প্রতিবন্ধী নারী

ইন্টারনেটে সিঁড়ি নেই

পর্ব ২৮ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

শারমিন, ২৫। হুইলচেয়ারে বসে আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছে। সিজিপিএ ৩.৭৮। কিন্তু চাকরি নেই। কারণ, অফিসে সিঁড়ি আছে। র্যাম্প নেই।

---

তিন বছর বয়সে পোলিও হয়েছিল। তখনো বাংলাদেশে পোলিওর টিকা সবজায়গায় পৌঁছায়নি। শারমিনদের গ্রাম সিরাজগঞ্জের একটা চর। যমুনার বুকে জেগে ওঠা চর। বর্ষায় ডুবে যায়। শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠে। সেই চরে হাসপাতাল নেই। ডাক্তার নেই। টিকাকর্মী আসেন, কিন্তু সবসময় আসেন না। যমুনা পার হতে হয়। নৌকা লাগে। নৌকা থাকে না সবসময়।

শারমিনের মা বলেন, "জ্বর হইছিল। তিন দিন। তারপর পা কাজ করত না।" এটুকুই। তিন দিনের জ্বর। তারপর একটা আজীবনের অক্ষমতা। তিন দিন আর বাকি জীবন।

শারমিনের বাবা রিকশা চালাতেন সিরাজগঞ্জ শহরে। মেয়ের চিকিৎসায় যা ছিল, সব শেষ। তারপরও মেয়ে হাঁটতে পারল না। ডাক্তার বললেন, "আর সম্ভব না। হুইলচেয়ার লাগবে।"

হুইলচেয়ার। শারমিনের প্রথম হুইলচেয়ার একটা এনজিও দিয়েছিল। পুরোনো। একটা চাকা ঠিকমতো ঘুরত না। কিন্তু সেটাই ছিল শারমিনের পা। সেটাই ছিল তার পৃথিবী ঘোরার উপায়। সেই হুইলচেয়ারে বসে শারমিন প্রথম উঠানের বাইরে গিয়েছিল। রাস্তা দেখেছিল। গাছ দেখেছিল। অন্য বাচ্চাদের দৌড়ানো দেখেছিল। সেদিন শারমিন বুঝেছিল, পৃথিবীটা তার জন্য একটু অন্যরকম। কঠিনতর। কিন্তু দেখার মতো।

---

স্কুলে যাওয়া ছিল যুদ্ধ। প্রতিদিনের যুদ্ধ। প্রাইমারি স্কুল দুই কিলোমিটার দূরে। কাঁচা রাস্তা। বর্ষায় কাদা। হুইলচেয়ারের চাকা কাদায় আটকে যেত। শারমিনের বাবা রোজ সকালে মেয়েকে কোলে করে নিয়ে যেতেন। দুই কিলোমিটার। তারপর রিকশা চালাতে যেতেন। বিকালে আবার আনতে আসতেন।

"বাবা, তুমি ক্লান্ত হও না?" শারমিন একদিন জিজ্ঞেস করেছিল।

বাবা হেসেছিলেন। "তুই পড়বি, আমি থামব না।"

বাবার সেই কথাটা শারমিনের জীবনের ভিত্তি। সেই কথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে সে। পা দিয়ে না, কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে।

ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেল শারমিন। হেডমাস্টার বললেন, "এই মেয়ের মাথায় আলো আছে।" হাই স্কুলে ভর্তি হলো। হাই স্কুলে সিঁড়ি ছিল। ক্লাস ছিল দোতলায়। প্রথম দিন শারমিন স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে, না, বসে, হুইলচেয়ারে বসে সিঁড়ির দিকে তাকাল। সতেরোটা সিঁড়ি। সতেরোটা। প্রতিটা সিঁড়ি একটা পাহাড়।

শারমিনের বাবা হেডমাস্টারকে অনুরোধ করলেন, "ক্লাস কি নিচতলায় করা যায়?" হেডমাস্টার রাজি হলেন। নিচতলার একটা ঘরে শারমিনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু বন্ধুরা দোতলায়। টিফিনের সময় সবাই দোতলায় যায়। শারমিন নিচে একা বসে থাকে। একা। সিঁড়ির নিচে।

সেই একাকীত্ব শারমিন চেনে। সেটা তার পুরোনো সঙ্গী।

একটা মেয়ে একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, "তোর পা কেন চলে না?" শারমিন বলেছিল, "অসুখ হয়েছিল।" মেয়েটা বলেছিল, "তুই কি কোনোদিন হাঁটতে পারবি?" শারমিন বলেছিল, "না।" মেয়েটা চলে গিয়েছিল। পরে আর কথা বলেনি। বাচ্চারা নিষ্ঠুর না। বাচ্চারা সত্য বলে। আর সত্য কখনো কখনো নিষ্ঠুর।

