ফ্রিল্যান্সার

যে ছাড়তে বলবে, সে আমার জন্য না।

পর্ব ৩২ · ১৫ মিনিট পড়া · ২০২৬-০৩-২০

মিতুর ঘরে দুটো জানালা।

একটা রাস্তার দিকে, যেটা দিয়ে রিকশার ঘণ্টা শোনা যায়, ফেরিওয়ালার ডাক শোনা যায়, মফস্বলের সেই চিরকালের শব্দ যেটা সকাল থেকে রাত অবধি চলে। ভোরে আজানের শব্দ, তারপর কাকের ডাক, তারপর স্কুলের ঘণ্টা, তারপর বাজারের হই-হল্লা, তারপর সন্ধ্যার নীরবতা, তারপর ঝিঁঝিঁ পোকা। রাস্তার জানালা দিয়ে মফস্বলের সময় দেখা যায়, ঘড়ি না দেখেও বোঝা যায় কটা বাজে।

আরেকটা জানালা পেছনের দিকে, পুকুরপাড়ে, যেখানে সন্ধ্যায় বকেরা আসে। মিতু দ্বিতীয় জানালার দিকে তাকিয়ে কাজ করে। পুকুরের পানিতে আকাশ উল্টে পড়ে থাকে, সেটা দেখলে মিতুর মনে হয় পৃথিবীটাও উল্টে দেখা যায়। উল্টে দেখলে অনেক কিছু বোঝা যায় যেটা সোজা দেখলে বোঝা যায় না। যেমন মফস্বলে বসে বিশ্বের সাথে কাজ করা। সোজা দেখলে অসম্ভব। উল্টে দেখলে, মানে ইন্টারনেটের চোখ দিয়ে দেখলে, সহজ।

মিতুর ল্যাপটপটা পুরোনো। একটা রিফার্বিশড Lenovo, ময়মনসিংহ শহরের কম্পিউটার দোকান থেকে কেনা, বারো হাজার টাকায়। স্ক্রিনের বাঁ দিকে একটা মরা পিক্সেল আছে, সবসময় সবুজ জ্বলে থাকে। মিতু সেটাকে "চোখ" বলে ডাকে। "চোখটা আজও জেগে আছে," রাতে কাজ করতে বসলে বলে। একা থাকা মানুষ জিনিসের সাথে কথা বলে, এটা পাগলামি নয়, এটা টিকে থাকার কৌশল।

কিবোর্ডের কয়েকটা লেটার মুছে গেছে। A নেই, S নেই, E নেই। সবচেয়ে বেশি চাপা হয় যে অক্ষরগুলো, সেগুলোই আগে মুছে যায়। মিতু অন্ধের মতো টাইপ করে, আঙুল জানে কোথায় কী আছে। এই ল্যাপটপটা মিতুর শরীরের এক্সটেনশন হয়ে গেছে, যেমন কৃষকের লাঙল, জেলের জাল, সেরকম।

চব্বিশ বছর বয়স। অনার্স শেষ করেছে, বাংলায়।

মাস্টার্স করেনি। মাস্টার্সের খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। বাবা প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক, বেতন আঠারো হাজার। মায়ের আয় নেই। মা সারাজীবন ঘর সামলেছেন, রান্না করেছেন, বাচ্চা মানুষ করেছেন। মায়ের কাজের বাজারমূল্য শূন্য, কিন্তু মায়ের কাজ ছাড়া এই পরিবার চলত না। এই প্যারাডক্সটা মিতু বোঝে, এই প্যারাডক্স নিয়ে মিতু ভাবে, কিন্তু এই প্যারাডক্সের সমাধান মিতুর কাছে নেই।

এক ভাই, ক্লাস নাইনে পড়ে। ভাই তানভীর। তানভীরের জন্য কোচিং লাগে, বই লাগে, জামা লাগে। তানভীর জানে দিদি কম্পিউটারে কাজ করে টাকা কামায়। তানভীর কখনো জিজ্ঞেস করে না "কী করো?" তানভীর দেখেছে দিদির টাকায় তার কোচিংয়ের ফি জমা হয়। তানভীরের কাছে সেটাই যথেষ্ট প্রমাণ।

