রাজনীতিবিদ

তারা আমার সই চায়। আমি তাদের প্রতিশ্রুতি চাই।

পর্ব ২৩ · ১১ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

ফিরোজার অফিস একটা টিনের ঘরে।

ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অফিস। ওয়ার্ড নম্বর ছয়, ময়মনসিংহ পৌরসভা। টিনের চাল, ইটের দেওয়াল, সামনে একটা সাইনবোর্ড: "ওয়ার্ড কাউন্সিলর (সংরক্ষিত মহিলা আসন) - ফিরোজা বেগম।" সাইনবোর্ডের রঙ উঠে গেছে। বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে। কিন্তু নামটা পড়া যায়।

ফিরোজার বয়স পঞ্চাশ। ত্রিশ বছর আগে এই ওয়ার্ডে এসেছিলেন বিয়ের পর। স্বামী ছিলেন ছোট ব্যবসায়ী। চালের আড়ত। স্বামী মারা গেছেন আট বছর আগে। হার্ট অ্যাটাক। হঠাৎ। সকালে চা খেতে খেতে। চায়ের কাপ হাত থেকে পড়ে গেছিল। ফিরোজা কাপটা তুলতে গিয়ে দেখেছিলেন স্বামী চেয়ারে ঢলে পড়েছেন।

স্বামীর মৃত্যুর পর ফিরোজার সামনে দুটো রাস্তা ছিল। একটা: ছেলের ওপর নির্ভর করে বাকি জীবন কাটানো। আরেকটা: নিজে কিছু করা। ফিরোজা দ্বিতীয়টা বেছে নিয়েছিলেন। কারণ প্রথমটায় নিজেকে ছোট মনে হতো।

মহিলা সমিতি দিয়ে শুরু। পাড়ার মহিলাদের নিয়ে সঞ্চয় সমিতি। প্রতি মাসে একশো টাকা করে জমা। কুড়িজন মহিলা। মাসে দুই হাজার। সেই টাকা ঘুরিয়ে ঋণ দেওয়া। সুদ কম, শর্ত সহজ।

সমিতি থেকে পাড়ায় একটা পরিচিতি হলো। "ফিরোজা আপা।" মহিলারা আসতেন সমস্যা নিয়ে। জমির সমস্যা, স্বামীর সমস্যা, ছেলেমেয়ের স্কুলের সমস্যা। ফিরোজা শুনতেন। সমাধান করতেন। কখনো পারতেন, কখনো পারতেন না। কিন্তু শুনতেন সবসময়।

নির্বাচন করলেন ২০১৯ সালে।

সংরক্ষিত মহিলা আসন। ময়মনসিংহ পৌরসভার ওয়ার্ড ছয়। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তিনজন। একজন ইউপি চেয়ারম্যানের স্ত্রী, একজন স্থানীয় দলীয় নেতার মেয়ে, একজন শিক্ষিকা। ফিরোজা দলীয় মনোনয়ন পাননি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন।

"তুমি কী করে জিতবা? টাকা নাই, দল নাই।"

ফিরোজা বলেছিলেন, "মানুষ আছে।"

আর মানুষ ছিল। সমিতির কুড়িজন মহিলা, তাদের পরিবার, তাদের প্রতিবেশী। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরেছিলেন ফিরোজা। মাইক ছিল না, পোস্টার ছিল কম, টাকা ছিল না ভাড়া করা লোকজনের। কিন্তু ফিরোজা নিজে গেছিলেন। প্রতিটা ঘরে।

"আমি ফিরোজা। আপনাদের ওয়ার্ডের মেয়ে। আপনাদের সমস্যা আমি জানি। কারণ আমিও একই সমস্যায় থাকি।"

জিতেছিলেন। চারশো ভোটে। কম ব্যবধান, কিন্তু জিতেছিলেন।

জেতার পর প্রথম যে সমস্যায় পড়লেন সেটা ভোটের সমস্যা না। সেটা ক্ষমতার সমস্যা। ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে তার কিছু ক্ষমতা আছে। বাজেট বরাদ্দে মতামত দেওয়ার ক্ষমতা। উন্নয়ন প্রকল্পে সই দেওয়ার ক্ষমতা। কিন্তু সেই ক্ষমতা কে ব্যবহার করবে? ফিরোজা? না, ফিরোজার চারপাশের পুরুষেরা।

মেয়র সাহেব ফিরোজাকে ডাকলেন।

প্রথম সপ্তাহে। "ফিরোজা আপা, আপনার ওয়ার্ডে একটা রাস্তা হবে। পাঁচ লাখ টাকার প্রজেক্ট। ঠিকাদার ঠিক করা আছে। আপনি শুধু সই দিবেন।"

ফিরোজা বললেন, "ঠিকাদার কে?"