শারমিনের মা একবার বলেছিলেন, "মা, তুই যদি হাঁটতে পারতিস..." তারপর থেমে গিয়েছিলেন। বাক্য শেষ করেননি। শেষ করার দরকার নেই। শারমিনও "যদি" ভাবে। কিন্তু "যদি" একটা অসম্ভব শব্দ। "যদি" নিয়ে বসে থাকলে জীবন চলে না। শারমিন "যদি" ছেড়ে দিয়েছে। সে "যা আছে" নিয়ে চলে।

---

এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেল। এইচএসসিতে জিপিএ ৫। ভর্তি পরীক্ষায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেল। সমাজবিজ্ঞান বিভাগ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার দিন শারমিনের মা কাঁদলেন। "এত দূরে? একা? হুইলচেয়ারে?" বাবা বললেন, "যাবে। পড়বে। আমি রিকশা চালায়ে খরচ জোগাব।"

জাহাঙ্গীরনগরের ক্যাম্পাস সুন্দর। গাছে ভরা। পাখি ডাকে। কিন্তু র্যাম্প কম। লিফট নেই বেশিরভাগ বিল্ডিংয়ে। হলে যেতে হলে একটা ঢাল ভাঙতে হয়। লাইব্রেরিতে যেতে তিনটা সিঁড়ি। ক্যান্টিনে দুটো। শারমিন হিসাব রাখত। কোথায় কয়টা সিঁড়ি। কোন পথে গেলে কম সিঁড়ি। সে একটা মানসিক মানচিত্র তৈরি করেছিল, যেটায় সিঁড়ি চিহ্নিত। যেমন মাইনফিল্ড চিহ্নিত করা হয় যুদ্ধের মাঠে।

ক্লাসের বন্ধুরা সাহায্য করত। হুইলচেয়ার ঠেলে দিত। সিঁড়িতে তুলে দিত। শারমিন কৃতজ্ঞ ছিল। কিন্তু কৃতজ্ঞতা একটা ক্লান্তিকর অনুভূতি। প্রতিদিন কৃতজ্ঞ থাকতে হয়। প্রতিদিন অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। শারমিন চাইত, সে নিজে পারুক। নিজের শক্তিতে। কিন্তু সিঁড়ি তো নিজের শক্তিতে ভাঙা যায় না। সিঁড়ি তো সমাজ বানিয়েছে। সমাজ ভাঙেনি।

একবার সমাজবিজ্ঞানের ক্লাসে প্রফেসর বললেন, "প্রতিবন্ধিতা শরীরে থাকে না। প্রতিবন্ধিতা থাকে সমাজের কাঠামোতে। যখন একটা বিল্ডিংয়ে র্যাম্প নেই, তখন সমাজ প্রতিবন্ধী, ব্যক্তি না।"

শারমিন সেদিন প্রথমবার বুঝল, তার সমস্যা তার পায়ে না। তার সমস্যা সিঁড়িতে।

পরীক্ষার হলেও সমস্যা ছিল। হল দোতলায়। লিফট নেই। চারজন ছেলে শারমিনকে হুইলচেয়ারসহ তুলত। প্রতিটা পরীক্ষায়। প্রতিটা সেমিস্টারে। শারমিন হিসাব করে দেখেছে, চার বছরে সে ১২০ বারের বেশি অন্যের কাঁধে চেপে সিঁড়ি পার হয়েছে। ১২০ বার। প্রতিবার একটা ঋণ। প্রতিবার একটা "ধন্যবাদ।" প্রতিবার একটা চাপা অপমান, যেটা কেউ বোঝে না, কারণ সবাই ভাবে সাহায্য করা মানে ভালো কাজ। ভালো কাজ। হ্যাঁ। কিন্তু র্যাম্প থাকলে এই "ভালো কাজ" এর দরকার হতো না।

কনভোকেশনের দিন শারমিন ক্যাপ-গাউন পরে মঞ্চে উঠেছিল। হুইলচেয়ারে। ভাইস চ্যান্সেলর সনদ দিলেন। ছবি তোলা হলো। বাবা দর্শকসারিতে বসে কাঁদছিলেন। নিঃশব্দে। রিকশাওয়ালার কান্না কেউ দেখেনি।

