বন্ধ্যা নারী
সন্তান না হওয়া আমার অপরাধ না
পারভীন, ৩৩। বিয়ের আট বছর। কোনো সন্তান নেই।
শব্দটা মুখে আনতে পারে না পারভীন। "বন্ধ্যা।" শব্দটা একটা ছুরি। যে ছুরি সমাজ তৈরি করেছে, পরিবার শান দিয়েছে, আর পারভীনের বুকে বসিয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন। আট বছর ধরে। প্রতিটা দিন।
---
বিয়ে হয়েছিল পঁচিশ বছর বয়সে। আরিফের সাথে। আরিফ সরকারি স্কুলের শিক্ষক। মানিকগঞ্জ শহরে। ভালো মানুষ। বিয়ের রাতে পারভীনের হাত কাঁপছিল। আরিফ বলেছিল, "ভয় পেও না। আমি আছি।" পারভীন ভেবেছিল, এই মানুষটার সাথে জীবন কাটবে। সন্তান হবে। সংসার হবে। স্বাভাবিক, সাধারণ, সুন্দর একটা জীবন।
প্রথম বছর কেটে গেল। কিছু হলো না। পারভীন ভাবল, সময় লাগে। সবার একরকম হয় না। দ্বিতীয় বছর। তৃতীয় বছর। কিছু না। শ্বাশুড়ি জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন, "কিছু হচ্ছে না কেন?" প্রতি মাসে। প্রতি মাসে একই প্রশ্ন। পারভীন কী উত্তর দেবে? সে নিজে তো জানে না।
চতুর্থ বছরে ডাক্তার দেখাল। মানিকগঞ্জের সরকারি হাসপাতালে। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। বললেন, "আপনার ওভারিতে সমস্যা আছে। পিসিওএস। চিকিৎসা আছে।" ওষুধ দিলেন। ছয় মাস খেল পারভীন। কিছু হলো না।
পঞ্চম বছরে ঢাকায় গেল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানকার ডাক্তার আরও পরীক্ষা করলেন। বললেন, "আইইউআই ট্রাই করা যায়। খরচ ১৫-২০ হাজার টাকা প্রতিবার।" তিনবার করল পারভীন। তিনবার ব্যর্থ। প্রতিবার একটা আশা, তারপর রক্ত। প্রতিবার একটা ভেঙে পড়া।
তারপর ডাক্তার বললেন সেই শব্দটা। "আইভিএফ।"
"খরচ?"
"তিন লাখ টাকা। কম-বেশি হতে পারে। আর একবারে সফল হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই।"
তিন লাখ। পারভীন শব্দটা শুনল। তিন লাখ। আরিফের মাসিক বেতন ২৮ হাজার টাকা। ভাড়া, খাবার, আরিফের মায়ের ওষুধ, সব বাদ দিলে মাসে জমে পাঁচ-ছয় হাজার। তিন লাখ জমাতে চার বছর লাগবে। যদি কোনো বিপদ না আসে। বিপদ সবসময় আসে।
পারভীন ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে বারান্দায় দাঁড়াল। ঢাকার আকাশ ধূসর। গাড়ির হর্ন। মানুষের ভিড়। পারভীনের মনে হলো, এই শহরে সবার কোনো না কোনো গন্তব্য আছে। সবাই কোথাও যাচ্ছে। পারভীন কোথায় যাবে? তার গন্তব্য কী? একটা সন্তান? তিন লাখ টাকার একটা সন্তান? যেটা হয়তো হবে, হয়তো হবে না?
---
শ্বশুরবাড়িতে ফিরে আসার পর সবকিছু বদলে গেল। না, আস্তে আস্তে বদলায়নি। হঠাৎ করে বদলেছে। যেন কেউ একটা সুইচ টিপে দিয়েছে।
শ্বাশুড়ি আর প্রশ্ন করেন না। এখন সরাসরি বলেন। "তালাক দাও। আবার বিয়ে করো। এই মেয়ে বন্ধ্যা।"
বন্ধ্যা। শব্দটা শ্বাশুড়ির মুখে যেন স্বাভাবিক। যেন একটা সাধারণ বিশেষণ। লম্বা, বেঁটে, কালো, ফর্সা, বন্ধ্যা। যেন এটা পারভীনের একটা বৈশিষ্ট্য, তার চোখের রঙের মতো, তার চুলের ধরনের মতো।
আরিফের বড় ভাই সাত্তার ভাই। তিন ছেলের বাবা। সাত্তার ভাই একদিন আরিফকে বললেন, "ভাই, আম্মা ঠিকই বলছেন। তুই একটু ভাবো।" আরিফ বলল, "ভাবার কিছু নেই। পারভীন আমার বউ।"
পারভীন পাশের ঘরে শুনছিল। আরিফের এই কথাটা শুনে তার চোখ ভিজে গেল। আরিফ তাকে ছাড়বে না। এটা পারভীন জানে। কিন্তু আরিফের চোখের কথা? সেটা কি পারভীন জানে?