মেয়র সাহেব একটু অবাক হলেন। এই প্রশ্ন তিনি আশা করেননি। সংরক্ষিত মহিলা আসনের কাউন্সিলরদের কাছ থেকে এই প্রশ্ন আসে না সাধারণত। তারা সই দেন, আর বাড়ি যান।

"ঠিকাদার আমাদের পরিচিত। ভালো কাজ করে।"

ফিরোজা বললেন, "আমি দেখি। রাস্তাটা কোথায় হবে, কতটুকু হবে, কী ধরনের রাস্তা, আমি দেখে তারপর সই দিই।"

মেয়র সাহেব বললেন, "আপা, এত কিছু দেখার দরকার নাই। এগুলো আমরা দেখি।"

ফিরোজা বললেন, "আমি নির্বাচিত কাউন্সিলর। ওয়ার্ডের উন্নয়ন আমার দায়িত্ব। দেখব।"

মেয়র সাহেব আর কিছু বলেননি। কিন্তু বুঝিয়ে দিলেন, এই মহিলা "কঠিন।"

ফিরোজা রাস্তাটা দেখতে গেলেন। ওয়ার্ডের পশ্চিম দিকে। দেখলেন, এই রাস্তায় লোকজন কম থাকে। পূর্ব দিকে একটা গলি আছে, সেটা বর্ষায় পানিতে ডুবে যায়। সেটা বেশি দরকার। ফিরোজা মেয়র সাহেবকে বললেন, "রাস্তাটা পূর্ব দিকের গলিতে হোক। সেটা বেশি দরকার।"

মেয়র সাহেব বললেন, "পশ্চিমের রাস্তা ঠিক আছে।"

ফিরোজা জানতেন কেন। পশ্চিমের রাস্তার পাশে মেয়র সাহেবের এক আত্মীয়ের জমি আছে। রাস্তা হলে জমির দাম বাড়বে। কিন্তু ফিরোজা এটা মুখে বললেন না। বললেন, "আমি পূর্ব দিকে সই দেব। পশ্চিমে সই দেব না।"

রাস্তা পূর্ব দিকে হলো।

এভাবে ফিরোজা শিখলেন।

সই-এর ক্ষমতা। একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তার সই। সই ছাড়া প্রকল্প চলে না। বাজেট ছাড়া হয় না। ফিরোজা বুঝলেন, তারা তার মতামত চায় না, তারা তার সই চায়। তাহলে সই-ই তার ক্ষমতা।

ফিরোজা সই দেন। কিন্তু শর্তে। প্রতিটা প্রকল্পে শর্ত থাকে। রাস্তার প্রকল্পে শর্ত: ড্রেনেজ থাকতে হবে। স্কুলের প্রকল্পে শর্ত: মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট থাকতে হবে। বাজারের প্রকল্পে শর্ত: মহিলা ব্যবসায়ীদের জন্য পাঁচটা দোকান বরাদ্দ থাকতে হবে।

পুরুষেরা বিরক্ত হন। "আপা, এত শর্ত দিয়েন না।" ফিরোজা বলেন, "আমার ভোটারদের কাছে জবাবদিহি আমার। আপনাদের কাছে না।"

এটা সত্য। ফিরোজার ভোটার বেশিরভাগ মহিলা। তারা ফিরোজাকে ভোট দিয়েছেন কারণ ফিরোজা তাদের একজন। তাদের কথা বলেন। তাদের সমস্যা বোঝেন।

