বিধবা
বিধবা মানে অসহায় না। বিধবা মানে একা যুদ্ধ করা।
১
আয়েশা মুরগি গোনে।
সতেরোটা। গতকাল আঠারোটা ছিল। একটা মরেছে। রাণীক্ষেত। টিকা দেওয়ার কথা ছিল গত সপ্তাহে, কিন্তু টিকাওয়ালা আসেনি। আয়েশা নিজে ফোন করেছিল। ফোন ধরেনি। আজ আবার করবে। না ধরলে আবার করবে। না ধরলে নিজে উপজেলায় গিয়ে টিকা আনবে। আয়েশা ছাড়বে না। ছেড়ে দেওয়ার বিলাসিতা আয়েশার নেই।
কিশোরগঞ্জের এই গ্রামে আয়েশার বাড়ি। বাড়ি বলতে টিনের ঘর। দুইটা ঘর, একটা রান্নাঘর, একটা গোয়ালঘর। গোয়ালঘরে মুরগি থাকে। গরু নেই। গরু কেনার সামর্থ্য নেই এখনো। হয়তো আগামী বছর। হয়তো তার পরের বছর। আয়েশা তাড়াহুড়ো করে না। তাড়াহুড়ো করার সুযোগও নেই। প্রতিটা পদক্ষেপ হিসেব করে ফেলতে হয়। একটা ভুল পদক্ষেপের সামর্থ্য নেই।
পাঁচ বছর আগে আয়েশার স্বামী ছিল। নাম কালাম। কালাম জেলে ছিল। হাওরে মাছ ধরতো। ভালো মানুষ ছিল কালাম। নরম কথা বলতো। বাচ্চাদের সাথে খেলতো। আয়েশার জন্য হাওর থেকে শাপলা তুলে আনতো। শাপলার গন্ধ আয়েশা এখনো মনে করতে পারে। ভেজা, মিষ্টি, একটু কাদার গন্ধ মেশানো।
কালাম ডুবে মারা গেল। বর্ষায়। হাওরের পানি হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিল। নৌকা উল্টে গিয়েছিল। কালাম সাঁতার জানতো। কিন্তু জাল পায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল। নিজের জাল। যে জাল দিয়ে সে মাছ ধরতো, সে জালই তাকে ধরে ফেলল।
তিনদিন পরে শরীর পাওয়া গেল। ফুলে গিয়েছিল। আয়েশা দেখেছিল। চিনতে পেরেছিল। মুখ দেখে না, হাত দেখে। কালামের বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে একটা কাটা দাগ ছিল। ছোটবেলায় বটি দিয়ে কেটেছিল। সেই দাগ দেখে আয়েশা জানল, এটা কালাম।
জানাজা হলো। দাফন হলো। সাত দিন লোকজন এলো। খাওয়ালো। সমবেদনা জানাল। অষ্টম দিনে কেউ এলো না। নবম দিনে আয়েশা বুঝল, সে একা।
২
"বিধবা" শব্দটা একটা দেয়াল। এই দেয়ালের একদিকে আয়েশা দাঁড়িয়ে, অন্যদিকে পুরো সমাজ।
কালাম মারা যাওয়ার এক মাসের মধ্যে শুরু হলো। দেবর ইকবাল এলো। কালামের ছোট ভাই। শহরে থাকে। কিছু একটা করে। কী করে আয়েশা জানে না। জানতেও চায় না।
ইকবাল বলল, "ভাবি, জমির কাগজপত্র আমার কাছে দেন।"
"কেন?"
"আমি দেখাশোনা করব। আপনি একা পারবেন না।"
আয়েশার ছয় কাঠা জমি। কালামের নামে ছিল। কালাম মারা যাওয়ার পরে আয়েশার নামে হওয়া উচিত। ওয়ারিশসূত্রে। কিন্তু ইকবাল চায় নিজের নামে করতে। "দেখাশোনা" মানে দখল। "আমি করব" মানে "তুমি পাবে না।"
আয়েশা বলল, "না।"
ইকবাল অবাক হলো। বিধবা ভাবি "না" বলবে, এটা সে ভাবেনি। বিধবারা "না" বলে না। বিধবারা মাথা নিচু করে, কাঁদে, সয়ে যায়। বিধবারা অসহায়। এটাই নিয়ম।
"ভাবি, আপনি বুঝতেছেন না। জমি একলা মহিলার পক্ষে সামলানো..."
