পতিতা
আমার ছেলে যেন আমাকে দেখে লজ্জা না পায়।
১
পাঁচশো টাকা।
একটা শরীরের দাম পাঁচশো টাকা। কখনো তিনশো। কখনো সাতশো, যদি রাত কাটায়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় পাঁচশো। এই দামটা মায়া ঠিক করেনি। সর্দারনি ঠিক করেছে। সর্দারনি সবকিছু ঠিক করে: দাম, সময়, কে ঢুকবে, কে ঢুকবে না। মায়ার কাজ শুধু ঘরে থাকা, দরজা খোলা, দরজা বন্ধ করা।
দৌলতদিয়া।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পতিতালয়। পদ্মার পাড়ে। ফেরিঘাটের কাছে। ট্রাকচালক, ফেরির খালাসি, দিনমজুর, মাঝে মাঝে স্কুলের ছেলে, মাঝে মাঝে শহরের লোক গাড়ি নিয়ে আসে। তারা আসে, যায়। মায়ার ঘরটা ছয় বাই আট ফুট। একটা খাট, একটা আলমারি, দরজায় পর্দা। পর্দাটা সবুজ ছিল, এখন ধূসর। কতবার ধোয়া হয়েছে, কতবার শুকিয়েছে, গুনে রাখেনি। পর্দা গুনে রাখার জিনিস না।
মায়ার বয়স পঁচিশ। এখানে জন্ম। মায়ের নাম হালিমা। হালিমাও এখানে কাজ করত। হালিমার আগে হালিমার মা। তিন প্রজন্ম। একই ঘর, একই খাট, একই পর্দা। মায়া ভাবে, পর্দাটা কি সেই আগেরটাই? হয়তো না। কিন্তু ঘরের গন্ধ একই। ঘাম, সস্তা সেন্ট, বিড়ির ধোঁয়া, আর একটা গন্ধ যেটা মায়া চেনে কিন্তু নাম জানে না। সেই গন্ধ দেয়ালে ঢুকে গেছে, মেঝেতে ঢুকে গেছে, খাটের কাঠে ঢুকে গেছে। সাবান দিয়ে ওঠে না। ব্লিচ দিয়ে ওঠে না। কিছু দিয়ে ওঠে না।
সকাল নয়টা। প্রথম কাস্টমার এখনো আসেনি। মায়া চা খাচ্ছে। পাশের ঘরে রেখা আয়নার সামনে বসে আছে। রেখা নতুন, ছয় মাস হয়েছে। গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছে, না কি পাচার হয়ে এসেছে, মায়া জিজ্ঞেস করেনি। জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। এখানে সবার একটা গল্প আছে। গল্পগুলো আলাদা, কিন্তু শেষটা একই: এই ঘর, এই খাট, এই পর্দা। গল্পের শুরুতে হয়তো একটা গ্রাম ছিল, একটা নদী ছিল, একটা মেয়ে ছিল যে ভালোবাসত অথবা বিশ্বাস করত অথবা ক্ষুধার্ত ছিল। শেষে সব গল্প এখানে এসে থামে।
মায়ার গল্পে কোনো শুরু নেই। মায়ার গল্প এখানেই শুরু, এখানেই শেষ। মায়া জানে না বাইরের পৃথিবী কেমন। শুধু জানে এই গলি, এই ঘর, এই পদ্মার বাতাস।
২
মায়ার একটা ছেলে আছে।
নাম রাকিব। সাত বছর। গ্রামে থাকে, মায়ার বোন আমেনার কাছে। আমেনা মায়ার চেয়ে বড়। আমেনা ভাগ্যবান ছিল, বলা ভুল হবে, আমেনা দৌলতদিয়া থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। ষোলো বছরে। একজন দিনমজুরকে বিয়ে করে গ্রামে চলে গিয়েছিল। হালিমা মেনে নিয়েছিল। "একটা মেয়ে তো বেঁচে গেল।" আমেনা জানে মায়া কী করে। গ্রামের আর কেউ জানে না। গ্রামে সবাই জানে মায়া ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করে।
রাকিব জানে না।
মায়া প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা পাঠায়। কখনো সাত হাজার। টাকাটা বিকাশে যায়। আমেনা নেয়। রাকিবের স্কুলের বেতন, খাতা-কলম, জামাকাপড়, ওষুধ। মায়া ফোনে কথা বলে রাকিবের সাথে। সপ্তাহে দুইবার। মঙ্গলবার আর শুক্রবার। এই দুটো দিন মায়ার দিন। বাকি পাঁচটা দিন কাস্টমারের দিন। মঙ্গলবার আর শুক্রবার, বিকেল পাঁচটায়, মায়া ফোন করে।
"আম্মা, তুমি কবে আসবে?"
