আইনজীবী

আবেগ না, স্যার। এটা আইন।

পর্ব ২৫ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

সালমার ব্রিফকেস চামড়ার।

পুরোনো চামড়া। বাবার ছিল। বাবাও আইনজীবী ছিলেন। জেলা কোর্টে প্র্যাকটিস করতেন। বরিশালে। বাবা মারা গেছেন পনেরো বছর আগে। ব্রিফকেসটা রেখে গেছেন। ভেতরে বাবার নাম খোদাই করা ছিল, ইংরেজিতে: "Advocate Abdur Rahim।" সালমা সেই নামের পাশে নিজের নাম লিখেছে: "Advocate Salma Rahim।"

ব্রিফকেস খুললে ভেতরে চামড়ার গন্ধ পাওয়া যায়। পুরোনো কাগজের গন্ধ। আইনের গন্ধ। ন্যায়ের গন্ধ? সালমা জানে না। আইন আর ন্যায় সবসময় এক জিনিস না।

সালমার বয়স চল্লিশ। হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন। বিশেষত্ব: পারিবারিক আইন, সম্পত্তি আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন আইন। মক্কেলদের বেশিরভাগ মহিলা। যৌতুক মামলা, ভরণপোষণ মামলা, সন্তানের অভিভাবকত্ব মামলা, বিধবার সম্পত্তি দখল মামলা।

সালমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পাশ করেছেন। এলএলবি, তারপর এলএলএম। বার কাউন্সিলে এনরোল করেছেন ২০১০ সালে। প্রথমে জুনিয়র ছিলেন একজন সিনিয়র আইনজীবীর কাছে। চার বছর জুনিয়র থাকার পর স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন।

সকাল নয়টায় সালমা চেম্বারে আসেন।

চেম্বার মানে সুপ্রিম কোর্ট বারের কাছে একটা ছোট অফিস। দুটো রুম। একটায় সালমা বসেন, আরেকটায় জুনিয়র দুজন আর একজন কেরানি। চেম্বারের ভাড়া মাসে পঁচিশ হাজার। ঢাকায় সুপ্রিম কোর্টের কাছে এর চেয়ে সস্তায় অফিস পাওয়া যায় না।

আজকের তালিকায় তিনটা মামলা। প্রথমটা দশটায়। যৌতুক মামলা। মক্কেল: রেশমা, তিরিশ বছর। স্বামী যৌতুকের জন্য মেরেছে। মোটরসাইকেল চেয়েছিল। রেশমার বাবা দিতে পারেননি। স্বামী মেরেছে, বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। রেশমা বাবার বাড়িতে ফিরে গেছে। সাথে দুটো বাচ্চা।

সালমা মামলা করেছেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ধারা ১১। যৌতুকের জন্য নির্যাতন। সাথে ভরণপোষণ দাবি। আর সন্তানের অভিভাবকত্বের আবেদন।

রেশমা আজ কোর্টে আসবেন। সাক্ষ্য দেবেন। সালমা রেশমাকে আগে বুঝিয়ে দিয়েছেন কী বলতে হবে, কীভাবে বলতে হবে। "সত্যি কথা বলবেন। কিন্তু শান্তভাবে। কাঁদলে কোর্ট বুঝবে আপনি আবেগপ্রবণ। না কাঁদলে কোর্ট বুঝবে আপনি শক্ত। দুটোই সমস্যা। তাই স্বাভাবিক থাকুন। যা হয়েছে তা বলুন।"

রেশমা বলেছিলেন, "আপা, আমি পারব?"

সালমা বলেছিলেন, "পারবেন। আমি পাশে আছি।"

কোর্টরুমে সালমা ঢোকেন।

কালো গাউন। সাদা ব্যান্ড। বাবার ব্রিফকেস হাতে। পেছনে জুনিয়র, ফাইল নিয়ে। কোর্টরুমে বিচারক বসে আছেন। প্রতিপক্ষের আইনজীবী বসে আছেন। রেশমার স্বামীও আছে, পেছনের বেঞ্চে।

সালমা দাঁড়ান। "মাই লর্ড, অভিযোগকারী রেশমা বেগম সাক্ষ্য দিতে চান।"

রেশমা দাঁড়ান। হাত কাঁপছে। কিন্তু গলা কাঁপছে না। সালমা শিখিয়েছেন।

রেশমা বলেন। বিয়ের পর থেকে যৌতুকের দাবি। প্রথমে টিভি চেয়েছিল। বাবা দিয়েছিলেন। তারপর ফ্রিজ। বাবা ঋণ করে দিয়েছিলেন। তারপর মোটরসাইকেল। বাবা পারেননি। তারপর মার শুরু। হাত দিয়ে। পা দিয়ে। বেল্ট দিয়ে। একবার গরম পানি ছুড়ে দিয়েছিল বাম হাতে।

রেশমা বাম হাতটা দেখালেন। পোড়ার দাগ। কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত।

প্রতিপক্ষের আইনজীবী জেরা করলেন। "আপনি কি নিজে থেকে বাড়ি ছেড়ে এসেছেন?"

