বস্তির মা
এই বস্তি থেকে বের হওয়ার রাস্তা একটাই: পড়াশোনা।
১
আলেয়ার ঘুম ভাঙে ফজরের আজানে না। ঘুম ভাঙে ছোট মেয়ে রুবির কাশিতে। রুবির কাশি শীতকাল থেকে শুরু হয়েছে, এখনো যায়নি। ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে, ফার্মেসির ওষুধ, বিশ টাকার সিরাপ। কাশি কমেনি। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাওয়া মানে একদিনের কাজ বাদ। একদিনের কাজ বাদ মানে তিনশো টাকা কম। তিনশো টাকা কম মানে তিন দিনের চাল নেই।
আলেয়া উঠে বসে। অন্ধকার। ঘরে বিদ্যুৎ আছে, একটা বাল্ব, কিন্তু এত ভোরে জ্বালায় না। পাশের ঘরের লোকজন জেগে যাবে। পাশের ঘর মানে তিন ফুট দূরে। দেয়াল মানে টিনের পাতলা পার্টিশন। এই ঘরে কেউ কাশলে ওই ঘরে শোনা যায়। এই ঘরে কেউ কাঁদলে ওই ঘরে জানা যায়।
করাইল বস্তি। গুলশান লেকের পাড়ে। লেকের ওপারে গুলশান দুই। টাওয়ার। কাচের দেওয়ালে সূর্যের আলো ঝকমক করে। এপারে করাইল। টিনের চালে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ে। দুই পাড়ের মধ্যে দূরত্ব দুইশো মিটার। দুই পাড়ের মধ্যে দূরত্ব দুইশো বছর।
আলেয়ার বয়স পঁয়ত্রিশ। চার সন্তান। বড় ছেলে ফারুক, চৌদ্দ। মেয়ে রিনা, বারো। ছোট ছেলে বাবুল, আট। ছোট মেয়ে রুবি, পাঁচ। চারজন। একটা ঘরে। ঘরটা দশ ফুট বাই আট ফুট। দুটো চৌকি। একটা আলনা। একটা চুলা। এটুকুই সংসার।
২
স্বামী আনোয়ার রিকশা চালাত।
"চালাত" বলছি, কারণ এখন আর চালায় না। দুই বছর আগে দুর্ঘটনা হয়েছিল। ট্রাকের নিচে পড়েছিল রিকশা। আনোয়ারের ডান হাঁটু ভেঙেছিল। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল পনেরো দিন। সরকারি হাসপাতাল। বিনামূল্যে চিকিৎসা। কিন্তু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছিল। রড বসাতে হয়েছিল হাঁটুতে। খরচ হয়েছিল বাইশ হাজার। টাকা এসেছিল ঋণ করে। মহাজনের কাছ থেকে। সুদে।
হাঁটু সারেনি পুরো। আনোয়ার হাঁটতে পারে, কিন্তু রিকশা চালাতে পারে না। সারাদিন ঘরে বসে থাকে। আর জর্দা খায়। সকালে জর্দা। দুপুরে জর্দা। বিকেলে জর্দা। রাতে জর্দা। পান-সুপারি-জর্দা। দিনে চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা যায় শুধু জর্দায়।
আলেয়া বলেছিল, "এত জর্দা খাও ক্যান? টাকা নাই।"
আনোয়ার বলেছিল, "আর কী করুম? সারাদিন বইসা থাকুম?"
