ধাত্রী

আধুনিক চিকিৎসা দিনে আসে। রাতে আমি আসি।

পর্ব ১৭ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

করিমনের হাত বড়।

গ্রামের মেয়েদের তুলনায় অস্বাভাবিক বড়। আঙুল লম্বা, তালু চওড়া, হাতের রেখাগুলো গভীর, যেন কেউ ধারালো কিছু দিয়ে খোদাই করেছে। এই হাত চল্লিশ বছর ধরে বাচ্চা ধরেছে। পিচ্ছিল, রক্তমাখা, কাঁদতে থাকা জীবন, এই হাত দিয়ে পৃথিবীতে নামিয়েছে।

দুই হাজারের বেশি।

করিমন গুনে রাখেনি। গোনার অভ্যাস নেই। কিন্তু হিসেব করলে দুই হাজারের কাছাকাছি হবে। বছরে পঞ্চাশটা ধরলে, চল্লিশ বছরে দুই হাজার। কম হতে পারে, বেশিও হতে পারে। কিছু বছর বেশি ছিল। বন্যার পরের বছর বেশি হতো। বন্যার পরে মানুষ অনেক বাচ্চা নেয়। করিমন জানে না কেন। হয়তো মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এলে মানুষ জীবন বানাতে চায়।

সকালে করিমন উঠে নামাজ পড়ল। তারপর চা বানাল। চায়ে দুধ নেই, আদা আছে। চিনি কম দিল। বয়স পঁয়ষট্টি, সুগার একটু বেশি। ডাক্তার বলেছে কম খেতে। করিমন ডাক্তারের কথা শোনে, কিন্তু পুরোপুরি মানে না। সব মানলে বেঁচে থাকার মজাই থাকে না।

উঠোনে বসে চা খেতে খেতে করিমন হাতের দিকে তাকাল। ডান হাতের তর্জনীটা একটু বাঁকা। বিশ বছর আগে একটা কঠিন ডেলিভারিতে বেঁকে গেছে। বাচ্চার মাথা আটকে গিয়েছিল। করিমনকে জোর দিতে হয়েছিল। আঙুল বেঁকে গেল, কিন্তু বাচ্চা বেরিয়ে এলো। মা বাঁচল, বাচ্চা বাঁচল, আঙুল বেঁকে গেল। এটা ন্যায্য বিনিময়।

বাম হাতের মধ্যমায় একটা দাগ। পুরোনো। ত্রিশ বছর আগের। একটা ডেলিভারিতে ব্লেড হাতে কেটে গিয়েছিল। রক্ত বেরিয়েছিল। করিমন থামেনি। নিজের হাতে কাপড় জড়িয়ে কাজ শেষ করেছিল। পরে ডেটল লাগিয়েছিল। সেলাই হয়নি। দাগ রয়ে গেছে।

প্রতিটা আঙুলে একটা গল্প। প্রতিটা দাগে একটা রাত। করিমনের হাত একটা মানচিত্র, চল্লিশ বছরের।

চা শেষ হলো। করিমন উঠল। আজ বিশেষ কিছু করার নেই। উঠোন ঝাড়ু দেবে। হাঁস-মুরগিকে খাবার দেবে। দুপুরে রান্না করবে। বিকেলে সুরাইয়া আসবে, কলেজ থেকে ফিরে। সুরাইয়ার জন্য পিঠা বানাবে।

এটাই এখন করিমনের দিন। শান্ত। ধীর। একসময় প্রতিটা দিন ছিল অনিশ্চিত। যে কোনো সময় ডাক আসতে পারত। যে কোনো রাতে উঠে যেতে হতো। সেই অনিশ্চয়তা ছিল করিমনের জীবনের স্বাদ। এখন সেই স্বাদ ফুরিয়ে যাচ্ছে।

করিমন ধাত্রীবিদ্যা শিখেছে তার মায়ের কাছে।

মা আমেনা বিবি। গ্রামের সবাই তাকে "দাইমা" বলত। আমেনা বিবিও শিখেছিলেন তাঁর মায়ের কাছে। তিন প্রজন্মের জ্ঞান। কোনো বই নেই, কোনো সার্টিফিকেট নেই, কোনো ডিগ্রি নেই। হাত আছে। হাতই বই।

করিমনের বয়স যখন বারো, মা তাকে প্রথম ডেলিভারিতে নিয়ে গেল। "দেখ। শুধু দেখ। কিছু করবি না।" করিমন দেখল। ভয় পেল। রক্ত দেখে বমি আসল। মা বলল, "বমি করলে বাইরে যা। ভেতরে বমি করবি না। মায়ের সামনে দুর্বলতা দেখাবি না। মা ভয় পেয়ে যাবে।"

