পুলিশ অফিসার

আমি আইন মানি। আইনে পারিবারিক সহিংসতা অপরাধ।

পর্ব ২২ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

শামীমার ডিউটি শুরু হয় সকাল দশটায়।

কিন্তু সে আসে নয়টায়। থানায় ঢুকে আগে চা বানায়। নিজের জন্য না, পুরো থানার জন্য। এটা সে করে না কারণ এটা তার কাজ, করে কারণ না করলে কেউ করবে না। আর চা না হলে থানার কেউ ঠিকমতো কথা বলে না সকালে।

মতিঝিল থানা। পুরান ঢাকা আর নতুন ঢাকার সীমানায়। এই থানায় সব ধরনের মামলা আসে। চুরি, ছিনতাই, জমি বিবাদ, মারামারি। আর পারিবারিক সহিংসতা। শামীমা এই থানায় সাব-ইন্সপেক্টর। মহিলা সাব-ইন্সপেক্টর। থানায় একমাত্র মহিলা অফিসার।

শামীমার বয়স পঁয়ত্রিশ। বিসিএস পুলিশ ক্যাডার। ত্রিশতম বিসিএস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স করে বিসিএস দিয়েছিল। প্রথমবার পাশ করেনি। দ্বিতীয়বার পাশ করেছিল। পুলিশে এসেছিল ২০১৬ সালে। সারদায় ট্রেনিং। রাজশাহীতে প্রথম পোস্টিং। তারপর গাজীপুর। এখন ঢাকা।

থানায় ঢুকলে পুরুষ সহকর্মীরা তাকায়। শামীমা জানে সেই তাকানোর মানে। কৌতূহল না, সমীহ না। একটা নীরব প্রশ্ন: "মহিলা SI? ডিউটি কী করবে?"

এই প্রশ্নটা শামীমা প্রথম শুনেছিল সারদায়।

ট্রেনিংয়ে। ব্যাচে ত্রিশজন ছিল। মেয়ে ছিল চারজন। বাকি ছাব্বিশজন পুরুষ। প্রথম দিন পিটি-তে (ফিজিক্যাল ট্রেনিং) একজন ব্যাচমেট বলেছিল, "ম্যাডাম, পুলিশে কেন এলেন? স্কুলে পড়াতেন।"

শামীমা বলেছিল, "স্কুলেও পড়াতে পারতাম। কিন্তু পুলিশে এসেছি কারণ এখানে আমাকে দরকার।"

ছেলেটা হেসেছিল। বুঝেছিল না। কেন দরকার, সেটা বুঝতে তার আরো কয়েক বছর লাগবে। অথবা কোনোদিন বুঝবে না।

ট্রেনিংয়ে শামীমা সব পেরেছিল। প্যারেড, পিটি, ফায়ারিং, ড্রিল, আইন। সবকিছু পেরেছিল। প্যারেডে পুরুষদের সাথে একই কাতারে দাঁড়িয়েছিল। ফায়ারিংয়ে টার্গেটে গুলি করেছিল, দশটার মধ্যে আটটা লেগেছিল। পাশের ছেলেটার ছয়টা লেগেছিল। সে কিছু বলেনি।

কিন্তু ফিল্ডে এসে বুঝেছিল, ট্রেনিং আর বাস্তব এক জিনিস না। ট্রেনিংয়ে শামীমা একজন অফিসার। ফিল্ডে শামীমা একজন "মহিলা অফিসার।" এই "মহিলা" শব্দটা সবকিছু বদলে দেয়।

থানায় সন্ধ্যা নামলে শামীমার আসল কাজ শুরু হয়।

পারিবারিক সহিংসতার মামলাগুলো সন্ধ্যার পরে আসে। কারণ সন্ধ্যায় পুরুষরা ঘরে ফেরে। মদ খেয়ে ফেরে, রাগ নিয়ে ফেরে, হতাশা নিয়ে ফেরে। আর সেই রাগ, সেই হতাশা, সেই মদ, সব গিয়ে পড়ে একজনের ওপর। স্ত্রীর ওপর।

