নারী চেয়ারম্যান

আমি নির্বাচিত। আপনি মনোনীত। বিষয় কার, সেটা মানুষ ঠিক করবে।

পর্ব ১৫ · ৮ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

মিটিং রুমে আটজন পুরুষ।

একজন নারী: জাহানারা।

জাহানারা চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসে আছে। চেয়ারটা কাঠের, হাতলওয়ালা, পেছনে হেলান দেওয়ার জায়গা আছে। এই চেয়ারে আগে বসতেন আকবর আলী। তিরিশ বছর। তিরিশ বছর ধরে আকবর আলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিরিশ বছর ধরে এই চেয়ারে বসেছেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, হুকুম করেছেন। এখন চেয়ারটা জাহানারার। সংরক্ষিত নারী আসন। নির্বাচনে জিতেছে। ভোট পেয়েছে। বৈধ, আইনি, সরকারি।

কিন্তু চেয়ারে বসলেই চেয়ারম্যান হওয়া যায় না। এটা জাহানারা প্রথম দিনেই বুঝেছে।

প্রথম মিটিং। জাহানারা কথা বলতে শুরু করল। স্কুলের রাস্তা মেরামতের প্রস্তাব। ভাইস চেয়ারম্যান হানিফ ফোনে কথা বলছে। মেম্বার রশিদ জানালার বাইরে তাকাচ্ছে। মেম্বার আলী দাঁত খিলাল করছে।

জাহানারা থামল। "আমি কথা বলছি।"

হানিফ ফোন থেকে চোখ তুলল। "হ্যাঁ, আপা। বলেন। আমরা শুনছি।"

শুনছি। কিন্তু শুনছে না। জাহানারা জানে। "শুনছি" বলা আর শোনা এক জিনিস না। জাহানারার স্বামী ত্রিশ বছর ধরে "শুনছি" বলে। কখনো শোনেনি। শাশুড়ি "শুনছি" বলতেন। কখনো শোনেননি। গ্রামের মানুষ "শুনছি" বলে। কখনো শোনে না। "শুনছি" একটা শব্দ, যেটা না-শোনার ভদ্র রূপ।

জাহানারা আবার বলল। ধীরে, পরিষ্কারভাবে, জোরে।

"স্কুলের রাস্তা ভাঙা। বর্ষায় পানি জমে। বাচ্চারা কাদা মাখা পায়ে স্কুলে যায়। কেউ কেউ যায় না। এই রাস্তা মেরামত করতে হবে। বরাদ্দ আছে। আমি প্রস্তাব করছি।"

হানিফ বলল, "আপা, রাস্তার কাজ আমরা দেখি। আপনি বসেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিই।"

আপনি বসেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিই।

জাহানারা বসে আছে। চেয়ারম্যানের চেয়ারে। কিন্তু "বসেন" মানে "চুপ থাকেন।" "আমরা" মানে "পুরুষরা।" "সিদ্ধান্ত" মানে "যেটা আমরা চাই সেটা।"

জাহানারা চুপ থাকল। প্রথম মিটিংয়ে চুপ থাকল। দ্বিতীয় মিটিংয়ে চুপ থাকল। তৃতীয় মিটিংয়ে চুপ থাকল না।

তৃতীয় মিটিংয়ে জাহানারা ফাইল নিয়ে এলো।

ইউনিয়ন পরিষদের বাজেট। বরাদ্দের হিসাব। কোন খাতে কত টাকা। কোথায় খরচ হয়েছে, কোথায় হয়নি। জাহানারা সংখ্যা পড়তে পারে। জাহানারা ক্লাস টেন পাস। গ্রামের মেয়েদের মধ্যে এটা অনেক। এই পড়াটুকুই যথেষ্ট ফাইল পড়তে, সংখ্যা বুঝতে, হিসাব মেলাতে।

"গত বছরের কালভার্ট মেরামত বাবদ দুই লক্ষ টাকা বরাদ্দ ছিল। কালভার্ট মেরামত হয়নি। টাকা কোথায়?"

চুপ। মিটিং রুমে চুপ। হানিফ ফোন রেখে দিল। রশিদ জানালা থেকে ঘুরল। আলী দাঁত খিলাল বন্ধ করল।

জাহানারা আবার বলল। "কালভার্ট বরাদ্দের দুই লক্ষ টাকা। ভাউচার দেখাচ্ছে খরচ হয়েছে। কিন্তু কালভার্ট আগের মতোই ভাঙা। আমি গতকাল গিয়ে দেখে এসেছি।"

হানিফ বলল, "আপা, এগুলো আগের চেয়ারম্যান সাহেবের সময়ের কাজ। আমরা জানি না।"

"আমি জানি। ফাইলে আছে। ফাইল মিথ্যা বলে না।"

