চা-বাগানের নারী

আমার মেয়ে চা পাতা তুলবে না। সে চা খাবে।

পর্ব ৩১ · ১২ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

ভোর চারটায় সরস্বতীর ঘুম ভাঙে।

অ্যালার্ম নেই। ঘড়ি নেই। শরীরই ঘড়ি। চার প্রজন্ম ধরে এই শরীর ভোর চারটায় জাগে, যেমন চা গাছ জানে কখন কুঁড়ি দিতে হবে। সরস্বতীর শরীরও জানে। তার ঠাকুমা জানত, তার মা জানত, সে জানে। জানাটা রক্তে মিশে গেছে, হাড়ে বসে গেছে।

শ্রীমঙ্গলের বাগানের ভেতর লাইন ঘর। টিনের চালা, বাঁশের বেড়া, মাটির মেঝে। এক ঘরে সরস্বতী, তার স্বামী মঙ্গল, দুই মেয়ে। বড় মেয়ে লক্ষ্মী, ষোলো। ছোট মেয়ে পার্বতী, বারো। পাশের ঘরে শাশুড়ি। তার পাশের ঘরে জেঠার পরিবার। তার পাশে কাকার পরিবার। পুরো লাইনটাই একই বংশ, একই ভাগ্য, একই চা বাগান।

সরস্বতী মুখ ধোয়। টিউবওয়েলের পানি ঠান্ডা, মার্চের শেষেও। হাত ভেজায়, মুখে ছিটায়। চোখ খোলে। চোখ খোলার অর্থ এখানে ঘুম ভাঙা নয়, দিন শুরু হওয়া। দিন মানে চা পাতা। চা পাতা মানে ১৭০ টাকা। ১৭০ টাকা মানে বেঁচে থাকা।

চুলায় আগুন দেয়। ভাত বসায়। গতকালের তরকারি, একটু গরম করলেই হবে। লক্ষ্মী উঠে এসেছে, চুপচাপ মায়ের পাশে বসে আলু কাটছে। লক্ষ্মী কথা কম বলে। বারো বছর বয়স থেকে বাগানে যায়, মায়ের সাথে পাতা তোলে। চার বছর হয়ে গেল। লক্ষ্মীর হাত দেখলে বোঝা যায়, আঙুলের ডগায় চা পাতার দাগ, গাঢ় সবুজ, যেটা সাবান দিয়ে ওঠে না।

পার্বতী ঘুমাচ্ছে। পার্বতী স্কুলে যায়। ক্লাস সিক্সে পড়ে। সরস্বতী পার্বতীকে ঘুমাতে দেয়। স্কুল আটটায়, তার আগে উঠলেই হবে। পার্বতীর হাতে চা পাতার দাগ নেই। সরস্বতী চায় সেই হাত পরিষ্কার থাকুক।

মঙ্গল ঘুমাচ্ছে। মঙ্গলের শরীর ভালো নেই।

পেটে আলসার। বাগানের ডাক্তার বলেছে ওষুধ খেতে, কিন্তু ওষুধের দাম বেশি। বাগানের ডিসপেনসারিতে প্যারাসিটামল আছে, ব্যান্ডেজ আছে, অ্যান্টিসেপটিক আছে। আলসারের ওষুধ নেই। সেটা বাইরে থেকে কিনতে হয়। বাইরে মানে শ্রীমঙ্গল শহর। শহরে যেতে বাস ভাড়া ত্রিশ টাকা, ওষুধের দাম পাঁচশো। একদিনের মজুরির তিন গুণ। মঙ্গল ওষুধ কেনে না। মঙ্গল ব্যথা সহ্য করে।

সরস্বতী মঙ্গলের দিকে তাকায়। ঘুমের ভেতরেও মঙ্গলের ভ্রু কুঁচকে থাকে, পেটে ব্যথা হচ্ছে নিশ্চয়ই। সরস্বতী ভাবে, মঙ্গল যদি কাজ করতে না পারে, তাহলে কী হবে? তাহলে সরস্বতী আর লক্ষ্মী দুজনে কামাবে, ৩৪০ টাকা। তিন মানুষের খাবার, পার্বতীর স্কুলের খরচ, শাশুড়ির ওষুধ। ৩৪০ টাকায়।

সরস্বতী এই হিসেব মাথায় রাখে। সবসময় রাখে। হিসেব না জানলেও হিসেব রাখতে হয়। বেঁচে থাকার হিসেব কোনো স্কুলে শেখায় না। এটা শরীর শেখে, পেট শেখে, ক্ষুধা শেখে।