করিমন বাইরে গিয়ে বমি করে এলো। তারপর আবার দেখল। দেখতে দেখতে শিখল।

মা শেখাল কীভাবে পেট ছুঁয়ে বাচ্চার অবস্থান বোঝা যায়। মাথা কোন দিকে, পা কোন দিকে, পিঠ কোন দিকে। "বাচ্চা কেমন আছে, হাত দিলেই বুঝি," করিমন বলে। এটা মিথ্যা নয়। আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন যা দেখায়, করিমনের হাত তার অনেক কিছু বোঝে। সব না। কিন্তু অনেক কিছু।

মা শেখাল কখন বাচ্চা আসবে, শ্বাসের ছন্দ দেখে বোঝা যায়। মা শেখাল নাভি কাটার আগে কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। মা শেখাল কোন গাছের পাতা সেদ্ধ করে মায়ের পেটে দিলে ব্যথা কমে। কিছু কাজ করত, কিছু করত না। কিন্তু বিশ্বাসটা কাজ করত সবসময়। মা যখন বলত, "ভয় নাই, আমি আছি," প্রসূতি শান্ত হতো। এটা কোনো ওষুধ নয়। এটা উপস্থিতি।

পঁচিশ বছর বয়সে করিমন প্রথম একা ডেলিভারি করল। মা পাশে ছিলেন, কিন্তু হাত দেননি। "তুই কর। আমি দেখি।" করিমনের হাত কাঁপছিল। প্রসূতি চিৎকার করছিল। ঘরে কেরোসিনের বাতি। ছায়া দেয়ালে নাচছিল। করিমন হাত রাখল। পেটে। মাথা অনুভব করল। ঠিক জায়গায় আছে। মাথা নিচে, পা ওপরে। ভালো।

"হাত ঠিক রাখ। তাড়াহুড়ো করিস না। বাচ্চা নিজে আসবে। তুই শুধু পথ দেখা।"

করিমন পথ দেখাল। বাচ্চা এলো। মেয়ে। ছোট্ট। লাল। কাঁদছে। পৃথিবীর প্রথম কান্না। করিমন বাচ্চাটাকে কাপড়ে মুড়ে মায়ের বুকে দিল। মা হাসলেন। প্রসূতি হাসল। বাচ্চা কাঁদল। করিমন কাঁদল। সবাই একসাথে।

সেই মেয়েটা এখন তিরিশ বছরের। নিজের বাচ্চা আছে। সেই বাচ্চা হাসপাতালে জন্মেছে। সিজারিয়ান। করিমনকে ডাকেনি।

করিমনের স্বামী ছিল। সোলায়মান। ভালো মানুষ। করিমনের কাজে বাধা দেয়নি কোনোদিন। মাঝরাতে করিমন যখন উঠে যেত, সোলায়মান বলত, "যা। আল্লাহ হাফেজ।" তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ত। সোলায়মান মারা গেছে আট বছর আগে। তারপর থেকে করিমন একা। ছেলেরা শহরে। ঢাকায়, চট্টগ্রামে। মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠায়। "আম্মা, শহরে আসো।" করিমন যায় না। শহরে তার কোনো কাজ নেই। শহরে কেউ তাকে "দাইমা" বলে ডাকবে না।

হাসপাতাল এসেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। দশ বছর আগে হয়েছে। ডাক্তার আছে, নার্স আছে, আল্ট্রাসাউন্ড মেশিন আছে, অপারেশন থিয়েটার আছে। মেয়েরা এখন হাসপাতালে যায়। সরকার বলেছে হাসপাতালে যেতে। এনজিও বলেছে হাসপাতালে যেতে। টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন বলেছে হাসপাতালে যেতে। সবাই বলেছে হাসপাতালে যেতে।

করিমনও বলে, "হাসপাতালে যাও।"

এটা মিথ্যা নয়। করিমন জানে, হাসপাতালে অনেক কিছু আছে যা তার কাছে নেই। সিজারিয়ান করার ক্ষমতা নেই। রক্তক্ষরণ হলে ব্লাড ব্যাংক নেই। বাচ্চার শ্বাসকষ্ট হলে অক্সিজেন নেই। করিমনের কাছে আছে দুটো হাত, কিছু অভিজ্ঞতা, আর আল্লাহর নাম। এটা সবসময় যথেষ্ট নয়।