মিতু পরিবারের সবচেয়ে বেশি আয় করে। এই কথাটা বলতে গেলে মিতুর গলায় একটা অদ্ভুত জট পাকায়, গর্বও আছে, কষ্টও আছে। গর্ব কারণ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। কষ্ট কারণ বাবার চেয়ে বেশি কামানো মানে বাবাকে ছোট করা নয়, কিন্তু সমাজ সেভাবে দেখে। মেয়ে বাবার চেয়ে বেশি কামায়, এটা গর্বের বিষয় হওয়া উচিত, কিন্তু বাংলাদেশে এটা একটা অস্বস্তিকর সত্য যেটা পরিবারে ফিসফিস করে বলা হয়, উচ্চস্বরে নয়।

মিতুর দিন শুরু হয় সকাল নয়টায়।

অন্য মেয়েরা এই সময়ে ঘর ঝাড়ু দেয়, কাপড় ধোয়, বাজারের ফর্দ লেখে। মিতুও করে। কিন্তু তার আগে Upwork খোলে, মেসেজ চেক করে। টাইমজোনের পার্থক্য মিতুর শত্রু আর বন্ধু দুটোই। আমেরিকায় রাত যখন, বাংলাদেশে সকাল। ক্লায়েন্ট রাতে মেসেজ পাঠায়, মিতু সকালে দেখে। মিতু সকালে কাজ করে পাঠায়, ক্লায়েন্ট দুপুরে পায়। এই চক্রটা চলে।

মা বলে, "আগে নাশতা খা, তারপর ওই যন্ত্র খোল।" মিতু বলে, "মা, ক্লায়েন্ট অপেক্ষা করছে।" মা বলে, "ক্লায়েন্ট কে? সে কি তোর মা?" মিতু হাসে। মায়ের যুক্তির সামনে কোনো ক্লায়েন্টের ডেডলাইন টেকে না।

নাশতা খেয়ে কাজে বসে। টেবিল নেই, বিছানায় বসে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে কাজ করে। পিঠে ব্যথা করে। ঘাড়ে ব্যথা করে। মিতু জানে এটা ভালো না, কিন্তু টেবিল কেনার সামর্থ্য নেই। একটা ভালো টেবিল তিন হাজার টাকা। তিন হাজার টাকা মানে তানভীরের এক মাসের কোচিং ফি। মিতু পিঠের ব্যথা সহ্য করে, তানভীর কোচিংয়ে যায়।

গ্রাফিক ডিজাইন মিতু শিখেছে ইউটিউব থেকে।

কেউ শেখায়নি। কোনো কোর্সে ভর্তি হয়নি। টাকা ছিল না কোর্সের। তিন বছর আগে, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে, বন্ধু শারমিনের ফোনে একটা ভিডিও দেখেছিল, কেউ একজন Canva তে পোস্টার বানাচ্ছে। মিতুর মনে হয়েছিল, "এটা তো আমিও পারব।" সেই "পারব" থেকে শুরু।

Canva থেকে Photoshop। Photoshop ভারী সফটওয়্যার, পুরোনো ল্যাপটপে চলতে কষ্ট হয়, ফ্যান জোরে ঘোরে, গরম হয়ে যায়। মিতু একটা ছোট প্লাস্টিকের ফ্যান কিনেছিল, USB তে চলে, ল্যাপটপের নিচে রাখে। সেই ফ্যানটা মিতুর প্রথম "পেশাগত সরঞ্জাম।"

