সাংবাদিক
কলম ধরি মেয়ে বলে। কলম চালাই সাংবাদিক বলে।
১
তিথি সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ ফোন চেক করে।
ফোনে নোটিফিকেশন। ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমেইল। প্রতিদিন পঞ্চাশ-ষাটটা নোটিফিকেশন আসে। বেশিরভাগ গালি। মেসেঞ্জারে অচেনা আইডি থেকে। "কুত্তি", "রাস্তার মেয়ে", "এসব লিখে পেট চলে?", "তোকে দেখে নেব।"
তিথি পড়ে। প্রতিটা পড়ে। ব্লক করে। স্ক্রিনশট নেয়। একটা ফোল্ডারে রাখে। ফোল্ডারের নাম "Evidence।" এই ফোল্ডারে এখন সাতশোর বেশি স্ক্রিনশট আছে। তিন বছরের সংগ্রহ।
তিথি বয়স আটাশ। অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ করে। "প্রতিচ্ছবি নিউজ।" ছোট পোর্টাল। টিম সাতজন। সম্পাদক একজন, রিপোর্টার চারজন, ফটোগ্রাফার একজন, ওয়েব ডেভেলপার একজন। তিথি রিপোর্টার। বিট: নারী ও শিশু।
নারী ও শিশু বিট মানে ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, পাচার। প্রতিদিন এই খবর। প্রতিদিন কোনো না কোনো মেয়ে বা শিশু কোনো না কোনো সহিংসতার শিকার। তিথি সেই খবর লেখে।
২
তিথি রিপোর্টিং শুরু করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ। চতুর্থ বর্ষে ইন্টার্নশিপ। একটা জাতীয় দৈনিকে। সেখানে প্রথম রিপোর্ট লিখেছিল একটা ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে। ঢাকার বাইরে, একটা গ্রামে। তেরো বছরের মেয়ে। আত্মীয়ের হাতে। পরিবার মামলা করতে চায়নি। "সমাজে মুখ দেখাতে পারব না।"
তিথি গিয়েছিল। মেয়েটার পরিবারের সাথে কথা বলেছিল। মেয়েটার সাথে কথা বলেছিল। মেয়েটা কিছু বলতে পারেনি। চুপ বসেছিল। চোখ মাটিতে। তিথি তার হাত ধরেছিল। কিছু বলেনি। শুধু হাত ধরে বসেছিল।
রিপোর্ট লিখেছিল। সম্পাদক ছেপেছিলেন। পরদিন মামলা হয়েছিল। পুলিশ আসামিকে ধরেছিল। মেয়েটা কিছুটা বিচার পেয়েছিল।
তিথি সেদিন বুঝেছিল। কলম কাজ করে। শব্দ কাজ করে। একটা রিপোর্ট একটা মেয়ের জীবন বদলে দিতে পারে। অথবা অন্তত, বদলানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।
সেদিন থেকে তিথি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নারী ও শিশু বিটেই থাকবে। অন্য বিট নেবে না। রাজনীতি না, অর্থনীতি না, খেলা না। শুধু এই বিট। কারণ এই বিটে কেউ থাকতে চায় না। পুরুষ রিপোর্টাররা বলে, "ওসব ছোট খবর।" মেয়ে রিপোর্টারদের সবাই রাজনীতি বা বিনোদনে যেতে চায়। নারী ও শিশু বিট কেউ চায় না।
তিথি চেয়েছিল। কারণ কেউ না চাইলে কেউ লিখবে না। কেউ না লিখলে কেউ জানবে না।
৩
তিথির দিন শুরু হয় সকাল নয়টায়।