লক্ষ্মী চা বানাচ্ছে। চা বাগানের শ্রমিকরা চা খায়, এটা একটা তিক্ত রসিকতা। নিজেদের তোলা পাতা দিয়ে তৈরি চা নয়, সেটা বিক্রি হয়ে যায় শহরের দোকানে, রপ্তানি হয়ে যায় বিদেশে। শ্রমিকরা খায় সস্তা ধুলো চা, যেটা ফ্যাক্টরি থেকে রেশনে পায়। গুঁড়ো চা, দুধ ছাড়া, চিনি সামান্য। এই চায়ের সাথে শহরের চায়ের মিল নেই। এটা শ্রমিকের চা। এটা ভোরের চা। এটা বেঁচে থাকার চা।

বাগানে ঢোকার আগে সারদার ডাক দেয়।

"লাইন ছয়, আজকে সেকশন নয়।"

সরস্বতী ঝুড়ি মাথায় তুলে নেয়। বাঁশের ঝুড়ি, পিঠে বাঁধা, মাথায় ফিতা। এই ঝুড়ি তার ঠাকুমারও ছিল। একই নকশা, একই বাঁশ, একই ওজন। চারটা প্রজন্ম এই ঝুড়ি বয়ে এনেছে। ঝুড়ি বদলায়নি। শুধু পিঠ বদলেছে।

চা গাছের সারি। সবুজ। ঢেউ খেলানো। দূর থেকে দেখলে সুন্দর, পর্যটকেরা ছবি তোলে, "কী অপূর্ব!" কিন্তু ভেতরে ঢুকলে সৌন্দর্য থাকে না। থাকে রোদ, থাকে ঘাম, থাকে পিঁপড়া, থাকে জোঁক। থাকে ঝুঁকে ঝুঁকে পাতা তোলার সেই একঘেয়ে ছন্দ যেটা মেরুদন্ডকে ধীরে ধীরে বাঁকিয়ে দেয়। সরস্বতীর মা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারত না শেষ দিকে। পিঠ বেঁকে গিয়েছিল। চা গাছের উচ্চতায় নিজেকে মাপতে মাপতে শরীর নিজেই সেই উচ্চতা মেনে নিয়েছিল।

দুটো পাতা, একটা কুঁড়ি। এটাই নিয়ম। দুটো পাতা, একটা কুঁড়ি। বেশি তুললে গাছের ক্ষতি। কম তুললে ওজন হবে না। ওজন না হলে মজুরি কাটা যাবে। ন্যূনতম ২৩ কেজি। ২৩ কেজির নিচে হলে দিনটা গোনা হবে না।

সরস্বতীর হাত দ্রুত চলে। বাঁ হাতে ডাল ধরে, ডান হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনীতে টুক করে পাতা ছেঁড়ে। এক সেকেন্ড, একটা ছেঁড়া। ঘণ্টায় প্রায় তিন হাজার। দিনে বিশ হাজারেরও বেশি। কুড়ি বছরে কত হয়? সরস্বতী গুনতে পারে না। সরস্বতী গুনতে শেখেনি। সরস্বতী স্কুলে যায়নি।

দুপুরে ছায়ায় বসে ভাত খায়।

অ্যালুমিনিয়ামের টিফিন বক্স। ভাত, আলু ভর্তা, একটু ডাল। মাংস নেই। মাংস সপ্তাহে একদিন, রবিবারে, যদি পয়সা থাকে। মাছ মাঝে মাঝে। ডিম মাঝে মাঝে। বেশিরভাগ দিন ভাত আর আলু।

পাশে বসে কমলা। কমলার বয়স পঞ্চাশ, সরস্বতীর চেয়ে দশ বছরের বড়। কমলার পিঠ বেঁকে গেছে, ঠিক সরস্বতীর মায়ের মতো। কমলা বলে, "আমার মেয়েও বাগানে আসছে এই সিজন থেকে।"

সরস্বতী চুপ থাকে।

"তোর লক্ষ্মীও তো আসে," কমলা বলে।

"লক্ষ্মী আসে," সরস্বতী বলে। "কিন্তু পার্বতী আসবে না।"

"পার্বতী? ওকে তো স্কুলে দিয়েছিস।"

"হ্যাঁ।"

"স্কুলে কী হবে? শেষে তো বাগানেই আসতে হবে।"

সরস্বতী কমলার দিকে তাকায়। কমলার কথা ভুল নয়। এই বাগানে এমন কেউ নেই যে স্কুল পড়ে বাইরে গেছে। চার প্রজন্ম, একই বাগান, একই ঝুড়ি, একই ১৭০ টাকা। এটাই বাস্তবতা। কিন্তু বাস্তবতা মানলেই কি বাস্তবতা বদলানো যায় না?