"শীঘ্রই, বাবা।"
"তোমার কাজ কী, আম্মা?"
"কাপড়ের ফ্যাক্টরিতে কাজ করি। সেলাই করি।"
"তুমি কি ভালো সেলাই করো?"
"হ্যাঁ, বাবা। খুব ভালো।"
রাকিব বিশ্বাস করে। সাত বছরের ছেলে বিশ্বাস করে। মায়ার বুকে কিছু একটা ভাঙে প্রতিবার। ভাঙা জিনিস আবার ভাঙে কীভাবে? ভাঙে। মায়া জানে। কাচের গ্লাস ভাঙলে টুকরো হয়। টুকরোগুলো পায়ে গেঁথে যায়। সেই গাঁথা টুকরোগুলো আবার ভাঙে, আরো ছোট হয়, আরো গভীরে ঢোকে। মায়ার বুকের ভেতরে অনেক ছোট ছোট টুকরো আছে। প্রতিটা ফোনকলে একটা করে নতুন টুকরো যোগ হয়।
ফোন রেখে মায়া ঘরে ফেরে। পর্দা সরিয়ে ঢোকে। খাটে বসে। দেয়ালের দিকে তাকায়। দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডার, গত বছরের। ছবিতে কক্সবাজারের সমুদ্র। নীল জল, সাদা বালু, আকাশ। মায়া কখনো সমুদ্র দেখেনি। মায়া কখনো দৌলতদিয়ার বাইরে যায়নি। শুধু একটা জায়গা চেনে: এই ঘর। আর একটা জায়গা কল্পনা করে: সেই গ্রাম, যেখানে রাকিব থাকে, যেখানে আমেনার ঘরের সামনে একটা আমগাছ আছে, যেখানে রাকিব বিকেলে ক্রিকেট খেলে।
মায়া সেই গ্রামে কখনো যায়নি। যেতে পারে না। গেলে লোকে চিনবে। দৌলতদিয়ার মেয়ে, শরীরে গন্ধ লেগে আছে, চোখে দেখা যায়। মায়া জানে, এই গন্ধ সাবান দিয়ে ওঠে না। এই গন্ধ চলন-বলনে, হাঁটায়, চোখের ক্লান্তিতে, হাতের ইশারায়। যে দেখার সে দেখবে। মায়া ঝুঁকি নিতে পারে না। রাকিবের জন্য।
৩
দুপুরের দিকে পুলিশ আসে।
দুইজন। একজন বয়স্ক, একজন তরুণ। বয়স্কজন সর্দারনির ঘরে যায়। চা খায়। হাসে। গল্প করে। তারপর মায়ার ঘরে আসে। পর্দা সরায়।
"মায়া, আছিস?"
মায়া আছে। মায়া সবসময় আছে। যাওয়ার তো জায়গা নেই।
পুলিশ টাকা দেয় না। পুলিশের দিতে হয় না। এটাই নিয়ম। কার নিয়ম? কে বানিয়েছে? জানা নেই। কিন্তু নিয়ম। আইন বলে পতিতাবৃত্তি বৈধ, আইন বলে পতিতার অধিকার আছে, আইন অনেক কিছু বলে। কিন্তু এই ঘরে আইন ঢোকে না। এই ঘরে ঢোকে পুলিশ, কাস্টমার, সর্দারনি। আইন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে, পর্দার ওপাশে।
পুলিশ আসে, পুলিশ যায়। মায়ার শরীরে আরেকটা দাগ পড়ে, কিন্তু এই দাগ চোখে দেখা যায় না। এই দাগ ভেতরে। চামড়ার নিচে, মাংসের নিচে, হাড়ের কাছে। সেখানে দাগগুলো জমে থাকে, একটার ওপর আরেকটা, স্তরে স্তরে।
তরুণ পুলিশটা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। অস্বস্তিতে। পায়ের ওপর পা রাখে। মায়া ভেতর থেকে দেখে, ছেলেটা লজ্জা পাচ্ছে। নতুন এসেছে হয়তো। লজ্জা কমে যাবে। সময় লাগে। সবকিছুতেই সময় লাগে, শুধু লজ্জা হারাতে কম সময় লাগে। মায়া জানে। মায়ার নিজের লজ্জা কবে গেছে সে মনে করতে পারে না। হয়তো কখনো ছিল না। দৌলতদিয়ায় জন্ম নিলে লজ্জা সাথে আসে না। লজ্জা বাইরের পৃথিবীর জিনিস।