ফিরোজা প্রতি শুক্রবার ওয়ার্ডে বসেন। টিনের অফিসে। সকাল দশটা থেকে দুপুর একটা। মানুষ আসে। বেশিরভাগ মহিলা। জমির সমস্যা, পানির সমস্যা, রাস্তার সমস্যা, স্কুলের সমস্যা। ফিরোজা শোনেন। খাতায় লেখেন। যেটা পারেন করেন, যেটা পারেন না সেটা বলেন "পারছি না।"

এই "পারছি না" বলাটাই ফিরোজাকে আলাদা করে। বাকি নেতারা বলেন "করব ইনশাআল্লাহ।" ফিরোজা বলেন, "পারছি না। বাজেট নাই। চেষ্টা করব, কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না।"

মানুষ এটা শুনে হতাশ হয়? হয়তো। কিন্তু বিশ্বাস করে।

ফিরোজার সবচেয়ে বড় লড়াই বাজেট নিয়ে।

পৌরসভার বার্ষিক বাজেটে ওয়ার্ড ছয়ের বরাদ্দ কত? ফিরোজা প্রথম বছর বুঝতেই পারেননি। কাগজপত্র জটিল। অ্যাকাউন্টিং শব্দ বোঝেন না। ব্যালেন্স শিট পড়তে পারেন না। ফিরোজার শিক্ষা এইচএসসি পর্যন্ত। তারপর বিয়ে।

কিন্তু ফিরোজা শিখেছেন। ছেলের কাছ থেকে। ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে। ছেলে শিখিয়েছে কীভাবে বাজেট পড়তে হয়। কোথায় টাকা যায়, কোথায় আসে, কোন খাতে কত বরাদ্দ।

দ্বিতীয় বছরে ফিরোজা বাজেট মিটিংয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। "ওয়ার্ড তিনে রাস্তার জন্য বারো লাখ, আর ওয়ার্ড ছয়ে পাঁচ লাখ। কেন?"

মেয়র সাহেব বলেছিলেন, "ওয়ার্ড তিনের রাস্তা বেশি খারাপ।"

ফিরোজা বলেছিলেন, "আমি গতকাল দুটো ওয়ার্ডেই গেছি। ওয়ার্ড তিনের রাস্তা গত বছরই মেরামত হয়েছে। ওয়ার্ড ছয়ের রাস্তা তিন বছর ধরে ভাঙা।"

সভায় নীরবতা। মেয়র সাহেবের মুখ শক্ত। অন্য কাউন্সিলররা তাকাচ্ছেন ফিরোজার দিকে। কেউ কেউ মুচকি হাসছেন: "মহিলা কাউন্সিলর বাজেট নিয়ে প্রশ্ন করছে।"

কিন্তু ফিরোজা সঠিক ছিলেন। সংখ্যা তার পক্ষে ছিল। মেয়র সাহেব বাজেট সংশোধন করেছিলেন। ওয়ার্ড ছয়ে আট লাখ হয়েছিল।

ফিরোজার চারপাশে পুরুষেরা।

ওয়ার্ড ছয়ে দুইজন কাউন্সিলর। ফিরোজা, সংরক্ষিত আসনে। আর মনির ভাই, সাধারণ আসনে। মনির ভাই বয়সে ছোট, পঁয়তাল্লিশ। দলীয় লোক। স্থানীয় ক্ষমতাবান। মনির ভাইয়ের ছেলেরা আছে, মাস্তানি করে। মনির ভাইয়ের ব্যবসা আছে, ঠিকাদারি।

মনির ভাই ফিরোজাকে সম্মান করেন না। প্রকাশ্যে বলেন না, কিন্তু কাজে বোঝা যায়। প্রকল্পের মিটিংয়ে ফিরোজাকে ডাকেন না। সিদ্ধান্ত আগে নিয়ে ফেলেন, তারপর ফিরোজাকে জানান। "আপা, এটা হয়ে গেছে। সই দেন।"

ফিরোজা প্রথমে কষ্ট পেতেন। এখন পান না। কষ্টকে হাতিয়ার বানিয়েছেন।

মনির ভাই একবার বলেছিলেন একটা মিটিংয়ে, সবার সামনে, "আপা, আপনি মহিলাদের বিষয়গুলো দেখেন। বাকিটা আমরা দেখি।"

