নারী উদ্যোক্তা

সে হিসাব রাখে। আমি আচার বানাই। কিন্তু ব্যবসা আমার।

পর্ব ১৪ · ৯ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আচারের গন্ধ।

তাসলিমার হাতে, চুলে, শাড়ির আঁচলে, সর্বত্র আচারের গন্ধ। সরিষার তেল, মেথি, কালোজিরা, শুকনো মরিচ, আমের টুকরো। এই গন্ধ ছোটবেলা থেকে। মায়ের হাতে ছিল এই গন্ধ। দাদির হাতে ছিল। প্রদাদির হাতে ছিল। চার প্রজন্মের নারীর হাতে একই গন্ধ, একই রেসিপি, একই হাতের ছোঁয়া। একটা সরিষার দানা ফেলে দিলে সেই দানা থেকে গাছ হয়, গাছ থেকে ফুল, ফুল থেকে আবার দানা। এই রেসিপিও তাই। একটা মায়ের হাত থেকে মেয়ের হাতে, মেয়ের হাত থেকে তার মেয়ের হাতে। কখনো লেখা হয়নি। কোনো বইয়ে নেই। শুধু হাতে আছে, আঙুলে আছে, নখের কোণায় হলুদের দাগে আছে।

মা বলতেন, "আচার বানানো শিল্প। লবণ একটু বেশি হলে সব নষ্ট। কম হলে পচে যাবে। ঠিক মাপে দিতে হয়। জীবনের মতো।"

তাসলিমা ভাবত, জীবনেও কি ঠিক মাপ আছে? লবণের মতো? হয়তো আছে। কিন্তু জীবনের মাপ কে ঠিক করে? আচারের মাপ মা ঠিক করত। জীবনের মাপ? সেটা কেউ ঠিক করে না। সেটা নিজেকে খুঁজে বের করতে হয়।

মা আচার বানাত ঘরের জন্য। দাদি বানাত ঘরের জন্য। প্রদাদি বানাত ঘরের জন্য। কোনো বিক্রি নেই, কোনো দাম নেই, কোনো হিসাব নেই। শুধু পরিবারের জন্য, প্রতিবেশীর জন্য, ঈদে-পার্বণে বানিয়ে দেওয়া, "এটা তাসলিমার মায়ের আচার" বলে সবাই চিনত। চার প্রজন্ম ধরে এই আচার বানানো হয়েছে, চার প্রজন্ম ধরে কেউ ভাবেনি এটার একটা দাম আছে। কারণ মেয়েদের হাতের কাজের দাম থাকে না। সেলাই, রান্না, আচার, নকশিকাঁথা, সব বিনামূল্যে। সব "ঘরের কাজ।" ঘরের কাজের কোনো বেতন নেই।

তাসলিমা ভাবল, যেটা সবাই চেনে, সেটা কি বিক্রি করা যায়? যেটার কোনো দাম নেই, সেটা কি দাম দিলে মানুষ কিনবে?

পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে, দুই সন্তানের মা, স্বামী মুনির একটা মুদি দোকানে কাজ করে, মাসে আট হাজার টাকা আয়, ভাড়া পাঁচ হাজার, বাকি তিন হাজারে সংসার। চালের দাম বাড়ছে, তেলের দাম বাড়ছে, সবকিছুর দাম বাড়ছে, শুধু মুনিরের বেতন বাড়ছে না। তিন হাজার টাকায় দুই বেলা ভাত, একবেলা মুড়ি, মাছ সপ্তাহে দুইদিন, মাংস ঈদে। এটাই হিসাব।

তাসলিমা পাঁচশো টাকা জমিয়েছিল। কীভাবে? বাজার করার সময় একটু একটু বাঁচিয়ে। পেঁয়াজ দুই কেজির বদলে দেড় কেজি। মাছ আধা কেজির বদলে পাও কেজি। নিজে একবেলা না খেয়ে। এভাবে, মাসে মাসে, পঞ্চাশ টাকা, একশো টাকা, ছয় মাসে পাঁচশো টাকা। পাঁচশো টাকা মানে একটা শাড়ি। কিন্তু তাসলিমা শাড়ি কেনেনি। পাঁচশো টাকা দিয়ে: পাঁচ কেজি কাঁচা আম (মৌসুমে সস্তা), সরিষার তেল, মশলা, বয়াম।

