প্রবাসী স্ত্রী
টাকা আসে, মানুষ আসে না।
১
ফোন বাজল।
রাত এগারোটা বাজে। সৌদি আরবে তখন রাত আটটা। ফারুক ভিডিও কল করেছে। রোকেয়া ফোন তুলল। স্ক্রিনে ফারুকের মুখ। চেহারা কালো হয়ে গেছে। রোদে পুড়েছে। চোখের নিচে কালি। ক্লান্ত দেখাচ্ছে।
"কেমন আছ?"
"ভালো।"
"বাচ্চারা?"
"ভালো।"
"টাকা পাঠাইছি। ত্রিশ হাজার। চেক কর।"
"পাইছি।"
"আর কিছু লাগবে?"
"না।"
এটুকুই। পাঁচ মিনিটের কথা। কখনো দশ মিনিট হয়। পনেরো মিনিট বিরল। ফারুক ক্লান্ত। সারাদিন রোদে কাজ করে। কনস্ট্রাকশন সাইটে। রিয়াদের চল্লিশ ডিগ্রি রোদে ইট বহন করে, সিমেন্ট মেশায়, রড বাঁধে। সন্ধ্যায় ক্যাম্পে ফিরে ভাত খায়, নামাজ পড়ে, ফোন করে, ঘুমায়। পাঁচ বছর ধরে এটাই রুটিন।
রোকেয়া ফোন রেখে দিল। পাশে দুই বাচ্চা ঘুমাচ্ছে। আরিফ, আট বছর। রুমা, পাঁচ বছর। আরিফ বাবাকে চেনে, কিন্তু চেনে ফোনের স্ক্রিনে। শেষ যখন ফারুক এসেছিল, আরিফের বয়স তিন। আরিফ মনে রাখেনি। রুমা বাবাকে দেখেইনি। রুমার জন্মের দুই মাস আগে ফারুক সৌদি গেছে।
রোকেয়া উঠে রান্নাঘরে গেল। কালকের জন্য চাল ভিজিয়ে রাখতে হবে। সকালে আরিফের স্কুল। টিফিন বানাতে হবে। রুমাকে ননীর কাছে রেখে যেতে হবে। তারপর জমির দিকে যেতে হবে। বর্গাচাষি হালিম কাকা বলেছে আমন ধানের চারা তৈরি। রোকেয়াকে দেখতে যেতে হবে। তারপর ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হবে। ভিজিএফের কার্ড নবায়ন। তারপর ওষুধের দোকান। শাশুড়ির রক্তচাপের ওষুধ শেষ।
তিরিশ হাজার টাকা আসে। ফারুক পাঠায়। কিন্তু টাকা নিজে তো কাজ করে না। টাকা দিয়ে সংসার চালাতে হয়। সেটা রোকেয়া করে। টাকা আসে, মানুষ আসে না।
২
সকালে রোকেয়া আরিফকে স্কুলে দিয়ে এলো।
আরিফ গেটে ঢুকতে ঢুকতে বলল, "আম্মা, আমাদের ক্লাসে সবার বাবা আসে। আমার বাবা কবে আসবে?"
"শীঘ্রই।"
"শীঘ্রই মানে কবে?"