জাহানারা ফাইল টেবিলে রাখল। খোলা। সংখ্যাগুলো দেখাল। ভাউচার দেখাল। তারিখ, অর্থ, স্বাক্ষর। সব আছে। শুধু কাজ নেই। কাগজে আছে, মাটিতে নেই। কাগজে কালভার্ট মেরামত হয়েছে, মাটিতে কালভার্ট ভাঙা।

এই ফাঁকটা জাহানারা ধরেছে। এই ফাঁকটা ত্রিশ বছর ধরে কেউ ধরেনি। কারণ কেউ ফাইল পড়েনি। কারণ ফাইল পড়ার দরকার ছিল না। আকবর আলী বলতেন, ফাইল ঠিক আছে। সবাই মানত। আকবর আলী বলতেন, কাজ হয়েছে। সবাই মানত।

জাহানারা মানেনি।

রাস্তা ঠিক করল জাহানারা।

স্কুলের রাস্তা। তিনশো মিটার। ইউপি বরাদ্দ থেকে ইট আনল, বালু আনল। শ্রমিক লাগাল। জাহানারা নিজে সকালে গিয়ে দাঁড়াল। কাজ দেখল। শ্রমিকদের সাথে কথা বলল। চা খাওয়াল। দশ দিনে রাস্তা হলো। পাকা না, ইটের সলিং, কিন্তু আগের চেয়ে একশোগুণ ভালো। বর্ষায় পানি জমবে না। বাচ্চাদের পা কাদায় ডুববে না।

রাস্তা হওয়ার পর মানুষ তাকাল। জাহানারার দিকে। অন্যরকম তাকানো। আগে তাকাত "ওই মহিলা চেয়ারম্যান" বলে, এখন তাকায় "ওই যে রাস্তা করিয়ে দিয়েছে" বলে।

তারপর নলকূপ। গ্রামের পূর্বপাড়ায়। সেখানে আর্সেনিক পানি। দশ বছর ধরে মানুষ আর্সেনিক পানি খাচ্ছে। কেউ কিছু করেনি। জাহানারা ডিপিএইচই অফিসে গেল। আবেদন করল। ফলোআপ করল। সাতবার গেল। আটবার গেল। নবম বারে একটা গভীর নলকূপ বসানো হলো। আর্সেনিকমুক্ত পানি।

পূর্বপাড়ার মানুষ পানি খেল। পরিষ্কার পানি। জাহানারা দেখল, একটা বুড়ি হাত দিয়ে পানি ধরে চোখে দেখছে। স্বচ্ছ পানি। বুড়ি বলল, "দশ বছরে প্রথম পরিষ্কার পানি দেখলাম।"

তারপর বাল্যবিবাহ।

খবর পেল, গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় একটা মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। মেয়ের বয়স তেরো। জাহানারা গেল। বাড়িতে। মেয়ের বাবার সাথে কথা বলল।

"মেয়ের বয়স তেরো। বিয়ে দেওয়া যাবে না। আইন আছে।"

বাবা বলল, "আমাদের এলাকায় এটাই নিয়ম। সবাই দিচ্ছে।"

"সবাই দিচ্ছে মানে সবাই ভুল করছে। আইন হলো আইন।"

বাবা রাজি হলো না। জাহানারা পুলিশ ডাকল। ফোন করল উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিসে। পুলিশ এলো। বিয়ে বন্ধ হলো। মেয়েটা স্কুলে ফিরে গেল।

গ্রামে কথা হলো। "জাহানারা পুলিশ ডাকে। জাহানারার সাথে লাগা ঠিক না।"

জাহানারা শুনল। কিছু বলল না। বলার দরকার নেই। কাজ বলে।

ভাইস চেয়ারম্যান হানিফ আবার বলল।

মিটিংয়ে। সবার সামনে।

"ম্যাডাম, এটা আপনার বিষয় না।"

বিষয়টা ছিল হাটবাজারের ইজারা। লক্ষ টাকার ব্যাপার। প্রতি বছর ইজারা দেওয়া হয়, যে সবচেয়ে বেশি দাম দেবে সে পাবে। কিন্তু ত্রিশ বছর ধরে ইজারা পায় একই লোক: হানিফের শ্যালক। দাম বাড়ে না। প্রতিযোগিতা হয় না। কারণ কেউ প্রতিযোগিতা করতে সাহস পায় না।

জাহানারা বলল, "এটা আমার বিষয়। আমি চেয়ারম্যান। ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটা বিষয় আমার বিষয়।"

"আপনি সংরক্ষিত আসনে জিতেছেন। পুরো ইউনিয়ন আপনার এখতিয়ারে না।"

"আমি নির্বাচিত। আপনি মনোনীত। বিষয় কার, সেটা মানুষ ঠিক করবে।"