ফিরোজা বলেছিলেন, "মনির ভাই, ওয়ার্ডে শুধু মহিলা থাকে না। পুরুষও থাকে। আমি পুরো ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। আপনিও। আমরা দুজনেই সব বিষয় দেখব।"

মনির ভাই হেসেছিলেন। সেই হাসি যেটা বলে, "বলতে পারেন, কিন্তু করতে পারবেন না।"

ফিরোজা করেছিলেন। একটু একটু করে। প্রতিটা প্রকল্পে নাক গলিয়েছিলেন। প্রতিটা বাজেটে প্রশ্ন করেছিলেন। প্রতিটা মিটিংয়ে কথা বলেছিলেন।

ক্ষমতা জিনিসটা পুরুষেরা দেওয়ালে পেরেক দিয়ে আটকে রাখে।

ফিরোজা এটা বুঝেছিলেন ধীরে ধীরে। ক্ষমতা চাইলে পাওয়া যায় না। ক্ষমতা নিতে হয়। ছিনিয়ে না, কৌশলে। ফিরোজা কৌশল শিখেছিলেন।

প্রথম কৌশল: তথ্য। ফিরোজা সব প্রকল্পের কাগজপত্র পড়েন। বাজেট পড়েন। নিয়ম পড়েন। পৌরসভা আইন পড়েন। যখন মিটিংয়ে কথা বলেন, তথ্য দিয়ে বলেন। "পৌরসভা আইন ২০০৯, ধারা ৫৬, অনুচ্ছেদ ৩।" পুরুষেরা এটা আশা করেন না। একজন মহিলা কাউন্সিলর ধারা-উপধারা বলবেন, এটা তাদের হিসেবে নেই।

দ্বিতীয় কৌশল: জোট। ফিরোজা অন্য ওয়ার্ডের মহিলা কাউন্সিলরদের সাথে সম্পর্ক রাখেন। ছয়জন মহিলা কাউন্সিলর পৌরসভায়। ফিরোজা তাদের নিয়ে একটা অনানুষ্ঠানিক গ্রুপ করেছেন। বাজেট মিটিংয়ের আগে তারা বসেন। কৌশল ঠিক করেন। কোন প্রশ্ন কে করবে, কোন দাবি কে তুলবে।

তৃতীয় কৌশল: জনসংযোগ। ফিরোজা মানুষের সাথে কথা বলেন। প্রতিদিন। বাজারে, রাস্তায়, মসজিদের পাশে, স্কুলের গেটে। মানুষ যখন জানে ফিরোজা কাজ করেন, তখন মানুষ ফিরোজার পাশে থাকে। আর মানুষ পাশে থাকলে পুরুষ নেতারা ফিরোজাকে এড়িয়ে যেতে পারেন না।

ফিরোজার সবচেয়ে বড় সাফল্য কী?

বড় কোনো প্রকল্প না। বড় কোনো বাজেট না। ওয়ার্ড ছয়ে একটা মহিলা বাজার হয়েছে। ছোট। দশটা দোকান। মহিলারা চালান। সবজি বিক্রি করেন, মুড়ি বিক্রি করেন, আচার বিক্রি করেন, কাপড় বিক্রি করেন।

এই বাজারটা ফিরোজার আইডিয়া। পৌরসভার জমিতে। ফিরোজা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মেয়র সাহেব বলেছিলেন, "মহিলা বাজার? কে আসবে?" ফিরোজা বলেছিলেন, "মহিলারা আসবেন। আর মহিলারা এলে পুরুষেরাও আসবেন। কারণ মহিলাদের কেনা জিনিস পুরুষেরাই খান।"

মেয়র সাহেব হেসেছিলেন। কিন্তু অনুমোদন দিয়েছিলেন। ছোট প্রকল্প, বেশি টাকা লাগেনি।

বাজারটা হয়েছে। দশটা দোকান। দশজন মহিলা। প্রত্যেকে মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আয় করেন। বেশি না। কিন্তু তাদের নিজের আয়। স্বামীর দেওয়া না। বাবার দেওয়া না। নিজের হাতে কামানো।

ফিরোজা মাঝে মাঝে বাজারে যান। মহিলাদের সাথে কথা বলেন। একজন বলেছিলেন, "আপা, আগে স্বামীর কাছে হাত পাততাম সাবান কেনার জন্য। এখন নিজে কিনি।" ফিরোজা শুনেছিলেন। আর কিছু বলেননি।

এটুকুই। এটুকু যথেষ্ট।

রাজনীতি ফিরোজাকে কী দিয়েছে?