বিকেলে এনজিও আসে। একজন আপা। ব্যাগ ভর্তি কনডম আর লিফলেট। আপা হাসে, কথা বলে, "নিরাপদ থাকো, মায়া। কনডম ব্যবহার করো। তোমার অধিকার আছে না বলার।" মায়া কনডম নেয়। লিফলেট নেয়। আপা চলে যায়। কনডম ব্যবহার করে কিছু কাস্টমার। বাকিরা করে না। "কনডমে মজা নেই।" মায়া কী বলবে? না বললে কাস্টমার চলে যাবে। কাস্টমার চলে গেলে টাকা আসবে না। টাকা না আসলে রাকিবের স্কুল বন্ধ হবে। অধিকার আর ক্ষুধার মধ্যে ক্ষুধা জেতে। সবসময়।
মায়ার শরীরে যা আছে: দুইবার গনোরিয়া (সেরেছে), একবার সিফিলিস (চিকিৎসা হয়েছে, এনজিও-র ক্লিনিকে), টিবির সম্ভাবনা (কাশি দুই মাস ধরে, পরীক্ষা করাতে হবে কিন্তু সময় নেই, কাস্টমার আসছে, কাস্টমার অপেক্ষা করে না)। মায়ার শরীর একটা যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধ চলছে, কিন্তু কেউ জিততে পারছে না। শরীর হারছে, ধীরে ধীরে, প্রতিদিন একটু একটু করে। মায়া জানে। মায়া গুনে রাখে না। গুনলে থামতে হবে। থামলে রাকিবের টাকা বন্ধ হবে।
৪
রাতে মায়া ঘরের দরজা বন্ধ করে।
আজ আটজন এসেছে। শরীর ব্যথা করছে। পেট, কোমর, ভেতরে। ভেতরে মানে কোথায়? মায়া ঠিক জানে না। শরীরের কোনো একটা জায়গায়, যেটার নাম মায়া জানে না, যেটা ডাক্তার হয়তো জানে, কিন্তু মায়া ডাক্তারের কাছে যায় না। ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার জিজ্ঞেস করবে, কী করেন? মায়া কী বলবে?
মায়া গরম পানিতে একটু লবণ দিয়ে বসে থাকে। এটা মায়ের কাছে শেখা। হালিমা বলত, "লবণ-পানি সব ব্যথা কমায়।" সব ব্যথা কমায় না, কিন্তু মায়া বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করলে কাজ হয়। কাজ না হলেও বিশ্বাস থাকে। বিশ্বাস একটা পর্দা। পর্দার আড়ালে ব্যথাটা একটু কমে দেখায়।
মায়া ফোন বের করে। রাকিবের ছবি দেখে। ছবিটা আমেনা পাঠিয়েছে গত ঈদে। রাকিব সাদা পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে আছে, হাসছে। সামনের দুইটা দাঁত নেই, পড়ে গেছে, নতুন উঠছে। চোখ দুটো মায়ার মতো। নাক মায়ার মতো। কিন্তু হাসিটা মায়ার মতো না। মায়া এভাবে হাসে না। মায়া হাসতে ভুলে গেছে কবে থেকে মনে নেই। হয়তো কোনোদিন হাসেনি। হয়তো শিশুকালে হেসেছিল, কিন্তু সেই স্মৃতি নেই। দৌলতদিয়ায় শিশুকাল থাকে না। দৌলতদিয়ায় সব শিশু তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যায়।
মায়া ভাবে, রাকিব বড় হবে। স্কুলে যাবে। কলেজে যাবে। হয়তো চাকরি করবে। হয়তো দোকান দেবে। হয়তো গাড়ি চালাবে। কিছু একটা করবে। পরিষ্কার কিছু। যেটায় গন্ধ নেই, দাগ নেই, পর্দা নেই।
একদিন রাকিব জানবে। কেউ না কেউ বলবে। গ্রামে কেউ জানে না, কিন্তু গ্রাম ছোট, কথা বড়। একদিন কেউ বলবে, "তোর মা ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করে না। তোর মা দৌলতদিয়ায়।"
সেদিন রাকিব কী করবে?