আলেয়া আর কিছু বলেনি। কী বলবে? আনোয়ারের কথায় যুক্তি আছে। একটা পুরুষ, যে সারাজীবন রিকশা চালিয়েছে, যার শরীরই ছিল তার পুঁজি, সেই শরীর যখন কাজ করে না, তখন সে কী করবে? জর্দা তার সঙ্গী। জর্দা তাকে ব্যস্ত রাখে। জর্দা তাকে ভুলিয়ে রাখে।
কিন্তু জর্দার টাকা কে দেয়? আলেয়া দেয়। নিজের রোজগার থেকে। চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা। প্রতিদিন। মাসে বারোশো-পনেরোশো টাকা। শুধু জর্দায়।
৩
আলেয়া তিনটা বাড়িতে কাজ করে।
প্রথম বাড়ি গুলশান দুইয়ে। সকাল সাতটা থেকে নয়টা। মেমসাহেব ব্যাংকে চাকরি করেন। সকালে বের হওয়ার আগে ঘর ঝাড়ু-মোছা হয়ে যেতে হয়। বাসন ধুতে হয়। কাপড় মেশিনে দিতে হয়। বেতন তিন হাজার। মেমসাহেব ভালো মানুষ। ঈদে বোনাস দেন। পুরোনো কাপড় দেন। কিন্তু বেতন বাড়ান না। দুই বছর হলো তিন হাজার। আলেয়া একবার বলেছিল বাড়াতে। মেমসাহেব বলেছিলেন, "আলেয়া, এখন সবকিছুরই দাম বাড়ছে। আমরাও তো হিসাব করে চলি।" আলেয়া মাথা নিচু করে কাজ করে গেছিল।
দ্বিতীয় বাড়ি বনানীতে। সকাল দশটা থেকে দুপুর একটা। এই বাড়িতে রান্নাও করতে হয়। বাড়ির বুড়ি আম্মা একা থাকেন। ছেলে আমেরিকায়। মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায়। বুড়ি আম্মা আলেয়ার সাথে কথা বলেন। অনেক কথা। ছেলের কথা, মেয়ের কথা, মৃত স্বামীর কথা। আলেয়া শোনে। শুনতে শুনতে বাসন ধোয়, শুনতে শুনতে ভাত রাঁধে। বেতন চার হাজার। বুড়ি আম্মা মাঝে মাঝে বাড়তি দুইশো-তিনশো দেন। বলেন, "রাখো, বাচ্চাদের কিছু কিনে দিও।"
তৃতীয় বাড়ি গুলশান একে। বিকেল তিনটা থেকে পাঁচটা। এই বাড়িতে বাচ্চা সামলাতে হয়। দুটো বাচ্চা, তিন আর পাঁচ বছর। আম্মা-আব্বা দুজনেই চাকরি করেন। বাচ্চাদের খাওয়াতে হয়, ঘুম পাড়াতে হয়, খেলাতে হয়। বেতন তিন হাজার পাঁচশো।
তিন বাড়ি মিলিয়ে: দশ হাজার পাঁচশো টাকা। মাসে। এটাই আলেয়ার আয়। এটাই সংসারের একমাত্র আয়।
৪
দশ হাজার পাঁচশো টাকায় ছয়জনের সংসার।
আলেয়া হিসাব করে। প্রতিদিন করে। মাথার ভেতরে একটা অদৃশ্য খাতা আছে, সেখানে প্রতিটা টাকার হিসাব লেখা। ঘরের ভাড়া তিন হাজার। করাইলে একটা ঘর, দশ বাই আট, ভাড়া তিন হাজার। ঢাকায় এর চেয়ে সস্তায় ঘর নেই। চাল, ডাল, তেল, নুন, সবজি: মাসে চার হাজার। কমাতে পারে না। বাচ্চারা খায়। বাড়ন্ত বাচ্চা, ক্ষিদে লাগে সবসময়। আনোয়ারের জর্দা: বারোশো। বিদ্যুৎ: তিনশো। গ্যাস সিলিন্ডার: পাঁচশো (দুই মাসে একটা, মানে মাসে আড়াইশো)। সাবান, শ্যাম্পু, কেরোসিন: দুইশো।
যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় নয় হাজার একশো পঞ্চাশ।
বাকি থাকে এক হাজার তিনশো পঞ্চাশ। কিন্তু থাকে না। কারণ রুবির ওষুধ লাগে। ফারুকের স্কুলের খাতা-কলম লাগে। রিনার জামা ছিঁড়ে যায়। বাবুলের জুতো ফেটে যায়। কোনো না কোনো খরচ আসে। প্রতি মাসে।
তবু আলেয়া বাঁচায়। পাঁচশো টাকা। প্রতি মাসে। যেভাবেই হোক। কোনো মাসে নিজে না খেয়ে। কোনো মাসে সাবান কিনে না। কোনো মাসে বিদ্যুতের বিল বকেয়া রেখে। কিন্তু পাঁচশো টাকা আলাদা করে।
এই পাঁচশো টাকা রাখে তোশকের নিচে। পুরোনো তোশক। তুলা বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তোশকের একটা কোনায়, সেলাই করা একটা পকেট আছে। আলেয়া নিজে সেলাই করেছে। সেই পকেটে টাকা রাখে। পাঁচশো করে। প্রতি মাসে। কেউ জানে না। আনোয়ার জানে না। বাচ্চারা জানে না।
এই টাকা রিনার জন্য। মেয়ের পড়াশোনার জন্য।
৫
রিনা ক্লাস সিক্সে পড়ে।
করাইলের সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। এখন ষষ্ঠে, কাছের মাধ্যমিক স্কুলে। স্কুলটা বস্তির বাইরে, মহাখালীর দিকে। হেঁটে যেতে পনেরো মিনিট। রিনা একা যায়। বারো বছরের মেয়ে, একা, ঢাকার রাস্তায়। আলেয়ার বুক কাঁপে। কিন্তু কী করবে? সাথে যাওয়ার সময় নেই। সকাল সাতটায় তো গুলশানের বাড়িতে ঢুকতে হয়।
রিনা পড়ায় ভালো। ক্লাসে প্রথম পাঁচের মধ্যে থাকে। গণিতে ভালো। বাংলায় ভালো। ইংরেজিতে একটু কম, কিন্তু চেষ্টা করে। স্কুলের টিচার বলেছেন, "রিনা মেধাবী। পড়াশোনা চালিয়ে গেলে ভালো করবে।"
আলেয়া শুনেছিল। বুকের ভেতরে কিছু একটা নড়ে উঠেছিল। কী সেটা? আশা? গর্ব? ভয়? তিনটাই। আশা, কারণ মেয়ে পারবে। গর্ব, কারণ মেয়ে পারছে। ভয়, কারণ পড়াশোনায় টাকা লাগে, আর টাকা নেই।
ফারুক স্কুলে যায় না। অষ্টম শ্রেণিতে ছেড়ে দিয়েছে। এখন গুলশানের একটা দোকানে কাজ করে। হেলপার। মাসে তিন হাজার টাকা পায়। সেই টাকা আনোয়ারকে দেয়। আনোয়ার খরচ করে। জর্দায়, চায়ের দোকানে, মোবাইলে রিচার্জে।
আলেয়ার বুকে ব্যথা করে ফারুকের জন্য। ছেলেটা পড়তে চেয়েছিল। কিন্তু আলেয়া পারেনি। দুজনকে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। একজনকে বেছে নিতে হয়েছিল। আলেয়া মেয়েকে বেছে নিয়েছে। কারণ মেয়েকে না পড়ালে মেয়ের ভবিষ্যৎ নেই। ছেলে কাজ করতে পারবে। ছেলের জন্য রাস্তা আছে। মেয়ের জন্য রাস্তা একটাই।
৬
তোশকের নিচে এখন কত টাকা আছে?
