ট্রান্সজেন্ডার নারী

সবচেয়ে কঠিন দরজা আমার নিজের শরীরের দরজা।

পর্ব ২০ · ১৪ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিমা।

বিউটি পার্লারের আয়না। বড় আয়না, চারপাশে হলুদ বাল্বের আলো। এই আলোয় সবকিছু নরম দেখায়। চোখের নিচের কালি কম দেখায়। চামড়ার খসখসে ভাব কম দেখায়। এই আলো দয়ালু। বাইরের আলো দয়ালু নয়।

রিমা আয়নায় নিজের মুখ দেখল। কপালে টিপ। চোখে কাজল। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। চুল কাঁধ পর্যন্ত। কানে দুল। সালোয়ার-কামিজ পরা। একটা মেয়ে। আয়নায় একটা মেয়ে দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু আয়না সব দেখায় না। আয়না ন্যাশনাল আইডি কার্ড দেখায় না। সেখানে লেখা আছে: পুরুষ। নাম: মোহাম্মদ রিয়াদ। পিতা: মোহাম্মদ কাশেম।

রিমা ন্যাশনাল আইডি কার্ডটা পার্সে রাখে। কাউকে দেখাতে চায় না। কিন্তু দেখাতে হয়। ব্যাংকে। হাসপাতালে। পুলিশ চেকপোস্টে। প্রতিবার একই দৃশ্য। কার্ড দেখে, মুখ দেখে, আবার কার্ড দেখে। চোখে প্রশ্ন। কখনো হাসি। কখনো ঘৃণা। কখনো কৌতূহল। প্রতিবার রিমাকে ব্যাখ্যা করতে হয়। প্রতিবার নিজের অস্তিত্বের পক্ষে যুক্তি দিতে হয়।

সবচেয়ে খারাপ পুলিশ চেকপোস্ট। রাতে। রিমা পার্লার থেকে ফেরে রাত নয়টায়। মিরপুরের রাস্তায় মাঝে মাঝে পুলিশ দাঁড়ায়। আইডি চায়। রিমা আইডি দেখায়। পুলিশ তাকায়। হাসে। কখনো বলে, "তুমি কী? ছেলে না মেয়ে?" কখনো বলে, "হিজড়া?" রিমা চুপ থাকে। চুপ থাকাই নিরাপদ। কথা বললে আরো খারাপ হয়। একবার কথা বলেছিল, পুলিশ থানায় নিয়ে গিয়েছিল। সারারাত বসিয়ে রেখেছিল। কোনো অভিযোগ নেই, কোনো কারণ নেই, শুধু ক্ষমতার প্রদর্শন। সকালে ছেড়ে দিয়েছিল। "যাও। আর রাতে একা ঘুরবা না।"

রিমা রাতে একা ঘোরে না। রিমা রাতে বাড়ি ফেরে। কাজ শেষে। যেমন সবাই ফেরে। কিন্তু সবাই সমান নয়। কিছু মানুষের রাতে বাড়ি ফেরার অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ।

আট বছর বয়সে রিমা জানত।

তখন রিমা ছিল রিয়াদ। ছেলে। খুলনার একটা মধ্যবিত্ত পরিবার। বাবা দোকানদার, মা গৃহিণী। দুই ভাই, এক বোন। রিয়াদ সবার ছোট।

আট বছর বয়সে বুঝল, সে বোনের মতো হতে চায়। বোনের ফ্রক পরতে চায়। বোনের চুড়ি পরতে চায়। ছেলেদের সাথে খেলতে ইচ্ছে করে না। মেয়েদের সাথে খেলতে চায়। এটা কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। সিদ্ধান্ত নিয়ে কেউ এরকম হয় না। এটা ছিল আবিষ্কার। নিজের ভেতরের একটা সত্য, যেটা আট বছর ধরে চাপা ছিল, হঠাৎ মাথা তুলল।

মা প্রথম বুঝলেন। মায়েরা বোঝেন। রিয়াদ যখন লুকিয়ে বোনের লিপস্টিক লাগাত, মা দেখতেন। কিছু বলতেন না। একদিন বললেন, "রিয়াদ, তুই কী করিস?"