---

গ্র্যাজুয়েশনের পর চাকরি খুঁজতে শুরু করল শারমিন। সিভি লিখল। সুন্দর সিভি। সিজিপিএ ৩.৭৮। তিনটা গবেষণা প্রকাশনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা শিক্ষার্থীর পুরস্কার। দক্ষতা: বাংলা, ইংরেজি, কম্পিউটার, তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণা পদ্ধতি।

প্রথম ইন্টারভিউ। একটা এনজিও। ঢাকার কাওরান বাজারে অফিস। পুরোনো বিল্ডিং। চারতলায় অফিস। লিফট নেই।

শারমিন বিল্ডিংয়ের সামনে পৌঁছে তাকাল। সিঁড়ি। আবার সিঁড়ি। সে ফোন করল। "আমি শারমিন। ইন্টারভিউয়ের জন্য এসেছি। আমি হুইলচেয়ার ব্যবহার করি। আপনাদের অফিস চারতলায়?"

ওপাশ থেকে একটু চুপ। তারপর, "আসলে... আমরা নিচে এসে আপনার সাথে কথা বলতে পারি।"

"ইন্টারভিউ বোর্ড নিচে আসবে?"

আবার চুপ। "আপনি একটু অপেক্ষা করুন।"

অপেক্ষা। বিশ মিনিট। তারপর একজন নেমে এলেন। বললেন, "আসলে আমাদের এই পদের জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে হয়। আপনার পক্ষে কি..."

শারমিন বুঝে গেল। বাক্য শেষ হওয়ার আগেই বুঝে গেল। তারা তাকে চায় না। তার সিভি দেখে ডেকেছে। তার শরীর দেখে ফিরিয়ে দিচ্ছে।

"ধন্যবাদ।" শারমিন বলল। ঘুরে গেল। হুইলচেয়ার ঠেলে রাস্তায় নামল। ঢাকার ফুটপাথ অসমান। ইটভাঙা। গর্ত আছে। ম্যানহোলের ঢাকনা নেই কোথাও কোথাও। একজন সুস্থ মানুষের জন্যও এই ফুটপাথ বিপজ্জনক। হুইলচেয়ারে? শারমিন প্রতিটা ইঞ্চি সামলে সামলে চলে। একটা চাকা গর্তে পড়লে সে পড়ে যাবে। কেউ তুলবে। মানুষ ভালো, তুলবে। কিন্তু পড়াটা? পড়াটা প্রতিবার একটা অপমান।

সেদিন বাসায় ফিরে শারমিন অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। রুমমেট জিজ্ঞেস করল, "ইন্টারভিউ কেমন হলো?" শারমিন বলল, "ইন্টারভিউ হয়নি। সিঁড়ি হয়েছে।"

---

দ্বিতীয় ইন্টারভিউ। তৃতীয়। চতুর্থ। পঞ্চম। প্রতিবার একই গল্প। সিঁড়ি। লিফট নেই। "মাঠ পর্যায়ে কাজ।" "আমাদের অফিসে হুইলচেয়ার চলাচলের ব্যবস্থা নেই।" "আপনি কি বাসায় বসে কাজ করতে পারবেন?" "আমাদের বাজেটে অ্যাক্সেসিবিলিটি সুবিধা নেই।"

একটা একটা করে দরজা বন্ধ হচ্ছে। একটা একটা করে। শারমিন গুনে রাখে। পাঁচটা ইন্টারভিউ কল। পাঁচটা প্রত্যাখ্যান। কোনোটাতে তার সিভি নিয়ে একটা প্রশ্নও করা হয়নি। তার গবেষণা? কেউ পড়েনি। তার সিজিপিএ? কেউ দেখেনি। সবাই দেখেছে হুইলচেয়ার।

শারমিন একদিন রাতে নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপ খুলল। সিভিটা আবার পড়ল। সিজিপিএ ৩.৭৮। গবেষণা প্রকাশনা। পুরস্কার। দক্ষতা। সব আছে। সব কিছু আছে। শুধু পা নেই।

আমার মস্তিষ্ক চলে। পা চলে না। কিন্তু চাকরিদাতারা পা দেখে, মস্তিষ্ক দেখে না।

শারমিন ল্যাপটপটা বন্ধ করল। ছাদে যেতে চাইল। ছাদে গেলে আকাশ দেখা যায়, বাতাস লাগে, মাথা পরিষ্কার হয়। কিন্তু ছাদে যেতে পারে না। সিঁড়ি আছে। সিঁড়ি সবজায়গায়। জানালার পাশে বসল।

বাইরে ঢাকার রাত। গাড়ির শব্দ। মানুষের হাঁটার শব্দ। সবাই হাঁটছে। সবাই কোথাও যাচ্ছে। শারমিন জানালার পাশে বসে আছে।

---

একদিন শারমিনের বিশ্ববিদ্যালয়ের বান্ধবী রুমা ফোন করল।

"শারমিন, তুই কি অনলাইনে টিউশনি করতে পারবি?"