রাত নয়টায় একজন মহিলা এলেন। নাম জাহানারা। বয়স ত্রিশ। কপালে কাটা দাগ। ঠোঁট ফুলে গেছে। শাড়ির আঁচল রক্তে ভেজা। সাথে একটা মেয়ে, চার বছর। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে মায়ের কাঁধে।

জাহানারা বললেন, "স্বামী মেরেছে।"

তিন শব্দ। এই তিন শব্দে সব বলা হয়ে গেছে। কিন্তু সব বলা হয়নি। কতবার মেরেছে? প্রতি সপ্তাহে? প্রতি মাসে? কোথায় মারে? মুখে? পিঠে? পেটে? মেয়ের সামনে মারে? মেয়েকেও মারে?

শামীমা জাহানারাকে বসালেন। পানি দিলেন। মেয়েটাকে বেঞ্চে শোয়ালেন।

তারপর জিডি লেখা শুরু করলেন। জেনারেল ডায়েরি। ঘটনার বিবরণ। তারিখ, সময়, স্থান, অভিযোগকারীর নাম, অভিযুক্তের নাম, ঘটনার বর্ণনা।

পেছন থেকে কনস্টেবল মাসুদ বলল, "ম্যাডাম, পারিবারিক ব্যাপার। মীমাংসা করে দিন। মামলা করে লাভ নাই।"

শামীমা কলম থামালেন।

ঘুরে তাকালেন মাসুদের দিকে। মাসুদ দশ বছর ধরে এই থানায়। শামীমার চেয়ে বয়সে বড়। র‍্যাংকে ছোট, কিন্তু অভিজ্ঞতায় বড়। মাসুদ জানে থানা কীভাবে চলে। মাসুদ জানে কোন মামলা নেওয়া হয়, কোনটা নেওয়া হয় না।

"মাসুদ, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০। ধারা ৩। পারিবারিক সহিংসতা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।"

মাসুদ চুপ করে গেল।

শামীমা বললেন, "আমি আইন মানি। আইনে পারিবারিক সহিংসতা অপরাধ। জাহানারা আপার কপালে সেলাই লাগবে। আগে হাসপাতালে পাঠাও। তারপর আমি মামলা নেব।"

মাসুদ গেল। কিন্তু যাওয়ার সময় মুখটা শক্ত ছিল। চোখে সেই চেনা ভাব: "মহিলা SI। আবেগের বশে মামলা নেয়।"

শামীমা জানে এই ভাবটা। দেখেছে শত শতবার। পুরুষ সহকর্মীদের চোখে। OC-র চোখে। এমনকি কোর্টেও। "মহিলা অফিসার, একটু বেশি emotional।" যেন আইন মানা আবেগ। যেন একজন রক্তাক্ত মহিলার অভিযোগ নেওয়া sentimentality।

শামীমা মামলা নিল।

জাহানারার স্বামী আশরাফকে পরদিন সকালে থানায় ডাকা হলো। আশরাফ এল। বিরক্ত মুখে। "কী হইছে? ঘরের ব্যাপার এটা।"

শামীমা বললেন, "ঘরে মারধর করা অপরাধ। আইনে আছে।"

আশরাফ বলল, "বউ আমার। শাসন আমি করব। এটা পুলিশের কী?"

শামীমা চুপ ছিলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর বললেন, "বউ আপনার সম্পত্তি না। বউ একজন মানুষ। মানুষকে মারলে সেটা অপরাধ। ঘরে মারুন বা বাইরে, আইন একই।"

আশরাফ থানায় জবানবন্দি দিল। শামীমা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করলেন। আশরাফকে জামিনে ছাড়া হলো, কিন্তু সুরক্ষা আদেশ জারি হলো। জাহানারা আর মেয়েকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে রেফার করা হলো।

পরদিন OC ডাকলেন। অফিসার-ইন-চার্জ। থানার বড় কর্তা।

"শামীমা, আশরাফের শ্বশুর ওয়ার্ড কমিশনারের লোক। ফোন এসেছে।"

শামীমা বললেন, "স্যার, আমি তো মামলা নিয়ে ফেলেছি। জিডি হয়ে গেছে। নম্বরও দিয়ে দিয়েছি।"

OC বললেন, "তুমি বুঝো না। সব মামলা নেওয়ার দরকার নাই।"

শামীমা বললেন, "স্যার, মহিলা রক্তাক্ত অবস্থায় থানায় এসেছিলেন। কপালে সেলাই লেগেছে। আমি কীভাবে মামলা না নিয়ে ফেরত পাঠাতাম?"