আলেয়া হিসাব করে। আঠারো মাস ধরে জমাচ্ছে। পাঁচশো গুন আঠারো, নয় হাজার। কিন্তু তিনবার টাকা তুলতে হয়েছিল। একবার রুবির জ্বরে, একবার আনোয়ারের ওষুধে, একবার ঘরের টিনের চাল উড়ে গেলে। প্রতিবার তুলে আবার জমিয়েছে। এখন সাত হাজার দুইশো টাকা আছে।
সাত হাজার দুইশো।
রিনা ক্লাস সেভেনে উঠলে ভর্তি ফি লাগবে। বই কিনতে হবে। ইউনিফর্ম লাগবে। জুতো লাগবে। সব মিলিয়ে পাঁচ-ছয় হাজার। তার মানে তোশকের টাকা প্রায় শেষ হয়ে যাবে। আবার শুরু থেকে জমাতে হবে।
কিন্তু আলেয়া জমাবে। জমাতে থাকবে। ক্লাস আট, ক্লাস নাইন, ক্লাস টেন। এসএসসি পর্যন্ত। তারপর? তারপর দেখা যাবে। আলেয়া এত দূর ভাবে না। এত দূর ভাবলে ভয় লাগে। শুধু পরের ক্লাসটা পর্যন্ত ভাবে। পরের ক্লাসের টাকাটা পর্যন্ত জমায়।
রাতে, বাচ্চারা যখন ঘুমিয়ে যায়, আনোয়ার যখন জর্দা চিবুতে চিবুতে ঘুমিয়ে পড়ে, আলেয়া তোশকের কোনাটা ধরে দেখে। টাকাগুলো আছে। গুনে দেখে। ঠিক আছে। তোশকের সেলাই ঠিক আছে। কেউ ধরেনি। নিশ্চিন্ত হয়ে শোয়।
এটাই তার ব্যাংক। তোশকের কোনা। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ব্যাংক? না। কিন্তু এই মুহূর্তে তার কাছে একমাত্র ব্যাংক।
৭
সকাল ছয়টায় আলেয়া রান্না করে।
ভাত আর আলু ভর্তা। এটাই সকালের খাবার। এটাই দুপুরের খাবার। বাচ্চারা খাবে, আনোয়ার খাবে। আলেয়া নিজে একটু ভাত খায়, তরকারি ছাড়া। তরকারি বাচ্চাদের জন্য রেখে দেয়।
ফারুক বের হয়ে যায় দোকানে। রিনা স্কুলের জন্য তৈরি হয়। বাবুল স্কুলে যায়, তৃতীয় শ্রেণি। রুবি ঘরে থাকে, পাশের ঘরের খালা দেখেন।
আলেয়া বের হয়। করাইলের সরু গলি দিয়ে হাঁটে। গলি মানে দুই ফুট চওড়া রাস্তা। দুপাশে টিনের ঘর। মাথার ওপরে তার, কাপড়ের লাইন, প্লাস্টিকের ছাউনি। গলিতে পানি জমে আছে। গতকাল বৃষ্টি হয়েছিল। পানি নামেনি। পানিতে ময়লা ভাসছে। আলেয়া পানির মধ্য দিয়ে হাঁটে। স্যান্ডেল ভিজে যায়। পায়ের পাতা ভিজে যায়।
গলি থেকে বের হয়ে মূল রাস্তায় আসে। গুলশানের দিকে হাঁটে। লেকের পাড় ধরে। লেকের ওপারে টাওয়ার দেখা যায়। কাচের জানালায় আলো জ্বলছে। সেই টাওয়ারগুলোর কোনো একটায় আলেয়ার মেমসাহেব থাকেন। আলেয়া সেই টাওয়ারে ঢুকবে, ঝাড়ু মারবে, বাসন ধোবে, মেঝে মুছবে। তারপর বের হয়ে আসবে। টাওয়ারের ভেতরে আলেয়া শ্রমিক। টাওয়ারের বাইরে আলেয়া বস্তির মানুষ।
