে ডাক্তার হলে মেজাজ খারাপ হয়। লোকে বলে বত্রিশ বছরের মেয়ে মানে পচা আম। লোকে বলে অনেক কিছু। লোকে কোনোদিন চুপ থাকে না।

সুমাইয়া ফোন রাখল। থালা ধুয়ে রাখল। বাথরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল।

আয়নায় একটা মুখ। চোখের নিচে কালো দাগ। চুলে দুটো তিনটে সাদা। কপালে একটা সূক্ষ্ম রেখা। বত্রিশ বছরের মুখ। যে মুখ প্রতিদিন দুইশো মানুষের দিকে তাকায়, কিন্তু নিজের দিকে তাকানোর সময় পায় না।

সুমাইয়া আয়না থেকে চোখ ফেরাল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

পঞ্চাশটা বাচ্চা ডেলিভারি করিয়েছে এই বছর। কোনোটা তার না।

সবার জীবন বাঁচায়। নিজের জীবন সাজানোর সময় নেই।

পরদিন সকালে হাসপাতালে একটা মিটিং ছিল।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, ডাক্তার নাসির সাহেব, চেয়ারে বসে। টেবিলে ফাইলের পাহাড়। দেয়ালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পোস্টার।

"সুমাইয়া, তোমার ওপিডি নম্বর কত?"

"গতমাসে ৪,২০০।"

"আরিফ?"

"১,৮০০।"

নাসির সাহেব চশমা খুলে মুছলেন। "সুমাইয়া, তুমি দ্বিগুণের বেশি দেখছো। কেন?"

সুমাইয়া বলল, "মহিলা রোগীরা মেয়ে ডাক্তারের কাছে আসে। গাইনি কেসগুলো সব আমার কাছে আসে। শিশু কেসগুলো মায়েরা আমার কাছে নিয়ে আসে।"

"তাহলে আমরা আরেকজন মেয়ে ডাক্তার চাইব। প্রস্তাব দেবো।"

সুমাইয়া জানে, এই প্রস্তাব দেওয়া হবে। ফাইল যাবে জেলায়। জেলা থেকে বিভাগে। বিভাগ থেকে ঢাকায়। ঢাকায় ছয় মাস ঘুরবে। তারপর হয়তো অনুমোদন হবে। হয়তো হবে না। হলেও নতুন ডাক্তার পোস্টিং পেতে আরো ছয় মাস। এক বছর পরে হয়তো কেউ আসবে। হয়তো আসবে না। যে আসবে সে হয়তো তিন মাস পরে বদলি চাইবে। কুষ্টিয়ায় কেউ থাকতে চায় না। সবাই ঢাকা চায়।

মিটিং শেষে আরিফ বলল, "সুমাইয়া আপা, চা খাবেন?"

"না, রোগী আছে।"

"আপনি একটু রেস্ট নেন। শরীর খারাপ করবেন।"

সুমাইয়া হাসল। হাসিটা ক্লান্ত। "আমি ডাক্তার, আরিফ। আমি জানি শরীর খারাপ করলে কী হয়। আমি এটাও জানি না খেয়ে, না ঘুমিয়ে, না বিশ্রাম নিয়ে কাজ করলে কী হয়। কিন্তু বাইরে মানুষ বসে আছে।"

আরিফ কিছু বলল না। কী বলবে? সুমাইয়ার যুক্তির বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি নেই। সুমাইয়া ভুল করছে না। সুমাইয়া নিজেকে শেষ করছে। কিন্তু সেটা ভুল না। সেটা পছন্দ। না, পছন্দও না। সেটা বাধ্যতা। এমন বাধ্যতা যেটাকে পছন্দ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়।

রাত দশটায় ইমার্জেন্সি কল এলো।

একটা মহিলা। ডেলিভারি। প্রথম বাচ্চা। জটিলতা আছে। ব্রিচ পজিশন। বাচ্চা উল্টো।

সুমাইয়া দৌড়ে গেল। অপারেশন থিয়েটার খুলল। নার্স রাবেয়া সাথে আছে। অ্যানেস্থেটিস্ট নেই। রাতে থাকে না। সুমাইয়া নিজেই ম্যানেজ করল। লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া দিল। সিজারিয়ান করল।

বাচ্চাটা বের হলো। কান্না করল না। সুমাইয়ার হৃৎপিণ্ড থামল। এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তিন সেকেন্ড। সে বাচ্চাটাকে উল্টো করল। পিঠে হালকা চাপড় দিল। একবার। দুইবার।

কান্না। তীক্ষ্ণ, জোরে, জীবনের প্রথম কান্না।

সুমাইয়ার চোখে পানি এলো। প্রতিবার আসে। পঞ্চাশবারের পরেও আসে। এটা অভ্যাসে যায় না। নতুন জীবনের প্রথম শব্দ শুনলে চোখে পানি আসবেই। এটা দুর্বলতা না। এটা মানুষ হওয়ার প্রমাণ।

মা ঠিক আছে। বাচ্চা ঠিক আছে। ওজন তিন কেজি দুইশো গ্রাম। ছেলে।

মায়ের স্বামী বাইরে অপেক্ষা করছিল। খবর পেয়ে ঢুকল। বাচ্চাকে দেখে কাঁদতে শুরু করল। "ছেলে! ছেলে হইছে!"

ছেলে। ছেলে হওয়াটা এখনো বড় খবর। মেয়ে হলে কি একই কান্না হতো? হয়তো। হয়তো না। সুমাইয়া জানে না। সুমাইয়া শুধু জানে, বাচ্চাটা সুস্থ। এটাই যথেষ্ট।

রাত একটায় সুমাইয়া কোয়ার্টারে ফিরল। হাত ধুলো। দশ সেকেন্ড বেশি। চোখ বন্ধ করল। পানির শব্দ শুনল।

আজ একটা প্রাণ বাঁচিয়েছে। দুইটা, আসলে। মা আর বাচ্চা। কাল আরো দুইশো দেখবে। পরশুও।

বিছানায় শুয়ে সুমাইয়া ভাবল। রোখসানার দুইটা বাচ্চা। সুমাইয়ার পঞ্চাশটা। রোখসানা দুইটা বড় করবে। সুমাইয়া পঞ্চাশটাকে শুধু পৃথিবীতে আনবে। তারপর তারা চলে যাবে। নিজের জীবনে। সুমাইয়াকে মনে রাখবে না। মনে রাখার দরকারও নেই।

সুমাইয়া চোখ বন্ধ করল। ঘুমের আগে একটা চিন্তা মাথায় এলো। সে নিজে কখনো মা হবে কিনা। উত্তর জানে না। উত্তর খোঁজার সময়ও নেই।

সকাল আটটায় আবার বসতে হবে। স্টেথোস্কোপ গলায়। প্রেসক্রিপশন প্যাড সামনে। দরজা খুলে বলতে হবে:

"পরের রোগী।"