ক্রীড়াবিদ
জিতলে সবার মেয়ে। হারলে কারো না।
১
সাবিনা দৌড়ায়।
সকাল পাঁচটায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটির রাস্তায়। আমবাগানের পাশ দিয়ে। ধানক্ষেতের আল ধরে। কুয়াশায়। খালি পায়ে। পায়ের তলায় মাটি ঠান্ডা, শিশির ভেজা ঘাস, কখনো কাঁকর, কখনো শুকনো পাতা। প্রতিটা পদক্ষেপে মাটি একটু করে সরে যায়, সাবিনার পায়ের ছাপ রেখে যায়। কিন্তু সাবিনা পেছনে তাকায় না। দৌড়বিদ পেছনে তাকায় না।
চারশো মিটার।
এটাই সাবিনার দূরত্ব। ট্র্যাকের এক চক্কর। পঞ্চাশ সেকেন্ডের কম। এই পঞ্চাশ সেকেন্ডের জন্য সাবিনা প্রতিদিন তিন ঘণ্টা ট্রেনিং করে। দুই ঘণ্টা সকালে, এক ঘণ্টা বিকেলে। পঞ্চাশ সেকেন্ডকে ঊনপঞ্চাশ সেকেন্ডে নামাতে হবে। ঊনপঞ্চাশকে আটচল্লিশে। প্রতিটা সেকেন্ড একটা পাহাড়।
সাবিনার বয়স কুড়ি।
বিশ বছর আগে এই গ্রামে জন্ম। বাবা আব্দুল করিম, কৃষক। মা ফাতেমা, গৃহিণী। তিন ভাই, দুই বোন। সাবিনা মেজো। ছোটবেলা থেকে দৌড়াত। স্কুলে যেত দৌড়ে, বাড়ি ফিরত দৌড়ে, খেলার মাঠে দৌড়াত, ধান ক্ষেতের আলে দৌড়াত। মা বলত, "মেয়ে এত দৌড়ায় কেন? পাগল নাকি?" সাবিনা জানত না কেন দৌড়ায়। দৌড়ালে ভালো লাগে, এটুকুই জানত।
ক্লাস সেভেনে একদিন বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। দৌড় প্রতিযোগিতা। একশো মিটার। সাবিনা দৌড়াল। জিতল। সহজে জিতল। এত সহজে জিতল যে পেছনের মেয়েটা যখন আশি মিটারে, সাবিনা তখন শেষ করে ফেলেছে।
মনোয়ার স্যার দেখছিলেন। শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক। পঁয়তাল্লিশ বছরের মানুষ। নিজে একসময় দৌড়াতেন। জেলা পর্যায়ে রৌপ্য ছিল তাঁর সেরা ফলাফল। কিন্তু চোখ ছিল। দৌড়বিদের চোখ। প্রতিভা চেনার চোখ।
স্যার সাবিনাকে ডাকলেন। "তুমি কি প্রতিদিন দৌড়াও?"
"জি স্যার।"
"কার কাছে শিখেছ?"
"কারো কাছে শিখিনি। এমনি দৌড়াই।"
মনোয়ার স্যারের চোখ বড় হলো। "তুমি ন্যাচারাল। তোমাকে ট্রেনিং দিতে হবে।"
সাবিনা বুঝল না "ন্যাচারাল" মানে কী। পরে বুঝেছে। ন্যাচারাল মানে শরীর নিজে জানে কীভাবে দৌড়াতে হয়। কেউ শেখায়নি, কিন্তু পা জানে কোথায় পড়তে হবে, হাত জানে কীভাবে দুলতে হবে, ফুসফুস জানে কখন শ্বাস নিতে হবে। এটা শেখানো যায় না। এটা থাকে অথবা থাকে না।
২
ট্রেনিং শুরু হলো।
মনোয়ার স্যার নিজে কোনোদিন জাতীয় পর্যায়ে যেতে পারেননি। জেলা পর্যায়ে রৌপ্য পদক ছিল তাঁর সেরা ফলাফল। কিন্তু চোখ ছিল। প্রতিভা চেনার চোখ। সাবিনার মধ্যে তিনি দেখলেন সেই জিনিস যেটা বই পড়ে শেখা যায় না। ছন্দ। শরীরের ভেতরে একটা ছন্দ আছে সাবিনার। পা ফেলার ছন্দ, শ্বাস নেওয়ার ছন্দ, হাত দোলানোর ছন্দ। সব মিলে একটা সুর। সাবিনা দৌড়ায় না, সাবিনা গান গায় শরীর দিয়ে।
কিন্তু ট্রেনিং মানে সুবিধা দরকার। ট্র্যাক নেই। জুতো নেই। কোচ নেই। পুষ্টিকর খাবার নেই। সিনথেটিক ট্র্যাকের বদলে মাটির রাস্তা। স্পাইক জুতোর বদলে খালি পা। কোচের বদলে মনোয়ার স্যার আর ইউটিউব ভিডিও। মুরগির মাংসের বদলে ডাল-ভাত।
সাবিনা মাটির রাস্তায় দৌড়াল। মনোয়ার স্যার স্টপওয়াচ ধরলেন। স্টপওয়াচটা পুরোনো, কিন্তু সময় ঠিক দেয়।
"তোমার ফর্ম ঠিক করতে হবে। বাঁকে শরীর বেশি কাত করছ। সোজা রাখ।"
সাবিনা সোজা রাখল। আবার দৌড়াল। আবার। আবার।
প্রতিদিন সকালে দৌড়াত। স্কুলের আগে। তারপর স্কুল। তারপর বিকেলে আবার দৌড়াত। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরত। মা জিজ্ঞেস করত, "কোথায় ছিলি?"