রেশমা বললেন, "না। আমাকে বের করে দিয়েছে।"

"আপনার স্বামী কি আপনাকে ভরণপোষণ দিতেন?"

"না।"

"আপনার কি কোনো আয় আছে?"

"না।"

প্রতিপক্ষের আইনজীবী বিচারকের দিকে তাকালেন। "মাই লর্ড, অভিযোগকারীর কোনো আয় নেই। তিনি পুরোপুরি বাবার ওপর নির্ভরশীল। এই মামলা করে তিনি স্বামীর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছেন।"

সালমা দাঁড়ালেন। "মাই লর্ড, স্ত্রীর আয় না থাকা স্বামীর অপরাধ কমায় না। বরং এটা প্রমাণ করে যে স্ত্রী সম্পূর্ণভাবে স্বামীর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, এবং স্বামী সেই নির্ভরশীলতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। অভিযোগকারীর হাতের পোড়ার দাগ মেডিকেল রিপোর্টে নথিবদ্ধ।"

বিচারক পরবর্তী তারিখ দিলেন। মামলা চলবে।

দ্বিতীয় মামলা। দুপুর বারোটায়।

বিধবার সম্পত্তি দখল। মক্কেল: হালিমা, ষাট বছর। স্বামী মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। স্বামীর নামে একটা বাড়ি ছিল, গাজীপুরে। পাঁচ কাঠা। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর ভাই বাড়ি দখল করেছেন। হালিমাকে বলেছেন, "ভাবি, আপনি মেয়ের বাড়ি যান।"

হালিমার একটাই মেয়ে। মেয়ে ঢাকায় থাকে। ছোট ফ্ল্যাট। স্বামী আর দুই বাচ্চা নিয়ে। হালিমা গেলে ঘরে জায়গা হবে না। হালিমা নিজের বাড়িতে থাকতে চান। নিজের বাড়ি মানে স্বামীর বাড়ি। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর আইনত সেই বাড়িতে হালিমার অংশ আছে।

সালমা হিসাব করেছেন। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী পান সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ (সন্তান থাকলে)। হালিমার একটি কন্যাসন্তান। কন্যা পান সম্পত্তির অর্ধেক। বাকিটা স্বামীর ভাই পান। কিন্তু স্বামীর ভাই পুরোটা দখল করে নিয়েছেন। হালিমার অংশ দেননি।

কোর্টে সালমা দাঁড়ালেন। তথ্য দিলেন। জমির দলিল দেখালেন। উত্তরাধিকার সনদ দেখালেন। মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখালেন (হালিমার বয়স প্রমাণের জন্য)।

প্রতিপক্ষের আইনজীবী বললেন, "মাই লর্ড, জমিটা আমার মক্কেল (স্বামীর ভাই) দেখাশোনা করেছেন। ভাবিকে থাকতে দিয়েছিলেন। ভাবি নিজেই চলে গেছেন।"

সালমা বললেন, "মাই লর্ড, 'চলে গেছেন' না, 'বের করে দিয়েছেন।' আমার মক্কেলের সাক্ষ্য আছে। প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য আছে। আমার মক্কেলের ঘরের তালা বদলে দেওয়া হয়েছিল। তার জিনিসপত্র বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এটা উচ্ছেদ।"

হালিমা কোর্টরুমে বসে ছিলেন। পুরোনো শাড়ি। হাতে তসবিহ। চোখে পানি, কিন্তু কাঁদছিলেন না। সালমাকে বলেছিলেন, "বাবা, আমার ঘরটা ফেরত পাব তো?"