"কিছু না, আম্মা।"

"কিছু না মানে? তুই তো ছেলে। ছেলেরা এসব করে না।"

রিয়াদ কাঁদতে শুরু করল। মা আর কিছু বললেন না। মা বুঝলেন। বুঝলেন কিন্তু মেনে নিতে পারলেন না। মেনে নেওয়ার ভাষা এই সমাজে নেই। "আমার ছেলে মেয়ে হতে চায়," এই বাক্য কোনো মা কাকে বলবে? প্রতিবেশীকে? ডাক্তারকে? ইমাম সাহেবকে? কেউ বুঝবে না। কেউ।

বাবা জানলেন ক্লাস সেভেনে। স্কুলের ছেলেরা বলাবলি করল। বাবা শুনলেন। বাড়ি এসে দরজা বন্ধ করে মারলেন। বেল্ট দিয়ে। পিঠে, হাতে, পায়ে। "তুই কি হিজড়া? আমার ঘরে হিজড়া?" প্রতিটা আঘাতে একটা শব্দ। হিজড়া। হিজড়া। হিজড়া। শব্দটা বেল্টের চেয়ে বেশি ব্যথা দিল।

রিয়াদ সেদিন রাতে ঠিক করল, এই ঘরে থাকা যাবে না।

বোন জানত। বোন ছাড়া কেউ বুঝত না। বোন একদিন রিয়াদকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, "তুই যা করতে চাস, কর। কিন্তু এই বাড়িতে থেকে করতে পারবি না।" বোনের চোখে পানি ছিল। রিয়াদের চোখেও। দুই ভাইবোন জানত, এই বাড়ি একজন ছেলেকে চায় যে ছেলে হয়ে থাকবে। রিয়াদ সেই ছেলে নয়।

ষোলো বছরে বের হয়ে গেল। রাতে। একটা ব্যাগে কিছু কাপড়, ২০০ টাকা, বোনের একটা চুড়ি। চুড়িটা বোন দিয়েছিল। "রাখ। এটা তোর।" ঢাকা। বাস। সারারাত। জানালার পাশে বসে রিয়াদ চুড়িটা হাতে ধরে রেখেছিল। পরেনি। পরার সাহস ছিল না। বাসের অন্ধকারে, অচেনা মানুষের ভিড়ে, রিয়াদ চুপচাপ বসে ছিল।

সকালে ঢাকায় নামল। গাবতলি বাসস্ট্যান্ড। ভোরের আলো। ধুলো। গাড়ির হর্ন। মানুষের ভিড়। কিছু চেনে না। কাউকে চেনে না। ষোলো বছরের একটা বাচ্চা, যে ছেলেও না, মেয়েও না, কিছুই না। শুধু একটা মানুষ। ভয়ে কাঁপছে।

প্রথম তিন দিন একটা মসজিদে ঘুমিয়েছিল। তারপর মসজিদের ইমাম সাহেব বললেন, "এখানে থাকা যাবে না। কোথাও যাও।" কোথাও। কোথাও মানে কোথায়? রিয়াদ জানত না। রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে একটা চায়ের দোকানে কাজ পেল। দিনে একবেলা খাবার, রাতে দোকানের মেঝেতে ঘুম। এটাই শুরু।

ঢাকায় রিমা হলো।

চায়ের দোকানে দুই মাস কাজ করল। দোকানের মালিক একদিন ধরে ফেলল। "তুই ছেলে না মেয়ে?" রিয়াদ কিছু বলতে পারল না। মালিক বলল, "যা। আর আসিস না।" আবার রাস্তায়।

তারপর একটা হিজড়া দলের সাথে পরিচয় হলো। তারা আশ্রয় দিল। খাবার দিল। নতুন নাম দিল। রিমা। "তুই রিমা। রিয়াদ ভুলে যা।"