Photoshop থেকে Illustrator। Illustrator থেকে Figma। প্রতিটা ধাপ ইউটিউব ভিডিও, ইংরেজি, সাবটাইটেল পড়ে বুঝেছে। প্রথম ছয় মাস কিছু বুঝত না। "Bezier curve" কী সেটা বুঝতে দুই সপ্তাহ লেগেছিল। "Kerning" বুঝতে আরো এক সপ্তাহ। প্রতিটা নতুন শব্দ ছিল একটা পাহাড়, আর মিতু সেই পাহাড় একটা একটা করে পার হয়েছে, কোনো গাইড ছাড়া, কোনো শিক্ষক ছাড়া, শুধু ইউটিউবের সাবটাইটেল আর নিজের জেদ দিয়ে।

সাত মাসের মাথায় প্রথম লোগো বানিয়েছিল, পাশের বাড়ির মুদি দোকানের জন্য, বিনা পয়সায়। একটা সবুজ পাতার ভেতর দোকানের নাম। সাধারণ ডিজাইন, কিন্তু দোকানদার রাজ্জাক ভাই খুশি হয়ে দুই প্যাকেট বিস্কুট দিয়েছিলেন। সেটাই মিতুর প্রথম "পেমেন্ট।" মিতু সেই বিস্কুটের প্যাকেটের ছবি ফোনে রেখে দিয়েছে। কেন রেখেছে? কারণ প্রতিটা যাত্রার একটা শুরু থাকে, সেই শুরুটা মনে রাখা দরকার, যখন পথ কঠিন হয়, তখন শুরুর কথা মনে পড়লে সাহস আসে।

শারমিন মিতুর একমাত্র বান্ধবী যে বোঝে।

শারমিন নিজেও ফ্রিল্যান্সার। কন্টেন্ট রাইটিং করে। ফাইভারে। মাসে পনেরো হাজারের মতো কামায়। শারমিন ঢাকায় থাকে এখন, একটা মেসে, চারজন মেয়ে এক রুমে। শারমিন বলে, "ঢাকায় আয়, এখানে ইন্টারনেট ভালো, লোডশেডিং কম।" মিতু বলে, "আমি এখান থেকেই করব।"

শারমিনের সাথে রাতে ফোনে কথা হয়। কাজের কথা, ক্লায়েন্টের কথা, রেটের কথা। শারমিন বলে কোন ক্লায়েন্ট ভালো, কোনটা খারাপ, কোন দেশের ক্লায়েন্ট বেশি পে করে। দুজন মিলে শেখে, দুজন মিলে বাড়ে। মফস্বলের দুটো মেয়ে, যারা ইউটিউব থেকে শিখে বিশ্বের সাথে কাজ করে।

শারমিন একদিন বলেছিল, "মিতু, আমরা কি জানি আমরা কতটা অসম্ভব কাজ করছি? মফস্বলের মেয়ে, কোনো ট্রেনিং ছাড়া, কোনো ইনভেস্টমেন্ট ছাড়া, শুধু একটা পুরোনো ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট দিয়ে ডলার কামাচ্ছি?" মিতু বলেছিল, "অসম্ভব কিনা জানি না। দরকার ছিল, তাই করেছি।" দরকার। এই শব্দটাই চালিকাশক্তি। শখ না, প্যাশন না, দরকার।

এখন Upwork এ কাজ করে।

প্রোফাইলে লেখা আছে: "Graphic Designer. Logo. Brand Identity. Social Media." রেটিং ৪.৯। ১১৮টা কাজ শেষ করেছে। প্রতিটা কাজের পেছনে একটা গল্প আছে যেটা ক্লায়েন্ট জানে না।

