তালাকপ্রাপ্তা

তালাক মানে ব্যর্থতা না। তালাক মানে নিজেকে বেছে নেওয়া।

পর্ব ১০ · ৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

ফারহানা সকালে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চোখের নিচে কালি নেই। ঘুম হয়েছে। পুরো রাত। কারো নাক ডাকা নেই। কারো ফোনের আলো নেই। কারো অভিযোগ নেই।

এটাই তালাকের সবচেয়ে বড় উপহার: নিরবতা।

বিশ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। পঁচিশে তালাক। পাঁচ বছরের সংসার। পাঁচটি বছরে ফারহানা শিখেছে রান্না করতে, শাশুড়িকে সামলাতে, স্বামীর মেজাজ পড়তে, নিজের ইচ্ছাকে গিলে ফেলতে। শেখেনি শুধু একটা জিনিস: নিজেকে ছোট করতে।

সেটাই সমস্যা হয়েছিল।

রাকিব চেয়েছিল ফারহানা চাকরি ছাড়ুক।

"তোমার চাকরির দরকার নেই। আমি আছি তো।"

ফারহানা ব্যাংকে চাকরি করে। অফিসার পদে। মাসে ত্রিশ হাজার টাকা। রাকিব একটি ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করে। মাসে পঁচিশ হাজার। ফারহানা বেশি আয় করে। এটাই রাকিবের গলায় কাঁটা।

"লোকে কী বলবে? বউ বেশি কামায়?"

"লোকে কী বলবে সেটা ভাবলে আমি কোনোদিন ব্যাংকে ঢুকতে পারতাম না।"

এই বাক্যটা ছিল তালাকের বীজ। রোপিত হয়েছিল প্রথম বছরেই। চার বছর ধরে অঙ্কুরোদগম হয়েছে। পঞ্চম বছরে গাছ হয়ে ছায়া ফেলেছে পুরো সংসারে।

শাশুড়ি বলেছিলেন, "মেয়েরা চাকরি করলে সংসার ভাঙে।"

ফারহানা বলেছিল, "চাকরি সংসার ভাঙে না। অসম্মান ভাঙে।"

সেদিন রাত থেকে রাকিব আলাদা ঘরে ঘুমিয়েছে। তিন মাস। তারপর একদিন কাগজ এনেছে। তালাকনামা।

ফারহানা কাগজটা দেখেছে। হাত কাঁপেনি। চোখ ভেজেনি। ভেতরে কিছু একটা ভেঙেছে, কিন্তু সেটা ভালোবাসা না। সেটা ছিল আশা। হয়তো সে বদলাবে। মানুষ বদলায় না। অভ্যাস বদলায়, মানুষ বদলায় না।

সই করেছে।

সমাজের রায় তাৎক্ষণিক এসেছে।

"মেয়েটা মানিয়ে নিতে পারেনি।"

মানিয়ে নেওয়া। এই শব্দটা শুধু মেয়েদের জন্য। ছেলেদের জন্য কেউ বলে না মানিয়ে নাও। ছেলেরা যা খুশি করে, মেয়েরা মানিয়ে নেয়। এটাই নিয়ম। ফারহানা নিয়ম মানেনি।

খালা বলেছেন, "তালাকপ্রাপ্তা মেয়ে? কী মুখ নিয়ে ঘুরবে?"

ফুপু বলেছেন, "আরেকটু সহ্য করলেই হতো।"

প্রতিবেশী ফিসফিস করে, "ফারহানার বাড়ি থেকে কোনো শব্দ আসে না। একা থাকে। কে জানে কী করে।"

একা থাকা মেয়ে সন্দেহজনক। একা থাকা ছেলে স্বাধীন। ভাষায়ই বৈষম্য।

বিয়ের প্রস্তাব আসে। মাঝে মাঝে।

"তালাকপ্রাপ্তা? বিপত্নীক হলে চলতো।"

পুরুষের স্ত্রী মারা গেলে সে দুর্ভাগা। মেয়ের তালাক হলে সে দোষী। মৃত্যু ক্ষমাযোগ্য, তালাক না।

একজন প্রস্তাব দিয়েছিল: "আপনাকে বিয়ে করবো। কিন্তু চাকরি ছাড়তে হবে।"

ফারহানা হেসেছিল। শব্দ করে হেসেছিল। সেই হাসিতে পাঁচ বছরের জমানো কান্না ছিল।

"আমি একবার চাকরির জন্য সংসার ছেড়েছি। আবার ছাড়বো বলে মনে করেন?"

বাবা-মা লজ্জিত। কিন্তু পাশে আছেন।

বাবা একদিন বলেছিলেন, "তুই ঠিক করেছিস কিনা জানি না। কিন্তু তুই নিজে করেছিস। এটাই বড় কথা।"

মা বলেছিলেন, "আমি তোর বয়সে মানিয়ে নিয়েছিলাম। তুই মানিয়ে নিসনি। কে ঠিক করেছে, সেটা সময় বলবে।"

মায়ের কথায় একটা ছায়া ছিল। মায়ের নিজের গল্পের ছায়া। মা কী মানিয়ে নিয়েছিলেন, সেটা ফারহানা জানে। কিন্তু জিজ্ঞেস করে না। কিছু প্রশ্ন না করাই ভালোবাসা।

ফারহানা এখন মিরপুরে একটা ছোট ফ্ল্যাটে থাকে। একটা ঘর, একটা রান্নাঘর, একটা বারান্দা। ভাড়া আট হাজার।

সকালে উঠে নিজের জন্য চা বানায়। দুধ, চিনি, এলাচ। আগে রাকিবের জন্য আগে বানাতে হতো, তারপর শাশুড়ির জন্য, তারপর নিজের জন্য সময় থাকলে। এখন প্রথম কাপটা তার।

সন্ধ্যায় নিজের জন্য রান্না করে। যা ইচ্ছা রান্না করে। আজ ডিম ভুনা। কাল খিচুড়ি। পরশু শুধু দই-চিড়া। কেউ বলে না এটা কী রান্না। কেউ বলে না নুন কম হয়েছে।

রাতে বারান্দায় দাঁড়ায়। মিরপুরের আকাশে তারা দেখা যায় না। কিন্তু ফারহানা জানে তারা আছে। ধোঁয়ার ওপরে। দেখা না গেলেও আছে।

তার জীবনটাও তাই। বাইরে থেকে দেখলে একা, ভাঙা, অসম্পূর্ণ। ভেতর থেকে দেখলে পরিপূর্ণ। প্রথমবার পরিপূর্ণ।

ফোন বাজে। মা।

"খেয়েছিস?"

"হ্যাঁ, আম্মা। খেয়েছি।"

এবার সত্যি খেয়েছে।

তালাক মানে ব্যর্থতা না। তালাক মানে নিজেকে বেছে নেওয়া। এই বেছে নেওয়ার দাম আছে। দাম একাকীত্ব, দাম সমাজের চোখ, দাম আত্মীয়ের ফিসফিস। কিন্তু দামের বিপরীতে যা পেয়েছে, সেটার কোনো মূল্য নেই।

সেটা হলো সকালের প্রথম কাপ চা। নিজের জন্য। নিজের হাতে। নিজের সময়ে।

---

*অর্ধেক আকাশ। পর্ব ১০/১০০।*