"আমার মেয়ে চা পাতা তুলবে না," সরস্বতী বলে। "সে চা খাবে।"

কমলা হাসে। সেই হাসি যেটায় বিশ্বাস নেই, কিন্তু তিরস্কারও নেই। শুধু ক্লান্তি আছে। ক্লান্ত মানুষ স্বপ্নকে হাসি দিয়ে এড়িয়ে যায়।

সরস্বতীর কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই।

এটা অবিশ্বাস্য শোনায়, কিন্তু এটাই সত্য। চা বাগানের আদিবাসী শ্রমিকদের একটা বড় অংশ নথিহীন। ব্রিটিশ আমলে ছোটনাগপুর, সাঁওতাল পরগনা, ওড়িশা থেকে তাদের পূর্বপুরুষদের আনা হয়েছিল। জোর করে, প্রতারণা করে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে। "জমি দেব, বাড়ি দেব।" জমি দেয়নি। বাড়ি দিয়েছে, লাইন ঘর, যেটা বাগানের সম্পত্তি, শ্রমিকের নয়। চার প্রজন্ম পরেও সেই ঘর তাদের নামে নয়।

জমি নেই বলে ঠিকানা নেই। ঠিকানা নেই বলে জন্ম নিবন্ধন জটিল। জন্ম নিবন্ধন নেই বলে জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া কঠিন। জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বলে ভোট দিতে পারে না। ভোট দিতে পারে না বলে রাজনীতিবিদরা তাদের চেনে না। রাজনীতিবিদরা চেনে না বলে তাদের সমস্যা কারো এজেন্ডায় নেই। একটা বৃত্ত। বন্ধ বৃত্ত। চার প্রজন্ম এই বৃত্তের ভেতরে ঘুরছে।

সরস্বতীর স্বামী মঙ্গল একবার ইউনিয়ন পরিষদে গিয়েছিল। জন্ম নিবন্ধনের জন্য। চেয়ারম্যান বলেছিলেন, "তোমাদের তো কোনো কাগজপত্র নেই। জমি নেই, দলিল নেই। কীভাবে করব?" মঙ্গল বলেছিল, "আমরা এখানে জন্মেছি, এখানে মরব, কাগজ কোথা থেকে আসবে?" চেয়ারম্যান চুপ করে গিয়েছিলেন। চুপ করে যাওয়া মানে সমস্যা স্বীকার করা, কিন্তু সমাধান না করা।

সরস্বতী ভোট দিতে পারে না। দেশের নাগরিক, কিন্তু দেশ তাকে চেনে না। সে চা বানায় যেটা পুরো দেশ খায়, কিন্তু দেশের কাছে সে অদৃশ্য।

বিকেলে ওজন হয়। সারদার দাঁড়িপাল্লায় ঝুড়ি তোলে।

সরস্বতীর ঝুড়ি: ২৬ কেজি। তিন কেজি বোনাস। বোনাস মানে কিছু না, মজুরি একই ১৭০ টাকা, কিন্তু দিনটা গোনা হবে। সারদার খাতায় টিক দেয়।

লক্ষ্মীর ঝুড়ি: ২১ কেজি। দুই কেজি কম। সারদার মাথা নাড়ে। "আবার কম হলো।" লক্ষ্মী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। সরস্বতী বলে, "আমারটা থেকে দুই কেজি ওর ঝুড়িতে দেন।" সারদার বলে, "সেটা তো নিয়ম না।" সরস্বতী বলে, "নিয়ম না হলে আমরা মরব, সেটাও নিয়ম?" সারদার চুপ করে যায়। দুই কেজি সরিয়ে দেয়। লক্ষ্মীর দিন গোনা হয়।

মা মেয়ের ঝুড়িতে নিজের শ্রম ঢালে। এটা হিসেবের বাইরে। এটা ভালোবাসার হিসেব, যেটা কোনো দাঁড়িপাল্লায় ওঠে না।