OC আর কিছু বললেন না। শামীমাকে জানতে দিলেন যে তিনি খুশি নন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বললেন না।

মধ্যরাতে থানায় একা বসে শামীমা।

ডিউটি অফিসার সে আজ। রাত বারোটা থেকে সকাল ছয়টা। পুরুষ কনস্টেবলরা বাইরে টহলে। থানার ভেতরে শামীমা একা। ডেস্কে বসে আছে। সামনে রেজিস্টার। পাশে ল্যান্ডফোন।

ফোন বাজল। রাত একটা।

একজন মহিলা। কাঁদছেন। "আমার স্বামী মারতেছে। বাচ্চারা ভয়ে কাঁদতেছে। আমি বাথরুমে লুকায়ে আছি। প্লিজ আসেন।"

শামীমা ঠিকানা নিলেন। কনস্টেবল মাসুদকে ফোন করলেন। "পাঁচ মিনিটে আসো। একটা ডমেস্টিক ভায়োলেন্স কল।"

মাসুদ এল। পাশে আরেক কনস্টেবল। তিনজন মিলে গেল। মতিঝিলের একটা পুরোনো বিল্ডিং। তিন তলায়। দরজায় ধাক্কা দিল। ভেতর থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

দরজা খুলল একজন পুরুষ। মদের গন্ধ। চোখ লাল। "কী চান?"

শামীমা বললেন, "পুলিশ। ভেতর থেকে কল এসেছে।"

"আমার বউ ফোন করেছে? পুলিশ ডেকেছে?"

শামীমা ভেতরে ঢুকলেন। তিনটা বাচ্চা কোণায় জড়ো হয়ে কাঁদছে। মহিলা বাথরুম থেকে বের হয়ে এলেন। গালে আঘাতের চিহ্ন।

শামীমা পুরুষটাকে বললেন, "আপনি বাইরে আসুন। কথা আছে।"

পুরুষটা প্রথমে রাজি হলো না। তারপর কনস্টেবলদের দেখে বাইরে এল। সিঁড়িতে দাঁড়ালো।

শামীমা বললেন, "আপনার বউ আর বাচ্চারা ভয়ে কাঁপছে। এটা কি ঠিক?"

পুরুষটা বলল, "ঘরের ব্যাপার।"

সেই একই কথা। "ঘরের ব্যাপার।" যেন ঘরের দেওয়ালের ভেতরে আইন ঢোকে না। যেন বিয়ে মানে মারার লাইসেন্স।

শামীমা বললেন, "ঘরের ব্যাপার না। আইনের ব্যাপার। আপনাকে এখন জিডি করতে হবে। আর আপনার বউ চাইলে মামলা করতে পারবেন।"

পুরুষটা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। "একটা মাইয়ালোক পুলিশ এসে আমারে শেখাবে ঘরে কী করব?"

শামীমা নড়লেন না। গলা তুললেন না। বললেন, "আমি মাইয়ালোক না, স্যার। আমি সাব-ইন্সপেক্টর। বাংলাদেশ পুলিশ। আর হ্যাঁ, আপনাকে শেখাব। কারণ এটা আমার চাকরি।"

শামীমার কথা শুনে পুরুষটা চুপ হয়েছিল।

সব পুরুষ চুপ হয় না। কেউ কেউ আরো চিৎকার করে। কেউ কেউ হাত তোলে। কেউ কেউ হুমকি দেয়। "তোমার চাকরি খাওয়ামু।" "তোমার ওপরওয়ালারে চিনি।" "দেখে নিমু।"