জানে।
ঈদের দিন। আরিফের বড় ভাইয়ের ছেলেরা আসে। তিনটা। ছোটটার বয়স তিন। সে আরিফের কোলে উঠতে চায়। আরিফ কোলে নেয়। খেলায়। হাসায়। ছোট ছেলেটা "চাচা, চাচা" বলে ডাকে। আরিফ হাসে। সেই হাসিটা আসল। কিন্তু সেই হাসির পেছনে একটা ছায়া আছে, যেটা শুধু পারভীন দেখতে পায়। অন্য কেউ দেখে না।
সেই ছায়াটার নাম: "আমারও একটা থাকতে পারত।"
আরিফ কখনো বলে না। কখনো বলবে না। কিন্তু চোখ বলে। চোখ সবসময় সত্য বলে। মুখ মিথ্যা বলতে পারে, হাত মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু চোখ পারে না।
পারভীন সেই ঈদের রাতে বাথরুমে গিয়ে কাঁদল। চাপা কান্না। দেওয়ালে মুখ চেপে। যেন কান্নাটাও তার নিজের না, ধার করা।
---
পারভীনের মা আসেন মাঝে মাঝে। মা বলেন, "বাবা, হতাশ হইও না। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো।" পারভীন মায়ের কথা শোনে। মায়ের কথায় সান্ত্বনা আছে। কিন্তু সান্ত্বনা সমাধান না।
পারভীনের বাবা বলেন, "মেয়ে, তোর জামাই ভালো ছেলে। ধরে রাখো।" পারভীন জানে, বাবা ঠিক বলেছেন। আরিফ ভালো। কিন্তু "ভালো" কতদিন টেকে? চাপ বাড়ে। চাপ সবকিছু বদলে দেয়।
পাড়ার মহিলারা কথা বলে পেছনে। পারভীন জানে। পারভীন শোনে। "ওর কপালে সন্তান নেই।" "ছেলে পাগল, বউ ছাড়বে না।" "বন্ধ্যা বউ ঘরে রাখলে বরকত থাকে না।"
বরকত। আরেকটা শব্দ। বরকত মানে কী? বরকত মানে একটা শিশু? বরকত মানে গর্ভধারণ? তাহলে যে নারী গর্ভধারণ করতে পারে না, সে কি অভিশপ্ত? সে কি পাপী?
পারভীন রাতে শুয়ে ভাবে। সে কি কোনো পাপ করেছে? কোন জন্মে? কোন অপরাধ? সে তো মানুষ। সে তো স্বাভাবিক জীবন চেয়েছিল। বিয়ে। সন্তান। সংসার। এটুকু তো সবাই চায়। এটুকু পাওয়া কি এত কঠিন?
হ্যাঁ। কারো কারো জন্য এটুকু কঠিন। কারো কারো জন্য এটুকু অসম্ভব।
---
একদিন আরিফ বাড়িতে ফিরে দেখল পারভীন রান্নাঘরে বসে আছে। চুলা জ্বালানো নেই। রান্না হয়নি। পারভীন শুধু বসে আছে। দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে।
"পারভীন?"
কোনো উত্তর নেই।
"পারভীন, কী হয়েছে?"
পারভীন ধীরে ধীরে মুখ ঘোরাল। চোখ শুকনো। কান্নাও নেই। কান্নার পরের একটা জায়গা আছে, যেখানে আর কান্না আসে না, শুধু একটা শূন্যতা থাকে। পারভীন সেখানে পৌঁছে গেছে।
"আরিফ, তুমি আরেকটা বিয়ে করো।"
আরিফ থমকে গেল। "কী বলছ?"
"করো। তোমার মায়ের কথা ঠিক। তোমার একটা সন্তান দরকার। আমি দিতে পারব না। অন্য কেউ পারবে।"
আরিফ পারভীনের পাশে বসল। মেঝেতে। রান্নাঘরের মেঝে ঠান্ডা। আরিফ পারভীনের হাত ধরল।
"শোনো।"
পারভীন তাকাল।
"আমি তোমাকে বিয়ে করেছি। সন্তানকে না। সন্তান আল্লাহ দিলে ভালো। না দিলেও তোমাকে ছাড়ব না।"
পারভীন বলল, "কিন্তু তোমার চোখ..."
"আমার চোখ কী?"
"ঈদের দিন। ভাতিজাকে কোলে নিয়ে যেভাবে তাকাও..."