"দৌড়াচ্ছিলাম।"
"মেয়ে দৌড়ায়? শরীর দেখায়?"
এই প্রশ্ন। এই একটা প্রশ্ন সাবিনাকে তাড়া করেছে বছরের পর বছর। মেয়ে দৌড়ায়? মেয়ে হাফ প্যান্ট পরে? মেয়ে ঘামে? মেয়ে হাঁপায়? মেয়ে পেশি দেখায়? শরীর। সব কথা শরীরে এসে ঠেকে। মেয়ের শরীর সমাজের সম্পত্তি। মেয়ে কতটুকু দেখাবে, কতটুকু ঢাকবে, কোথায় দৌড়াবে, কোথায় থামবে, সব সমাজ ঠিক করবে।
সাবিনা দৌড়াল। থামল না।
গ্রামের মেয়েরা শালীনতা নিয়ে কথা বলে। শালীনতা মানে ঢাকা শরীর। শালীনতা মানে নিচু গলা। শালীনতা মানে ছোট পদক্ষেপ। দৌড়বিদের শালীনতা আলাদা। দৌড়বিদের শরীর হাতিয়ার। পেশি, হাড়, ফুসফুস, সব মিলে একটা যন্ত্র। এই যন্ত্র যত মুক্ত, তত দ্রুত। কাপড়ে জড়ানো শরীর দৌড়াতে পারে না।
সাবিনা যখন প্রথমবার হাফ প্যান্ট পরে মাঠে নামল, মনোয়ার স্যার বলেছিলেন, "এটাই নিয়ম। দৌড়বিদেরা এটা পরে। এটা খেলার পোশাক, অন্য কিছু না।" সাবিনা জানত। কিন্তু গ্রামের মানুষ জানত না। গ্রামের মানুষ দেখল, মেয়ে পা দেখাচ্ছে। এটুকুই দেখল। মেয়ে দৌড়াচ্ছে, এটা দেখল না।
বাবা একদিন বললেন, "লোকে কী বলবে?"