রিয়াদ মরল। রিমা জন্মাল। এটা রূপকথা নয়। এটা বেঁচে থাকার কৌশল। রিয়াদ নামে কেউ ঢাকায় বাঁচতে পারত না। রিমা পারে। রিমা মেয়েদের কাপড় পরে, মেয়েদের মতো কথা বলে, মেয়েদের মতো হাঁটে। কিন্তু শরীর প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, তুমি মেয়ে নও। দাড়ি ওঠে। গলার স্বর ভারী হয়। কাঁধ চওড়া হয়। শরীর যুদ্ধ করে মনের বিরুদ্ধে।

কুড়ি বছর বয়সে হরমোন শুরু করল। ব্ল্যাক মার্কেট। কোনো ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন নেই। কোনো ডাক্তার প্রেসক্রিপশন দেয় না। রিমা একজন ট্রান্সজেন্ডার বোনের কাছ থেকে জানল কোথায় পাওয়া যায়। পুরান ঢাকার একটা গলির ভেতরে একটা দোকান। দোকানদার কিছু জিজ্ঞেস করে না। টাকা দাও, ওষুধ নাও।

হরমোন নেওয়ার পর শরীর বদলাতে শুরু করল। চামড়া নরম হলো। বুক ফুলল সামান্য। দাড়ি কমল। গলার স্বর একটু বদলাল। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হলো। মাথা ঘোরে। বমি ভাব। মেজাজ ওঠানামা করে। ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে হরমোন নিলে এসব নিয়ন্ত্রণে থাকে। রিমার কোনো ডাক্তার নেই। রিমা নিজেই নিজের ডাক্তার। ইন্টারনেটে পড়ে। অন্য বোনদের সাথে কথা বলে। ডোজ নিজে ঠিক করে। ভুল হলে শরীর কষ্ট পায়। ঠিক হলে শরীর একটু একটু করে সেই শরীর হয়ে ওঠে যেটা রিমা চায়।

কিন্তু পুরোপুরি বদলায়নি। পুরোপুরি বদলাতে গেলে সার্জারি দরকার। সার্জারির খরচ লাখ টাকার ওপরে। রিমার কাছে সেই টাকা নেই।

রিমা বিউটি পার্লারে কাজ পেল। গুলশানে। মালিক একজন মধ্যবয়সী মহিলা। ভালো মানুষ। রিমাকে চিনতে পেরেছেন, কিন্তু কিছু বলেননি। রিমা ভালো কাজ করে। চুল কাটতে পারে, মেকআপ করতে পারে, ফেসিয়াল করতে পারে। হাত দক্ষ। কাস্টমাররা খুশি। কেউ কেউ বোঝে, কেউ কেউ বোঝে না। যারা বোঝে, তাদের কেউ কেউ আর আসে না। বেশিরভাগ আসে। রিমার হাতের কাজ ভালো, এটুকুই যথেষ্ট বেশিরভাগের জন্য।

বেতন আট হাজার। ভাড়া সাড়ে তিন হাজার। একটা ছোট ঘর, মিরপুরে, তিন তলায়। রান্নাঘর শেয়ার করে আরেকজন ট্রান্সজেন্ডার বোনের সাথে। নাম সোনিয়া। সোনিয়াও পার্লারে কাজ করে। অন্য পার্লারে। রাতে দুজন একসাথে রান্না করে। ডাল-ভাত। কখনো সবজি। মাংস মাসে একবার।

ঘর খুঁজতে এক বছর লেগেছিল। বাড়িওয়ালারা ভাড়া দিতে চায় না। "হিজড়া? না, আমাদের বাড়িতে হিজড়া থাকতে পারবে না। পাড়ার মানুষ কথা বলবে।" রিমা আটটা বাড়ি ঘুরেছিল। নয় নম্বরে পেল। বাড়িওয়ালা বৃদ্ধ মানুষ। ভালো মানুষ না খারাপ মানুষ, রিমা জানে না। কিন্তু টাকা দরকার ছিল তার। ভাড়া দিচ্ছে, থাকতে দিচ্ছে। এটুকুই।

পাড়ার লোকে জানে। কিছু বাচ্চা মাঝে মাঝে পেছনে ছুটে আসে, "হিজড়া, হিজড়া!" চিৎকার করে। রিমা পেছনে ফেরে না। দ্রুত হাঁটে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠে। দরজা বন্ধ করে। দরজার ওপাশে পৃথিবী। দরজার এপাশে রিমার ঘর। ছোট। কিন্তু নিরাপদ।

সোনিয়া একদিন বলেছিল, "আমরা কি কোনোদিন সাধারণ হতে পারব?"