ফেরার পথে পায়ে কাদা। বর্ষায় এই পথ হাঁটুসমান কাদায় ডুবে যায়। এখন শুকনো মৌসুম, তাও গোড়ালি পর্যন্ত। জুতো নেই। সরস্বতীর জুতো নেই। খালি পায়ে হাঁটে, পাথর ফুটে, কাঁটা ফুটে, কিন্তু পায়ের তলা এত শক্ত হয়ে গেছে যে বেশিরভাগ কাঁটা ফোটে না। চার প্রজন্মের খালি পায়ের তলা।

সন্ধ্যায় বাগান থেকে ফেরার পথে সরস্বতী পার্বতীর স্কুলের দিকে তাকায়।

স্কুলটা বাগানের বাইরে। আধা কিলোমিটার দূরে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পুরোনো ভবন, দেয়ালের রঙ উঠে গেছে, কিন্তু ভেতরে ব্ল্যাকবোর্ড আছে, চক আছে, শিক্ষক আছেন। পার্বতী সেখানে ক্লাস সিক্সে পড়ে।

পার্বতী পড়তে পারে, লিখতে পারে, হিসেব করতে পারে। পার্বতী বাংলা পড়তে পারে, কিছু ইংরেজিও জানে। "My name is Parbati. I live in Srimangal." এটুকু বলতে পারে। সরস্বতী একটা শব্দও পারে না। সরস্বতীর ভাষা সাদ্রি, চা বাগানের ভাষা, যেটা বাংলাদেশের কোনো সরকারি ফর্মে লেখা নেই, কোনো টিভি চ্যানেলে বলা হয় না।

পার্বতী জানে ২৩ কেজি চা পাতায় ১৭০ টাকা মানে প্রতি কেজি ৭ টাকা ৩৯ পয়সা। পার্বতী জানে এক কেজি চা পাতা থেকে ২০০ গ্রাম তৈরি চা হয়। পার্বতী জানে সেই ২০০ গ্রাম প্যাকেটের দাম বাজারে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। পার্বতী হিসেব করতে পারে যে তার মায়ের শ্রমের মূল্য চূড়ান্ত পণ্যের মূল্যের কত ভাগ।

একদিন পার্বতী মাকে বলেছিল, "মা, তুমি যে পাতা তোলো, সেটা দিয়ে যে চা হয়, সেটা বিক্রি হয় তোমার মজুরির চল্লিশ গুণ দামে।" সরস্বতী বুঝেছিল সংখ্যাটা না, কিন্তু বুঝেছিল "চল্লিশ গুণ" মানে অনেক বেশি। অনেক বেশি মানে তাকে ঠকানো হচ্ছে। এটা সে আগেও জানত, কিন্তু সংখ্যায় শুনলে সত্যটা আরো তীক্ষ্ণ হয়।

সরস্বতী এই হিসেব জানে না। কিন্তু সে জানে যে হিসেব জানাটা জরুরি। যে হিসেব জানে না, তাকে ঠকানো সহজ। চার প্রজন্ম ধরে তাদের ঠকানো হয়েছে। ঠাকুমাকে বলা হয়েছিল জমি দেবে, দেয়নি। মাকে বলা হয়েছিল মজুরি বাড়বে, বাড়েনি। সরস্বতীকে বলা হয়েছিল ঘর পাকা করে দেবে, করেনি। প্রতিশ্রুতির স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে চার প্রজন্মের শ্রম।

পার্বতীকে কেউ ঠকাতে পারবে না। পার্বতী হিসেব জানে।

সরস্বতী ঘরে ফেরে। পিঠে ব্যথা। কোমরে ব্যথা। হাঁটুতে ব্যথা। পায়ের পাতায় কাদা, ঝুড়ির ফিতার দাগ কপালে। এই দাগ তার মায়ের কপালেও ছিল। ঠাকুমার কপালেও ছিল। চার প্রজন্মের কপালে একই দাগ। সরস্বতী চায় পার্বতীর কপালে এই দাগ না থাকুক।

রাতে লক্ষ্মী বলে, "মা, আমারও স্কুলে যাওয়া উচিত ছিল।"

সরস্বতী কিছু বলে না। এটা তার সবচেয়ে বড় ক্ষত। লক্ষ্মীকে স্কুলে পাঠাতে পারেনি। মঙ্গলের অসুখ হয়েছিল, দুই বছর কাজ করতে পারেনি, তখন লক্ষ্মীকে বাগানে নিয়ে যেতে হয়েছিল। বারো বছরের মেয়ে, মাথায় ঝুড়ি, হাতে চা পাতা। সেই দিনটা সরস্বতী মনে রাখে। লক্ষ্মী কাঁদেনি। একটা শব্দও করেনি। শুধু ঝুড়ি মাথায় তুলে নিয়েছিল, যেন জানত এই দিন আসবে।

"লক্ষ্মী, তোর বোনকে পড়াতে হবে। তুই আর আমি পাতা তুলব, পার্বতী পড়বে।"

"তারপর?"