মায়ের রেসিপি। দাদির হাতের মাপ। প্রদাদির ধৈর্য।

বিশটা বয়াম বানালো তাসলিমা। ছোট ছোট বয়াম। প্রতিটায় আধা কেজি আমের আচার। বয়ামের গায়ে কাগজ সেঁটে দিল, হাতে লেখা: "মায়ের আচার।" দাম: পঞ্চাশ টাকা।

বিশটা বয়াম বিক্রি হতে দুই সপ্তাহ লাগল।

প্রথম কাস্টমার: পাশের বাড়ির খালা। "তোর মায়ের আচারের স্বাদ পাই। দে, একটা দে।" দ্বিতীয় কাস্টমার: মুনিরের দোকানের মালিক। "ভালো আচার। আর আছে?" তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম: মুখে মুখে খবর ছড়ালো। গ্রামে। "তাসলিমার আচার খেয়ে দেখ। মায়ের হাতের স্বাদ।" স্বাদ মানুষকে টানে। স্বাদের কোনো জাত নেই, শ্রেণি নেই। ধনী-গরিব সবাই একই স্বাদ চেনে। সেই টক-ঝাল-মিষ্টি, যেটা জিভে লাগলে শৈশব মনে পড়ে, মায়ের রান্নাঘর মনে পড়ে, দুপুরে গরম ভাতে আচার মাখিয়ে খাওয়া মনে পড়ে।

বিশটা বয়ামে এক হাজার টাকা। খরচ বাদে লাভ: তিনশো টাকা। তাসলিমার প্রথম লাভ। তিনশো টাকা। টাকাটা হাতে নিয়ে তাসলিমা গুনল, আবার গুনল। টাকা কম, কিন্তু টাকাটা তার নিজের। মুনিরের নয়, শ্বশুরের নয়, কারো নয়। তাসলিমার। নিজের হাতের তৈরি। নিজের রেসিপির ফল। নিজের ধৈর্যের পুরস্কার।

মুনির বলল, "মেয়েমানুষের ব্যবসা! লোকে হাসবে।"

তাসলিমা বলল, "হাসুক।"

মুনির আর কিছু বলল না। মুনির খারাপ মানুষ না। মুনিরের পৃথিবীতে ব্যবসা মানে দোকান, সাইনবোর্ড, ক্যাশবাক্স। রান্নাঘরের আচার ব্যবসা হয় কীভাবে? মেয়েমানুষ ব্যবসা করে কীভাবে? মুনির জানে না। মুনিরের বাবা জানত না। মুনিরের দাদা জানত না। পুরুষের জ্ঞানের সীমানা পুরুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি। সেই সীমানার বাইরে যা আছে, সেটা তারা দেখে না।

তাসলিমা আবার বানালো। পঞ্চাশটা বয়াম। এবার শুধু আমের আচার না। তেঁতুলের আচার, জলপাইয়ের আচার, বড়ই-এর আচার। চার রকম। প্রতিটায় মায়ের রেসিপির ভিন্ন শাখা। মা সব বানাত। তাসলিমা সব শিখেছে। হাতে দেখে শিখেছে, কোনো লেখা নেই, কোনো মাপের কাগজ নেই। শুধু হাতের অভ্যাস, নাকের ঘ্রাণ, জিভের স্বাদ। এটাই রেসিপি। এটাই চার প্রজন্মের উত্তরাধিকার।

পঞ্চাশটা বয়াম বিক্রি হতে এক সপ্তাহ লাগল।

ব্যাংকে গেল তাসলিমা। ঋণ চাই।

"কী ব্যবসা?"

"আচার।"

ম্যানেজার তাকালো। একজন গ্রামের মহিলা, শাড়ি পরা, হাতে সরিষার তেলের গন্ধ, নখে হলুদের দাগ। ম্যানেজার বলল, "জামানত আছে?"

"নেই।"

"জমি?"

"নেই।"

"দোকান?"