ক্লায়েন্ট বেশিরভাগ আমেরিকান, কিছু ইউরোপিয়ান, কিছু অস্ট্রেলিয়ান। তারা জানে না মিতু কোথায় থাকে। তারা দেখে প্রোফাইলে "Bangladesh" লেখা, কিন্তু বাংলাদেশের কোন জায়গায়, কেমন জায়গায়, সেটা তারা কল্পনাও করতে পারে না। তারা জানে না মিতুর ঘরে লোডশেডিং হয়, দিনে দুবার, কখনো তিনবার। তারা জানে না লোডশেডিং মানে হঠাৎ অন্ধকার, হঠাৎ ফ্যান বন্ধ, হঠাৎ ইন্টারনেট নেই। তারা জানে না মিতু তখন ফোনের হটস্পটে কাজ করে, ফোনের ব্যাটারি ফুরিয়ে গেলে চার্জ করতে পারে না কারণ বিদ্যুৎ নেই, ল্যাপটপের ব্যাটারি দুই ঘণ্টা টেকে, সেই দুই ঘণ্টায় যতটুকু পারা যায় ততটুকু করে। তারা শুধু জানে মিতু সময়মতো ডেলিভারি দেয়, কাজ ভালো করে, রিভিশন ছাড়া। এটুকুই যথেষ্ট।

একবার একটা ডেডলাইন ছিল রাত বারোটায়। আমেরিকান সময়, মানে বাংলাদেশে সকাল। সেই রাতে ঝড় হয়েছিল। বিদ্যুৎ গেছে। ইন্টারনেটও গেছে। মিতু তিন কিলোমিটার হেঁটে গিয়েছিল শহরের একটা সাইবার ক্যাফেতে, রাত এগারোটায়, একা, ছাতা ছাড়া, ভিজতে ভিজতে। ক্যাফের মালিক অবাক হয়ে বলেছিল, "এত রাতে মেয়ে একা?" মিতু বলেছিল, "ডেডলাইন আছে।" ক্লায়েন্ট পরের দিন মেসেজ করেছিল, "Delivered right on time. Impressive." মিতু "Thanks" লিখেছিল। ঝড়ের কথা বলেনি। ভেজার কথা বলেনি। তিন কিলোমিটার হাঁটার কথা বলেনি। পেশাদারিত্ব মানে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখা, শুধু কাজ দেখানো।

পঁচিশ হাজার টাকা মাসে। কখনো ত্রিশ। কখনো কুড়ি। গড়ে পঁচিশ। ডলারে চারশোর কাছাকাছি। মফস্বলে এটা অনেক টাকা। বাবার বেতন আঠারো হাজার। মিতুর আয় বাবার চেয়ে বেশি। এই তথ্যটা পরিবারে কেউ উচ্চস্বরে বলে না।

"সারাদিন কম্পিউটারে কী করে?"

এটা মায়ের প্রশ্ন। প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে দুবার। মা বুঝতে পারে না। মায়ের জগতে কাজ মানে হাতে ধরা যায়, চোখে দেখা যায়। চাষ করলে ফসল দেখা যায়। দোকান দিলে পণ্য দেখা যায়। শিক্ষকতা করলে স্কুলে যেতে দেখা যায়। কিন্তু ঘরে বসে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা? এটা কাজ কীভাবে?

মিতু বুঝিয়েছে। অনেকবার বুঝিয়েছে। "মা, আমি ছবি বানাই। বিদেশের মানুষেরা আমাকে টাকা দেয়।" মা বলে, "বিদেশের মানুষ কেন তোকে টাকা দেবে?" মিতু বলে, "কারণ আমি ভালো কাজ করি।" মা বলে, "ভালো কাজ তো এখানেও আছে। স্কুলে পড়াও, সেটাও ভালো কাজ।"

মা ভুল বলে না। মা তার জগত থেকে বলে। সেই জগতে কম্পিউটার মানে গেম, ফেসবুক, টাইমপাস। সেই জগতে মেয়ে সারাদিন ঘরে বসে স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা মানে সমস্যা। সেই জগতে মেয়ের বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, চব্বিশ হয়ে গেল, এখনো বিয়ে হয়নি, এটা চিন্তার বিষয়।