শামীমা শুনেছে এসব। অনেকবার। প্রথম প্রথম ভয় পেত। এখন পায় না। ভয় চলে গেছে। রাগও চলে গেছে। এখন শুধু কাজ করে। আইন প্রয়োগ করে। জিডি লেখে, মামলা নেয়, সুরক্ষা আদেশ আদায় করে, শেল্টারে পাঠায়।

ন-বছরে শামীমা তিনশোর বেশি পারিবারিক সহিংসতার মামলা নিয়েছে। তিনশোর বেশি। প্রতিটা মামলায় একজন মহিলা আছে যে মার খেয়েছে, কাঁদতে কাঁদতে থানায় এসেছে। প্রতিটা মামলায় একজন পুরুষ আছে যে বলেছে, "ঘরের ব্যাপার।"

তিনশো মামলার মধ্যে কতগুলোতে শাস্তি হয়েছে? শামীমা গুনেছে। বিয়াল্লিশটায়। বিয়াল্লিশ। বাকি আড়াইশোর বেশি মামলায় কী হয়েছে? কিছু মামলায় আপোষ হয়েছে। কিছু মামলায় সাক্ষী পাওয়া যায়নি। কিছু মামলায় মহিলা নিজেই মামলা তুলে নিয়েছেন। কারণ? কারণ "ছেলেমেয়েদের কথা ভেবে।" কারণ "সমাজে মুখ দেখাতে পারব না।" কারণ "উনি ক্ষমা চেয়েছেন।"

শামীমা বোঝে। বিচার করে না। কারণ শামীমা জানে, একজন মহিলার পক্ষে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন। শুধু আইনি লড়াই না। পরিবারের চাপ, সমাজের চাপ, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, সব মিলিয়ে একটা দেওয়াল। সেই দেওয়াল ভেদ করে খুব কম মহিলা আসতে পারে।

শামীমার নিজের জীবন?

স্বামী আছে। নাম ফয়সাল। সরকারি চাকরি করে। শিক্ষা অফিসে। ভালো মানুষ। শামীমাকে মারে না। কিন্তু বোঝে না।

"তুমি রাতে ডিউটি করো কেন? মেয়েদের রাতে ডিউটি করা ঠিক না।"

শামীমা বলে, "ডিউটি রোস্টার অনুযায়ী। আমার পালা আসলে আমাকে করতে হয়।"

ফয়সাল বলে, "OC-কে বলো, তোমার রাতের ডিউটি না দিতে।"

শামীমা বলে, "তাহলে আমি কী ধরনের অফিসার? পুরুষ SI রাতে ডিউটি করবে, মহিলা SI করবে না?"

ফয়সাল চুপ করে যায়। কিন্তু চোখে সেই অসন্তোষ। যেটা বলে, "তোমার চাকরি আমাদের সংসারের চেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে।"

একটা মেয়ে আছে শামীমার। নাম সামিয়া। সাত বছর। সামিয়া শামীমাকে জিজ্ঞেস করে, "আম্মা, তুমি কেন বন্দুক রাখো?" শামীমা বলে, "আম্মা পুলিশ, তাই।" সামিয়া বলে, "পুলিশ তো ভিলেন ধরে। তুমি কি ভিলেন ধরো?" শামীমা বলে, "হ্যাঁ, মা। ধরি।"

সামিয়া খুশি হয়। সামিয়ার কাছে আম্মা হিরো। বাইরের পৃথিবীতে শামীমা "মহিলা SI।" ঘরে সামিয়ার কাছে শামীমা হিরো।

একটা মামলা শামীমা ভুলতে পারে না।

দুই বছর আগে। একজন মহিলা এসেছিলেন থানায়। নাম ফেরদৌসী। বয়স পঁচিশ। বিয়ের তিন বছর। শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। শরীরে পোড়ার দাগ। স্বামী সিগারেটের ছ্যাঁকা দিত। বাহুতে, পিঠে, পেটে।