"দৌড়ে জিতলে লোকে কিছু বলবে না।"
বাবা চুপ করে গেলেন। সাবিনা জানত, বাবা মনে মনে চান মেয়ে জিতুক। কিন্তু সমাজের ভয়। সবসময় সমাজের ভয়। সমাজ একটা অদৃশ্য দড়ি, প্রতিটা মানুষের গলায় বাঁধা।
৩
জেলা পর্যায়ে প্রথম।
বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম।
জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয়। প্রথমবার।
জাতীয় পর্যায়ে প্রথম। দ্বিতীয়বার।
জাতীয় দলে নাম।
এই প্রতিটা ধাপে একটা গল্প আছে। জেলা পর্যায়ে যাওয়ার আগে মনোয়ার স্যার নিজের পকেটের টাকায় সাবিনার বাসভাড়া দিয়েছিলেন। বিভাগীয় পর্যায়ে যাওয়ার আগে সাবিনার জুতো ছিল না, স্যার নিজের ছেলের জুতো এনে দিলেন। সাইজ একটু বড় ছিল, সাবিনা কাগজ ঠেসে পরেছিল। জাতীয় পর্যায়ে প্রথমবার দ্বিতীয় হওয়ার পর কেউ ফোন করে অভিনন্দন জানায়নি। মা বলেছিল, "দ্বিতীয় মানে হেরে গেছিস।"
দ্বিতীয়বার জাতীয় পর্যায়ে যাওয়ার আগে সাবিনা অসুস্থ ছিল। জ্বর। ১০১ ডিগ্রি। মনোয়ার স্যার বললেন, "না গেলেও হবে। পরের বার যাবি।" সাবিনা বলল, "পরের বার নাও থাকতে পারে।" জ্বর নিয়ে দৌড়াল। জিতল। জ্বর নামল না, কিন্তু জিতল।
সাবিনার উত্থান দ্রুত হয়েছে। মাটির রাস্তা থেকে সিনথেটিক ট্র্যাক। খালি পা থেকে স্পাইক জুতো। প্রথমবার যখন স্পাইক জুতো পরল, সাবিনার মনে হলো সে মাটি ছেড়ে উড়ছে। জুতোগুলো লাল। সাবিনার প্রথম পছন্দের জুতো। এর আগে জুতো পছন্দ করার সুযোগ হয়নি। যেটা পায় সেটাই পরেছে।
ঢাকায় ক্যাম্প। ক্রীড়া ইনস্টিটিউট। হোস্টেলে থাকে। খাবার পায়। ডিম, মাছ, মুরগি, দুধ, ফল। এগুলো সাবিনা গ্রামে পেত না। প্রথম মাসে তিন কেজি ওজন বেড়েছে। শরীর পাল্টে গেছে। পেশি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু পরিবারের চাপ থামেনি।
মা ফোনে কাঁদে। "ফিরে আয়। তোর বিয়ের বয়স হইছে। পাত্র দেখতেছি। ভালো ঘর। তুই ফিরে আয়।"
বড় ভাই ফোনে বলে, "তোর জন্য মানুষ কথা কয়। আমরা মুখ দেখাইতে পারি না। মেয়ে হাফ প্যান্ট পইরা দৌড়ায়, এটা কোন কথা?"
সাবিনা ফোন রাখে। দৌড়াতে যায়। ট্র্যাকে দাঁড়ায়। শ্বাস নেয়। ব্লক সেট করে। বাঁশি বাজে। সাবিনা ছুটে যায়। চারশো মিটার। পঞ্চাশ সেকেন্ডের কম।
এই পঞ্চাশ সেকেন্ডে সাবিনা কিছু ভাবে না। মায়ের কান্না নেই, ভাইয়ের রাগ নেই, সমাজের কথা নেই। শুধু বাতাস আছে, পা আছে, ট্র্যাক আছে, ফিনিশ লাইন আছে। এই পঞ্চাশ সেকেন্ড সাবিনার নিজের। সম্পূর্ণ নিজের। পৃথিবীর কেউ এই পঞ্চাশ সেকেন্ড কেড়ে নিতে পারে না।
৪
সাউথ এশিয়ান গেমস। কাঠমান্ডু।
সাবিনা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। লেন ফোর। পাশে ভারতের মেয়ে, শ্রীলঙ্কার মেয়ে, পাকিস্তানের মেয়ে। সবাই লম্বা, পেশিবহুল, পেশাদার। সাবিনা সবার চেয়ে ছোটখাটো। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডাল-ভাতে বড় হওয়া শরীর। কিন্তু শরীরে একটা জিনিস আছে যেটা পুষ্টি দিয়ে তৈরি হয় না। আগুন। ভেতরে একটা আগুন।
পিস্তল ফাটল।
সাবিনা ছুটল। প্রথম একশো মিটারে তৃতীয়। দ্বিতীয় একশো মিটারে দ্বিতীয়। বাঁকে শরীর কাত করল, মনোয়ার স্যারের কথা মনে পড়ল, "বেশি কাত করো না।" সোজা রাখল। তৃতীয় একশো মিটারে সামনে চলে এলো। ভারতের মেয়েটা পাশাপাশি। শেষ একশো মিটার। এখানেই সব হয়। এখানে শরীর চিৎকার করে থামতে, ফুসফুস আগুন হয়ে যায়, পায়ের পেশি পাথর হয়ে আসে। এখানে শরীর বলে, "আর পারি না।" এখানে মন বলে, "পারবি।"