মিটিং রুমে চুপ। হানিফের মুখ লাল। রশিদ, আলী, বাকি মেম্বাররা চুপ। কেউ জাহানারার পক্ষে বলল না। কেউ বিপক্ষেও বলল না। চুপ থাকা মানে সম্মতি। কার সম্মতি? জাহানারা জানে না। কিন্তু চুপ থাকাটা যথেষ্ট। জাহানারাকে কেউ থামাল না। এটুকুই এখন জয়।

জাহানারা ইজারার জন্য খোলা দরপত্র আহ্বান করল। তিনজন দরদাতা এলো। দাম বাড়ল। গত বছর: দুই লক্ষ। এবার: তিন লক্ষ ষাট হাজার। বাড়তি এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা ইউনিয়ন পরিষদের তহবিলে গেল।

হানিফের শ্যালক ইজারা পেল না। হানিফ কথা বলা বন্ধ করল জাহানারার সাথে। জাহানারা গায়ে মাখল না।

সন্ধ্যায় জাহানারা বাড়ি ফেরে।

বাড়িতে সংসার আছে। স্বামী আছে, ছেলে আছে, মেয়ে আছে, শাশুড়ি আছে। রান্না করতে হয়, বাসন ধোয়া হয়, বাচ্চাদের পড়া দেখতে হয়। জাহানারা চেয়ারম্যান, কিন্তু ঘরে সে বউ। দুটো জীবন। সকালে চেয়ারম্যান, সন্ধ্যায় গৃহিণী। সকালে সিদ্ধান্ত নেয়, সন্ধ্যায় ভাত বাড়ে। সকালে টেবিলের মাথায় বসে, সন্ধ্যায় মেঝেতে বসে খায়।

এই দ্বৈত জীবন জাহানারা কাউকে দেখায় না। দেখালে দুর্বল দেখাবে। দুর্বল দেখালে মানুষ বলবে, "দেখ, মহিলা পারে না। সংসারই সামলাতে পারে না, ইউনিয়ন কী সামলাবে।"

জাহানারা পারে। দুটোই পারে। কারণ জাহানারার কোনো বিকল্প নেই। পারতে হবে। পারতে না পারলে আরো তিরিশ বছর আকবর আলীর মতো কেউ চেয়ারে বসবে, ফাইলে কালভার্ট মেরামতের ভাউচার থাকবে, মাটিতে কালভার্ট ভাঙা থাকবে, আর কেউ কিছু বলবে না।

রাতে মেয়ে তাহমিনা জিজ্ঞেস করে, "আম্মা, তুমি চেয়ারম্যান কেন হয়েছ?"

জাহানারা ভাবে। অনেকগুলো উত্তর আছে। "মানুষের সেবা করতে" বলতে পারে, কিন্তু সেটা বক্তৃতা, সত্য না পুরোটা। "ক্ষমতার জন্য" বলতে পারে, কিন্তু সেটা ক্ষমতা না, ক্ষমতা পুরুষদের কাছে আছে, জাহানারার কাছে আছে একটা চেয়ার। "পরিবর্তনের জন্য" বলতে পারে, কিন্তু পরিবর্তন ধীর, এতো ধীর যে কখনো কখনো মনে হয় কিছুই বদলাচ্ছে না।

জাহানারা বলে, "কারণ আমি যদি না হই, তাহলে যারা হবে তারা আমার কথা শুনবে না। আমি হলে অন্তত নিজের কথা নিজে বলতে পারি।"

তাহমিনা বুঝল কিনা জাহানারা জানে না। তাহমিনা ক্লাস নাইনে পড়ে। তাহমিনা হয়তো বুঝবে পরে। যখন তাহমিনা কোনো মিটিংয়ে বসবে, যখন কোনো পুরুষ বলবে "আপা, আপনি বসেন," তখন তাহমিনা বুঝবে।

জাহানারা আশা করে, ততদিনে "আপনি বসেন" শব্দটার অর্থ বদলে যাবে। "বসেন" মানে "চুপ থাকেন" না। "বসেন" মানে "বসেন, কথা বলেন, আমরা শুনি।"

হয়তো বদলাবে। হয়তো বদলাবে না। জাহানারা জানে না। জাহানারা শুধু জানে, আজ রাস্তা হয়েছে। নলকূপ বসেছে। একটা বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছে। ইজারায় এক লক্ষ ষাট হাজার টাকা বেশি এসেছে।

এটুকু।

জাহানারা বাতি নেভায়। ঘুমায়। সকালে আবার উঠবে। সকালে আবার সেই চেয়ারে বসবে। সকালে আবার আটজন পুরুষ তাকিয়ে থাকবে। জাহানারা কথা বলবে। কেউ শুনবে, কেউ শুনবে না।

কিন্তু জাহানারা বলবে। বলা বন্ধ করবে না। কারণ চুপ থাকলে চেয়ারটা শুধু একটা চেয়ার। কথা বললে চেয়ারটা ক্ষমতা।

পঁয়তাল্লিশ বছর লেগেছে এই চেয়ারে বসতে। এখন বসেছে। এখন কথা বলবে।