শামীমা মামলা নিয়েছিলেন। মেডিকেল রিপোর্ট হয়েছিল। বারোটা পোড়ার দাগ। ফেরদৌসীকে শেল্টারে পাঠানো হয়েছিল।

দুই সপ্তাহ পরে ফেরদৌসী শেল্টার থেকে চলে গেলেন। কোথায়? স্বামীর কাছে। কেন? ফেরদৌসী বলেছিলেন, "বাচ্চাটার জন্য। বাচ্চার বাবা তো উনি। বাচ্চার সাথে বাবার থাকা দরকার।"

শামীমা বুঝতে পারেনি। বুঝতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। কীভাবে একজন মহিলা বারোটা সিগারেটের ছ্যাঁকা নিয়ে আবার সেই পুরুষের কাছে ফিরে যায়? কীভাবে?

তারপর বুঝেছিল। ফেরদৌসীর যাওয়ার জায়গা নেই। বাবার বাড়িতে জায়গা নেই, বাবা মৃত, ভাই বলেছে "তুমি আর আসবা না।" চাকরি নেই, টাকা নেই, ঠিকানা নেই। শেল্টারে কতদিন থাকবে? একটা বাচ্চা নিয়ে রাস্তায়?

ফেরদৌসী ফিরে গেছিল। ছ-মাস পরে শামীমা খবর পেয়েছিল। ফেরদৌসী মারা গেছে। স্বামী মেরেছে। মাথায় আঘাত। ফেরদৌসীর বাচ্চাটা এখন ইয়াতিমখানায়।

শামীমা সেদিন থানার বাথরুমে কেঁদেছিল। দরজা বন্ধ করে। পানির শব্দ চালু রেখে। যেন কেউ না শোনে।

তারপর মুখ ধুয়ে বের হয়ে এসেছিল। ডেস্কে বসেছিল। পরের মামলা নিয়েছিল। কারণ থামলে আরো ফেরদৌসী তৈরি হবে। থামা যাবে না।

১০

শামীমা জানে, সে সিস্টেম বদলাতে পারবে না।

একজন SI, একটা থানায়, কী বদলাবে? আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। সুরক্ষা আদেশ আছে, কিন্তু কেউ মানে না। শেল্টার আছে, কিন্তু জায়গা নেই। কোর্ট আছে, কিন্তু মামলা ঝুলে থাকে বছরের পর বছর।

তবু শামীমা কাজ করে। প্রতিটা মামলা নেয়। প্রতিটা জিডি লেখে। প্রতিটা মহিলাকে বলে, "আপনার অধিকার আছে। আইন আপনার পাশে।"

কথাটা কতটা সত্য? শামীমা জানে, পুরোটা সত্য না। আইন আছে, কিন্তু আইন যথেষ্ট না। আইনের বাইরে সমাজ আছে, সংস্কার আছে, অর্থনীতি আছে। একজন মহিলা যতক্ষণ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হচ্ছে, ততক্ষণ সে আইনের সুরক্ষা পুরোপুরি নিতে পারবে না।

কিন্তু শামীমা বলে। বলতে থাকে। কারণ বলাটা জরুরি। একজন মহিলা যদি জানে যে থানায় গেলে একজন মহিলা অফিসার আছেন যিনি কথা শুনবেন, মামলা নেবেন, আইন বোঝাবেন, তাহলে হয়তো সেই মহিলা আসবেন। হয়তো প্রথমবার আসবেন না। দ্বিতীয়বার আসবেন না। কিন্তু তৃতীয়বার আসবেন।

রাত শেষ হয়। ভোরের আলো থানার জানালায় পড়ে। শামীমা ডিউটি রেজিস্টার বন্ধ করে। উঠে দাঁড়ায়। ইউনিফর্ম ঠিক করে। ব্যাজ পরিষ্কার করে হাতের তালু দিয়ে।

ব্যাজে লেখা: Bangladesh Police.

শামীমা পড়ে। প্রতিদিন পড়ে। নিজেকে মনে করিয়ে দেয়। সে পুলিশ। মহিলা পুলিশ না। পুলিশ।