মায়া এই প্রশ্নটা নিয়ে প্রতিরাতে ঘুমায়। প্রশ্নটা বালিশের পাশে শুয়ে থাকে। প্রশ্নটা ঘুমায় না। মায়াও ঘুমায় না। মায়া সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। সিলিংয়ে একটা টিকটিকি। টিকটিকি মায়ার দিকে তাকায়। মায়া টিকটিকির দিকে তাকায়। দুজনেই নিশ্চুপ। দুজনেই এই ঘরে আটকে আছে।
আমার ছেলে জানে না আমি কী করি। সে জানে আমি ঢাকায় চাকরি করি।
এই মিথ্যাটা মায়ার একমাত্র সম্পদ। এই মিথ্যাটা দিয়ে সে রাকিবের জন্য একটা পৃথিবী বানিয়েছে। সেই পৃথিবীতে রাকিবের মা একজন সাধারণ মানুষ, যে কাপড় সেলাই করে, টাকা পাঠায়, ফোনে কথা বলে, ভালোবাসে। সেই পৃথিবীতে রাকিবের মাকে নিয়ে কোনো লজ্জা নেই। সেই পৃথিবীটা মিথ্যা, কিন্তু সেই পৃথিবীটা রাকিবের একমাত্র পৃথিবী।
মায়া চায় সেই পৃথিবীটা যেন না ভাঙে। মায়া চায় রাকিব যেন সেই পৃথিবীতে থাকে, হাসে, দাঁত পড়ুক, নতুন দাঁত উঠুক, সাদা পাঞ্জাবি পরুক, ক্রিকেট খেলুক।
৫
ভোর হয়।
পদ্মার ওপর দিয়ে বাতাস আসে। বাতাসে নদীর গন্ধ, পলিমাটির গন্ধ, ফেরির ডিজেলের গন্ধ। মায়া দরজা খোলে। বাইরে গলিতে কেউ নেই। শুধু একটা কুকুর ঘুমাচ্ছে দরজার পাশে। কুকুরটা চেনা। প্রতিদিন আসে। মায়া ভাত দেয়। কুকুরটা খায়, ঘুমায়, চলে যায়। আবার আসে। কুকুরের জীবন সরল। কুকুরকে কেউ জিজ্ঞেস করে না কী করে। কুকুরকে কেউ দাম দেয় না। কুকুর শুধু থাকে।
মায়া গলিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়। আকাশ ধূসর। ভোরের আকাশ। একটু পরে লাল হবে, তারপর নীল। মায়া নীল আকাশ পছন্দ করে। নীল আকাশে কোনো দাগ নেই, কোনো সীমানা নেই, কোনো পর্দা নেই। নীল আকাশ সবার জন্য একই। সর্দারনির জন্য, কাস্টমারের জন্য, পুলিশের জন্য, মায়ার জন্য। আকাশ ভেদাভেদ করে না। আকাশ দাম ধরে না।
গলি থেকে ফেরিঘাটের শব্দ আসছে। প্রথম ফেরি ছেড়ে যাচ্ছে। ফেরি মানে যাওয়া। মানুষ ফেরিতে ওঠে, নদী পার হয়, অন্য পাড়ে যায়। মায়া কোথাও যেতে পারে না। মায়ার কোনো অন্য পাড় নেই।
মায়া ঘরে ফেরে। চা বানায়। পর্দা সরিয়ে রাখে। একটু পরে প্রথম কাস্টমার আসবে। দিন শুরু হবে। পাঁচশো টাকা। আবার পাঁচশো টাকা। আবার।
কিন্তু মায়া একটা কথা মনে মনে বলে, প্রতিদিন, চায়ের কাপে ঠোঁট দেওয়ার আগে, চোখ বন্ধ করে, নিঃশব্দে:
আমার ছেলে যেন আমাকে দেখে লজ্জা না পায়।
এটা প্রার্থনা নয়। প্রার্থনা করার মতো ঈশ্বর মায়া চেনে না। ঈশ্বর যদি থাকেন, তিনি দৌলতদিয়ায় আসেন না। এটা একটা ইচ্ছা। ছোট্ট ইচ্ছা। একটা মায়ের, যার কোনো পরিচয় নেই, কোনো ঠিকানা নেই, কোনো মর্যাদা নেই, কিন্তু একটা ছেলে আছে, যে সাদা পাঞ্জাবি পরে হাসে, যার সামনের দুটো দাঁত নেই, যার চোখ মায়ার মতো।
সেই চোখে যেন কোনোদিন লজ্জা না আসে। এটুকুই।
চায়ের কাপ খালি হয়। মায়া কাপ ধুয়ে রাখে। পর্দা টানে। খাটে বসে। অপেক্ষা করে। পাঁচশো টাকা। রাকিবের জন্য।