দুটো পৃথিবী। দুইশো মিটারের ব্যবধান। আলেয়া প্রতিদিন দুটো পৃথিবীর মধ্যে হাঁটে।
৮
গুলশানের বাড়িতে ঢুকে আলেয়া জুতো খোলে।
স্যান্ডেল রাখে দরজার বাইরে। খালি পায়ে ঢোকে। মেঝে মার্বেলের। ঠান্ডা। আলেয়ার পা মাটির গলির পর মার্বেলে আসে, একটা শীতল স্পর্শ পায়ের তলায় ছড়ায়।
মেমসাহেবের বাসায় তিনটা বাথরুম। তিনজনের পরিবার, তিনটা বাথরুম। আলেয়ার বস্তিতে একটা পায়খানা পঁচিশটা পরিবার শেয়ার করে। সারি দিয়ে দাঁড়াতে হয়। সকালে লাইন লম্বা হয়। আলেয়া ভোর পাঁচটায় যায়, লাইন ছোট থাকে তখন।
মেমসাহেবের ফ্রিজে দুধ আছে, জুস আছে, ফল আছে, মাছ আছে, মাংস আছে। আলেয়া ফ্রিজ খোলে, সবজি বের করে, রান্নার জন্য প্রস্তুত রাখে। ফ্রিজের দরজা বন্ধ করতে করতে দেখে, একটা কমলা পচে যাচ্ছে। মেমসাহেব ফেলে দিতে বলবেন। আলেয়ার মনে হয়, পচা কমলাটা নিয়ে যাবে। রুবিকে খাওয়াবে। পচা জায়গাটা কেটে ফেললে বাকিটা খাওয়া যায়। কিন্তু নেয় না। লজ্জা করে। মেমসাহেব কী ভাববেন?
আলেয়া ঘর মোছে। মোছার সময় ভাবে। সবসময় ভাবে। হাত চলে, মাথা চলে। দুটো আলাদা মেশিন।
ভাবে রিনার কথা। রিনা যদি পড়াশোনা করে, ভালো রেজাল্ট করে, কোথাও চাকরি পায়, তাহলে রিনাকে আর বস্তিতে থাকতে হবে না। রিনা একটা ফ্ল্যাটে থাকবে। ছোট ফ্ল্যাট, দুই রুমের হলেও চলবে। কিন্তু নিজের। নিজের বাথরুম। নিজের রান্নাঘর। নিজের দরজা, যেটা বন্ধ করলে বাইরের কেউ ভেতরে আসতে পারবে না।
এটাই স্বপ্ন। এটুকুই।
৯
দুপুরে বনানীর বুড়ি আম্মার বাসায়।
আলেয়া ভাত রাঁধছে। মাছের ঝোল। বুড়ি আম্মা পাশে বসে কথা বলছেন।
"আলেয়া, তোমার মেয়ে কোন ক্লাসে?"
"ছয়ে, আম্মা।"
"পড়াশোনায় কেমন?"
"ভালো, আম্মা। টিচার ভালো বলেন।"
বুড়ি আম্মা চুপ করলেন একটু। তারপর বললেন, "আমার মেয়েও ক্লাস সিক্সে ভালো ছাত্রী ছিল। এখন মেলবোর্নে। ডাক্তার।"
আলেয়া মাছ উল্টাচ্ছিল কড়াইতে। হাত থেমে গেল একটা মুহূর্তের জন্য। বুড়ি আম্মার মেয়ে ডাক্তার। মেলবোর্নে। ক্লাস সিক্সে ভালো ছাত্রী ছিল। রিনাও ক্লাস সিক্সে ভালো ছাত্রী।
কিন্তু বুড়ি আম্মার মেয়ের বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। বাড়ি ছিল বনানীতে। স্কুল ছিল ইংলিশ মিডিয়াম। প্রাইভেট টিউটর ছিল। আর রিনার বাবা রিকশাচালক, ঘর বস্তিতে, স্কুল সরকারি, প্রাইভেট টিউটর নেই।