সালমা বলেছিলেন, "চেষ্টা করব, আম্মা।"

"চেষ্টা করব" বলেন। "পাবেন" বলেন না। কারণ সালমা জানেন, আইনে পাওনা থাকলেও পাওয়া নিশ্চিত না। মামলা চলবে দুই বছর, তিন বছর, পাঁচ বছর। হালিমার বয়স ষাট। পাঁচ বছরে পঁয়ষট্টি। বাড়ি ফিরে পাবেন কিনা জানেন না। বেঁচে থাকবেন কিনা জানেন না।

তৃতীয় মামলা। বিকেল তিনটায়।

সন্তানের অভিভাবকত্ব। মক্কেল: নিলুফার, বত্রিশ বছর। তালাক হয়ে গেছে। একটা ছেলে, ছয় বছর। স্বামী ছেলেকে নিয়ে গেছে। নিলুফার ছেলেকে ফেরত চান।

মুসলিম পারিবারিক আইনে মায়ের হেফাজতের অধিকার আছে। ছেলে সাত বছর পর্যন্ত মায়ের কাছে থাকে (হানাফি মতে)। মেয়ে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত। কিন্তু আদালত সন্তানের "কল্যাণ" (best interest) বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।

সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হলো, "কল্যাণ" কে নির্ধারণ করবে? বিচারক। বিচারক পুরুষ হলে কীভাবে দেখেন? "বাবা আর্থিকভাবে সক্ষম। মা না। তাহলে বাবার কাছে থাকলে বাচ্চার কল্যাণ বেশি।"

সালমা এই যুক্তির বিরুদ্ধে লড়েন। "মাই লর্ড, অর্থনৈতিক সক্ষমতা অভিভাবকত্বের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। শিশুর আবেগের প্রয়োজন, শিশুর মায়ের সাথে বন্ধন, এগুলোও বিবেচনা করতে হবে। আমার মক্কেল একটা ছয় বছরের শিশুর মা। শিশুটা মায়ের কাছে থাকতে চায়।"

বিচারক বললেন, "আপা, আবেগ দিয়ে আইন চলে না।"

সালমা বললেন, "আমি আবেগের কথা বলছি না, স্যার। আমি শিশুর অধিকারের কথা বলছি। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ধারা তিন: শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ সবার আগে বিবেচ্য। আর বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষরকারী।"

বিচারক মুচকি হাসলেন। "আপা, এত emotional হবেন না।"

সালমা থামলেন। শ্বাস নিলেন। তারপর বললেন।

"আবেগ না, স্যার। এটা আইন।"

"আবেগ না, এটা আইন।"

এই বাক্যটা সালমা বলেন প্রায়ই। কোর্টে। চেম্বারে। মক্কেলদের সামনে। নিজের কাছে।

কারণ পুরুষেরা, বিচারক থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষের আইনজীবী পর্যন্ত, সালমাকে "আবেগপ্রবণ" বলেন যখনই সালমা জোরে কথা বলেন। যখনই সালমা দৃঢ়ভাবে যুক্তি দেন। যখনই সালমা ছাড় দেন না।

পুরুষ আইনজীবী জোরে কথা বললে সেটা "বলিষ্ঠ।" মহিলা আইনজীবী জোরে কথা বললে সেটা "আবেগপ্রবণ।" পুরুষ আইনজীবী টেবিলে হাত মারলে সেটা "প্রতিবাদ।" মহিলা আইনজীবী কণ্ঠ উঁচু করলে সেটা "হিস্টিরিয়া।"

সালমা জানেন এই খেলা। পনেরো বছর ধরে খেলেন। প্রতিদিন।

সালমার মক্কেলরা বেশিরভাগ মহিলা। তারা আসেন কারণ সালমা মহিলা। তারা বলেন, "আপনি মেয়ে, আপনি বুঝবেন।"

সালমা বোঝেন। হ্যাঁ, বোঝেন। যৌতুকের যন্ত্রণা বোঝেন। কারণ সালমার নিজের বিয়েতেও যৌতুকের প্রশ্ন উঠেছিল। শ্বশুরবাড়ির মানুষ বলেছিল, "মেয়ে আইনজীবী, ভালো কথা, কিন্তু বিয়েতে কিছু তো আসবে।" সালমার বাবা দিয়েছিলেন। সালমা বাধা দিতে চেয়েছিলেন, বাবা বলেছিলেন, "থাক, সমাজে চলতে হয়।"

ভরণপোষণের যন্ত্রণা বোঝেন। কারণ সালমা দেখেছেন, একজন মহিলা বাচ্চা নিয়ে কীভাবে চালান সংসার যখন স্বামী তালাক দিয়ে আরেকটা বিয়ে করে ফেলে।

সন্তান ছিনিয়ে নেওয়ার যন্ত্রণা বোঝেন। কারণ সালমা নিজে মা। দুটো সন্তান। ছেলে বারো, মেয়ে নয়। সন্তান থেকে আলাদা হওয়ার কল্পনাই সালমাকে ভেতর থেকে ছিঁড়ে ফেলে।