"আমি সামলাব।"
ইকবাল চলে গেল। কিন্তু ছাড়ল না। দুই সপ্তাহ পরে আবার এলো। এবার শ্বশুর সাথে। শ্বশুর বললেন, "বুমা, ইকবালের কথা শোন। ছেলেমানুষ তুমি। জমিজমার ব্যাপার বুঝবা না।"
ছেলেমানুষ। পঁয়তাল্লিশ বছরের আয়েশা। তিন সন্তানের মা। ছেলেমানুষ। কারণ মহিলা। মহিলা মানেই ছেলেমানুষ। মহিলা মানেই বুঝবে না। মহিলা মানেই কেউ একজন পুরুষ দরকার যে তার হয়ে ভাববে, তার হয়ে করবে, তার হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
আয়েশা বলল, "আব্বা, জমি কালামের ছিল। কালাম নেই। জমি আমার আর আমার সন্তানদের। আমি কাগজ দেবো না।"
শ্বশুর রেগে গেলেন। ইকবাল রেগে গেল। চলে গেল দুজনেই।
তারপর শুরু হলো আসল যুদ্ধ।
৩
ইকবাল কোর্টে কেস করল। দাবি: জমি কালামের পৈতৃক সম্পত্তি, তাই ভাইয়েরও অংশ আছে।
আয়েশা উকিল খুঁজল। গ্রামে উকিল নেই। উপজেলায় আছে। উকিলের ফি: প্রতি তারিখে দুই হাজার টাকা। কোর্টে যাতায়াত: বাসে পাঁচশো টাকা। খাওয়া-দাওয়া: দুইশো টাকা। প্রতি তারিখে তিন হাজার টাকা খরচ। মাসে দুইটা তারিখ। ছয় হাজার টাকা। আয়েশার মাসিক আয় তখন শূন্য।
আয়েশা কী করল? কাজ শুরু করল। প্রথমে অন্যের বাড়িতে কাজ করল। রান্না। কাপড় ধোওয়া। ঘর মোছা। তিনটা বাড়িতে। সকাল থেকে দুপুর। মাসে চার হাজার টাকা।
এটা যথেষ্ট না। তাই আয়েশা মুরগি পালন শুরু করল। পাঁচটা মুরগি দিয়ে। একটা মুরগি কিনেছিল তিনশো টাকায়। পাঁচটায় দেড় হাজার। এই দেড় হাজার কোথা থেকে এলো? আয়েশার বিয়ের গয়না ছিল একটা মাত্র সোনার নাকফুল। বিক্রি করল। দুই হাজার পেল। দেড় হাজারে মুরগি কিনল। বাকি পাঁচশো রাখল জরুরির জন্য।
পাঁচটা মুরগি ডিম দিল। ডিম বিক্রি করল। ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বের করল। বাচ্চা বড় করল। বিক্রি করল। আবার কিনল। আবার পালল।
তিন বছর লাগল কেসে। তিন বছর ধরে আয়েশা কোর্টে গেছে। বাসে। একা। কখনো বৃষ্টিতে। কখনো রোদে। কোর্টের বারান্দায় বসে থেকেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। উকিলের সাথে কথা বলেছে। কাগজপত্র জোগাড় করেছে। ওয়ারিশ সনদ। জমির দলিল। খাজনার রশিদ। নামজারি।
তিন বছরে পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ হলো। উকিলের ফি, যাতায়াত, স্ট্যাম্প, ফটোকপি, এটা-সেটা।
কোর্ট রায় দিল আয়েশার পক্ষে। জমি আয়েশা ও তার সন্তানদের।
রায়ের দিন আয়েশা কাঁদেনি। কোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। তিন বছরের দীর্ঘশ্বাস। ভারী। গভীর। তারপর বাসে উঠে বাড়ি ফিরেছিল। রাতে মুরগিদের খাবার দিয়েছিল। গুনেছিল। সব আছে। একটাও কম নেই।
৪