সাবিনা পারল।
ফিনিশ লাইন। প্রথম। সময়: ৫২.১৭ সেকেন্ড। তার ব্যক্তিগত সেরা। স্বর্ণপদক।
স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের পতাকা। জাতীয় সংগীত বাজছে। সাবিনা পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে আছে। গলায় পদক। চোখে পানি। পানিটা আনন্দের না কষ্টের, সাবিনা নিজেও বুঝতে পারল না। হয়তো দুটোই।
ফোন বেজে উঠল হোটেলে ফিরে। মা। "মা, আমি গোল্ড মেডেল পাইছি।"
মা কাঁদল। এবার অন্য কান্না। গর্বের কান্না।
বড় ভাই ফোন করল। "অনেক ভালো করছিস। আমরা গর্বিত।"
সাবিনা মনে মনে হাসল। তিক্ত হাসি। ছয় মাস আগে এই ভাই বলেছে, "মানুষ কথা কয়।" আজ বলছে, "আমরা গর্বিত।"
৫
গ্রামে ফিরল সাবিনা।
স্বর্ণপদক গলায়। সবাই ফুল দিল। সবাই মিষ্টি দিল। স্কুলে সংবর্ধনা হলো। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সংবর্ধনা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এলেন। ছবি উঠল। পত্রিকায় খবর হলো। "চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেয়ে সাবিনা, দক্ষিণ এশিয়ায় সোনা।"
মনোয়ার স্যার এলেন। চোখ ভেজা। কিছু বললেন না। সাবিনা পা ছুঁয়ে সালাম করল। স্যার মাথায় হাত রাখলেন।
যারা বলত "মেয়ে দৌড়ায়?", তারা আজ বলছে "আমাদের মেয়ে!" যে সমাজ ছয় মাস আগে সাবিনার হাফ প্যান্ট নিয়ে কথা বলত, সেই সমাজ আজ সাবিনার ছবি ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখছে। যে ভাই বলত "মুখ দেখাইতে পারি না," সেই ভাই আজ ফেসবুকে সাবিনার ছবি শেয়ার করছে। ক্যাপশন: "আমার বোন।"
জিতলে সবার মেয়ে। হারলে কারো না।
সাবিনা জানে এটা। সাবিনা জানে, পরের প্রতিযোগিতায় যদি হারে, এই মানুষগুলো আবার বলবে, "দৌড়ে কী হবে? বিয়ে দাও মেয়েটার।" স্বর্ণপদকের আয়ু ছোট। মানুষ ভুলে যায়। শুধু পরের দৌড় মনে থাকে। শুধু পরের জয় জরুরি।
রাতে সাবিনা বাড়ির ছাদে উঠল। ছোট ছাদ। টিনের ঘরের টিনের ওপর বসা যায় না, পাশের পাকা বাড়ির ছাদে। মালিক অনুমতি দিয়েছে। সাবিনা বসল। আকাশ দেখল। পদকটা হাতে। ভারী। একটা ছোট ধাতুর টুকরো। এটার জন্য সাবিনা পাঁচ বছর দৌড়েছে। মাটির রাস্তায়। খালি পায়ে। ঘামে। কান্নায়। একা।
কাল সকালে আবার দৌড়াতে হবে। পাঁচটায়। আমবাগানের পাশ দিয়ে। কুয়াশায়। এবার জুতো আছে। লাল স্পাইক জুতো।
সাবিনা পদকটা রেখে দিল। উঠে দাঁড়াল। শরীর টানটান করল। শ্বাস নিল।
মনোয়ার স্যার ফোন করেছিলেন। "সাবিনা, এখন তুই জিতেছিস। কিন্তু মনে রাখবি, একটা গোল্ড মেডেল তোকে সারাজীবন রক্ষা করবে না। পরের দৌড়, তারপরের দৌড়, প্রতিটা দৌড় নতুন।"
সাবিনা জানে। সাবিনা জানে, একটা মেয়ের জন্য জেতা সহজ নয়, কিন্তু জেতার পরে টিকে থাকা আরো কঠিন। ছেলে অ্যাথলেট হারলে বলে, "পরের বার জিতবে।" মেয়ে অ্যাথলেট হারলে বলে, "বিয়ে দিয়ে দাও।" ছেলের ক্যারিয়ার দীর্ঘ, মেয়ের ক্যারিয়ার শর্তসাপেক্ষ। শর্ত: জিততে থাকো। হারলেই শেষ।
সাবিনা হারবে না। হারতে পারে, কিন্তু থামবে না। হারানো আর থামা এক জিনিস নয়। দৌড়বিদ হারে, কিন্তু দৌড়বিদ থামে না।
দৌড় শেষ হয় না। দৌড়বিদ শুধু বিরতি নেয়।