বাল্যবধূ

যোগ-বিয়োগ জানতাম। এখন শুধু বিয়োগ জানি।

পর্ব ১১ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

খাতাটা বিছানার নিচে।

গণিতের খাতা। ক্লাস সেভেন। রুমার নাম লেখা প্রথম পাতায়, নীল কালিতে। নামের নিচে রোল নম্বর: ১৭। সেকশন: খ। বিষয়: গণিত। শিক্ষক: মোস্তফা স্যার।

মোস্তফা স্যার বলতেন, "রুমা, তোর মাথায় নম্বর ঘোরে। তুই ভালো করবি।"

ভালো করেনি রুমা।

চৌদ্দ বছরে বিয়ে হয়ে গেছে। পনেরো বছরে পেট। এখন পেটটা এতো বড় যে রুমা নিজের পায়ের নখ দেখতে পায় না। শরীর ভারী, পা ফোলা, মাথা ঘোরে মাঝে মাঝে। ধাত্রী ফুপু বলেছে, "মাথা ঘোরা স্বাভাবিক। প্রথমবার সবারই হয়।"

প্রথমবার। রুমার সবকিছুই প্রথমবার। প্রথমবার অন্যের ঘরে ঘুমানো। প্রথমবার অচেনা মানুষের শরীরের পাশে শুয়ে থাকা। প্রথমবার বমি, যেটা সকালে আসে আর দুপুর পর্যন্ত থাকে। প্রথমবার এই ভয়, যেটার কোনো নাম নেই, শুধু পেটের ভেতর থেকে উঠে এসে গলায় আটকে যায়।

স্বামীর নাম জসিম। আঠাশ বছর। সিএনজি চালায়। জসিম খারাপ মানুষ না। মারে না। গালি দেয় না। কিন্তু জসিমের সাথে কথা বলার কিছু নেই রুমার। জসিম ক্রিকেট নিয়ে কথা বলে, রুমা ক্রিকেট বোঝে না। জসিম সিএনজির যাত্রী নিয়ে কথা বলে, রুমা শোনে। জসিম রাতে রুমার কাছে আসে, রুমা চুপ করে থাকে। এটুকুই। দুটো মানুষ একটা খাটে ঘুমায়, কিন্তু দুটো আলাদা পৃথিবীতে থাকে। জসিমের পৃথিবীতে স্ত্রী আছে, সংসার আছে, সিএনজির কিস্তি আছে। রুমার পৃথিবীতে একটা খাতা আছে, বিছানার নিচে।

বিয়ের আগে রুমার একটা পৃথিবী ছিল। ছোট পৃথিবী। স্কুল, বাড়ি, পুকুরঘাট, মলিনা আপার দোকান যেখানে এক টাকায় চানাচুর পাওয়া যেত। সেই পৃথিবীতে রুমা দৌড়াতো। গাছে উঠত। নদীতে পা ডুবিয়ে বসে থাকত। সেই পৃথিবীতে রুমার হাতে একটা খাতা থাকত, খাতায় সংখ্যা থাকত, সংখ্যাগুলো বলত যে পৃথিবীটা বোঝা যায়, গোনা যায়, সাজানো যায়।

সেই পৃথিবী থেকে এই পৃথিবী। দূরত্ব কত? রুমা হিসাব করতে পারে। চৌদ্দ কিলোমিটার, বাবার বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু আসল দূরত্ব কিলোমিটারে মাপা যায় না। আসল দূরত্ব: এক বছর। এক বছরে রুমা ক্লাস সেভেনের ছাত্রী থেকে পনেরো বছরের গর্ভবতী হয়ে গেছে। এক বছরে স্কুলের ইউনিফর্ম খুলে বিয়ের শাড়ি পরেছে। এক বছরে হাতের খাতা সরে গেছে, হাতে এসেছে হাতা, খুন্তি, ঝাড়ু।

এখন রুমার পৃথিবী একটা ঘর। দশ বাই আট ফুট। টিনের চাল। একটা খাট, একটা আলমারি, একটা আয়না। আয়নায় রুমা নিজেকে দেখে। পনেরো বছরের মুখে চল্লিশ বছরের ক্লান্তি।