সালমার সবচেয়ে কঠিন মামলাটা ছিল তিন বছর আগে।

একজন মহিলা, নাম জোবেদা। গ্রামের মহিলা। স্বামী মারা গেছে। জমি ছিল আট বিঘা। স্বামীর নামে। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর চাচাতো ভাইরা জমি দখল করেছে। জোবেদার কোনো ছেলে নেই, তিনটা মেয়ে। "ছেলে নাই, জমি পাবে না।" এটা গ্রামের আইন। এটা আসল আইন না, কিন্তু গ্রামে এটাই চলে।

জোবেদা আইনত জমির অংশ পান। মেয়েরাও পায়। কিন্তু কাগজে যা আছে আর বাস্তবে যা ঘটে, সেটা আলাদা।

সালমা মামলা করেছিলেন। জেলা কোর্টে। প্রতিপক্ষের আইনজীবী বলেছিলেন, "জমি চাচাতো ভাইরা চাষ করেন। জোবেদা চাষ করতে পারবেন না। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলে তারা চলে যাবে। জমি পতিত পড়বে।"

সালমা বলেছিলেন, "জমি চাষ করতে পারা বা না পারা সম্পত্তির অধিকারের শর্ত না। আমার মক্কেলের আইনি অধিকার আছে। তিনি জমি ভাড়া দিতে পারেন, বিক্রি করতে পারেন, যেভাবে খুশি ব্যবহার করতে পারেন। এটা তার সিদ্ধান্ত।"

মামলা চলেছিল দুই বছর। সালমা জিতেছিলেন। কোর্ট রায় দিয়েছিল জোবেদার পক্ষে।

কিন্তু রায় কার্যকর করতে আরো ছয় মাস লেগেছিল। চাচাতো ভাইরা জমি ছাড়তে চাননি। ডিক্রি জারি করতে হয়েছিল। বেইলিফ পাঠাতে হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা নিতে হয়েছিল।

জোবেদা জমি ফিরে পেয়েছিলেন। সালমাকে ফোন করেছিলেন। "আপা, আমার জমি ফেরত পেয়েছি। আমার মেয়েরা এখন ক্ষেতে ধান বুনছে।"

সালমা সেদিন চেম্বারে বসে চোখ মুছেছিলেন। কেরানি দেখেছিল। কিছু বলেনি।

সালমার ক্লায়েন্টদের বেশিরভাগ গরিব।

ধনী মহিলারাও আসেন। কিন্তু কম। ধনী মহিলাদের পরিবার নিজেরা সমাধান করে। টাকা দিয়ে, ক্ষমতা দিয়ে, সম্পর্ক দিয়ে। গরিব মহিলাদের কিছু নেই। শুধু আইন আছে। আর আইন পেতে আইনজীবী লাগে।

সালমা ফি কম নেন। বাজারের অর্ধেক। কখনো ফ্রি। কখনো মক্কেল বলেন, "আপা, টাকা নাই।" সালমা বলেন, "থাকুক। মামলা করি। টাকা পরে দেবেন। না দিলেও চলবে।"

সালমার জুনিয়র মাহমুদ একবার বলেছিল, "আপা, এভাবে ফ্রি কেস করলে আমাদের চেম্বার চলবে কীভাবে?"

সালমা বলেছিলেন, "চলবে। যেভাবে হোক চলবে। কিন্তু একজন মহিলা যৌতুকের জন্য মার খেয়ে আমার কাছে আসবে, আর আমি বলব 'টাকা দেন', এটা আমি করতে পারব না।"

মাহমুদ বলেছিল, "কিন্তু আমাদের ভাড়া দিতে হয়, বিদ্যুতের বিল দিতে হয়।"

সালমা বলেছিলেন, "যেগুলোতে ফি পাই সেগুলো দিয়ে চলবে। বাকিগুলো, ওটা আমার দায়।"

সালমার আয় মাসে চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার। একজন হাইকোর্টের আইনজীবীর জন্য এটা কম। অনেক কম। সালমার ব্যাচমেটরা, যারা কর্পোরেট আইন করে, তারা লাখে কামায়। ট্যাক্স আইন, কোম্পানি আইন, ব্যাংকিং আইন, এসব লাভজনক। পারিবারিক আইন? মানবাধিকার মামলা? এগুলোতে টাকা কম।