করিমন পাঁচটা বাচ্চা হারিয়েছে চল্লিশ বছরে। পাঁচটা। প্রতিটার মুখ মনে আছে। প্রতিটার মায়ের চিৎকার মনে আছে। সেই রাতগুলোতে করিমন ঘুমাতে পারেনি। নিজেকে দোষ দিয়েছে। হাসপাতাল থাকলে হয়তো বাঁচত। হয়তো। নিশ্চিত নয়। কিন্তু "হয়তো" শব্দটাই যথেষ্ট করিমনকে ভেঙে দিতে।

একটা রাতের কথা করিমন কোনোদিন ভুলবে না। পঁচিশ বছর আগে। শীতের রাত। বাচ্চাটা উল্টো ছিল। পা আগে আসছিল। করিমন চেষ্টা করল ঘোরাতে। পারল না। বাচ্চা আটকে গেল। মায়ের রক্তক্ষরণ শুরু হলো। ঘরে আলো কম। কেরোসিনের বাতি কাঁপছে। করিমনের হাত রক্তে ভিজে গেল। সে চিৎকার করল, "কেউ ধর! কাপড় দাও!" বাড়ির মানুষ দৌড়াদৌড়ি করল। করিমন শেষ চেষ্টা করল। বাচ্চা বেরিয়ে এলো। নীল। শ্বাস নিচ্ছে না। করিমন মুখে ফুঁ দিল। পিঠে চাপড় দিল। কিছু হলো না। বাচ্চাটা চলে গেল। মায়ের চিৎকার ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল।

সেই রাতের পর করিমন এক সপ্তাহ কারো বাড়ি যায়নি। ঘরে বসে ছিল। সোলায়মান বলেছিল, "তোর দোষ না। আল্লাহর ইচ্ছা।" করিমন জানত, আল্লাহর ইচ্ছা ঠিক আছে, কিন্তু একটা হাসপাতাল থাকলে হয়তো আল্লাহর ইচ্ছা অন্যরকম হতো।

তাই করিমন বলে, "হাসপাতালে যাও।"

কিন্তু রাত দুইটায়, বর্ষার রাতে, যখন রাস্তা ডুবে গেছে হাঁটু পানিতে, যখন হাসপাতাল তিন ঘণ্টার পথ, যখন অ্যাম্বুলেন্স আসবে না কারণ অ্যাম্বুলেন্সের চাকা কাদায় আটকে যায়, তখন কে আসে?

করিমন আসে।

মাঝরাতে ডাক আসে। কেউ একজন দৌড়ে আসে। "দাইমা, জলদি আসেন। বউ ব্যথা পাইতেছে।" করিমন উঠে পড়ে। ব্যাগটা নেয়। ব্যাগে কী আছে? পরিষ্কার কাপড়, ব্লেড, সুতা, ডেটল, একটা টর্চলাইট। এই সব।

ছাতা মাথায়, হারিকেনের আলোয়, কাদামাখা রাস্তায়, করিমন হেঁটে যায়। পায়ের পাতা কাদায় ডুবে যায়, তুলে আনে, আবার ডুবে যায়। বৃষ্টি পড়ছে। ব্যাঙ ডাকছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে।

আধুনিক চিকিৎসা দিনে আসে। দিনের আলোতে, পাকা রাস্তায়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে। রাতে করিমন আসে। অন্ধকারে, কাদায়, কেরোসিনের আলোতে।

একবার এনজিও থেকে ট্রেনিং দিতে এসেছিল। দুই দিনের ট্রেনিং। "পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ডেলিভারি।" তরুণী মেয়ে, ঢাকা থেকে এসেছে। সুন্দর পোশাক, সুন্দর কথা। পাওয়ারপয়েন্ট দেখাল। ছবি দেখাল। বলল, "ব্লেড ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। হাত সাবান দিয়ে ধুতে হবে। পরিষ্কার কাপড় ব্যবহার করতে হবে।"

করিমন শুনল। মাথা নাড়ল। কিছু বলল না। কারণ করিমন এসব চল্লিশ বছর ধরে করছে। মা শিখিয়েছিল। "ময়লা হাতে বাচ্চা ধরবি না। বাচ্চা অসুখ করবে।" মা জীবাণু শব্দটা জানতেন না, কিন্তু ময়লা বুঝতেন।

ট্রেনিংয়ের শেষে মেয়েটা একটা সার্টিফিকেট দিল। করিমনের নাম লেখা। "প্রশিক্ষিত ধাত্রী।" করিমন সার্টিফিকেটটা হাতে নিল। হাসল। চল্লিশ বছর পর সার্টিফিকেট পেল। দুই দিনের ট্রেনিংয়ে যা শিখিয়েছে, তার চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতার এক শতাংশও নয়। কিন্তু কাগজ। কাগজই সব। কাগজ ছাড়া জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই এই দুনিয়ায়।