রাতে সবাই ঘুমালে রুমা খাতাটা বের করে।

বিছানার নিচে, পুরোনো কাপড়ের তলায় লুকানো। শাশুড়ি দেখলে বলবে, "এখনো পড়ার ভূত মাথায়? সংসার সামলা আগে।" জসিম দেখলে কিছু বলবে না, কিন্তু বুঝবেও না। জসিম ক্লাস ফাইভ পাস। গণিত মানে তার কাছে সিএনজির ভাড়ার হিসাব। পনেরো টাকা কিলোমিটার, দশ কিলোমিটার গেলে একশো পঞ্চাশ, সিএনজি গ্যাসের খরচ বাদ দিলে লাভ আশি। এটুকুই গণিত।

রুমার গণিত আলাদা। রুমার গণিতে ভগ্নাংশ আছে, দশমিক আছে, বীজগণিত আছে। রুমার গণিতে x আর y আছে, যেখানে x জানা নেই কিন্তু জানা সম্ভব, যেখানে সমীকরণ সমাধান করলে উত্তর পাওয়া যায়। জীবনে কোনো সমীকরণের সমাধান নেই। কিন্তু খাতায় আছে।

রুমা খাতা খোলে। পাতা উল্টায়। নিজের হাতের লেখা দেখে।

ভগ্নাংশ। অধ্যায় ৭। মোস্তফা স্যার বোর্ডে লিখেছিলেন: ১/২ + ১/৩ = ? রুমা প্রথম উত্তর দিয়েছিল। ৫/৬। স্যার হেসেছিলেন। "ঠিক। তুই একদিন ইঞ্জিনিয়ার হবি।"

ইঞ্জিনিয়ার। শব্দটা রুমা এখনো মনে রেখেছে। শব্দটা ভারী, ঝকঝকে, রোদের মতো। কিন্তু রোদ এখন জানালার ওপাশে। রুমার ঘরে রোদ আসে বিকেলে, অল্প একটু, খাটের এককোণায়। সেই আলোর টুকরোটা দেখে রুমা ভাবে, এই আলোটুকুই তার।

খাতার পাতায় পাতায় রুমার আঁকা ত্রিভুজ, আয়তক্ষেত্র, বৃত্ত। জ্যামিতির বাক্স ছিল রুমার, বাবা কিনে দিয়েছিল। কম্পাস, চাঁদা, স্কেল। কম্পাসটা ছিল রুমার প্রিয়। একটা বিন্দুতে সুঁই ফুটিয়ে ঘোরালে একটা বৃত্ত হয়। নিখুঁত বৃত্ত। পৃথিবীতে অনেক কিছু অসম, কিন্তু বৃত্ত সবসময় সমান। কেন্দ্র থেকে প্রতিটা বিন্দুর দূরত্ব একই। এই সাম্যটা রুমার ভালো লাগত।

সেই বাক্সটা বিয়ের সময় আনতে পারেনি। মা বলেছিল, "শ্বশুরবাড়িতে জ্যামিতির বাক্স নিয়ে যাবি? লোকে হাসবে।"

লোকে হাসবে। এই ভয়ে কত কিছু ফেলে আসতে হয়। জ্যামিতির বাক্স, স্কুলের ব্যাগ, বান্ধবী সুমির সাথে টিফিনে ভাগ করে খাওয়া পাউরুটি, বিকেলে মাঠে দৌড়ানো, সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসে অঙ্ক করা। সব ফেলে এসেছে। শুধু খাতাটা এনেছে। লুকিয়ে।

যোগ-বিয়োগ জানতাম। এখন শুধু বিয়োগ জানি।

রুমা খাতা বন্ধ করে। বিছানার নিচে রাখে। চোখ বন্ধ করে। পেটের ভেতরে বাচ্চাটা নড়ে ওঠে। একটা লাথি। ছোট্ট, কিন্তু জোরালো। রুমা হাত রাখে পেটের ওপর। বাচ্চাটা আবার নড়ে। যেন সে বলছে, আমি আছি। রুমা বলে, জানি। তুই আছিস। তোর জন্যই আছি।

রুমা ভাবে, তুইও কি অঙ্ক ভালোবাসবি?