রিমা বলেছিল, "সাধারণ মানে কী? যারা আমাদের অসাধারণ মনে করে, তাদের কাছে আমরা কোনোদিন সাধারণ হব না। কিন্তু আমরা তো সাধারণই। ভাত খাই, ঘুমাই, কাজে যাই, ক্লান্ত হই। এর চেয়ে সাধারণ আর কী হতে পারে?"

সোনিয়া হেসেছিল। বিষণ্ন হাসি।

হাসপাতাল সবচেয়ে কঠিন জায়গা।

রিমা অসুস্থ হলে হাসপাতালে যেতে ভয় পায়। ভয়ের কারণ রোগ নয়, মানুষ। রেজিস্ট্রেশন কাউন্টারে ন্যাশনাল আইডি দিতে হয়। আইডিতে পুরুষ। সামনে দাঁড়িয়ে আছে একজন নারী। কাউন্টারের মানুষ তাকায়। পেছনে লাইনের মানুষ তাকায়। ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকলে ডাক্তার তাকায়। "আপনি পুরুষ না মহিলা?" এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় প্রতিবার। প্রতিটা ওয়ার্ডে। প্রতিটা কাউন্টারে।

একবার জ্বর হয়েছিল। ১০৪ ডিগ্রি। রিমা হাসপাতালে গেল। ডাক্তার দেখলেন। প্রেসক্রিপশন দিলেন। তারপর বললেন, "আপনি কি ছেলে?" রিমা বলল, "আমি মেয়ে।" ডাক্তার বললেন, "আইডিতে তো ছেলে লেখা।" রিমা বলল, "আইডি ভুল।" ডাক্তার আর কিছু বললেন না, কিন্তু চোখে যা ছিল, সেটা কোনো ওষুধে সারে না।

রিমা মেয়ে হতে চেয়েছিল। মেয়ে হওয়ার মূল্য দিচ্ছে। প্রতিদিন। প্রতিটা দরজায়।

বাড়ির দরজা: ষোলো বছরে হারিয়েছে। সমাজের দরজা: কখনো খোলেনি। সরকারের দরজা: আইডি কার্ড বলে পুরুষ। হাসপাতালের দরজা: প্রতিবার লড়াই। চাকরির দরজা: বেশিরভাগ বন্ধ। ভালোবাসার দরজা: কে ভালোবাসবে? ছেলেরা লুকিয়ে আসে, প্রকাশ্যে অস্বীকার করে।

সবচেয়ে কঠিন দরজা রিমার নিজের শরীরের দরজা। এই শরীর যেটা সে চায় না, এই শরীর যেটা তার নয়, এই শরীরের সাথে প্রতিদিন বসবাস করতে হয়। প্রতিদিন আয়নায় দেখতে হয়। প্রতিদিন এই শরীরকে সেই শরীরে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করতে হয় যেটা তার মনের সাথে মেলে। মেকআপ দিয়ে। কাপড় দিয়ে। হরমোন দিয়ে। কিন্তু পুরোপুরি মেলে না। কখনো পুরোপুরি মেলে না।

সেই দরজা খুলতে পুরো পৃথিবীর সাথে লড়তে হয়।

রিমা একবার ভেবেছিল, থাইল্যান্ডে গেলে সার্জারি করাতে পারবে। খরচ কম। অনেক ট্রান্সজেন্ডার বোন গেছে। কিন্তু পাসপোর্ট লাগবে। পাসপোর্টে পুরুষ লেখা থাকবে। ছবিতে মেয়ে। নামের জায়গায় রিয়াদ। ইমিগ্রেশনে কী হবে? রিমা ভাবতে পারে না। প্রতিটা কাগজ, প্রতিটা ফর্ম, প্রতিটা সরকারি প্রক্রিয়া রিমার বিরুদ্ধে। সিস্টেম দুটো বাক্স চেনে: পুরুষ আর নারী। রিমা এই দুটো বাক্সের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে কোনো বাক্স নেই।