সার্টিফিকেটটা দেয়ালে টাঙিয়ে রেখেছে। কখনো কখনো তাকায়। হাসে।

আজকে করিমনের কাছে কেউ আসেনি।

গত মাসেও কেউ আসেনি। তার আগের মাসে একজন এসেছিল। সেটাও জরুরি ছিল বলে। হাসপাতালে যাওয়ার সময় ছিল না। করিমন গিয়ে ডেলিভারি করাল। ছেলে হয়েছে। মা-ছেলে দুজনেই ভালো আছে।

করিমনের কাজ কমে যাচ্ছে। এটা সত্য। এটা ভালো। করিমন জানে এটা ভালো। হাসপাতালে যাওয়া ভালো। ডাক্তারের কাছে যাওয়া ভালো। আল্ট্রাসাউন্ড করানো ভালো। সিজারিয়ানের ব্যবস্থা থাকা ভালো। করিমন এসব জানে।

কিন্তু করিমন এটাও জানে, হাসপাতালে গেলেই সব ঠিক হয়ে যায় না। গত বছর পাশের গ্রামের রুবিনা হাসপাতালে গেছিল। ডাক্তার ছিল না। রাতের শিফটে। নার্স ছিল, কিন্তু ডেলিভারি করার অভিজ্ঞতা নেই। অ্যাম্বুলেন্সে করে জেলা হাসপাতালে যেতে যেতে রাস্তায় বাচ্চা এসে গেল। অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ডেলিভারি করাল। ড্রাইভার।

হাসপাতাল আছে, কিন্তু ডাক্তার নেই। ডাক্তার আছে, কিন্তু রাতে নেই। রাতে আছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা নেই। অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু যন্ত্রপাতি নেই। একটার পর একটা "কিন্তু।" এই "কিন্তু" গুলোর ফাঁকে করিমন দাঁড়িয়ে আছে। চল্লিশ বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

তবু।

তবু একটা খালি জায়গা তৈরি হচ্ছে। করিমনের হাতদুটো এখন বেশিরভাগ সময় বসে থাকে। সবজি কাটে, ভাত রান্না করে, কাপড় ধোয়, কিন্তু যে কাজের জন্য এই হাত তৈরি হয়েছিল, সেই কাজ কমে যাচ্ছে। একজন কুমোর যদি মাটি না পায়, তার হাত কী করে? একজন জেলে যদি নদী শুকিয়ে যায়, তার জাল কোথায় ফেলে?

করিমনের নাতনি সুরাইয়া। বিশ বছর। কলেজে পড়ে। সুরাইয়া বলে, "নানি, তুমি তো ডাক্তারের মতোই। তোমাকে ট্রেনিং দিলে তুমি নার্স হতে পারতে।"

করিমন হাসে। "আমি পড়তে পারি না, মা। লেখাপড়া জানি না। কিন্তু বাচ্চা ধরতে জানি।"

"এখন তো সব হাসপাতালে হয়, নানি।"

"দিনের বেলা হয়। রাতের বেলা কী হয়?"

সুরাইয়া চুপ।

রাত। বর্ষা। তিন ঘণ্টার রাস্তা। এই তিনটা শব্দের উত্তর হাসপাতালের কাছে নেই। এই তিনটা শব্দের উত্তর করিমনের কাছে আছে।

সুরাইয়া একদিন করিমনকে জিজ্ঞেস করেছিল, "নানি, তোমার জীবনে সবচেয়ে ভালো মুহূর্ত কোনটা?"

করিমন ভেবেছিল। অনেক মুহূর্ত আছে। দুই হাজারের বেশি। প্রতিটা বাচ্চার প্রথম কান্না একটা মুহূর্ত। কিন্তু সবচেয়ে ভালো?

"যখন একটা বাচ্চা প্রথমবার কাঁদে, আর মা হাসে। এই দুটো শব্দ একসাথে, কান্না আর হাসি। এটাই সবচেয়ে ভালো।"

সুরাইয়া কিছু বলেনি। হয়তো বুঝেছে, হয়তো বোঝেনি। কিছু জিনিস বোঝার জন্য হাতে রক্ত লাগতে হয়। কিছু জিনিস বোঝার জন্য মাঝরাতে কাদায় হাঁটতে হয়। কিছু জিনিস বোঝার জন্য পাঁচটা বাচ্চা হারাতে হয়।