ব্যথা শুরু হলো রাত তিনটায়।

রুমা আগে কখনো এরকম ব্যথা পায়নি। পেটের নিচ থেকে শুরু হয়ে কোমর দিয়ে ঘুরে পিঠে যায়। যেন কেউ শরীরের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে মুচড়ে ধরেছে। রুমা চিৎকার করল। জসিম উঠে গেল। শাশুড়ি দৌড়ে এলো।

"সময় হয়েছে। ধাত্রী ফুপুকে ডাকো।"

ধাত্রী ফুপু এলো। হাত দিয়ে পেট দেখল। ভ্রু কুঁচকে গেল। "বাচ্চার মাথা নিচে আসেনি। উল্টো আছে।"

শাশুড়ি বলল, "কী করবে?"

"হাসপাতালে নিতে হবে। এটা আমার পক্ষে সম্ভব না।"

হাসপাতাল। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স। এখান থেকে বারো কিলোমিটার। রাত তিনটায় কোনো যানবাহন নেই। জসিমের সিএনজি আছে, কিন্তু রাস্তা ভাঙা, অন্ধকার, এবং রুমার শরীর থেকে রক্ত পড়তে শুরু করেছে।

রক্ত। রুমা আগে রক্ত দেখেছে। মাসিকের রক্ত, যেটা এখনো নতুন, যেটা শুরু হয়েছিল তেরো বছরে, মা বলেছিল "এটা স্বাভাবিক, সবার হয়," কিন্তু এই রক্ত স্বাভাবিক না। এই রক্ত গাঢ়, ঘন, থামছে না।

জসিম রুমাকে সিএনজিতে তুলল। শাশুড়ি পাশে বসল। ধাত্রী ফুপু অন্যদিকে। সিএনজি ছুটল। রাস্তার গর্তে গর্তে ধাক্কা খেল। প্রতিটা ধাক্কায় রুমা চিৎকার করল। শাশুড়ি বলল, "মা, একটু সহ্য কর।"

সহ্য করা। এটাই তো শিখেছে রুমা। চৌদ্দ বছরে বিয়ে: সহ্য কর। পনেরো বছরে গর্ভ: সহ্য কর। অচেনা ঘরে অচেনা মানুষের সাথে: সহ্য কর। শরীর যখন বলে "আমি পারছি না," তখনও: সহ্য কর। সহ্য করা মেয়েদের প্রথম পাঠ। স্কুলে শেখায় না, কিন্তু শেখা হয়ে যায়। মায়ের কাছ থেকে, দাদির কাছ থেকে, পাড়ার মেয়েদের কাছ থেকে। সবাই সহ্য করে। সবাই চুপ থাকে। সবার চোখের ভেতরে একই ক্লান্তি।

হাসপাতালে পৌঁছাতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগল। ইমার্জেন্সিতে একজন ডাক্তার। ক্লান্ত চোখ। রুমাকে দেখে বলল, "কত বয়স?"

"পনেরো।"

ডাক্তারের চোখে কিছু একটা চমকে উঠল। রাগ? দুঃখ? অভ্যাস? হয়তো তিনটাই। তিনি বলতে গিয়েও কিছু বললেন না। এই ডাক্তার কতজন পনেরো বছরের মেয়েকে দেখেছেন এই টেবিলে? কত রুমা এই ইমার্জেন্সিতে এসেছে, একই বয়সে, একই ভয়ে, একই রক্তে? ডাক্তার জানেন। ডাক্তার গুনে রাখেন না। গুনলে পাগল হয়ে যাবেন।

রুমাকে ট্রলিতে নিয়ে ভেতরে ঢোকালেন।

ব্লাড প্রেশার মাপলেন। সংখ্যাটা দেখে মুখ শক্ত হয়ে গেল। নার্সকে বললেন, "একলাম্পশিয়া হচ্ছে। ম্যাগনেসিয়াম সালফেট দাও। সিজার লাগবে।"

একলাম্পশিয়া। রুমা শব্দটা চেনে না। শব্দটা ভারী, বিদেশি, ভয়ংকর। রুমা শুধু বুঝল, তার শরীর আর পারছে না। পনেরো বছরের শরীর। যে শরীরে এখনো হাড় বাড়ছে, যে শরীর এখনো নিজেকে তৈরি করছে, সেই শরীরে এখন আরেকটা জীবনের ভার। শরীরটা তৈরি নয়। মন তৈরি নয়। কিছুই তৈরি নয়।