একদিন মিতু মাকে দেখিয়েছিল। Upwork এর ড্যাশবোর্ড খুলে দেখিয়েছিল কাজের লিস্ট, রেটিং, ক্লায়েন্টের রিভিউ। মা দেখেছিলেন। ইংরেজি পড়তে পারেন না, কিন্তু সংখ্যা দেখেছিলেন। ডলারের চিহ্ন দেখেছিলেন। পাঁচটা তারা দেখেছিলেন। মা কিছু বলেননি। পরের দিন থেকে "সারাদিন কম্পিউটারে কী করে?" প্রশ্নটা একটু কমেছিল। একটু। পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

বাবা কিছু বলে না। বাবা বোঝে কি না, মিতু জানে না। কিন্তু বাবা প্রতি মাসে মিতুর দেওয়া টাকা নেয়, চুপচাপ, কোনো প্রশ্ন ছাড়া। সেটাই হয়তো বাবার বোঝা। বাবা একবার স্কুলের সহকর্মীকে বলেছিলেন, "আমার মেয়ে কম্পিউটারে কাজ করে, ভালোই কামায়।" মিতু জানে, কারণ বাবার সেই সহকর্মীর মেয়ে মিতুর বান্ধবী, সে মিতুকে বলেছিল। বাবা সরাসরি মিতুকে বলেননি। বাবারা বলেন না। বাবারা পেছনে বলেন।

বিয়ের প্রস্তাব আসে।

নিয়মিত আসে। আত্মীয়রা আনে, পাড়ার মানুষেরা আনে। "ছেলে ভালো, সরকারি চাকরি, ঢাকায় থাকে।" অথবা "ছেলে ব্যবসায়ী, নিজের দোকান, কুমিল্লায়।" অথবা "ছেলে প্রবাসী, মালয়েশিয়ায়, মাসে পঞ্চাশ হাজার পাঠায়।"

প্রতিটা প্রস্তাবের শেষে একই শর্ত: "বিয়ের পর ওই কম্পিউটারের কাজ ছাড়তে হবে।"

কেন? কারণ "শ্বশুরবাড়ি মানবে না।" কারণ "সংসার করতে হবে, কম্পিউটার নিয়ে বসে থাকলে সংসার হবে?" কারণ "মেয়েলোকের এসব করা উচিত না।"

একটা প্রস্তাব ছিল ভালো। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, ঢাকায় কাজ করে, বেতন ভালো। ছেলের মা এসেছিলেন দেখতে। চা খেয়ে, মিতুকে দেখে, জিজ্ঞেস করেছিলেন, "মেয়ে কী করে?" মিতুর মা বলেছিলেন, "কম্পিউটারে কাজ করে, ভালোই কামায়।" ছেলের মা বলেছিলেন, "বিয়ের পর তো সংসার করতে হবে। ওই কম্পিউটারের কাজ রাখা যাবে না।" মিতু পাশের ঘরে বসে শুনেছিল। শুনে বেরিয়ে এসেছিল। বলেছিল, "খালা, আমি কম্পিউটারের কাজ ছাড়ব না।" ছেলের মা থমকে গিয়েছিলেন। প্রস্তাব শেষ।

মিতু প্রতিবার একই কথা বলে: "যে ছাড়তে বলবে, সে আমার জন্য না।"

মা কাঁদে। "তুই বিয়ে করবি না?" মিতু বলে, "করব। কিন্তু যে আমাকে আমার কাজসহ চাইবে, তাকে।" মা বলে, "সেরকম ছেলে কোথায়?" মিতু বলে, "খুঁজতে হবে। না পেলে একাই থাকব।" মা আবার কাঁদে।

মফস্বলে একা থাকার ঘোষণা বিপ্লবের সমান।

মেয়ে বিয়ে করবে না? মানে কী? অসুখ আছে? চরিত্রে সমস্যা? মফস্বলের মানুষের চিন্তার পথ সরলরেখায় চলে: মেয়ে, বয়স, বিয়ে। এই তিনটা শব্দ একটা সমীকরণ, যেটার উত্তর সবসময় "বিয়ে হওয়া উচিত।" মেয়ে চব্বিশ আর বিয়ে হয়নি, মানে সমীকরণে গন্ডগোল আছে।

"কম্পিউটারে কী করে কে জানে।" এই কথাটা মিতু শুনেছে। প্রতিবেশী হালিমা খালার মুখে। ফিসফিস করে, কিন্তু মিতুর কানে আসে। দেয়ালের ওপাশ থেকে আসে। রাস্তার কোণা থেকে আসে। দোকানের সামনে থেকে আসে।

"ডলার কামাই মেয়ে? কীভাবে?"