সালমা জানেন। জেনেশুনে এই পথে আছেন।

সন্ধ্যায় সালমা চেম্বার থেকে বের হন।

ব্রিফকেস হাতে। হাঁটতে হাঁটতে রিকশা ধরেন। বাড়ি মোহাম্মদপুরে। স্বামী সরকারি কর্মকর্তা। ভালো মানুষ। সালমার কাজ নিয়ে কখনো আপত্তি করেননি। বলেন, "তুমি ভালো কাজ করো।" এটুকু যথেষ্ট। সালমার বেশি কিছু লাগে না।

বাচ্চারা অপেক্ষা করে। ছেলে আমিন স্কুলের হোমওয়ার্ক করছে। মেয়ে নুসরাত ড্রয়িং করছে। সালমা ঘরে ঢুকলে আমিন বলে, "আম্মা, আজ কোর্টে কী হলো?" আমিন জিজ্ঞেস করে প্রতিদিন। ছেলে বারো বছর, কিন্তু মায়ের কাজে আগ্রহ।

সালমা বলেন, "আজ একটা মায়ের পক্ষে লড়লাম। ছেলেটাকে ফেরত পাওয়ার জন্য।"

আমিন বলে, "পাবে?"

সালমা বলেন, "চেষ্টা করছি।"

নুসরাত বলে, "আম্মা, তুমি কি সবসময় জেতো?"

সালমা হাসেন। "না, মা। সবসময় জিতি না। কিন্তু সবসময় লড়ি।"

রাতে বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেলে সালমা ফাইল নিয়ে বসেন। আগামীকালের মামলার প্রস্তুতি। একটা নতুন কেস। একজন মহিলা, স্বামী অ্যাসিড ছুড়ে দিয়েছে। মহিলার চিকিৎসা চলছে। মামলা করতে চান।

সালমা ফাইল পড়েন। মেডিকেল রিপোর্ট। ছবি। সালমা ছবিটা দেখেন। তারপর ফাইল বন্ধ করেন। চোখ বন্ধ করেন। একটা দীর্ঘশ্বাস।

তারপর আবার ফাইল খোলেন। পড়েন। নোট করেন। প্রস্তুত হন।

১০

সালমা জানেন, আইন একটা হাতিয়ার।

হাতিয়ার দিয়ে দেওয়াল ভাঙা যায়। কিন্তু দেওয়াল ভেঙে গেলেও পেছনে আরেকটা দেওয়াল থাকে। সমাজের দেওয়াল। সংস্কারের দেওয়াল। "মেয়েরা জমি পায় না" দেওয়াল। "ঘরের কথা ঘরে থাকুক" দেওয়াল। "ছেলে না থাকলে বংশ রক্ষা কে করবে" দেওয়াল।

আইন দিয়ে কোর্টে জেতা যায়। কিন্তু সমাজে জেতা যায় না। কোর্টে রায় হয় মহিলার পক্ষে। বাড়ি ফিরলে সমাজ বলে, "মামলা করেছে স্বামীর বিরুদ্ধে। লজ্জা নাই?"

সালমা এই দ্বন্দ্বের মধ্যে কাজ করেন। প্রতিদিন। প্রতিটা মামলায়। জানেন আইন যথেষ্ট না। জানেন সমাজ বদলাতে সময় লাগবে। দশ বছর, বিশ বছর, পঞ্চাশ বছর। কিন্তু আইন ছাড়া শুরু হবে না। প্রথম পদক্ষেপটা আইনি।

রাত গভীর হয়। সালমা ফাইল গোছান। ব্রিফকেসে রাখেন। বাবার ব্রিফকেস। চামড়ার গন্ধ। পুরোনো কাগজের গন্ধ।

বাবা বলতেন, "আইনজীবী হওয়া মানে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো।" সালমা বাবাকে জিজ্ঞেস করতে চান, "বাবা, ন্যায় কি সত্যিই জেতে?" কিন্তু বাবা নেই। বাবার ব্রিফকেস আছে।

সালমা ব্রিফকেসের ওপর হাত রাখেন। চামড়া মসৃণ হয়ে গেছে বছরের পর বছর ব্যবহারে। কত মামলার কাগজ বয়ে নিয়ে গেছে এই ব্রিফকেস। বাবার মামলা। সালমার মামলা। দুই প্রজন্মের আইন।

আগামীকাল সকাল নয়টায় সালমা আবার চেম্বারে যাবেন। গাউন পরবেন। ব্যান্ড লাগাবেন। ব্রিফকেস হাতে কোর্টরুমে ঢুকবেন।

আবার দাঁড়াবেন। আবার বলবেন।

"আবেগ না, স্যার। এটা আইন।"