ক্ষমতা? কিছুটা। টাকা? না। সম্মান? কখনো কখনো। অপমান? প্রায়ই।

ফিরোজা হিসাব করেন। পাঁচ বছরে কাউন্সিলর হিসেবে সম্মানী পেয়েছেন মাসে পাঁচ হাজার টাকা। এটাই সরকারি সম্মানী। পাঁচ হাজার। একজন গৃহকর্মীর বেতনের সমান। এই টাকায় অফিস চালান, টিনের অফিসের ভাড়া দেন, চায়ের খরচ দেন, ফোনের বিল দেন।

ফিরোজার নিজের খরচ চালে ছেলে। ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে। ভালো বেতন পায়। মাকে টাকা পাঠায়। ফিরোজা সেই টাকায় চলেন। কাউন্সিলরের সম্মানী দিয়ে সংসার চলে না।

তাহলে কেন করেন?

ফিরোজা নিজেকে জিজ্ঞেস করেছেন এটা। অনেকবার। রাতে ঘুমের আগে। ক্লান্ত শরীরে। মিটিংয়ে অপমানিত হয়ে ফেরার পথে।

উত্তরটা সহজ। কিন্তু কেউ বুঝবে না।

ফিরোজা এটা করেন কারণ কেউ না করলে কেউ করবে না। সংরক্ষিত মহিলা আসনে কেউ না কেউ বসবে। কিন্তু বসলেই হয় না। বসে কাজ করতে হয়। প্রশ্ন করতে হয়। দাঁড়াতে হয়।

ফিরোজা দাঁড়িয়েছেন। দাঁড়িয়ে আছেন।

১০

ফিরোজার একটা কথা আছে।

কথাটা বলেন মিটিংয়ে, মানুষের সামনে, পুরুষ কাউন্সিলরদের সামনে। কথাটা বলেন নিজেকেও, রাতে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।

"তারা আমার সই চায়। আমি তাদের প্রতিশ্রুতি চাই।"

এটাই চুক্তি। এটাই সমীকরণ। তুমি আমার কাছ থেকে সই চাও? ভালো। আমিও তোমার কাছে কিছু চাই। ড্রেনেজ চাই। মেয়েদের টয়লেট চাই। রাস্তায় বাতি চাই। মহিলা বাজারে পানির ব্যবস্থা চাই।

কেউ বলে, "ফিরোজা আপা বেশি দরকষাকষি করেন।" ফিরোজা বলেন, "মানুষের হয়ে দরকষাকষি করা আমার কাজ। এজন্যই মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছে।"

টিনের অফিসে সন্ধ্যা নামে। ফিরোজা ফাইল গোছান। কালকের মিটিংয়ের কাগজ। বাজেট প্রস্তাব। একটা নতুন প্রকল্প: ওয়ার্ডে মহিলাদের জন্য ফ্রি সেলাই প্রশিক্ষণ। ফিরোজা খরচ হিসাব করেছেন। সেলাই মেশিন পাঁচটা, প্রশিক্ষক একজন, তিন মাসের কোর্স। মোট খরচ দুই লাখ।

মেয়র সাহেব রাজি হবেন? হয়তো না। ফিরোজা লড়বেন? হ্যাঁ।

বাইরে অন্ধকার হয়ে আসছে। ফিরোজা অফিসের দরজায় তালা দেন। সাইনবোর্ডের দিকে তাকান। নামটা পড়া যায়। রঙ উঠে গেছে, কিন্তু নামটা পড়া যায়।

ফিরোজা বেগম। ওয়ার্ড কাউন্সিলর।

ফিরোজা হাঁটতে শুরু করেন। বাড়ির দিকে। পায়ে হেঁটে। গাড়ি নেই। রিকশার পয়সা বাঁচান। সেই পয়সা দিয়ে অফিসের চা কিনবেন। কালকে আবার মানুষ আসবে। চা ছাড়া মানুষ কথা বলে না।