"কেমন?"

"জুমে। আমার এক আত্মীয়ের মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। সমাজবিজ্ঞান আর ইংরেজিতে দুর্বল। তুই পড়াতে পারবি?"

শারমিন ভাবল। অনলাইন। মানে কম্পিউটার। মানে ইন্টারনেট। মানে কোনো সিঁড়ি নেই। মানে কোনো ফুটপাথ ভাঙতে হবে না। কোনো ম্যানহোল এড়াতে হবে না। কোনো অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ওপরে তাকাতে হবে না, "চারতলা, লিফট নেই" বলে ফিরে আসতে হবে না।

শারমিনের ল্যাপটপটা পুরোনো। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা প্রজেক্ট থেকে পাওয়া। স্ক্রিনের এক কোণায় একটু আবছা। কিন্তু চলে। ক্যামেরা চলে। মাইক্রোফোন চলে। ইন্টারনেট চলে। এটুকু যথেষ্ট।

"পারব।"

প্রথম ক্লাস হলো। মেয়েটার নাম তানিয়া। চট্টগ্রামে থাকে। স্ক্রিনে শারমিনকে দেখে তানিয়া বলল, "আপু, আপনি কোথায় থাকেন?"

"ঢাকায়।"

"কিন্তু আমি চট্টগ্রামে। এত দূর থেকে পড়াবেন?"

শারমিন হাসল। "ইন্টারনেটে দূর-কাছ নেই।"

তানিয়া পড়ল। ভালো পড়ল। দুই মাসে সমাজবিজ্ঞানে মার্কস ২০ বাড়ল। তানিয়ার মা ফোন করলেন। "আপনি আরও কিছু বাচ্চাদের পড়াতে পারেন? আমার পরিচিতদের মধ্যে অনেকে খুঁজছে।"

শারমিন পড়াতে শুরু করল। একজন, দুজন, পাঁচজন, দশজন। সকাল থেকে রাত। ক্লাসের পর ক্লাস। স্ক্রিনে স্ক্রিনে মুখ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা। সারা বাংলাদেশ।

শারমিন একটা নাম দিল তার এই কাজের। "মুক্তপাঠ।" মুক্ত, কারণ এখানে কোনো দেওয়াল নেই, কোনো সিঁড়ি নেই, কোনো র্যাম্পের দরকার নেই। শুধু একটা স্ক্রিন। আর একটা মস্তিষ্ক। শারমিনের মস্তিষ্ক চলে। সেটাই যথেষ্ট।

---

এখন শারমিনের মাসিক আয় ত্রিশ হাজার টাকা। কোনো অফিস ওকে চাকরি দেয়নি। কোনো অফিস ওর সিভি দেখেনি, ওর পা দেখেছে। কিন্তু শারমিন নিজেই অফিস বানিয়েছে। তার ঘরে। তার ল্যাপটপে। তার স্ক্রিনে।

শারমিনের বাবা এখনো রিকশা চালান। কিন্তু কম চালান। শারমিন বলেছে, "বাবা, এখন আমি পাঠাব। তুমি বিশ্রাম নাও।" বাবা শোনেন না। বলেন, "আমি সুস্থ আছি। চালাব।" কিন্তু চোখে একটা ভেজা ভাব। গর্বের ভেজা ভাব। যেটা বলে, "আমার মেয়ে পেরেছে।"

শারমিনের মা ফোনে বলেন, "মা, তুই ভালো তো?" শারমিন বলে, "ভালো, আম্মা।" এই "ভালো" শব্দটা এখন সত্যি। আগে ছিল না। আগে "ভালো" বলত, কিন্তু ভালো ছিল না। এখন বলে, আর আছেও।

গত মাসে শারমিন একটা ওয়েবসাইট বানিয়েছে। "মুক্তপাঠ ডট কম।" সেখানে অন্য প্রতিবন্ধী শিক্ষকরাও যুক্ত হতে পারবে। শারমিন জানে, তার মতো আরও অনেকে আছে। যাদের মস্তিষ্ক চলে, কিন্তু সিঁড়ি তাদের আটকে রাখে। শারমিন তাদের জন্য একটা পথ খুলতে চায়। সিঁড়িহীন পথ।