এই ইঙ্গিত। এই বিষাক্ত ইঙ্গিত। মেয়ে ঘরে বসে ডলার কামাচ্ছে, তাহলে নিশ্চয়ই... কেউ সরাসরি বলে না। সরাসরি বললে মিতু উত্তর দিতে পারত, প্রমাণ দেখাতে পারত, Upwork প্রোফাইল খুলে দেখাতে পারত। কিন্তু ইঙ্গিত মানে ধোঁয়া, ধোঁয়া ধরা যায় না, ধোঁয়া শুধু দম বন্ধ করে।

মিতু জানে। মিতু শোনে। মিতুর ভেতরে কিছু একটা পুড়ে যায় প্রতিবার, কিন্তু সে ছাই সরিয়ে আবার কাজে বসে। কারণ ছাই সরানো ছাড়া উপায় নেই। কাজ বন্ধ করলে ইঙ্গিতকারীরা জিতবে। মিতু জিততে দেবে না।

১০

রাত এগারোটা। মিতু একটা লোগো ডিজাইন শেষ করছে।

ক্লায়েন্ট অস্টিন, টেক্সাসের একটা ছোট কফি শপ। তারা চায় একটা মিনিমালিস্ট লোগো, কফি কাপের সাথে সূর্যোদয়ের ইমেজ। মিতু তিনটা অপশন বানিয়েছে। প্রতিটা অপশনে ঘণ্টাখানেক সময় লেগেছে। ক্লায়েন্ট বলেছে, "Option 2 is perfect. You're amazing."

মিতু হাসে। স্ক্রিনের এপাশে, অন্ধকার ঘরে, লোডশেডিং চলছে, ফোনের টর্চে কিবোর্ড দেখা যাচ্ছে, মশা কামড়াচ্ছে, বাইরে কুকুর ডাকছে। ওপাশে অস্টিনের রোদ, কফির গন্ধ, এয়ার কন্ডিশন। দুটো জগত, একটা স্ক্রিনের দুই পাশে। মিতু সেতু। মফস্বল আর অস্টিনের মধ্যে একটা সেতু। সেই সেতুর নাম ইন্টারনেট, সেই সেতুর দাম মাসে ছয়শো টাকা, যেটা মিতু গ্রামীণফোনকে দেয়।

মিতু "Thank you" টাইপ করে। পাঠায়। ত্রিশ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় সাড়ে তিন হাজারের মতো। একটা লোগোতে। বাবা এই টাকা কামাতে পাঁচ দিন স্কুলে যান। এই তুলনাটা মিতু নিজেই করে, নিজের সাথে, এবং প্রতিবার একটু অপরাধবোধ হয়, কারণ বাবার তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতার চেয়ে মিতুর তিন বছরের দক্ষতা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এটা বাবার দোষ নয়। এটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দোষ যেটা শিক্ষকদের এত কম দেয় যে তাদের মেয়ের ফ্রিল্যান্সিং আয় বাবার বেতনকে ছাড়িয়ে যায়।

মিতু ল্যাপটপ বন্ধ করে। মরা পিক্সেলের সবুজ চোখটা নিভে যায়। ঘর অন্ধকার। জানালা দিয়ে পুকুরের উপর চাঁদের আলো দেখা যায়। মিতু ভাবে, এই পুকুরের ওপারে ঢাকা, ঢাকার ওপারে সমুদ্র, সমুদ্রের ওপারে অস্টিন। সব সংযুক্ত। একটা ইন্টারনেট কেবল দিয়ে। সেই কেবলটাই মিতুর মুক্তি। সেই কেবলটাই মিতুর চাকরি। সেই কেবলটাই মিতুর উত্তর সেই সব মানুষকে যারা জিজ্ঞেস করে "কীভাবে?"