"তারপর পার্বতী চাকরি করবে। অফিসে বসবে। টেবিলে চা খাবে। সেই চা হয়তো এই বাগানের হবে। কিন্তু সে তুলবে না, সে খাবে।"

লক্ষ্মী চুপ থাকে। সরস্বতী জানে লক্ষ্মীর ভেতরে কী চলছে। ক্ষোভ আছে, দুঃখ আছে, কিন্তু বোনের জন্য ভালোবাসাও আছে। আদিবাসী পরিবারে বড় বোন মানে দ্বিতীয় মা। লক্ষ্মী সেই ভূমিকা নিয়েছে, নিজের ইচ্ছায় নয়, পরিস্থিতির জোরে।

সরস্বতী শোয়। মাটির মেঝে, পাতলা চাটাই, একটা কম্বল। দূরে বাগানের ফ্যাক্টরিতে মেশিন চলছে, চা পাতা শুকানো হচ্ছে, সেই গন্ধ বাতাসে ভাসছে। সরস্বতী এই গন্ধে জন্মেছে, এই গন্ধে বড় হয়েছে, এই গন্ধে বুড়ো হবে। কিন্তু পার্বতী? পার্বতী অন্য গন্ধ চিনবে। বইয়ের গন্ধ। অফিসের গন্ধ। নিজের ঘরের গন্ধ, যে ঘর তার নিজের, বাগানের নয়।

সরস্বতীর চোখ বুজে আসে। কাল আবার ভোর চারটা। কাল আবার ২৩ কেজি। কাল আবার ১৭০ টাকা।

কিন্তু প্রতিটা দিন পার্বতীকে একটু করে এগিয়ে দিচ্ছে। প্রতিটা পাতা একটু করে পার্বতীর স্কুলের খরচ জোগাচ্ছে। খাতার দাম, পেন্সিলের দাম, পরীক্ষার ফি, জুতোর দাম। প্রতিটা খরচ চা পাতায় মাপা যায়। একটা খাতা মানে দুই কেজি পাতা। একজোড়া জুতো মানে দশ কেজি পাতা। পরীক্ষার ফি মানে একদিনের পুরো ঝুড়ি।

সরস্বতী পাতা তোলে পার্বতীর জন্য। লক্ষ্মী পাতা তোলে পার্বতীর জন্য। মঙ্গল অসুস্থ শরীরে যেদিন পারে কাজ করে পার্বতীর জন্য। পুরো পরিবার একটা লক্ষ্যে।

দুটো জীবন পুড়ছে একটা জীবন বাঁচাতে।

এটা ত্যাগ নয়। এটা বিনিয়োগ। এটা চার প্রজন্মের বন্দিত্বের বিরুদ্ধে একটা পরিবারের বিদ্রোহ।

নীরব বিদ্রোহ।

ঝুড়ি মাথায় নিয়ে।

১৭০ টাকা দিয়ে।

একটু একটু করে।

পার্বতী যেদিন প্রথম চাকরির চিঠি পাবে, সেদিন সরস্বতী কাঁদবে। সারাজীবনের জমানো কান্না, যেটা ঝুড়ির ভারে চাপা ছিল, সেটা বেরিয়ে আসবে। সেই কান্না হবে আনন্দের। সেই কান্না হবে চার প্রজন্মের মুক্তির।

সেদিন পার্বতী আম্মাকে চা বানিয়ে দেবে। নিজের ঘরে। নিজের রান্নাঘরে। ভালো চা। দুধ চা। চিনি দিয়ে।

আর সরস্বতী সেই চায়ে চুমুক দেবে। প্রথমবার। জীবনে প্রথমবার সে চা তুলবে না, চা খাবে।

আমার মেয়ে চা পাতা তুলবে না।

সে চা খাবে।