"রান্নাঘর।"

ম্যানেজার একটু হাসল। ভদ্রভাবে। যে হাসিতে "না" লুকানো থাকে। যে হাসিতে বলা থাকে, "আপনি বুঝবেন না, এটা আপনার জায়গা না।"

"আপা, ঋণ দিতে হলে জামানত লাগে। আপনার কোনো সম্পদ নেই। আমরা ঝুঁকি নিতে পারি না।"

সম্পদ নেই। চার প্রজন্মের রেসিপি কি সম্পদ না? ছয় মাসের জমানো পাঁচশো টাকা কি সম্পদ না? পঞ্চাশটা বিক্রি হওয়া বয়াম কি সম্পদ না? ব্যাংকের হিসাবে না। ব্যাংকের হিসাবে সম্পদ মানে জমি, বাড়ি, গাড়ি। রেসিপি, হাতের দক্ষতা, ধৈর্য, সেগুলো ব্যাংকের খাতায় নেই।

তাসলিমা বের হয়ে এলো। দ্বিতীয় ব্যাংকে গেল। একই উত্তর। তৃতীয় ব্যাংকে গেল। একই উত্তর। মহিলা, জামানত নেই, রান্নাঘরের ব্যবসা, ঝুঁকি।

চতুর্থবার তাসলিমা ব্যাংকে যায়নি। আসা (ASA) অফিসে গেল। মাইক্রোফাইন্যান্স। সেখানে একজন মহিলা অফিসার। তাসলিমার কথা শুনল। আচারের বয়াম দেখল। একটা খুলে স্বাদ দেখল। চোখ বড় হলো। জিভে লেগেছে চার প্রজন্মের স্বাদ।

"এটা তুমি বানিয়েছ?"

"হ্যাঁ।"

"কার রেসিপি?"

"আমার মায়ের। তার মায়ের। তার মায়ের মায়ের।"

অফিসার ভাবল। তারপর বলল, "বিশ হাজার টাকা দিতে পারব। সাপ্তাহিক কিস্তি।"

বিশ হাজার টাকা। তাসলিমা বাড়ি ফিরল। সেদিন রাতে ঘুমাতে পারেনি। এত টাকা তাসলিমা একসাথে কখনো দেখেনি। কিন্তু ভয় পায়নি। ভয় পাওয়ার সময় নেই। পরিকল্পনা করার সময় আছে। কাঁচামাল কিনবে। বয়াম কিনবে। লেবেল ছাপাবে। উপজেলা বাজারে বিক্রি করবে।

এক বছর পরে।

তাসলিমার মাসিক আয়: পঞ্চাশ হাজার টাকা। খরচ বাদে লাভ: পনেরো-বিশ হাজার। পাঁচজন মহিলা কাজ করে তাসলিমার সাথে। গ্রামের মহিলা। রহিমা, সখিনা, পারুল, মোমেনা, ফাতেমা। সবাই একই গল্প: স্বামীর আয়ে সংসার চলে না, অন্য কোনো কাজ নেই, বাড়ি থেকে বের হওয়ার অনুমতি নেই। কিন্তু তাসলিমার কাছে আচার বানানো, সেটা "ঘরের কাজ," সেটায় আপত্তি কম। রান্নাঘরে কাজ করলে পুরুষের ইজ্জতে ঘা লাগে না। অফিসে কাজ করলে লাগে।

রান্নাঘর বড় করেছে তাসলিমা। পেছনের উঠোনে একটা টিনের ঘর তুলেছে। ছয় রকম আচার: আম, তেঁতুল, জলপাই, বড়ই, কাঁচা মরিচ, রসুন। প্রতিটায় মায়ের মূল রেসিপি, তাসলিমার নিজের সামান্য পরিবর্তন। মা বানাত লবণ বেশি দিয়ে। তাসলিমা কমিয়েছে, কারণ ডাক্তার বলে লবণ কমাতে, কারণ মানুষের স্বাদ বদলেছে, কারণ সময় বদলেছে। কিন্তু মূল স্বাদ একই। চার প্রজন্মের স্বাদ।

মুনির এখন হিসাব রাখে।

সে হিসাব রাখে। আমি আচার বানাই। কিন্তু ব্যবসা আমার।

মুনির খাতায় লেখে। কত বয়াম বিক্রি হলো, কত টাকা এলো, কত খরচ হলো। মুনির মুদি দোকানের কাজ ছেড়ে দিয়েছে। তাসলিমার ব্যবসায় কাজ করে। মুনির এখন তাসলিমার কর্মচারী, কিন্তু এই কথাটা কেউ জোরে বলে না। গ্রামে বললে অসুবিধা হবে। তাসলিমা জানে। তাই চুপ থাকে। মুনিরকে বলে "ম্যানেজার।" মুনিরও জানে। মুনিরও চুপ থাকে। ফল পেলেই হলো। নামে কী আসে যায়।

একদিন মেয়ে সুমাইয়া জিজ্ঞেস করল, "আম্মা, তুমি আচার বানানো কোথায় শিখেছ?"