দুজন মেয়ে। একই বয়সে একই রকম মেধাবী। কিন্তু একজন ডাক্তার হয়েছে, আরেকজন, আলেয়া জানে না কী হবে। জানে শুধু চেষ্টা করবে। তোশকের নিচে পাঁচশো টাকা করে জমাবে। আর বাকিটা ভাগ্যের হাতে।
বুড়ি আম্মা বললেন, "তোমার মেয়েকে পড়াও, আলেয়া। মেয়েদের পড়াশোনাই আসল।"
আলেয়া বলল, "জি, আম্মা।"
চোখ ঝাপসা হয়ে এল। মাছের ঝোলের ধোঁয়ায়।
১০
বিকেলে তৃতীয় বাড়ি। গুলশান একের বাচ্চা দুটোকে সামলায়।
বাচ্চা দুটো আলেয়াকে ভালোবাসে। "আলু আন্টি" ডাকে। ছোটটা আলেয়ার কোলে উঠে বসে। বড়টা আলেয়াকে ছবি আঁকতে দেয়। আলেয়া ছবি আঁকতে জানে না, কিন্তু চেষ্টা করে। গোল গোল মুখ আঁকে, দুটো চোখ, একটা হাসি। বাচ্চারা হাসে।
এই বাচ্চাদের ঘরে খেলনা আছে যেগুলোর দাম আলেয়ার এক মাসের বেতনের চেয়ে বেশি। একটা লেগো সেট, আটটা হাজার টাকা। আলেয়া জানে, কারণ বাক্সে দাম লেখা ছিল। আলেয়ার রুবি খেলে ভাঙা পুতুল দিয়ে, যেটা রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিল।
আলেয়া বাচ্চাদের খাওয়ায়। দুধ-কর্নফ্লেক্স, কলা, বিস্কুট। বাচ্চারা অর্ধেক খেয়ে ফেলে রাখে। আলেয়া বাকিটা ফ্রিজে রাখে। ফেলে দেয় না। কিন্তু নিজেও খায় না। মালিকের খাবার, কাজের মানুষ খাবে না। এটা অলিখিত নিয়ম। কেউ বলেনি, কিন্তু সবাই জানে।
পাঁচটায় বের হয়। হাঁটতে হাঁটতে করাইলে ফেরে। পা ব্যথা করে। কোমর ব্যথা করে। সকাল সাতটা থেকে বিকেল পাঁচটা, দশ ঘণ্টা কাজ। তিনটা বাড়ি। তিনটা পরিবারের ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, বাসন মাজা, রান্না, বাচ্চা সামলানো। দশ ঘণ্টা।
নিজের ঘরে ফিরে আবার রান্না। আবার বাসন। আবার মেঝে মোছা। এবার নিজের সংসারের জন্য। বিনা বেতনে।
১১
রাতে রিনা পড়ে।
একটা টেবিল ল্যাম্প। পুরোনো, ত্রিশ ওয়াটের। রিনা গণিত করছে। আলেয়া পাশে বসে দেখে। আলেয়া গণিত বোঝে না। আলেয়া ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছে। তারপর বাবা বলেছিল, "মাইয়ার এত পড়ার দরকার নাই।" আলেয়া পড়া ছেড়েছিল। ভোলায়। বাপের বাড়িতে। তারপর বিয়ে। তারপর ঢাকা। তারপর বস্তি। তারপর চার বাচ্চা। তারপর তিন বাড়িতে কাজ।
আলেয়া গণিত বোঝে না, কিন্তু রিনার খাতা দেখে। পরিপাটি হাতের লেখা। সমান লাইন। পরিষ্কার সংখ্যা। আলেয়ার ভালো লাগে। মেয়ে পারে। মেয়ে পারছে।
"আম্মা, একটা ক্যালকুলেটর লাগবে।"
"কত দাম?"