আরিফ চুপ করে রইল। অনেকক্ষণ। তারপর বলল, "হ্যাঁ। ইচ্ছা হয়। কষ্ট হয়। কিন্তু কষ্ট মানেই তো ছেড়ে দেওয়া না। কষ্ট মানে সহ্য করা। একসাথে।"
পারভীন কিছু বলল না। আরিফের হাত ধরে রইল। দুজন রান্নাঘরের মেঝেতে বসে রইল। বাইরে মাগরিবের আজান।
---
শ্বাশুড়ি একদিন সরাসরি পারভীনকে বললেন। "তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। আমার ছেলের জীবন নষ্ট করেছ।"
পারভীন বলল, "আম্মা, এটা আমার হাতে নেই।"
"হাতে নেই তো চলে যাও।"
পারভীন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল। বিছানায় বসল। হাতের দিকে তাকাল। এই হাত দিয়ে সে রান্না করে। কাপড় কাচে। ঘর মোছে। আরিফের জামা ইস্ত্রি করে। শ্বাশুড়ির ওষুধ গুলিয়ে দেয়। এই হাত দিয়ে সে সব করে। শুধু একটা জিনিস করতে পারে না: একটা সন্তান ধরতে পারে না।
আর সেই একটা না পারাটাই সব পারাকে মুছে দেয়।
---
আরিফ একদিন বাড়িতে এসে বলল, "পারভীন, আমি একটা কথা ভাবছি।"
পারভীনের বুক কাঁপল। এবার কি...?
"আমরা একটা বাচ্চা দত্তক নিতে পারি।"
পারভীন তাকাল। "দত্তক?"
"হ্যাঁ। এতিমখানায় অনেক শিশু আছে। আমরা একটা শিশুকে ঘরে আনতে পারি।"
পারভীন ভাবল। দত্তক। এই সমাজে? এই পরিবারে? শ্বাশুড়ি কী বলবেন? পাড়া কী বলবে? "পরের বাচ্চা নিয়ে ঘর ভরায়ে কী লাভ?"
কিন্তু আরিফ বলছে। আরিফ, যে আট বছর ধরে পারভীনের পাশে আছে, যে তাকে ছাড়েনি, সেই আরিফ বলছে। পারভীনের চোখ ভিজে এল।
"তোমার মা রাজি হবেন?"
"আম্মাকে রাজি করাব আমি।"
পারভীন কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর বলল, "আরিফ।"
"হ্যাঁ?"
"তুমি কেন এরকম?"
"কেমন?"
"ভালো।"
আরিফ হাসল না। হাসার জায়গা না এটা। বলল, "ভালো না। মানুষ।"
---
রাতে পারভীন ছাদে গেল। মানিকগঞ্জের আকাশে তারা দেখা যায়। ঢাকার মতো না। পারভীন তারাগুলোর দিকে তাকাল।
আট বছর। আট বছর ধরে সে একটা যুদ্ধ লড়ছে। শরীরের সাথে। সমাজের সাথে। নিজের সাথে। এই যুদ্ধে কোনো বিজয় নেই। কোনো পরাজয়ও নেই। শুধু টিকে থাকা। দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর।
সন্তান না হওয়া পারভীনের অপরাধ না। পারভীন জানে। ডাক্তারও জানেন। আরিফও জানে। কিন্তু সমাজ? সমাজ জানে না। সমাজের কাছে সন্তান না হওয়া মানে নারীর দোষ। সবসময়। শত শত বছর ধরে। পুরুষের কোনো দোষ হয় না। পুরুষ পরীক্ষা করায় না। পুরুষকে কেউ "বন্ধ্যা" বলে না। শব্দটাই নারীবাচক।
পারভীন ভাবল, আরিফের কথা ঠিক। দত্তক নেওয়া যায়। একটা শিশু, যার কোনো মা নেই, তাকে মা দেওয়া যায়। এটা কি মাতৃত্ব না? এটা কি ভালোবাসা না? পেটে ধরলেই কি মা? কোলে নিলে কি মা না?
পারভীন জানে না সামনে কী আছে। দত্তক হবে কি না। শ্বাশুড়ি মানবেন কি না। সমাজ কী বলবে। কিন্তু একটা জিনিস পারভীন জানে: সে অপরাধী না। সে কোনো অপরাধ করেনি। তার শরীর একটা কাজ করতে পারেনি, এটা সত্য। কিন্তু না পারা অপরাধ না। না পারা শুধু না পারা।
সমাজ তাকে অপরাধী বানিয়েছে। কিন্তু পারভীন জানে, সে নির্দোষ।
আকাশে একটা তারা খসে পড়ল। পারভীন দেখল। মানুষ বলে, তারা খসলে মানত করতে হয়। পারভীন কোনো মানত করল না। সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল। ছাদে। রাতের বাতাসে।
সন্তান না হওয়া আমার অপরাধ না। কিন্তু সমাজ আমাকে অপরাধী বানিয়েছে।