এখন আয়েশার পোল্ট্রি ফার্ম। ফার্ম বললে বড় শোনায়। আসলে বাড়ির পেছনে তিনটা শেড। বাঁশ আর টিন দিয়ে বানানো। মোট দুইশো মুরগি। ব্রয়লার না। দেশি মুরগি আর লেয়ার। ডিম বিক্রি করে। মুরগি বিক্রি করে। মাসে পনেরো হাজার টাকা আয়।
পনেরো হাজার। কালাম বেঁচে থাকলে হাওরের মাছ বিক্রি করে আট-দশ হাজার আনতো। আয়েশা এখন তার চেয়ে বেশি আনে। কিন্তু আয়েশা একজনের কাজ করে না। দুইজনের কাজ করে। মা, বাবা, দুটোই।
সকালে মুরগিদের খাবার দেয়। পানি দেয়। শেড পরিষ্কার করে। ডিম সংগ্রহ করে। অসুস্থ মুরগি আলাদা করে। টিকা দেয়। হিসেব রাখে। কোন মুরগি কতদিন বয়সী, কোনটা ডিম দিচ্ছে, কোনটা দিচ্ছে না, কোনটা বিক্রি করা উচিত। সব মাথায়।
দুপুরে বাচ্চাদের খাবার দেয়। বড় মেয়ে রুবি, ষোলো বছর, ক্লাস টেনে পড়ে। মেজো ছেলে সোহেল, তেরো বছর, ক্লাস সেভেনে। ছোট ছেলে রাকিব, দশ বছর, ক্লাস ফোরে। তিনজনের স্কুলের খরচ, বইয়ের খরচ, কোচিংয়ের খরচ। আয়েশা হিসেব করে কোনটা আগে, কোনটা পরে। রুবির SSC পরীক্ষা আসছে বছরে। রুবিকে প্রাইভেট পড়াতে হবে। সোহেলের জুতো ছিঁড়ে গেছে। রাকিবের স্কুলের ব্যাগের জিপার ভেঙে গেছে।
বিকেলে বাজারে যায়। ডিম নিয়ে। হাটে বিক্রি করে। দর কষাকষি করে। প্রথম প্রথম হাটের লোকেরা ঠকাতো। "বিধবা, একলা, বেচারি।" ঠকানো সহজ। কিন্তু আয়েশা শিখেছে। বাজারদর জানে। মোবাইলে চেক করে। কে কত দামে কিনছে, সব খবর রাখে। এখন কেউ ঠকাতে পারে না। এখন সবাই জানে, আয়েশার সাথে ব্যবসা করতে হলে সোজা কথা বলতে হবে।
৫
সন্ধ্যায় আয়েশা উঠানে বসে আছে। সোহেল পড়ছে ঘরে। রাকিব খেলতে গেছে। রুবি রান্না করছে। রুবি রান্না শিখেছে মায়ের কাছে। আয়েশা শিখিয়েছে, কারণ বাস্তবতা। রুবিকে একদিন নিজেকে সামলাতে হবে। আয়েশা চায় না রুবি অসহায় হোক। কখনো না।
সোহেল পড়া শেষ করে বাইরে এলো। আয়েশার পাশে বসল।
"মা, তুমি বাবার চেয়ে শক্তিশালী।"
আয়েশা সোহেলের মাথায় হাত রাখল। চুলে আঙুল বুলাল।
"না। আমি দুইজনের কাজ করি। এটা শক্তি না। এটা বাধ্যতা।"
সোহেল বুঝল কিনা আয়েশা জানে না। তেরো বছরের ছেলে। বাবাকে হারানোর ব্যথা আছে, কিন্তু বাবার স্মৃতি ঝাপসা হয়ে আসছে। এটা স্বাভাবিক। সময় সবকিছু ঝাপসা করে দেয়। স্মৃতিও। ব্যথাও। শুধু অভাবটা ঝাপসা হয় না। অভাব সবসময় স্পষ্ট।
আয়েশা আকাশের দিকে তাকাল। সন্ধ্যার আকাশ। প্রথম তারা উঠেছে। কালাম বলতো, "তারা হলো আল্লাহর বাতি। যখন পৃথিবীতে অন্ধকার হয়, আল্লাহ তারা জ্বালান।" কালাম সুন্দর কথা বলতো। সুন্দর মানুষ ছিল। কিন্তু সুন্দর মানুষও চলে যায়। সুন্দর কথা থাকে, মানুষ থাকে না।
আয়েশা ভাবল, কালাম থাকলে কেমন হতো? পোল্ট্রি ফার্ম হতো না হয়তো। কালাম মাছ ধরতো। আয়েশা সংসার করতো। জীবন সরল থাকতো। সরল, কিন্তু হয়তো আরামদায়ক। দুইজনের কাঁধে বোঝা ভাগ হতো। এখন পুরো বোঝা আয়েশার একার কাঁধে।