অফিসে আসে। অফিস মানে মিরপুরের একটা ফ্ল্যাটের দুটো রুম। সম্পাদকের ডেস্ক একটা রুমে, বাকি সবাই আরেকটা রুমে। ছয়টা ডেস্ক, গাদাগাদি করে বসা।
তিথি বসে সংবাদ খোঁজে। ফোন করে থানায়, হাসপাতালে, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে, নারী অধিকার সংগঠনে। জিজ্ঞেস করে, "নতুন কোনো ঘটনা?" প্রতিদিন ঘটনা আছে। প্রতিদিন কোনো না কোনো মেয়ে। কোনো না কোনো শিশু।
আজকের ঘটনা: গাজীপুরে একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে একজন মহিলা শ্রমিককে সুপারভাইজার যৌন হয়রানি করেছে। মহিলা অভিযোগ করতে গেছিলেন ম্যানেজমেন্টের কাছে। ম্যানেজমেন্ট বলেছে, "প্রমাণ আছে?" প্রমাণ নেই। সিসিটিভি ছিল না সেই জায়গায়। সাক্ষী ছিল, কিন্তু সাক্ষীরা ভয়ে কথা বলতে রাজি না।
তিথি গেল গাজীপুরে। ফ্যাক্টরির সামনে। মহিলার সাথে দেখা করল। মহিলার নাম বদলে দিল রিপোর্টে (সুরক্ষার জন্য)। মহিলা কথা বললেন। কাঁদলেন। তিথি রেকর্ড করল (অনুমতি নিয়ে)।
ফ্যাক্টরির ম্যানেজমেন্ট তিথির সাথে কথা বলতে রাজি হলো না। "নো কমেন্ট।"
তিথি রিপোর্ট লিখল। সন্ধ্যায় পোর্টালে আপলোড হলো। শেয়ার হলো সোশ্যাল মিডিয়ায়।
কমেন্ট আসতে শুরু করল। "এসব লিখে কী হবে?" "মেয়েটাই তো দোষী, কেন রাতে একা ছিল?" "ফ্যাক্টরি বন্ধ হলে হাজার মানুষ বেকার হবে, সেটা ভাবো।"
তিথি পড়ল। ব্লক করল না এবার। উত্তর দিল। "মেয়েটার দোষ না। কারো শরীর স্পর্শ করার অধিকার কারো নেই। এটা আইন।"
আরো গালি এল। তিথি ফোন রেখে দিল। চা বানাল। চা খেতে খেতে পরের রিপোর্টের নোট করল।
৪
তিথির সবচেয়ে বড় রিপোর্ট ছিল গত বছরের।
একটা স্থানীয় এমপির ছেলে। নাম বলা যাবে না (মামলা চলছে)। কিন্তু ঘটনাটা বলা যাবে। এমপির ছেলে একটা কলেজের ছাত্রীকে হয়রানি করেছিল। দিনের পর দিন। ফোন করত, ফলো করত, হুমকি দিত। মেয়েটা অভিযোগ করেছিল কলেজে। কলেজ কিছু করেনি। মেয়েটা থানায় গেছিল। থানায় জিডি হয়েছিল, কিন্তু মামলা হয়নি। "এমপির ছেলে। ভাবো।"
মেয়েটার বাবা তিথির কাছে এসেছিলেন। কীভাবে পেয়েছিলেন তিথিকে? তিথির আগের একটা রিপোর্ট পড়ে। তিথির নম্বর জোগাড় করে ফোন করেছিলেন। কাঁদছিলেন। "আমার মেয়েকে বাঁচান।"
তিথি রিপোর্ট করেছিল। এমপির ছেলের নাম দেয়নি (আইনি কারণে), কিন্তু এমনভাবে লিখেছিল যে সবাই বুঝেছিল কে। এলাকার মানুষ জানত ঘটনা। রিপোর্ট পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছিল।
তারপর শুরু হলো।
প্রথমে ফোন এল। অচেনা নম্বর। "রিপোর্ট নামাও। না হলে ভালো হবে না।"
তিথি নামায়নি।
দ্বিতীয় দিনে আরেকটা ফোন। "তোমার পরিবারকে জিজ্ঞেস করো, তারা কি নিরাপদ?"