রোকেয়া উত্তর দিল না। কারণ উত্তর জানে না। ফারুকের ভিসা দুই বছরের। দুই বছর পর নবায়ন হয়। পাঁচ বছরে একবার ছুটিতে আসার কথা। কিন্তু ছুটি নিলে টাকা কম আসবে। ফারুক ছুটি নেয় না। "আরেকটু কামাই করি। ঘর পাকা করতে হবে। আরিফকে ভালো স্কুলে দিতে হবে। রুমার জন্য জমি কিনতে হবে।" পরিকল্পনা অনেক। পরিকল্পনায় শুধু ভবিষ্যৎ আছে, বর্তমান নেই।
রোকেয়া জমিতে গেল। হালিম কাকা অপেক্ষা করছে। "ভাবী, এবার আমন ভালো হবে ইনশাআল্লাহ। বৃষ্টি ঠিকমতো হলে ফলন ভালো পাবেন।"
রোকেয়া জমি দেখল। মাটি দেখল। পানি দেখল। ফারুক যখন ছিল, জমির কাজ ফারুক করত। এখন রোকেয়া করে। প্রথম বছর বুঝতেই পারত না কী হচ্ছে। হালিম কাকা যা বলত তাই করত। দ্বিতীয় বছর থেকে নিজে বুঝতে শুরু করল। এখন রোকেয়া মাটি ধরে বলতে পারে জমিতে সার দরকার কি না। রোদ দেখে বলতে পারে ধান কাটার সময় হয়েছে কি না। এগুলো ফারুক তাকে শেখায়নি। জীবন শিখিয়েছে।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাস্তায় কয়েকটা মেয়ে দেখল। প্রবাসী স্ত্রীরা। রোকেয়ার মতো। স্বামী বিদেশে, তারা এখানে। সবার মুখে একই ক্লান্তি। একই চোখ। ঘুম-কম চোখ। দায়িত্ব-ভারী চোখ। একজন ডাকল, "রোকেয়া আপা, ভালো আছেন?"
"হ্যাঁ, ভালো।"
ভালো। এই শব্দটা প্রবাসী স্ত্রীদের জাতীয় শব্দ। সবাই ভালো আছে। কেউ ভালো নেই, কিন্তু সবাই ভালো আছে।
রোকেয়া মাঝে মাঝে ভাবে, ফারুক কি জানে সে কতটা বদলে গেছে? বিয়ের সময় রোকেয়া রান্না জানত। আর কিছু জানত না। এখন রোকেয়া জমি চেনে, ধান চেনে, সার চেনে। ব্যাংকে গিয়ে টাকা তোলে, একাই স্বাক্ষর করে। ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে চেয়ারম্যানের সামনে বসে কথা বলে। স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের সাথে কথা বলে। দোকানে গিয়ে দরদাম করে। এসবের কোনোটাই রোকেয়া পাঁচ বছর আগে পারত না।
ফারুক যখন ফিরবে, সে কোন রোকেয়াকে পাবে? সেই লাজুক মেয়ে? সেই মেয়ে আর নেই। এখন আছে একজন নারী যে একটা সংসার চালাতে শিখেছে, একা।
৩
গ্রামে কথা হয়।
রোকেয়া জানে। কথা সবসময় হয়। একটা মেয়ে একা থাকে, স্বামী বিদেশে, মেয়েটা বাজারে যায়, ইউনিয়ন পরিষদে যায়, জমিতে যায়, কথা হবেই।
"একা থাকে, কে জানে কী করে?"
এই বাক্যটা রোকেয়া শুনেছে। সরাসরি কেউ বলে না। পেছনে বলে। দেয়ালের ওপাশ থেকে ভেসে আসে। বাজারে দোকানদারের চোখে দেখা যায়। কখনো শাশুড়ির মুখে ধরা পড়ে, হালকা একটা ইঙ্গিত, "বাইরে এত যাওয়ার দরকার কী? হালিম কাকাকে বলে দিলেই তো হয়।"
রোকেয়ার উত্তর: নীরবতা।
কথা বলে কী হবে? কথা দিয়ে গুজব মরে না। গুজব পানির মতো, যেখানে ফাঁক পায় ঢুকে যায়। রোকেয়া ফাঁক বন্ধ করতে পারে না। রোকেয়া শুধু নিজের কাজ করে। সকালে বাচ্চাদের স্কুলে দেয়, সংসার চালায়, জমি দেখে, শাশুড়ির ওষুধ আনে, সন্ধ্যায় বাচ্চাদের পড়ায়, রাতে ফারুকের ফোন ধরে।
একবার ফারুককে বলেছিল। "তোমার গ্রামের মানুষ কথা কয়।"
ফারুক চুপ ছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, "কী কয়?"