কিন্তু আয়েশা বোঝা বহন করে। কারণ বিকল্প নেই। বোঝা নামিয়ে রাখলে বাচ্চারা পড়ে যাবে। বোঝা মানে বাচ্চাদের জীবন। সেটা নামানো যায় না।
৬
গ্রামের লোকেরা আয়েশাকে এখন অন্যভাবে দেখে। আগে বলতো, "বিচারা আয়েশা, বিধবা।" এখন বলে, "আয়েশা ভাবি ভালো করতেছে।"
কিন্তু এই "ভালো করতেছে"-র পেছনেও একটা অবাক আছে। অবাক, কারণ একটা বিধবা মহিলা একা দাঁড়িয়ে আছে। এটা অস্বাভাবিক। এটা নিয়মের বাইরে। নিয়ম হলো, বিধবা মহিলা কোনো পুরুষ আত্মীয়ের আশ্রয়ে যাবে। ভাই। দেবর। শ্বশুর। কেউ একজন। একটা পুরুষের ছায়া দরকার। ছায়া ছাড়া মহিলা থাকতে পারে না। এটা সমাজের বিশ্বাস।
আয়েশা ছায়া ছাড়া থাকছে। রোদে দাঁড়িয়ে থাকছে। রোদে চামড়া পুড়ছে। কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে।
মাঝে মাঝে একটা ভয় আসে। রাতে। যখন বাচ্চারা ঘুমিয়ে যায়। যখন বাড়িটা নিশ্চুপ। যখন শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরে শিয়ালের ডাক শোনা যায়। তখন আয়েশা ভাবে, যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে? যদি কাজ করতে না পারে? তাহলে?
তাহলে কোনো উত্তর নেই। তাহলে বাচ্চারা এতিম হবে পুরোপুরি। এখন তারা অর্ধ-এতিম। তখন পুরো।
আয়েশা এই ভয়ের সাথে বাঁচে। প্রতিরাতে। ভয়টাকে পাশে নিয়ে ঘুমায়। সকালে উঠে ভয়টাকে কোণায় রেখে কাজে বেরোয়। সন্ধ্যায় ফিরে আবার ভয়টাকে পাশে নেয়। এটা সঙ্গী। কালামের জায়গায় এখন ভয়। শাপলার গন্ধের জায়গায় মুরগির ঘরের গন্ধ। নৌকার দোলার জায়গায় কোর্টের বারান্দার অপেক্ষা।
৭
আয়েশা ঘুমানোর আগে মুরগির শেড চেক করে। তালা ঠিক আছে কিনা। শিয়াল ঢুকতে পারবে না তো। ছাদের টিন সরে যায়নি তো। সব ঠিক আছে।
সতেরোটা মুরগি ঘুমাচ্ছে। আগামীকাল টিকা আনতে হবে। পরশু হাটবার। ডিম বিক্রি করতে হবে। শুক্রবার রুবির প্রাইভেট টিউটরের টাকা দিতে হবে। রবিবার সোহেলের জুতো কিনতে হবে।
প্রতিটা দিন একটা যুদ্ধ। ছোট যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধ। আর আয়েশা একা সৈনিক।
বিধবা মানে অসহায় না। বিধবা মানে একা যুদ্ধ করা।
আয়েশা ঘরে ঢুকল। দরজা বন্ধ করল। বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে। তিনটা মুখ। তিনটা শ্বাস। তিনটা জীবন। আয়েশার তিনটা কারণ ভোরে ওঠার।
বিছানায় শুয়ে আয়েশা চোখ বন্ধ করল। ঘুমের আগে কালামের মুখ ভেসে উঠল। ঝাপসা। বছরে বছরে আরো ঝাপসা হচ্ছে। কিন্তু হাসিটা মনে আছে। কালামের হাসিটা স্পষ্ট। বাকি সব ঝাপসা, কিন্তু হাসিটা স্পষ্ট।
আয়েশা ঘুমিয়ে পড়ল। কাল ভোর পাঁচটায় উঠবে। মুরগি গুনবে। সতেরোটা। সব আছে কিনা দেখবে। তারপর দিন শুরু করবে। আরেকটা দিন। আরেকটা যুদ্ধ। একা।