তিথি কেঁপে উঠেছিল। পরিবার। মা আর বাবা থাকেন চট্টগ্রামে। ছোট ভাই ঢাকায় পড়ে। তিথি একা থাকে, মিরপুরে, একটা মেসে।
তিথি সম্পাদককে বলেছিল। সম্পাদক বলেছিলেন, "হুমকি রেকর্ড করো। থানায় জিডি করো। রিপোর্ট থাকবে।"
তিথি থানায় জিডি করেছিল। থানায় পুলিশ অফিসার বলেছিলেন, "ম্যাডাম, আপনি সাবধানে থাকবেন।" এটুকুই। বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেননি। কারণ হুমকিদাতা "পরিচিত পরিবারের।"
৫
তৃতীয় দিনে তিথির মেসের দরজায় একটা চিঠি।
কোনো নাম নেই। কোনো ঠিকানা নেই। ভেতরে একটা কাগজ। লেখা: "বেশি লেখালেখি করলে জিভ কেটে দেওয়া হবে।"
তিথি চিঠিটা হাতে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। হাত কাঁপছিল। পা কাঁপছিল। পেটের ভেতরে কিছু একটা উল্টে গেল।
তিথি ভয় পেয়েছিল। প্রচণ্ড ভয়। এতটা ভয় আগে কখনো পায়নি। ফোনে হুমকি আলাদা, দরজায় চিঠি আলাদা। ফোনে হুমকি মানে কেউ তোমার নম্বর জানে। দরজায় চিঠি মানে কেউ তোমার ঠিকানা জানে। কেউ তোমার দরজায় এসেছে। কেউ জানে তুমি কোন রুমে থাকো।
তিথি সেদিন রাতে ঘুমায়নি। সারারাত জেগে ছিল। বারবার দরজার তালা চেক করেছিল। জানালা বন্ধ আছে কিনা দেখেছিল। প্রতিটা শব্দে চমকে উঠেছিল।
পরদিন সকালে তিথি দুটো কাজ করেছিল।
প্রথম: মেস বদলেছিল। নতুন মেস। মোহাম্মদপুরে। কেউ জানে না ঠিকানা। সম্পাদক ছাড়া।
দ্বিতীয়: আরেকটা রিপোর্ট লিখেছিল। একই ঘটনার ফলোআপ। এবার আরো তথ্য দিয়ে। মেয়েটার পরিবারের সাক্ষাৎকার। কলেজের শিক্ষকদের মন্তব্য। থানার জিডি-র কপি।
রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। আরো শেয়ার হয়েছিল। একটা জাতীয় দৈনিক তুলে নিয়েছিল। টিভি চ্যানেলে আলোচনা হয়েছিল। জেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।
এমপির ছেলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। মামলা চলছে।
তিথি হুমকি পেতে থাকে। আগের মতো। কিন্তু লিখতেও থাকে। আগের মতো।
৬
তিথির মা ফোন করেন রোজ।
"বাবা, তুমি ভালো আছো?"
"ভালো আছি, আম্মা।"
"খেয়েছো?"
"খেয়েছি।"
"ওই লেখালেখি কি এখনো করো?"
"করি, আম্মা।"
মা একটু চুপ থাকেন। তারপর বলেন, "সাবধানে থেকো।"
তিথি জানে, মা ভয় পান। মা জানেন তিথি কী লেখে। মা পড়েন তিথির রিপোর্ট। মা দেখেন কমেন্ট সেকশনে কী লেখা হয়। মা রাতে ঘুমাতে পারেন না। মেয়ে ঢাকায় একা, সাংবাদিকতা করে, ধর্ষণ-হয়রানির খবর লেখে, হুমকি পায়।
বাবা একবার বলেছিলেন, "তিথি, অন্য কিছু করো। স্কুলে পড়াও। এনজিওতে চাকরি করো। সাংবাদিকতা মেয়েদের জন্য বিপদ।"
তিথি বলেছিল, "বাবা, মেয়েরা সাংবাদিকতা না করলে মেয়েদের খবর কে লিখবে?"