"এমনি কথা।"
"তুমি কিছু করো না তো?"
এই প্রশ্নটা রোকেয়ার বুকে ছুরির মতো ঢুকেছিল। স্বামীও সন্দেহ করে। পাঁচ বছর একা সংসার চালাচ্ছে, দুটো বাচ্চা মানুষ করছে, জমি দেখছে, শাশুড়ির সেবা করছে, তবু স্বামী জিজ্ঞেস করে, "তুমি কিছু করো না তো?"
রোকেয়া বলেছিল, "না।"
ফারুক বলেছিল, "ভালো। মানুষের কথায় কান দিও না।"
রোকেয়া কান দেয়নি। কিন্তু বুক তো বন্ধ করতে পারে না। বুকে ঢুকে গেছে।
৪
সন্ধ্যায় আরিফ পড়ছে। গণিত। রোকেয়া পাশে বসে আছে।
"আম্মা, এইটা কেমনে করব?"
ভাগ। ৪৮ ভাগ ৬। রোকেয়া ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে। বিয়ের পর আর পড়া হয়নি। কিন্তু ক্লাস থ্রির গণিত পারে। পারতে হয়। বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য রোকেয়া নিজে আবার পড়ছে। আরিফের বই পড়ে রাতে, আরিফ ঘুমিয়ে গেলে। পরদিন পড়ায়। কখনো পারে না। ইংরেজি পারে না। তখন ইউটিউবে দেখে। ফোনে। মোবাইল ডেটা কিনে।
"আট। ৪৮ ভাগ ৬ সমান আট।"
"কেমনে বুঝলা?"
"ছয়ের ঘরে আট মানে আটচল্লিশ। তাই আট।"
আরিফ লিখল। রোকেয়া দেখল।
রুমা এসে কোলে উঠল। "আম্মা, বাবা কবে আসবে?"
আবার এই প্রশ্ন।
"বাবা কাজ করে। কাজ শেষ হলে আসবে।"
"বাবার কাজ কবে শেষ হবে?"
রোকেয়া রুমার মাথায় হাত বুলাল। উত্তর দিল না।
রাতে বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে রোকেয়া উঠোনে বসল। আকাশে তারা। এই তারা সৌদিতেও দেখা যায়। ফারুকও কি এখন তারা দেখছে? সম্ভবত না। ফারুক ঘুমাচ্ছে। কাল সকালে আবার রোদে যেতে হবে।
রোকেয়া ভাবল, সে কী? স্ত্রী? পাঁচ বছর স্বামী নেই, স্ত্রী কীসের? মা? হ্যাঁ, মা। বাবা? হ্যাঁ, বাবাও। বাচ্চারা তাকেই বাবা-মা দুটোই মনে করে। ম্যানেজার? হ্যাঁ। সংসারের ম্যানেজার। টাকার হিসেব, জমির হিসেব, স্কুলের হিসেব, ওষুধের হিসেব, সব রোকেয়া করে। কৃষক? হ্যাঁ, সেটাও। শিক্ষক? হ্যাঁ, বাচ্চাদের পড়ায়। আইনজীবী? মাঝে মাঝে। জমি নিয়ে বিরোধ হলে রোকেয়াকেই সালিশে যেতে হয়।
সবকিছু। রোকেয়া সবকিছু।
ত্রিশ হাজার টাকা আসে প্রতি মাসে। সেই টাকা একটা পুরুষের পাঁচ বছরের ঘাম। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে যে সংসার চলছে, সেই সংসারে একটা নারী প্রতিদিন সতেরো ঘণ্টা জেগে থাকে। তার কোনো বেতন নেই। তার কোনো ছুটি নেই। তার কোনো "ক্যাম্পে ফিরে ঘুমানো" নেই।