খিঁচুনি শুরু হলো। রুমার শরীর ধনুকের মতো বেঁকে গেল। চোখ উলটে গেল। মুখ থেকে ফেনা বেরোলো। জসিম দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। শাশুড়ি দোয়া পড়ছে।

ডাক্তার বললেন, "সিজার করতে হবে এখনই। তা না হলে মা আর বাচ্চা দুজনকেই হারাবো।"

রুমা বেঁচে গেল।

বাচ্চাও বেঁচে গেল। ছেলে। দুই কেজি একশো গ্রাম। অপুষ্ট, কিন্তু জীবিত। বাচ্চাটা কাঁদল। সেই কান্না শুনে রুমা চোখ খুলল। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সাদা সিলিং। টিউবলাইটের আলো। গন্ধ: ডেটল, রক্ত, ঘাম।

নার্স বললেন, "মা, ছেলে হয়েছে।"

রুমা কিছু বলতে পারল না। শরীরে কোনো শক্তি নেই। পেটে সেলাই। মাথায় একটা শূন্যতা, যেন মাথার ভেতরে যা ছিল সব বেরিয়ে গেছে। বাচ্চাটাকে পাশে রাখা হলো। ছোট্ট মুখ। চোখ বন্ধ। হাতের আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ, যেন কিছু ধরে আছে, যেটা কেউ কেড়ে নেবে।

রুমা বাচ্চাটার দিকে তাকাল। এই বাচ্চাটা তার শরীরের ভেতরে ছিল। এই বাচ্চাটার জন্য তার শরীর ভেঙে গেছে। এই বাচ্চাটাকে সে চেনে না, কিন্তু এই বাচ্চাটার জন্য সে মরতে গিয়েছিল। পনেরো বছর বয়সে মৃত্যু। মৃত্যু আসতে পারত। আসেনি। সেটা কপাল না ডাক্তারের হাত, রুমা জানে না। ধাত্রী ফুপু বলবে কপাল। ডাক্তার বলবে ম্যাগনেসিয়াম সালফেট।

পনেরো বছর। পনেরো বছরে মৃত্যুর কাছে গিয়ে ফিরে আসা। পনেরো বছরে সিজারের দাগ পেটের নিচে, যেটা সারাজীবন থাকবে। সেই দাগটা রুমার শরীরের মানচিত্রে একটা নতুন রেখা, যেটা কোনো জ্যামিতির বইয়ে নেই। পনেরো বছরে শরীরের ভেতরে কিছু একটা ছিঁড়ে গেছে, যেটা আর জোড়া লাগবে না। ডাক্তার বললেন, "কিডনিতে সমস্যা হয়েছে। সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে। আর পরের বার সতর্ক থাকতে হবে।"

পরের বার। রুমা জানে পরের বার আসবে। জসিম চাইবে। শাশুড়ি চাইবে। "একটা ছেলে হয়েছে, এবার একটা মেয়ে দাও।" কিংবা, "আরেকটা ছেলে দাও, একটায় কী হবে।" রুমার শরীর কী চায়, সেটা কেউ জিজ্ঞেস করবে না। রুমার শরীর একটা জমি। সবাই চাষ করতে চায়। কেউ জিজ্ঞেস করে না, জমি ক্লান্ত কিনা, জমির আর ধারণক্ষমতা আছে কিনা।

তিন দিন পর রুমা বাড়ি ফিরল। জসিমের সিএনজিতে। একই রাস্তা। একই গর্ত। কিন্তু রুমা আর সেই রুমা না। রুমা এখন একটা মা। পনেরো বছরের মা। যার হাতে গণিতের খাতা থাকার কথা ছিল, সেই হাতে এখন একটা বাচ্চা। যার কোলে বই থাকার কথা ছিল, সেই কোলে এখন দুই কেজি একশো গ্রামের একটা জীবন।