"তিনশো টাকা।"
আলেয়া চুপ করে থাকে। তিনশো টাকা। তোশকের টাকা থেকে দিতে হবে। তোশকের টাকা রিনার জন্যই তো। দেবে।
"কিনে দিমু।"
রিনা হাসে। রিনার হাসি দেখলে আলেয়ার সব ক্লান্তি চলে যায়। দশ ঘণ্টার কাজের ক্লান্তি, পায়ের ব্যথা, কোমরের ব্যথা, সব। মেয়ের হাসিটা একটা ওষুধ। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ওষুধ, কিন্তু বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
১২
করাইলে মাঝে মাঝে আগুন লাগে।
গত বছর লেগেছিল। পাশের সারিতে। আটটা ঘর পুড়ে গেছিল। আলেয়ার ঘর বেঁচে গেছিল। কিন্তু ভয়টা থেকে গেছে। আগুন লাগলে কোথায় যাবে? সব পুড়ে গেলে? তোশকের টাকা?
আলেয়া একটা প্ল্যান করেছে। আগুন লাগলে প্রথমে বাচ্চাদের বের করবে। তারপর তোশকটা নেবে। তোশক না পারলে শুধু টাকাটা। সেলাই ছিঁড়ে টাকা বের করবে। টাকা হাতে নিয়ে বের হবে।
এটা ভেবে রেখেছে। রিহার্সাল করেনি, কিন্তু মাথায় গেঁথে রেখেছে। কোন দিকে দৌড়াবে, কাকে আগে তুলবে, কোন হাতে তোশকের কোনা ধরবে। সব ভেবে রাখা।
বস্তিতে বাঁচতে হলে ভেবে রাখতে হয়। প্রতিটা বিপদের জন্য একটা প্ল্যান। প্ল্যান না থাকলে বস্তি খেয়ে ফেলে।
আলেয়া ভয় পায়। প্রতিদিন ভয় পায়। উচ্ছেদের ভয়। আগুনের ভয়। বন্যার ভয়। অসুখের ভয়। চোরের ভয়। কিন্তু ভয়ের সাথে বাঁচে। ভয়কে পাশে নিয়ে হাঁটে। ভয়কে পাশে নিয়ে ঘুমায়। ভয় আলেয়ার স্থায়ী প্রতিবেশী।
১৩
একদিন রিনা জিজ্ঞেস করেছিল।
"আম্মা, আমরা কি সবসময় বস্তিতে থাকব?"
আলেয়া রিনার দিকে তাকিয়েছিল। মেয়ের চোখে প্রশ্ন। বারো বছরের মেয়ে। বুঝতে শুরু করেছে। বুঝতে শুরু করেছে যে তার বান্ধবীরা ফ্ল্যাটে থাকে আর সে বস্তিতে। বুঝতে শুরু করেছে যে স্কুলে কেউ কেউ তাকে "বস্তির মেয়ে" বলে।
আলেয়া বলেছিল, "না।"
এক শব্দে। "না।" আর কিছু বলেনি। কারণ বেশি বললে গলা কাঁপবে। গলা কাঁপলে মেয়ে বুঝে ফেলবে যে আম্মা নিশ্চিত না।
কিন্তু আলেয়া সত্যি নিশ্চিত না। সত্যি জানে না বস্তি ছেড়ে বের হতে পারবে কিনা। জানে শুধু একটা কথা, যেটা তার ভেতরে পেরেকের মতো গাঁথা।
এই বস্তি থেকে বের হওয়ার রাস্তা একটাই: পড়াশোনা।
রিনা পড়বে। রিনা পাশ করবে। রিনা চাকরি পাবে। আর রিনা একদিন বলবে, "আম্মা, চলো। আমরা এখান থেকে যাচ্ছি।"
সেদিনের জন্য আলেয়া অপেক্ষা করে। তোশকের নিচে পাঁচশো টাকা রাখে। প্রতি মাসে। ক্লান্ত শরীরে। ভাঙা পিঠে। ফাটা হাতে।
বাইরে করাইলের রাত নামে। লেকের ওপারে গুলশানের টাওয়ারে আলো জ্বলে। এপারে বস্তিতে অন্ধকার গাঢ় হয়। আলেয়া শোয়। তোশকের কোনায় হাত রাখে। টাকাগুলো আছে।
ঘুমের আগে একটা দোয়া পড়ে। রিনার জন্য। শুধু রিনার জন্য।