রাত হলো।

করিমন খাটিয়ায় শুয়ে আছে। পাশে ব্যাগটা রাখা। সবসময় রাখে। চল্লিশ বছরের অভ্যাস। যে কোনো সময় ডাক আসতে পারে। হয়তো আসবে না। হয়তো আর কোনোদিন আসবে না। কিন্তু করিমন প্রস্তুত থাকে। সৈনিক অবসর নেয়, কিন্তু ইউনিফর্ম ভাঁজ করে রেখে দেয়।

বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। দূরে কোথাও শেয়াল ডাকছে। গ্রামের রাত। শহরে এই শব্দ নেই। শহরে অন্য শব্দ আছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। হাসপাতালের করিডোরে জুতোর আওয়াজ। মনিটরের বিপবিপ। সেগুলো জীবন বাঁচায়। এগুলোও জীবন বাঁচায়। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক জীবন বাঁচায় না, কিন্তু করিমনকে জাগিয়ে রাখে। জেগে থাকাটাই প্রথম পদক্ষেপ।

করিমনের মা আমেনা বিবি মারা গেছেন বিশ বছর আগে। শেষ দিকে চোখে দেখতেন না। হাত কাঁপত। কিন্তু মুখে সবসময় নির্দেশনা দিতেন। "হাত একটু ওপরে রাখ। আস্তে। তাড়াহুড়ো করিস না।" শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ধাত্রী ছিলেন। মৃত্যুর আগের রাতে বলেছিলেন, "তোর হাত আমার চেয়ে ভালো। তোর হাত বড়। বড় হাতে বাচ্চা নিরাপদ থাকে।"

করিমন ভাবে, তার পরে কে? সুরাইয়া? সুরাইয়া কলেজে পড়ে। সুরাইয়া ডাক্তার হবে হয়তো। ভালো কথা। কিন্তু সুরাইয়া কি রাত দুইটায় কাদার রাস্তায় হাঁটবে? হয়তো হাঁটবে না। হয়তো হাঁটতে হবে না। হয়তো ততদিনে রাস্তা পাকা হয়ে যাবে। হয়তো অ্যাম্বুলেন্স আসবে। হয়তো।

কিন্তু যতদিন "হয়তো" আছে, ততদিন করিমন আছে।

করিমনের কাছে একটা খাতা আছে। সোলায়মান কিনে দিয়েছিল অনেক আগে। করিমন লিখতে পারে না, কিন্তু নাম লিখতে পারে। প্রতিটা বাচ্চা জন্মানোর পর সে বাচ্চার নাম লেখে। কখনো মা-ই বলে দেয় নাম, কখনো পরে জানায়। খাতাটা পুরোনো, হলুদ হয়ে গেছে, কিন্তু নামগুলো পড়া যায়। দুই হাজারের কাছাকাছি নাম। প্রতিটা নাম একটা জীবন। প্রতিটা নামের পেছনে একটা রাত আছে, একটা চিৎকার আছে, একটা প্রথম কান্না আছে, আর করিমনের দুটো হাত আছে।

করিমন মাঝে মাঝে খাতাটা বের করে দেখে। নামগুলো পড়ে। কিছু নাম চেনে, কিছু চেনে না। কিছু বাচ্চা বড় হয়ে গেছে, বিয়ে হয়ে গেছে, নিজেরা বাচ্চা নিয়েছে। করিমন তাদের বাচ্চাও ধরেছে কখনো কখনো। দুই প্রজন্ম। মায়ের বাচ্চা ধরেছে, মেয়ের বাচ্চাও ধরেছে।

বাইরে মেঘ করেছে। বৃষ্টি হতে পারে। করিমন ব্যাগটা একটু কাছে টানল। ব্লেড আছে, সুতা আছে, ডেটল আছে, টর্চলাইটের ব্যাটারি গতকাল বদলেছে।

খাটিয়ায় শুয়ে করিমন হাতদুটো বুকের ওপর রাখল। বড় হাত। বাঁকা আঙুল। গভীর রেখা। এই হাত দুই হাজার জীবন ধরেছে। এই হাত একদিন থামবে। হয়তো শীঘ্রই। কিন্তু আজ রাতে, যদি ডাক আসে, এই হাত প্রস্তুত।

দূরে বৃষ্টি শুরু হলো। টিনের চালে টুপটাপ। করিমনের কানে এই শব্দ পরিচিত। বর্ষার রাতে এই শব্দ শুনলে করিমনের ঘুম আসে না। কারণ বর্ষার রাতেই ডাক আসত সবচেয়ে বেশি। বর্ষার রাতেই জীবন আসত সবচেয়ে কঠিন পথে।

করিমন শুনছে। অপেক্ষা করছে।

প্রস্তুত।