দুই মাস পরে।

রুমা ঘরের কাজ করে। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ায়। ভাত রান্না করে। কাপড় কাচে। শাশুড়ির পা টিপে দেয়। জসিমের জন্য অপেক্ষা করে। এটাই জীবন। প্রতিদিন একই। একই ঘর, একই কাজ, একই ক্লান্তি। রুমার শরীর এখন পনেরো বছরের শরীর না, বুড়ির শরীর। কোমরে ব্যথা, পেটে সেলাইয়ের দাগে চুলকানি, হাঁটু ভারী, চোখে ঘুমের নেশা সবসময়। পনেরো বছরে বুড়ি হওয়ার রেসিপি সহজ: চৌদ্দতে বিয়ে দাও, পনেরোতে মা বানাও।

কিন্তু রাতে, সবাই ঘুমালে, রুমা খাতাটা বের করে।

বাচ্চাটা পাশে ঘুমায়। ছোট্ট শরীর। নাকডাকা নেই, শুধু হালকা শ্বাসের শব্দ। রুমা একহাতে বাচ্চার পিঠে হাত রাখে, অন্য হাতে খাতা ধরে। ফোনের আলোতে পড়ে। ভগ্নাংশ। দশমিক। শতকরা।

৫৯ শতাংশ। বাংলাদেশে ৫৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় আঠারো বছরের আগে। রুমা এই সংখ্যা জানে না। কিন্তু রুমা জানে, তার ক্লাসের ত্রিশজন মেয়ের মধ্যে কতজনের বিয়ে হয়ে গেছে। সুমি: চৌদ্দ বছরে। রেখা: তেরোতে। পারুল: পনেরোতে। শুধু মিনা পড়ছে এখনো। মিনার বাবা স্কুলের শিক্ষক। মিনার বাবা জানেন, সংখ্যার ক্ষমতা। জানেন, মেয়ের হাতে খাতা থাকলে মেয়ে নিজেই সমীকরণ সমাধান করবে।

রুমার বাবাও জানত। কিন্তু রুমার বাবা দিনমজুর। বাবার হাতে ক্ষমতা নেই, সংখ্যা নেই, শুধু ক্ষুধা আছে। ক্ষুধার সামনে সব সমীকরণ ভেঙে পড়ে। মেয়ের বিয়ে দিলে একটা মুখ কমে। একটা মুখ কমলে ভাতের চাহিদা কমে। এটাই বাবার গণিত। বিয়োগ।

রুমা খাতার শেষ পাতায় কিছু লেখে। ফোনের আলোতে। ছোট ছোট অক্ষরে। কেউ যেন না দেখে।

সে লেখে: "আমার ছেলে পড়বে। আমি পড়াবো। যতটুকু পারি।"

তারপর আরেকটা লাইন: "আমার ছেলে কোনো মেয়েকে চৌদ্দ বছরে বিয়ে করবে না।"

তারপর আরেকটা: "আমি একদিন বাকি অঙ্কগুলো শেষ করব। অধ্যায় ৮ বাকি আছে।"

খাতা বন্ধ করে। বিছানার নিচে রাখে। বাচ্চাটা নড়ে। রুমা কাছে টেনে নেয়। বাচ্চার মাথায় ঠোঁট রাখে। চুলের গন্ধ। দুধের গন্ধ। নতুন মানুষের গন্ধ।

জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে। বিছানার এককোণায় পড়েছে। রুমা সেই আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। চাঁদ গোল। নিখুঁত বৃত্ত। কম্পাস ছাড়াই বৃত্ত। রুমা ভাবে, কে এঁকেছে ওটা? কে ওটার কেন্দ্র ঠিক করেছে, ব্যাসার্ধ মেপেছে?

পনেরো বছর। পুরোনো শরীর। কিন্তু খাতাটা আছে। খাতায় যোগ-বিয়োগ আছে। রুমা জানে, যোগ-বিয়োগ জানলে পৃথিবী বোঝা যায়। সেই জানাটুকু কেউ কেড়ে নিতে পারেনি। সেই জানাটুকু বিছানার নিচে, পুরোনো কাপড়ের তলায়, অক্ষত আছে।

বিছানার নিচে, পুরোনো কাপড়ের তলায়, একটা গণিতের খাতা শুয়ে আছে। তার প্রথম পাতায় লেখা: রুমা, রোল ১৭, সেকশন খ।

সেই রুমা এখনো আছে। বিছানার নিচে, খাতার ভেতরে, সংখ্যার ফাঁকে ফাঁকে। অধ্যায় ৮ বাকি আছে। একদিন শেষ করবে।