বাবা চুপ হয়ে গেছিলেন। বুঝেছিলেন কিনা তিথি জানে না। কিন্তু আর বাধা দেননি।
তিথির বেতন মাসে বিশ হাজার টাকা। প্রতিচ্ছবি নিউজ ছোট পোর্টাল। বিজ্ঞাপন কম। রেভিনিউ কম। তাই বেতনও কম। তিথির ব্যাচমেটরা, যারা বড় পত্রিকায় বা টিভিতে কাজ করে, তারা পঞ্চাশ-ষাট হাজার পায়। তিথি বিশ হাজার। কিন্তু তিথি ওই পোর্টালে থাকে কারণ এখানে সে যা লিখতে চায় তা লিখতে পারে। সম্পাদক বাধা দেন না। সেন্সর করেন না। "লেখো। যেটা সত্য সেটা লেখো।"
এই স্বাধীনতাটা তিথির কাছে বেতনের চেয়ে বেশি দামি।
৭
তিথি লেখে ধর্ষণের খবর।
প্রতিটা ধর্ষণের খবর লেখার সময় তিথি মরে একটু। ভেতরে কিছু একটা ক্ষয় হয়। মেয়েটার চোখের দিকে তাকালে ক্ষয় হয়। মেয়েটার মায়ের কান্না শুনলে ক্ষয় হয়। পুলিশের উদাসীনতা দেখলে ক্ষয় হয়। আদালতের বিলম্ব দেখলে ক্ষয় হয়। সমাজের "মেয়েটাও তো..." শুনলে ক্ষয় হয়।
তিথি একটা হিসাব রাখে। তিন বছরে কতটা ধর্ষণের রিপোর্ট করেছে? একশো সাতানব্বইটা। একশো সাতানব্বইটা ধর্ষণ। তিন বছরে। শুধু তিথির রিপোর্ট করা। সব ঘটনা রিপোর্ট হয় না। হয়তো দশ ভাগের একভাগ হয়। তার মানে সত্যিকারের সংখ্যা কত?
তিথি হিসাব করে না। করলে পাগল হয়ে যাবে।
তিথি লেখে এসিড নিক্ষেপের খবর। একটা মেয়ে, বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। ছেলেটা এসিড ছুড়ে দিয়েছে মুখে। মেয়েটার বাম চোখ গেছে। গালের চামড়া গলে গেছে। হাসপাতালে। তিথি গেছে। মেয়েটার বিছানার পাশে বসেছে। মেয়েটা কথা বলতে পারে না, ঠোঁট পুড়ে গেছে। চোখ দিয়ে তাকিয়ে আছে। একটা চোখ। সেই চোখে কী আছে? ব্যথা? রাগ? প্রশ্ন?
তিথি জানে না। শুধু জানে, সেই চোখ তার ক্যামেরায় তোলা ছবিতে আছে। পোর্টালে প্রকাশিত রিপোর্টে আছে। পৃথিবী দেখেছে। পৃথিবী দেখেও কিছু করেনি।
তিথি লেখে বাল্যবিবাহর খবর। এগারো বছরের মেয়ে, ত্রিশ বছরের পুরুষের সাথে বিয়ে। কাজী বিয়ে পড়িয়েছে, জন্ম তারিখ বদলে দিয়েছে কাগজে। মেয়েটার শরীর তৈরি হয়নি সন্তান ধারণের জন্য। তবু সে মা হবে। পনেরো বছর বয়সে। ষোলোয়। তারপর?
তারপর তিথি আরেকটা রিপোর্ট লিখবে। একজন কিশোরী মা মারা গেছে প্রসবকালীন জটিলতায়।
৮
"এসব লিখে কী হবে?"
এই প্রশ্নটা তিথি সবচেয়ে বেশি শোনে। অনলাইনে। অফলাইনে। পরিবারে। বন্ধুদের কাছে।
"এসব লিখে কী হবে? সমাজ কি বদলাবে? ধর্ষণ কি বন্ধ হবে? এসিড কি বন্ধ হবে?"