মফস্বলে থাকে মিতু। মফস্বল ছাড়তে চায় না। ঢাকায় গেলে হয়তো আরো বেশি কামাতে পারত, ভালো ইন্টারনেট, লোডশেডিং কম, ক্লায়েন্টের সাথে সময় মেলে। কিন্তু মিতু ঢাকায় যেতে চায় না। মায়ের কাছে থাকতে চায়, বাবার কাছে থাকতে চায়, পুকুরের পাশে বসে কাজ করতে চায়, সন্ধ্যায় বকেরা আসলে দেখতে চায়। শুধু চায় মফস্বল তাকে বুঝুক। শুধু চায় মফস্বল তাকে সন্দেহ না করুক। শুধু চায় একটা মেয়ে ঘরে বসে কম্পিউটারে কাজ করলে সেটা কাজই হোক, অন্য কিছু নয়।

মিতু ঘুমায়। কাল সকালে আরেকটা অর্ডার আসবে। কাল আরেকটা লোগো বানাবে। কাল আরেকটু ডলার কামাবে। আর কাল হয়তো আবার কেউ জিজ্ঞেস করবে, "সারাদিন কম্পিউটারে কী করে?"

মিতু উত্তর দেবে না। উত্তর তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আছে। উত্তর তার পরিবারের ভাতের থালায় আছে। উত্তর তার ভাইয়ের স্কুলের বেতনে আছে। উত্তর তার ল্যাপটপের মুছে যাওয়া A, S, E অক্ষরে আছে, যেগুলো এত বেশি চাপা হয়েছে যে মুছে গেছে, কারণ কাজ হয়েছে, কাজ হচ্ছে, কাজ হবে।

যে বুঝবে, বুঝবে। যে বুঝবে না, তার জন্য মিতুর কাছে সময় নেই। কাজ আছে।

১১

ভোরে মিতুর ঘুম ভাঙে পাখির ডাকে।

জানালা দিয়ে আলো আসে, পুকুরের উপর কুয়াশা। মিতু উঠে ল্যাপটপ খোলে। নতুন মেসেজ। একটা নতুন ক্লায়েন্ট, লন্ডন থেকে। একটা রেস্তোরাঁর মেনু ডিজাইন চায়। বাজেট ভালো। মিতু প্রপোজাল লেখে।

তানভীর ঘুম থেকে উঠে দেখে দিদি ল্যাপটপে বসে আছে। তানভীর চা বানিয়ে আনে। চুপচাপ টেবিলে রাখে। কিছু বলে না। তানভীর জানে দিদি কী করে। তানভীর জানে এই ল্যাপটপ থেকে তার কোচিংয়ের টাকা আসে, তার বইয়ের টাকা আসে, তার ভবিষ্যতের টাকা আসে।

মিতু চায়ে চুমুক দেয়। মিষ্টি চা, একটু বেশি চিনি, যেভাবে মিতু পছন্দ করে। তানভীর মনে রাখে।

বাইরে রাস্তায় রিকশার ঘণ্টা বাজে। ফেরিওয়ালা ডাকে, "কাঁচা আম, কাঁচা আম!" মফস্বল জেগে উঠছে। মফস্বলের সকাল, মফস্বলের শব্দ, মফস্বলের আলো।

মিতু কাজ করে। পুকুরের জানালার দিকে তাকিয়ে। বকেরা এখনো আসেনি, বক সন্ধ্যায় আসে। কিন্তু পুকুরের পানিতে আকাশ আছে। উল্টে পড়া আকাশ।

মিতু সেই উল্টো আকাশের দিকে তাকিয়ে ডিজাইন করে। মফস্বলে বসে লন্ডনের জন্য।

দুটো জানালা। দুটো জগত। একটা মেয়ে।