"তোর নানির কাছে।"

"নানি কোথায় শিখেছে?"

"তার মায়ের কাছে।"

"তার মা?"

"তার মায়ের কাছে।"

সুমাইয়া ভাবল। "তাহলে সবচেয়ে প্রথমে কে শিখেছিল?"

তাসলিমা হাসল। "জানি না। কোনো একজন মেয়ে, অনেক আগে, হয়তো একশো বছর আগে, হয়তো তার চেয়ে বেশি। সে প্রথম আম কেটেছিল, লবণ দিয়েছিল, তেল দিয়েছিল, সূর্যের আলোয় শুকিয়েছিল। তারপর স্বাদ দেখেছিল। ভালো লেগেছিল। তার মেয়েকে শিখিয়েছিল। কোনো বই লেখেনি। কোনো স্কুলে যায়নি। শুধু হাত দিয়ে শিখিয়েছিল। এটা এতটুকু, এটা ওতটুকু, এটা এই সময়, এটা ওই সময়।"

"তারপর?"

"তারপর সেই মেয়ে তার মেয়েকে শিখিয়েছে। সেই মেয়ে তার মেয়েকে। এভাবে এসেছে। আমার কাছে এসেছে। আমি তোকে শেখাব।"

সুমাইয়া হাসল। সুমাইয়া ক্লাস সেভেনে পড়ে। ভালো ছাত্রী। তাসলিমা চায় সুমাইয়া পড়ুক, চাকরি করুক, ডাক্তার হোক বা ইঞ্জিনিয়ার হোক, যা হতে চায় তাই হোক। কিন্তু রেসিপিটাও শিখুক। রেসিপিটা শুধু আচারের না। রেসিপিটা ধৈর্যের, পরিমাপের, হাতের ছোঁয়ার, সময়ের। রেসিপিটা একটা ভাষা, যে ভাষায় চার প্রজন্মের মেয়েরা কথা বলেছে, কোনো শব্দ ছাড়া, কোনো বই ছাড়া, শুধু হাতের মুদ্রায়।

সন্ধ্যায় তাসলিমা টিনের ঘরে বসে আচার বানায়। পাশে রহিমা কাঁচা আম কাটছে। সখিনা মশলা বাটছে। পারুল বয়ামে ভরছে। মোমেনা লেবেল লাগাচ্ছে। ফাতেমা ঢাকনা বন্ধ করছে। ছয়জন মহিলা। ছয়টা জীবন। ছয়টা সংসার যেখানে টাকা কম ছিল, এখন একটু বেশি আছে। ছয়জন মহিলার হাতে আচারের গন্ধ, নখে হলুদের দাগ, চোখে একটু কম ক্লান্তি।

বয়ামের গায়ে লেখা: "মায়ের আচার।" এটা ব্র্যান্ডের নাম না। এটা সত্য। প্রতিটা বয়ামে চার প্রজন্মের নারী আছে। তাদের হাত আছে, তাদের ধৈর্য আছে, তাদের রান্নাঘরের ধোঁয়া আছে, তাদের চোখের জল আছে, তাদের হাসি আছে।

তাসলিমা বয়ামের ঢাকনা শক্ত করে বন্ধ করে। ভেতরে আচার। ভেতরে স্বাদ। ভেতরে চার প্রজন্ম।

পাঁচশো টাকায় শুরু। এখন পঞ্চাশ হাজার। সংখ্যা বদলেছে। কিন্তু রেসিপি বদলায়নি। মায়ের লবণ, দাদির তেল, প্রদাদির সময়। তাসলিমা শুধু একটা জিনিস যোগ করেছে: সাহস। সেটাও হয়তো মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছে। মা কখনো বলেনি। কিন্তু মায়ের হাতের মাপে, মায়ের চোখের দৃঢ়তায়, মায়ের "ঠিক মাপে দিতে হয়" বলার ধরনে, সেই সাহসটা ছিল। লুকানো ছিল। আচারের গন্ধের নিচে। তাসলিমা সেটা বের করেছে। বয়ামে ভরেছে। বিক্রি করেনি, কারণ সাহস বিক্রির জিনিস না। সাহস রেখে দেওয়ার জিনিস। সুমাইয়ার জন্য। পরের প্রজন্মের জন্য।