২০১৩ সালে সরকার "হিজড়া" তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কাগজে। কিন্তু রিমা হিজড়া নয়। রিমা একজন ট্রান্সজেন্ডার নারী। রিমা নারী হতে চায়, তৃতীয় লিঙ্গ হতে চায় না। এই পার্থক্যটা কেউ বোঝে না। সরকার বোঝে না, সমাজ বোঝে না, এমনকি অনেক সময় হিজড়া সম্প্রদায়ও বোঝে না। রিমা দুই জগতের কোনোটাতেই পুরোপুরি ফিট করে না। পুরুষদের জগতে ফিট করে না, নারীদের জগতে পুরোপুরি ঢুকতে দেয় না, আর তৃতীয় লিঙ্গের ছাতার নিচে নিজেকে খুঁজে পায় না।

রাতে রিমা ঘরে ফিরল।

সোনিয়া রান্না করছে। ডাল আর আলু ভর্তা। রিমা জুতো খুলে ঘরে ঢুকল। পা ব্যথা করছে। সারাদিন দাঁড়িয়ে কাজ করেছে। মেকআপ মুছে ফেলল। টিপ খুলল। চুড়ি খুলল। সালোয়ার-কামিজ বদলে একটা ঢোলা টি-শার্ট পরল। আয়নায় তাকাল। মেকআপ ছাড়া মুখটা অন্যরকম দেখায়। কিন্তু রিমা এই মুখও চেনে। এটাও তার।

"ভাত খাবি?" সোনিয়া জিজ্ঞেস করল।

"হুম।"

দুজন মেঝেতে বসে খেল। চুপচাপ। দুজনের দিনই একই রকম। পার্লারে কাজ, কাস্টমারের সাথে হাসি, ভেতরে ক্লান্তি। সোনিয়া বলল, "আজ একটা কাস্টমার বলল, তোমার হাত তো মেয়েদের মতো না। মোটা। আমি বললাম, মোটা হাতে ম্যাসাজ ভালো হয়।"

রিমা হাসল। এটা হাসি না, এটা ঢাল। প্রতিটা কথার বিরুদ্ধে একটা ঢাল তৈরি করতে হয়। রিমা বিশেষজ্ঞ হয়ে গেছে ঢাল বানাতে।

খাওয়ার পরে রিমা ফোন বের করল। ফেসবুক। একটা গ্রুপ আছে, ট্রান্সজেন্ডার মেয়েদের। গোপন গ্রুপ। দুইশো সদস্য। সবাই নিজের গল্প শেয়ার করে। কেউ কাজ হারিয়েছে। কেউ বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। কেউ হরমোন শুরু করেছে। কেউ সার্জারি করেছে, থাইল্যান্ডে। ছবি দিয়েছে। সুন্দর দেখাচ্ছে। রিমা ছবি দেখল। ভালো লাগল। আশা জাগল। আশা দ্রুত নিভে গেল। থাইল্যান্ডে যাওয়ার টাকা নেই। পাসপোর্ট করার সাহস নেই। রিমা ফোন রেখে দিল।

একটা মেয়ে পোস্ট করেছে: "আজ আমার মা ফোন করেছে। প্রথমবার। দশ বছর পর।" রিমার বুকে কিছু নড়ল। দশ বছর। রিমারও দশ বছরের বেশি হয়ে গেছে। মা কি কোনোদিন ফোন করবে?