একদিন একটা মেয়ে যোগাযোগ করল। নাম নাসরিন। রংপুর থেকে। সেরিব্রাল পালসি। হাত কাঁপে। কিন্তু কথা বলতে পারে। ইংরেজিতে দক্ষ। "আপু, আমিও পড়াতে চাই। কেউ আমাকে চাকরি দেয় না।" শারমিন বলল, "এখানে চাকরি দেওয়া-নেওয়ার ব্যাপার না। এখানে তুমি পড়াবে। তোমার দক্ষতাই তোমার যোগ্যতা।" নাসরিন এখন মুক্তপাঠে ইংরেজি পড়ায়। রংপুর থেকে। তার ঘর থেকে। যেখানে কোনো সিঁড়ি নেই।

আরেকজন এল। ফরিদ। যশোর থেকে। দুর্ঘটনায় একটা পা হারিয়েছে। গণিতে মাস্টার্স। কিন্তু স্কুলে চাকরি পায়নি। "একটা পা নেই, ক্লাসে দাঁড়িয়ে পড়াবে কীভাবে?" স্কুল কমিটির প্রশ্ন ছিল এটা। ফরিদ এখন মুক্তপাঠে বসে পড়ায়। দাঁড়ানোর দরকার নেই। বসেও পড়ানো যায়। শুয়েও পড়ানো যায়। শুধু জানতে হয়।

শারমিন দেখে, মুক্তপাঠ বড় হচ্ছে। তিনজন শিক্ষক। চল্লিশজন ছাত্র। ছোট। কিন্তু শুরু। প্রতিটা বড় জিনিস একসময় ছোট ছিল।

শারমিন একটা স্বপ্ন দেখে। একদিন মুক্তপাঠ শুধু টিউটোরিং না, একটা পুরো প্ল্যাটফর্ম হবে। যেখানে প্রতিবন্ধী মানুষেরা পড়াবে, শিখবে, কাজ করবে। যেখানে প্রতিবন্ধিতা কোনো বিষয়ই না। যেখানে শুধু দক্ষতা বিষয়। এটা স্বপ্ন। কিন্তু শারমিনের পুরো জীবনটাই একটা অসম্ভব স্বপ্ন ছিল। চরের মেয়ে। পোলিও। হুইলচেয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়। সিজিপিএ ৩.৭৮। এর কোনোটাই সম্ভব হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু হয়েছে।

---

রাতে শারমিন তার হুইলচেয়ারে বসে ল্যাপটপ বন্ধ করে। দিনের শেষ ক্লাস শেষ হয়েছে। একটা ছেলে, ক্লাস টেনে পড়ে, সিলেটে থাকে, বলল, "আপু, আপনি সবচেয়ে ভালো টিচার।" শারমিন হাসল। শুধু হাসল।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। ঢাকার রাত। নিয়ন আলো। ফুটপাথে মানুষ হাঁটছে। সিঁড়ি ভাঙছে। দৌড়াচ্ছে। শারমিন জানে, সে কোনোদিন দৌড়াতে পারবে না। কোনোদিন সিঁড়ি ভাঙতে পারবে না পায়ে হেঁটে। কিন্তু শারমিন একটা জিনিস পেরেছে যেটা অনেকে পারে না: সে নিজের পথ নিজে তৈরি করেছে। যেখানে সিঁড়ি নেই। যেখানে র্যাম্পের দরকার নেই। যেখানে শুধু মস্তিষ্ক দরকার।

ইন্টারনেটে সিঁড়ি নেই।

শারমিন হুইলচেয়ার থেকে বিছানায় উঠল। যেভাবে প্রতিদিন ওঠে। হাতের জোরে। পায়ের কোনো সাহায্য ছাড়া। এটাও একটা দক্ষতা। এটাও একটা শক্তি। যেটা কোনো সিভিতে লেখা থাকে না। কোনো চাকরিদাতা দেখে না।

শারমিন বালিশে মাথা রাখল। চোখ বন্ধ করল। কাল সকালে আবার ক্লাস। আবার স্ক্রিন। আবার মুখ। সারা বাংলাদেশের মুখ। যারা তার পা দেখে না। যারা তার মস্তিষ্ক দেখে। যারা তাকে "শারমিন আপু" বলে ডাকে, "প্রতিবন্ধী" বলে না।

ঘুমের আগে শারমিন ভাবল, একদিন এই দেশে সব অফিসে র্যাম্প থাকবে। সব বিল্ডিংয়ে লিফট থাকবে। প্রতিবন্ধী মানুষদের চাকরি দেওয়া হবে তাদের মস্তিষ্ক দেখে, পা দেখে না। সেদিন হয়তো শারমিন বুড়ো হবে। হয়তো থাকবে না। কিন্তু সেদিন আসবে।

আসতে হবে।