পাশের বাড়ির জাহানারা আপা। তারও স্বামী প্রবাসে। মালয়েশিয়া। সাত বছর। জাহানারা আপা আরো কঠিন অবস্থায়। স্বামী ছয় মাস ধরে টাকা পাঠায়নি। ফোনও ধরে না। শোনা যাচ্ছে, ওখানে অন্য বিয়ে করেছে। জাহানারা আপার তিনটা বাচ্চা। বড় মেয়েটা স্কুল ছেড়ে দিয়েছে। গার্মেন্টসে যাবে। বারো বছরের মেয়ে।
রোকেয়া জাহানারা আপাকে দেখে ভয় পায়। এটা কি তারও হতে পারে? ফারুক কি একদিন ফোন ধরা বন্ধ করবে? টাকা পাঠানো বন্ধ করবে? অন্য বিয়ে করবে? এই ভয়টা রোকেয়ার ভেতরে বাসা বেঁধেছে। কাউকে বলে না। বলার জায়গা নেই। মাকে বললে মা বলবে, "কপাল।" বাবাকে বললে বাবা বলবে, "মেয়েদের এমনই হয়।"
রোকেয়া একদিন হিসেব করেছিল। বাংলাদেশে কত প্রবাসী স্ত্রী আছে। লাখে লাখে। প্রতিটা ঘরে একটা রোকেয়া বসে আছে। একা। সন্তান নিয়ে। টাকা গুনছে। দিন গুনছে। স্বামীর ফেরার অপেক্ষায়। কেউ কেউ ফেরে। কেউ কেউ ফেরে না। কেউ কেউ ফিরে এসে চেনে না আর। পাঁচ বছরে মানুষ বদলে যায়। দুজনেই বদলে যায়। দুজনেই অচেনা হয়ে যায়।
৫
রাত গভীর হলো।
রোকেয়া বিছানায় শুয়ে আছে। দুই পাশে দুই বাচ্চা। আরিফ ডান পাশে, রুমা বাম পাশে। দুজনেই গভীর ঘুমে। আরিফ ঘুমের মধ্যে কিছু বলল। শোনা গেল না কী বলল।
দেয়ালে ফারুকের ছবি। বিয়ের ছবি। ফারুক হাসছে। রোকেয়াও হাসছে। কবে তোলা? আট বছর আগে। ফারুককে চেনা যায়, কিন্তু সেই ফারুক আর নেই। রোদে পুড়ে অন্য মানুষ হয়ে গেছে। রোকেয়াও অন্য মানুষ হয়ে গেছে। বিয়ের সময় রোকেয়া ছিল লাজুক, চুপচাপ, শাশুড়ির কথা মতো চলত। এখন রোকেয়া সংসার চালায়। কারো কথামতো চলার সময় নেই। চলার পথ নিজে বানাতে হয়।
ফোন কাঁপল। মেসেজ। ফারুক: "ঘুমাও। কাল কথা হবে।"
রোকেয়া টাইপ করল: "তুমিও ঘুমাও।"
পাঠিয়ে দিল। ফোন রেখে দিল।
একটা বিয়ে আছে যেটায় দুজন মানুষ একই ছাদের নিচে থাকে না। একটা সংসার আছে যেটা চলে দূরত্বের জোরে। একটা ভালোবাসা আছে যেটা স্ক্রিনের আলোয় টিকে আছে, কিন্তু চামড়ার পরশ ভুলে গেছে।
টাকা আসে। মানুষ আসে না।
রোকেয়া চোখ বন্ধ করল। ঘুমানোর চেষ্টা করল। কাল সকালে আবার উঠতে হবে। আরিফের টিফিন। রুমার দুধ। শাশুড়ির ওষুধ। হালিম কাকার সাথে জমির কথা। ইউনিয়ন পরিষদে কাগজপত্র। সব রোকেয়া। সবকিছু রোকেয়া।
বাইরে রাতপাখি ডাকছে। একটানা। একই সুর। পাখিটাও হয়তো একা।