রাত বাড়ল। সোনিয়া ঘুমিয়ে গেল। রিমা জানালার কাছে বসল।

ঢাকার রাত। বাইরে রিকশার ঘণ্টা। দূরে কোথাও মসজিদের আজান। কুকুরের ডাক। তিন তলার জানালা থেকে নিচের রাস্তা দেখা যায়। একটা চায়ের দোকান খোলা। দুইজন রিকশাচালক চা খাচ্ছে। সাধারণ দৃশ্য। সাধারণ মানুষ। সাধারণ রাত। রিমা এই সাধারণ জীবনটা চায়। শুধু এটুকু। রাস্তায় হেঁটে যেতে পারা কারো প্রশ্নের মুখে না পড়ে। চায়ের দোকানে বসে চা খেতে পারা কারো তাকানো ছাড়া। ব্যাংকে গিয়ে আইডি দেখাতে পারা কারো হাসি ছাড়া। এটুকুই।

ঢাকা কখনো ঘুমায় না। রিমাও ঘুমায় না।

রিমা ভাবল, মা কেমন আছে। দশ বছর মায়ের সাথে কথা হয়নি। একবার ফোন করেছিল। মা ফোন ধরেছিলেন। "রিয়াদ?"

"আম্মা, আমি রিমা।"

মা কিছুক্ষণ চুপ ছিলেন। তারপর বললেন, "তোর বাবা বেঁচে আছে। তুই ফোন করিস না। উনি জানলে..." মা ফোন রেখে দিলেন।

রিমা সেদিন কাঁদেনি। কান্না শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। ষোলো বছরে যখন বাড়ি ছেড়েছে, তখন সব কান্না শেষ করে এসেছে। এখন কান্নার জায়গায় একটা শক্ত জিনিস আছে। পাথর না। পাথর ভাঙে। এটা ভাঙে না। এটা কী, রিমা জানে না। হয়তো সহ্য করার ক্ষমতা। হয়তো অভ্যাস। হয়তো বেঁচে থাকার জেদ।

রিমা বোনের চুড়িটা হাত থেকে খুলে তাকাল। পুরোনো চুড়ি। রঙ ফিকে হয়ে গেছে। কিন্তু রিমা ফেলেনি। এগারো বছর ধরে রেখেছে। এটাই একমাত্র জিনিস যেটা সেই বাড়ি থেকে এসেছে। এটাই একমাত্র প্রমাণ যে কেউ একজন রিমাকে ভালোবাসত। বোন। বোন ভালোবাসত।

রিমা জানালা বন্ধ করল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। কাল সকালে আবার উঠতে হবে। মেকআপ করতে হবে। টিপ লাগাতে হবে। চুড়ি পরতে হবে। বোনের চুড়ি আর পার্লারের চুড়ি, দুটোই। আয়নায় তাকাতে হবে। নিজেকে দেখতে হবে। নিজেকে তৈরি করতে হবে।

প্রতিদিন রিমা নিজেকে তৈরি করে। প্রতিটা সকাল একটা যুদ্ধের প্রস্তুতি। মেকআপ তার যুদ্ধের বর্ম। কামিজ তার পতাকা। হাসি তার অস্ত্র। রিমা প্রতিদিন এই যুদ্ধে নামে। কখনো জেতে, কখনো হারে। কিন্তু প্রতিদিন নামে।

প্রতিটা সকাল একটা নতুন জন্ম।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, হলুদ বাল্বের দয়ালু আলোয়, রিমা প্রতিদিন জন্মায়।

বাইরের রোদে বেরিয়ে, রিমা প্রতিদিন বেঁচে থাকে।

পার্লারে একটা কাস্টমার আছে, নাম ফারজানা। নিয়মিত আসে। ফেসিয়াল করায়। রিমার হাতের কাজ পছন্দ করে। একদিন ফারজানা বলেছিল, "তুমি খুব ভালো কাজ কর, রিমা। তোমার হাত খুব নরম।"

রিমার চোখ ভিজে গিয়েছিল। কেউ তার হাতকে নরম বলেছে। কেউ তাকে রিমা বলে ডেকেছে, কোনো প্রশ্ন ছাড়া, কোনো সন্দেহ ছাড়া। এটুকুই যথেষ্ট। একটা মানুষ যদি শুধু নাম ধরে ডাকে, শুধু কাজের প্রশংসা করে, শুধু সাধারণভাবে কথা বলে, সেটাই যথেষ্ট। সেটাই জয়। ছোট জয়। কিন্তু ছোট জয়ই বড় জয়। যার কাছে কিছু নেই, তার কাছে একটু সম্মান পুরো পৃথিবী।

এটুকুই জয়।