তিথি উত্তর দেয়।
"হবে না। আমার একটা রিপোর্টে সমাজ বদলাবে না। কিন্তু না লিখলে মানুষ জানবে না। মানুষ না জানলে চাপ তৈরি হবে না। চাপ তৈরি না হলে কেউ কিছু করবে না। আমি লিখি যেন মানুষ জানে। জানার পর কী করবে, সেটা মানুষের ব্যাপার। কিন্তু জানানোর দায়িত্ব আমার।"
কেউ কেউ বলে, "তুমি তো ক্লিকবেইট করো। সেনসেশনাল খবর লেখো।"
তিথি বলে, "একটা মেয়ের ধর্ষণ সেনসেশনাল? এটা তো বাস্তবতা। বাস্তবতা সেনসেশনাল হলে সেটা আমার দোষ না, সমাজের দোষ।"
কেউ কেউ বলে, "তুমি পুরুষবিদ্বেষী। সব রিপোর্টে পুরুষ খারাপ।"
তিথি বলে, "আমি পুরুষবিদ্বেষী না। আমি সহিংসতাবিদ্বেষী। যে সহিংসতা করে সে পুরুষ হলে আমি পুরুষের কথা লিখব। নারী হলে নারীর কথা লিখব। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত পুরুষ। এটা আমার সৃষ্টি না, এটা পরিসংখ্যান।"
৯
রাতে তিথি বাসায় ফেরে।
নতুন মেস। মোহাম্মদপুর। একটা ছোট রুম। বিছানা, টেবিল, চেয়ার, আলমারি। দেওয়ালে একটা ছবি। তিথির বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনের ছবি। মা-বাবার সাথে। তিথি গাউন পরা। হাসছে।
সেই হাসিটা এখন কম আসে। তিথি জানে। আয়নায় নিজেকে দেখে জানে। চোখের নিচে কালো দাগ। গাল শুকিয়ে গেছে। চুলে যত্ন নেওয়ার সময় নেই। আটাশ বছর, কিন্তু মুখ দেখে তিরিশ-বত্রিশ মনে হয়।
তিথি রান্না করে। ভাত আর ডাল। একা খায়। ফোনে খবর দেখে। আজকের পোর্টালের ট্রাফিক কেমন? সেই গার্মেন্টসের রিপোর্ট কতজন পড়েছে? দুই হাজার ভিউ। ভালো না। তিথির সবচেয়ে বেশি পড়া রিপোর্ট, সেই এমপির ছেলেরটা, সেটা তিন লাখ ভিউ পেয়েছিল।
তিথি ভাত খেতে খেতে ভাবে। তিন লাখ মানুষ পড়েছে। তিন লাখ মানুষ জেনেছে। কিন্তু কতজন কিছু করেছে? কতজন প্রতিবাদ করেছে? কতজন অভিযুক্তের শাস্তি দাবি করেছে?
তিথি জানে না। তিথি শুধু জানে, সে আবার লিখবে। কাল সকালে। নতুন রিপোর্ট। নতুন ঘটনা। নতুন মেয়ে। নতুন কান্না।
১০
তিথির একটা কথা আছে।
কথাটা বলে নিজেকে। প্রতিদিন সকালে। ফোনের গালি পড়ার পর। হুমকি পড়ার পর। ব্লক করার পর।
"কলম ধরি মেয়ে বলে। কলম চালাই সাংবাদিক বলে।"
মেয়ে বলেই কলম ধরেছে। কারণ মেয়ে না হলে বুঝত না মেয়েদের কষ্ট। বুঝত না ধর্ষণের পর থানায় গেলে কী প্রশ্ন শুনতে হয়। বুঝত না এসিড খাওয়ার পর সমাজ কী বলে। বুঝত না বাল্যবিবাহর রাতে একটা শিশুর শরীরে কী ঘটে।
কিন্তু কলম চালায় সাংবাদিক বলে। মেয়ে বলে না। সাংবাদিক বলে। সাংবাদিকের দায়িত্ব সত্য লেখা। সত্য তিক্ত হলেও। সত্য বিপজ্জনক হলেও। সত্য কেউ পড়তে না চাইলেও।
তিথি কলম চালায়। ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালায়। প্রতিদিন। প্রতিটা রিপোর্টে। প্রতিটা শব্দে।
মিরপুরের অফিসে ভোরের আলো পড়ে। তিথি ডেস্কে বসে। সামনে ল্যাপটপ। পাশে চায়ের কাপ। ফোনে একটা মিসড কল। অচেনা নম্বর। হুমকি হতে পারে। নতুন খবর হতে পারে। দুটোই হতে পারে।
তিথি ফোন তোলে। ডায়াল করে।
"হ্যালো, আমি তিথি। প্রতিচ্ছবি নিউজ থেকে।"